জেলহত্যা ট্র্যাজেডি: একটি অপ্রকাশিত ঘটনা

  রণেশ মৈত্র ০৩ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রণেশ

চার জাতীয় নেতাকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর গভীর রাতে কারাপ্রকোষ্ঠে (ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে) নির্মমভাবে হত্যা করার খবর কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে দেয়া হয়নি, রেডিও টেলিভিশনেও নয়। ফলে আমরা কেউই জানতাম না এ মর্মান্তিক হত্যালীলার খবর। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ৬ নভেম্বর সকালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে বিশাল সমাবেশ চলছিল। কমপক্ষে হাজারখানেক ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ কর্মী ও শ’দেড়েক ন্যাপ-আওয়ামী লীগ-সিপিবির নেতাকর্মীর জমায়েত; সঙ্গে বিশাল কালো পতাকা। এসে উপস্থিত হলেন আওয়ামী লীগ কর্মী আমার সহপাঠী জ্যোতিরিন্দ্র নারায়ণ মজুমদার (গোদাবাবু) বঙ্গবন্ধুর বাঁধানো এক বিশাল ছবি নিয়ে। কেউ প্রধান গেট দিয়ে না ঢুকে অন্যান্য দিক থেকে এসে মাঠে সমবেত হয়েছেন, কারণ প্রধান গেট ছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশের নিয়ন্ত্রণে।

প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর গায়েবানা জানাজা; অতঃপর বের হবে শান্তিপূর্ণ এবং মৌন শোক মিছিল। ঘুরবে শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে হেড পেটি অফিস, অতঃপর সেখান থেকে অনন্তবাজার। সেখান থেকে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাসভবন এবং ওখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পর সমাপ্তি। মিছিল বের হওয়ার চেষ্টা করতেই মেইন গেটে পুলিশ বাধা দিল। পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে না বলতেই ছুটে এলেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি বললেন, দাদা, আমরাও শোকাচ্ছন্ন; কিন্তু কিছু তো করার নেই। আইন তো মানতে হবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এইমাত্র শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। তাই আপনারা মাঠের ভেতরেই আলোচনা সভা করে শেষ করুন- তাতে আমরা বাধা দেব না।

বললাম, মিছিল যাবেই। সুশৃঙ্খলভাবে যাবে, নিশ্চিত থাকুন। তবে যেহেতু ১৪৪ ধারার কথা বলছেন, তাই ৪ জন, ৪ জন করে সারিবদ্ধভাবে আমরা মৌন মিছিল নিয়ে গোটা রুট পরিক্রমণ করব। যদি পুলিশ বা আপনারা কোনো উসকানি না দেন, তাহলে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও শোক মিছিল হবে। তবে আপনারা উসকানি দিলে কী হবে জানি না- সে দায়িত্ব পুরোটাই আপনাদের। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের আয়োজন। আশা করি, সবাই বুঝে-শুনেই পদক্ষেপ নেবে। যা হোক, মিছিল বের হল দুই সারিতে। এক সারির সামনে জেলা আওয়ামীল লীগ সভাপতি আলহাজ আবু তালেব খোন্দকার (তালু হাজী নামে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন) ও অপর সারির সামনে আমি। যে দুই নেতার সঙ্গে আগের রাতে আলোচনা হয়েছিল তারাও ছিলেন। একজন মিছিলের মধ্যখানে, অপরজন মিছিল থেকে ২০০ গজ সামনে।

হঠাৎ ছুটে এল জ্যোতিরিন্দ্র নারায়ণ মজুমদার (গোদাবাবু), তার মাথায় বঙ্গবন্ধুর বিশাল ছবি। ওই ছবি নামিয়ে ফেলার হুকুম দিলেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। জবাবে জানানো হল ওই ছবি নামাতে গুলি করতে হবে, তাতেও নামবে কিনা জানা নেই। বিষয়টি আর এগোয়নি ম্যাজিস্ট্রেটের হস্তক্ষেপে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল, মিছিলটিতে কোনো স্লোগান না থাকলেও তার গন্তব্যের দেড় মাইল রাস্তার প্রতিটি মোড় থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ২০-৫০ জন করে মানুষ যোগ দিলেন। নানা পাড়া-মহল্লা থেকেও ছেলেরা এলো। ফলে দেখতে দেখতেই মিছিলটির আকার দ্বিগুণেরও বেশিতে পরিণত হল। মানুষ যেন এটাই চাইছিলেন, পারেনি নেতৃত্বের উদ্যোগের অভাবে।

এভাবে বিকাল হয়ে গেল শেষ গন্তব্য ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাসভবনের মাঠে গিয়ে পৌঁছাতে। সেখানে পৌঁছানোর পর দ্রুতই পুলিশ চারদিক ঘিরে ফেলে। শুরু হয় সমাবেশ। বক্তা একজন। তার বক্তৃতা শুরু হতে না হতেই ঢাকা থেকে আসা এক ছেলে জানাল ক্যাপ্টেন মনসুরসহ চার জাতীয় নেতাকে কারাগারে হত্যা করা হয়েছে। খবরটি সমাবেশস্থলে মুখে মুখে প্রচার হয়ে গেলে উত্তেজনায় সবাই ফেটে পড়ে। এবারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কিনা ভয়ানক দুশ্চিন্তায় পড়া গেল; কিন্তু উঠে দাঁড়িয়ে খুব কড়া ভাষায় ঘটনার নিন্দা করে বলা হল- খবরটির সত্যতা যাচাই করে সত্য হয়ে থাকলে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে- একের পর এক হত্যালীলা কিছুতেই মনে নেয়া হবে না। এখনকার মতো সমাবেশ সমাপ্ত। ধীরে ধীরে সবাই ফিরে গেলেন।

সেদিন মনে এ ধারণাও দৃঢ় হয়েছিল, দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ১৫ বা ১৬ আগস্ট যদি কোনো নেতা আহ্বান জানাতেন, তবে শক্তিশালী গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হতো। আর তা যদি করা যেত, তাহলে পরবর্তীকালে গণতন্ত্র হরণও সম্ভবত এড়িয়ে যাওয়া যেত। চার জাতীয় নেতাকেও আমরা হারাতাম না এবং তারাই আবারও হয়তো মন্ত্রিসভা গঠন করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে পারতেন।

তা করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। কেন? মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থেকেই ক্ষমতার যে স্বাদ ও বিলাসবহুল জীবনের সন্ধান পেয়েছিলেন একশ্রেণির নেতা, তারা নানাভাবে অর্জিত সম্পদ ও জীবন হারাতে রাজি ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু নিজেই তো আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি পেয়েছি চাটার দল’। বাস্তবে তা তখন যেমন সত্য প্রমাণিত হয়েছিল, এত বছর পর আজ আবার তা ততধিক সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। তাই দুর্নীতির সীমাহীন প্রকোপ জাতির নজরে আসছে। আজও প্রমাণিত, শক্তি কম হলেও বামপন্থীরা নিষ্ঠাশীল।

এবার ৩ নভেম্বরে তাই ভাবার প্রয়োজন- নেতাদের এবং শহীদদের স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা কীভাবে গড়ে তুলব? সে সোনার বাংলার রূপই বা কী হবে? জবাবে নিশ্চয়ই আমরা সমস্বরে বলব :

এক. বাহাত্তরের সংবিধান অবিকল পুনঃস্থাপন করে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ; দুই. নারী অধিকার, সর্বক্ষেত্রে নারীর সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং নারী নির্যাতন কঠোর হস্তে দমন; তিন. দেশকে কঠোরভাবে দুর্নীতিমুক্তকরণ; চার. শিক্ষাকে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত করে একমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন; পাঁচ. দেশের সব নাগরিক ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে যাতে সব ক্ষেত্রে সমানাধিকার ভোগ করতে পারেন তার নিশ্চয়তা নিধান; ছয়. বর্তমান ও বিগত দশকে সংঘটিত সব সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার ও দায়ী অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতকরণ; সাত. শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি জনগণের যৌক্তিক সব দাবি পূরণ, বেকার সমস্যার সমাধান ও দেশে নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ইত্যাদি। এসব অর্জন করতে পারি যদি, তবেই নেতাদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করা হবে; নয়তো সবই হবে অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতা।

রণেশ মৈত্র : সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×