প্রগতির অভিযাত্রায় ৭৪ বছরে ইউনেস্কো

  কাজী ফারুক আহমেদ ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইউনেস্কো

জাতিসংঘের বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্থা হিসেবে পরিচিত ইউনেস্কো আজ ৭৪ বছরে পদার্পণ করছে। আজকের দিনেই সংগঠনটির গঠনতন্ত্র স্বাক্ষর হয়। বাংলাদেশে ইউনেস্কোর কার্যক্রম বিশেষ প্রশংসা পেয়ে আসছে। প্যারিসে ইউনেস্কোর ৩৯তম সাধারণ সম্মেলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ইউনেস্কো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলা ও ইংরেজিতে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ মুদ্রণ, শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদাসংক্রান্ত ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালের সনদ বাংলায় প্রকাশ, বিশ্ব শিক্ষক দিবস জাতীয়ভাবে উদ্যাপনে সহযোগিতা প্রদান, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে বিশাল ভূমিকা পালন, সুন্দরবন সুরক্ষা উদ্যোগ, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের ঐতিহ্য স্মারকগুলো সংরক্ষণ থেকে শুরু করে মানব উন্নয়নের নানা কর্মসূচিতে ইউনেস্কোর অবদান অনস্বীকার্য।

শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ করে, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শিক্ষকদের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ উল্লেখের দাবি রাখে। প্যারিসে প্রধান কার্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর এডুকেশনাল প্ল্যানিংয়ের (আইআইইপি) সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণামূলক ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রকাশনার জন্য শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগী সবার কাছে ইউনেস্কো বিশেষভাবে সমাদৃত।

ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক প্রকাশনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : এমপাওয়ারিং স্টুডেন্টস ফর জাস্ট সোসাইটিজ, কমিট টু এডুকেশন, সাপোর্টিং টিচার্স উইথ মোবাইল টেকনোলজি। ২০১৯-এর বৈশ্বিক শিক্ষা পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু : ‘অভিবাসন, বাস্তুচ্যুতি ও শিক্ষা : দেয়াল নয়, প্রয়োজন সেতুবন্ধ’-এর ভূমিকায় জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘শিক্ষা একটি মানবাধিকার।

শিক্ষা-দারিদ্র্য বিমোচন, স্থায়িত্বশীলতা অর্জন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রূপান্তরমূলক শক্তি। শিক্ষার জন্য হোক বা কাজের জন্য হোক, স্বেচ্ছায় হোক বা বাধ্যতামূলকভাবে হোক, যারা অভিবাসী হয়, তারা শিক্ষার অধিকার থেকে যেন বঞ্চিত না হয়। অভিবাসী ও বাস্তুচ্যুতরা মানসম্পন্ন শিক্ষা পেলে যে ব্যাপক সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, সে বিষয়টির যে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, বৈশ্বিক শিক্ষা পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন ২০১৯-এ তা তুলে ধরা হয়েছে।’

ইউনেস্কোর কাছে নৈতিক মানদণ্ড প্রত্যাশা

১২ নভেম্বর থেকে ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দফতরে এর ৪০তম সাধারণ সম্মেলন শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। বিশ্বের ১৯৩টি দেশ এতে অংশ নিচ্ছে। বুধবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ইউনেস্কোর অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্রের শিক্ষামন্ত্রীরাও বক্তব্য দেন। তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে দীপু মনির তুলে ধরা কর্মপরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

এতে দেখা যায়, অনেক দেশের চেয়েই এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) শিক্ষার লক্ষ্য নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। এখন যেভাবে চলছে তাতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যও (এসডিজি) যথাসময়ে অর্জন করা সম্ভব হবে। সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের লক্ষ্য গুণগত শিক্ষায়ও রোল মডেল হওয়া।

স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এটি সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত করেছি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে রোবটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মতো বিষয়গুলো বিস্ময়কর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে একটি নৈতিক মানদণ্ড তৈরি করা জরুরি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার কাজ চলছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ আইসিটি শিক্ষায় খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি লেভেলে ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপনসহ ডিজিটাল সেন্টার চালু করা হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে।

প্রান্তিক জনপদেও আইসিটি শিক্ষা চালু করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজের ভাষায় শিক্ষায় জোর দেয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রাইমারি শিক্ষায় এনরোলমেন্টের হার ৯৮ শতাংশ এবং ছেলে শিক্ষার্থীর তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। আমরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুসহ প্রতিটি শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই।

জাতীয় পরিধি থেকে শিক্ষায় বিশ্বায়ন

ঐতিহ্যগত অবস্থান ও প্রগতিশীল শিক্ষা কার্যক্রমে বিভিন্নতা সত্ত্বেও সহাবস্থানের পরিস্থিতিতে বিগত পাঁচ দশকে দেশে দেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষা এখন জাতীয় পরিধিতে সীমিত নেই। শিক্ষায় বিশ্বায়ন হয়েছে। মানুষকে সম্পদে রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০০০ সাল থেকে শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ সুস্পষ্ট। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য থেকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার রূপান্তরে তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার।

বিশ্বব্যাপী শিক্ষায় সূচিত পরিবর্তন সত্ত্বেও আমাদের দেশে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ, প্রযুক্তি ও তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অবস্থানে সঙ্গতি, বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন অপরিহার্য, সময়ের দাবি। এদিকে তিনটি প্রশ্নের সদুত্তর সন্ধান করছে বিশ্ব : এক. শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থী কি শুধু শিক্ষা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে? দুই. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কত ব্যাপকভাবে শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম? তিন. শিল্প-কলকারখানায় অটোমেশনের মতো শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব কতটুকু পড়তে পারে?

আমাদের দেশ প্রসঙ্গে বলতে হয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নত কর্মসংস্থানে আমাদের শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? ওইসিডি (পিসা) পরিচালিত কর্মসূচিতে বাংলাদেশের যুক্ত না হওয়ার ফলে তরুণ সমাজ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে? জীবন গঠনে, কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান নিশ্চিতে, বিশ্ব-প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনে, মুক্তচিন্তা বিকাশে আমাদের শিক্ষা কতটুকু কাজে আসছে? স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নেতিবাচক দৃষ্টান্তের প্রাধান্যের পরিবর্তে বহুগুণ বেশি সৃজনশীল ও ইতিবাচক দৃষ্টান্তকে কীভাবে সামনে নিয়ে আসা যায়?

ইউনেস্কোর ওপর অবিচল আস্থা

ইউনেস্কোর তথ্য পরিসংখ্যানের ব্যাপকতা ও নির্ভুলতায় আমার আস্থা দীর্ঘদিনের। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান সংকট মোকাবেলায়, জটিল সমস্যা নিরসনে এ বিশ্ব সংস্থাটির প্রগতিশীল উদ্যোগ ও কার্যক্রম অনেকের মতো আমার মনেও আশার সঞ্চার করে। দেশে দেশে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষানীতি আলোচনা-পর্যালোচনা করে নতুন আলোর রেখাপাতে ইউনেস্কো এক কথায় অনন্য।

বিশ্ব সংস্থাটির ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বছরে আন্তরিকভাবে আশা করি, সব বাধা ও সংকট অতিক্রম করে ইউনেস্কো বিশ্বব্যাপী শিক্ষানুরাগী, বিজ্ঞানমনস্ক ও সংস্কৃতিসেবী মানুষের কাছে অব্যাহতভাবে নতুন নতুন সাফল্য ও অর্জন তুলে ধরবে। প্রগতির অভিযাত্রায় ইউনেস্কোর উত্তরোত্তর সাফল্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : ১৯৯৭ সালে প্যারিসে ইউনেস্কোর ২৯তম সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য; জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অন্যতম প্রণয়নকারী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×