স্বদেশ ভাবনা

অব্যবস্থাপনা ও বাড়তি লোভ মূল্যস্ফীতির কারণ

  আবদুল লতিফ মন্ডল ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অব্যবস্থাপনা ও বাড়তি লোভ মূল্যস্ফীতির কারণ

সম্প্রতি রান্নার জন্য অতি প্রয়োজনীয় মসলা পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম ২৬০ টাকায় পৌঁছে পণ্যটির দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে।

সেই সঙ্গে বেড়েছে চাল, গম, ভোজ্যতেল, ডালসহ অনেক খাদ্যপণ্যের দাম। এসব পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সরকারের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়ীদের লোভ এ জন্য দায়ী। আর এতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে কোনো পণ্যের দামে ওঠানামা নির্ভর করে বাজারে পণ্যটির সরবরাহ (দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি) ও চাহিদার ওপর।

চাহিদার চেয়ে বাজারে পণ্যটির সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে, আর চাহিদার তুলনায় বাজারে সেটির সরবরাহ কম হলে দাম বাড়ে। এখানে ‘বাজারে’ কথাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কোনো পণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন তথা মোট সরবরাহ সম্পর্কে সরকারের কাছে সঠিক তথ্য না থাকায় সরকার আগেভাগে পণ্যটির সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা না নেয়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলে বাজারে সেটির মূল্যস্ফীতি ঘটতে পারে।

দ্বিতীয়ত, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে কোনো পণ্য মজুদ থাকলেও সরকারের দুর্বল তদারকি ও সঠিক সময়ে ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে ব্যবসায়ীরা লাভের অঙ্ক বাড়াতে সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে সেটির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় পণ্যটির দামে উল্লম্ফন ঘটতে পারে।

দেশে পেঁয়াজ সংকটের কথাই ধরা যাক। এ পণ্যটির সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ে রয়ে গেছে অস্বচ্ছতা। দৈনিক বণিক বার্তার ২ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) হিসাবে গত (২০১৮-১৯) অর্থবছরে দেশে পণ্যটির উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ১৯ হাজার টন।

অন্যদিকে সরকারি তথ্য সংগ্রহ, সংকলন ও প্রকাশের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ টন। এর আগের অর্থবছরেও দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে ডিএই এবং বিবিএসের তথ্যের পার্থক্য দেখা যায়।

দৈনিক প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিবিএসের হিসাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ১৭ লাখ টনের কিছু বেশি, অন্যদিকে ডিএইর হিসাবে এ পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ টন।

সরকারি হিসাবে দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। গত অর্থবছরে ২৬ লাখ ১৯ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২ দশমিক ১৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়ে থাকলে বাজারে পণ্যটির সংকট দেখা দেয়ার কথা নয়।

তবে কেউ কেউ মনে করছেন, গত অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ বেশি করে দেখানো এবং দেশে পেঁয়াজের প্রকৃত চাহিদা সরকার নির্ধারিত চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হওয়া পণ্যটির বর্তমান ক্রাইসিসের জন্য দায়ী হতে পারে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের একটি সমিতি জানিয়েছে, পেঁয়াজের চাহিদার ৬০ শতাংশ মেটানো হয় দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ থেকে। বাকি ৪০ শতাংশ আমদানি করা হয়।

আর ভারত থেকেই সিংহভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর পণ্যটির দাম অবিশ্বাস্যভাবে বাড়তে থাকে।

১৫ নভেম্বর যুগান্তরের অনলাইন সংস্করণে পৃথিবীর কয়েকটি দেশের খুচরা বাজারে বাংলাদেশি মুদ্রায় পেঁয়াজের দাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে দেখা যায়, লন্ডনে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৫৫, বার্লিনে ৯২, ইতালিতে ১০০, স্পেনে ৭০, সৌদি আরবে ৩৫, বাহরাইনে ৫০, কুয়েতে ৫৫, ওমানে ৪০, কাতারে ৪৬, চীনের বেইজিংয়ে ৩৫, ব্রাজিলে ৫০ এবং মিসরে ২৫-৩০ বাংলাদেশি টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অনেকে মনে করছেন, দেশে পেঁয়াজের দামে উল্লম্ফনের জন্য মূলত ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটই দায়ী। ১৭ নভেম্বর যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা বেড়েই চলেছে।

বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রতিদিনই বাড়ানো হচ্ছে এর দাম। দুই মাস ধরে এ অবস্থা চলছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ছিল ৩০ থেকে ৩৩ টাকা।

ভারত পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়ানোর ফলে এর দাম আরও বেড়ে ৭০ টাকায় ওঠে। তবে অন্য দেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি কেজির খরচ পড়েছে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা। ওইসব পেঁয়াজ এই দুই মাসে বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা দরে। এভাবে বাড়তি মুনাফা করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা গত দুই মাসে কমপক্ষে দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ভোক্তার পকেট থেকে।

পেঁয়াজের দামে উল্লম্ফনে যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, তখন চাল, গম, ভোজ্যতেলসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আমনের ভরা মৌসুমে বাড়ছে আমাদের প্রধান খাদ্য চালের দাম। চলতি সপ্তাহে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে মোটা, চিকন ও সুগন্ধী চালের দাম বেড়েছে। কেজিতে চিকন চালের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত এবং মোটা চালের দাম ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আর বস্তাপ্রতি বিভিন্ন জাতের চালের দাম ৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাড়ছে খাদ্যশস্য হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে থাকা গমের দামও। সপ্তাহের ব্যবধানে গমের দাম মণপ্রতি ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে। গমের দাম বাড়ার কারণে আটা ও ময়দার দামও বেড়ে গেছে।

নিুমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ভরসা ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। গরিবের আমিষ নামে খ্যাত ডালের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কমবেশি এক সপ্তাহের ব্যবধানে এক কেজি মুগডালের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চলতি বাজেটে শুল্ক বৃদ্ধির কারণে বাড়ছে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম। বেড়েছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম।

পেঁয়াজ ছাড়াও বেড়েছে অন্যান্য মসলার দাম। গত কয়েক দিনে আদার দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। রসুনের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০ টাকা পর্যন্ত। কাঁচা মসলার (পেঁয়াজ, রসুন, আদা) পাশাপাশি বেড়েছে গরম মসলার দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকায় ঠেকেছে এলাচের দাম। বেড়েছে হলুদ ও শুকনো মরিচের দামও।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, নিত্যপণ্যের বাজারে উল্লম্ফনে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গকারী পেঁয়াজের দাম এবং আমনের ভরা মৌসুমে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। পেঁয়াজের রেকর্ড ভঙ্গকারী দামের জন্য যে সিন্ডিকেশনই মূলত দায়ী, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তাদের মধ্যে মোটামুটি একটা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকারও এ মতের সঙ্গে অনেকটা একমত পোষণ করে যারা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছে। ১৬ নভেম্বর রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে পেঁয়াজের দাম এত বেড়ে গেল কেন, তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এ তদন্ত কি সত্যি হবে এবং হলেও জনগণ কি তার ফলাফল সম্পর্কে জানতে পারবে?

এখন চালের দামে ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে আলোচনা করা যাক। সরকারি তথ্য মোতাবেক, গত অর্থবছরে আউশের উৎপাদন হয়েছিল ২৭ লাখ টন। আর ১ কোটি ৪১ লাখ টন আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কৃষিমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৩ লাখ টনে। এক কোটি ৯৬ লাখ টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রকৃত উৎপাদনের পরিমাণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে আবহাওয়া অনুকূল থাকায় লক্ষ্যমাত্রা যে পূরণ হয়েছে, তা অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায়। কৃষিমন্ত্রীর দেয়া তথ্য মোতাবেক, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ অর্থবছরে (২০১৯-২০) আমনের উৎপাদন আরও বাড়বে। তাহলে আমন ধান কাটা-মাড়ার মৌসুমে চালের দামে ঊর্ধ্বগতি কেন? এখানেও চালকল মালিকদের সিন্ডিকেশনকে দায়ী করা হচ্ছে। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা এবং ধানের বাম্পার ফলন হওয়ার পর হঠাৎ করে চালের দাম বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাহলে প্রধান খাদ্য চালসহ নিত্যপণ্যাদির দামের ক্ষেত্রে ভোক্তারা কি সিন্ডিকেশনের হাতে জিম্মি হয়েই থাকবে?

আর যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হল- প্রতিযোগিতা কমিশন কী করছে? ২০১২ সালে প্রণীত ও কার্যকর হওয়া প্রতিযোগিতা আইনে বলা হয়েছে, দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ উৎসাহিত করা, নিশ্চিত ও বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি ও ওনিগোপলি অবস্থা, জোটবদ্ধতা অথবা কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহারসংক্রান্ত প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূলের লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কমিশন সিন্ডিকেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন? জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত প্রতিযোগিতা কমিশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, যে দেশে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যে দেশে প্রতি ছয়জন মানুষের একজন অপুষ্টিতে ভুগছে, সে দেশের মানুষ সরকারের অব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়ীদের লোভের কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে বারবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে- এটা মেনে নেয়া যায় না। এর বিহিত হওয়া প্রয়োজন।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×