নিজ অবদানে স্মরণীয় থাকবেন মুক্তিযোদ্ধা খোকা

  হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে কফিনে মোড়ানো লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে নিজ জন্মভূমিতে ফিরলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। ’

৭১-এ দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রাম ও যুদ্ধে জয়ী হয়ে তেজোদীপ্ত, তরুণ-তুর্কি বীরের বেশে যেভাবে দেশে ফিরেছিলেন, এবার তা হল না। এবার জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে তার নিশ্চল-নিথর দেহ ফিরে এলো। ১৯৫২ থেকে ২০১৯- মাত্র ৬৭ বছর বয়সে এ মহান নেতার প্রাণপ্রদীপ নিভে গেল।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি-ক্যান্সারে ভুগছিলেন। আর এ ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ মে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানেই তার চিকিৎসা চলছিল। দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সার থেকে আর মুক্ত হতে না পেরে অবশেষে ৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনে স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খোকা মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বমহলে।

মূলত জীবনের নানা বাঁকে, নানা সময়ে, নানা কাজকর্মের মাধ্যমে যারা সাদেক হোসেন খোকার সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাদের স্মৃতিকথায় সাদেক হোসেন খোকার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সাফল্যের দিক তুলে ধরছিলেন। ফলে আমরাও এসব রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনের কথোপকথন থেকে তার জীবনযুদ্ধের অজানা কাহিনী সম্পর্কে জানতে পেরে গর্বিত।

সাদেক হোসেন খোকার মারাত্মক অসুস্থতার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রীও তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে খোকার মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে আনার ব্যাপারে সরকারের প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রশংসার দাবিদার।

খোকার মৃত্যুতে তার নিজের রাজনৈতিক দল বিএনপি ৬ নভেম্বর শোক দিবস পালনসহ দিবসটির অংশ হিসেবে ঢাকাসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, নেতাকর্মীদের কালো ব্যাজ ধারণ এবং কোরআনখানির আয়োজন করে।

সংসদ ভবনসহ ৫টি স্থানে খোকার জানাজায় মানুষের ঢল নামে। তারপর ঢাকা জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে পুলিশের ১৭ সদস্যের একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম ও গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানায় এ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাকে। সর্বশেষ সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা স্যালুট জানানোর পর জুরাইনের কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে সাদেক হোসেন খোকাকে অন্তিমশয়ানে সমাহিত করা হয়।

সাদেক হোসেন খোকার পৈতৃক নিবাস ছিল মুন্সীগঞ্জের সৈয়দপুরে। তার জন্ম ১৯৫২ সালের ১২ মে ঢাকার গোপীবাগে। শৈশব-কৈশোর থেকে শুরু করে তার রাজনৈতিক জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে এ গোপীবাগেই।

জনপ্রিয় এ রাজনীতিবিদ দলীয়ভাবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী; অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র থাকলেও এসব পরিচয় ছাপিয়ে খোকা খ্যাতিমান ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তার মমত্ববোধ-ভালোবাসা ছিল অসীম।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সর্বদা নিবেদিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করতে পারলে নিজেকে সার্থক মনে করতেন। ঢাকার মেয়র থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ঢাকার বিভিন্ন সড়কের নামকরণ করেছিলেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধারা কে কোন দল করেন, তা কখনও দেখেননি তিনি।

একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ই ছিল সবচেয়ে বড়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত ছিলেন এবং ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ওই সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা এলে সাদেক হোসেন খোকা পরিবারের অন্য কাউকে কিছু না জানিয়েই গোপনে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান।

মুক্তিযুদ্ধের ২নং সেক্টরে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। যে প্রশিক্ষণ শিবিরের নাম ছিল ‘মেলাঘর’।

এখানেই মেজর হায়দারের অধীনে তিন সপ্তাহ গেরিলা ট্রেনিং এবং সাবসেক্টরের দায়িত্বরত ক্যাপ্টেন গাফফারের (জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ও মন্ত্রী) কাছে সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করেন সাদেক হোসেন খোকা। ট্রেনিং শেষ করার পর তিনি কখনও সম্মুখযুদ্ধে আবার কখনও গেরিলাযুদ্ধে ঢাকায় বিভিন্ন অপারেশন চালিয়েছেন, যা তিনি তার ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বর্ণালি দিনগুলো’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন।

সেখানে তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের কথা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চিন্তা করলে তার মন সব সময় আবেগাপ্লুত হয়ে যেত। তিনি বলতেন, মন শুধু রণাঙ্গনের সাহসী সহযোদ্ধাদের হারানোর কারণেই ভারাক্রান্ত হয় না, তার চেয়েও বেশি হয় মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-চেতনার দুর্দশা দেখে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা স্বপ্ন যাই বলি না কেন সেটা শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়, একটি সার্বিক মুক্তিই ছিল এ মহান যুদ্ধের মূল স্পিরিট। সে কারণেই এর নাম হয়েছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’।

তাই এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাদেক হোসেন খোকা মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতা ও অসামান্য গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছিলেন- যা সবাইকে যেমন অনুপ্রাণিত করে, তেমনিভাবে এ জাতির শৌর্য-বীর্য ও গৌরব এনে দেয়।

১৯৯০ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার চেষ্টা হলে, তা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন খোকা। হিন্দুসহ সব ধর্মের মানুষের সার্বিক সাহায্যে ও রক্ষার্থে তিনি সব সময় এগিয়ে এসেছিলেন বীরদর্পে।

এতে করে পুরান ঢাকাবাসীর কাছে একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ হিসেবে তিনি আস্থা অর্জন করেন। ফলে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে ঢাকা-৭ আসনে (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) বিশাল ভোটের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো এমপি হন তিনি এবং মন্ত্রী হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঢাকার আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতে বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হলেও একমাত্র খোকাই নির্বাচিত হন শুধু ব্যক্তি জনপ্রিয়তার কারণে।

আবার ২০০১ সালেও একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন জনপ্রিয় এ রাজনীতিবিদ। ২০০১ সালে আবার বিএনপি সরকার গঠন করলে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় খোকাকে। ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে তিনি ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হন এবং ২৯ নভেম্বর ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন। জনবান্ধব নেতা হিসেবে যথেষ্ট সুনাম ছিল তার।

পুরান ঢাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের বিপদে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন। যখনই তারা তাকে ডেকেছেন, তখনই তিনি ছুটে গেছেন। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, বিনয়ের সঙ্গে সাহায্যের হাত প্রসারিত করছেন। রাজধানীবাসীর যে কোনো সমস্যা সমাধানের নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। এজন্য তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ছিল পুরান ঢাকার হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধরনের মানুষের মাঝে।

তার সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অপরিসীম। অসম্ভব ক্রীড়া অনুরাগী এ মানুষটি শুধু রাজনীতিতে নন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরেই ১৯৭২ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের দায়িত্ব নিয়ে ক্লাবকে তিন বছরের মধ্যে তৃতীয় থেকে প্রথম বিভাগে উন্নীত করেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খোকা ঢাকা ওয়ান্ডার্স ও ফরাশগঞ্জ ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ছিলেন। বহু খেলোয়াড় তার হাতে ও তার প্রেরণায় তৈরি হয়েছে।

আমাদের দেশে গণতন্ত্র, সুশাসনের যে সংকট চলছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য সাদেক হোসেন খোকার মতো ত্যাগী, নিবেদিত, সাহসী, অহিংস ও পরমতসহিষ্ণু নেতার বড্ড প্রয়োজন ছিল।

অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা, বিনয়ী ব্যবহার, সুখ-দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইত্যাকার কর্মকাণ্ড তার রাজনৈতিক জীবনে অসম্ভব জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, আইনের শাসন ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী ছিলেন এ মানুষটি। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তার অবদান ছিল সর্বজনবিদিত।

পক্ষান্তরে রাষ্ট্র ও সমাজের অসঙ্গতি, ত্রুটি বা দুর্বল দিকগুলো অপসারিত করে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, গণতন্ত্র, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেটাই ছিল তার রাজনৈতিক দর্শন ও প্রচেষ্টা। গণতন্ত্র রক্ষা, মানবাধিকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ছিলেন সর্বদা অবিচল।

দলীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে থাকলেও তিনি ছিলেন দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বের মানুষ। এর প্রমাণ অশ্রুসিক্ত নয়নে লাখো মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তার চিরবিদায় নেয়া।

স্নিগ্ধজন এ রাজনীতিক আজীবন বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে। একজন সফল গেরিলা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তার অসাধারণ বীরত্বের কাহিনী সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মকে জানানোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার দেশপ্রেমের স্বার্থে।

হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত