মিরপুর লোহার পুরনো ব্রিজে গণহত্যা
jugantor
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
মিরপুর লোহার পুরনো ব্রিজে গণহত্যা

  ইমন শিকদার  

১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মিরপুর লোহার পুরনো ব্রিজ
মিরপুর লোহার পুরনো ব্রিজ

মিরপুরে তুরাগ নদের ওপর স্থাপিত লোহার পুরনো ব্রিজটি গণহত্যার একটি দ্রষ্টব্য স্থান। ১৯৭১ সালে মিরপুরের এই ‘লোহার ব্রিজ’ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। এটি ছিল ঢাকার পশ্চিম প্রান্তের একমাত্র নদীকেন্দ্রিক ‘বধ্য জলাভূমি’; যেখানে প্রায় প্রতিরাতে গাড়িবোঝাই করে বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করে ব্রিজ থেকে নদীতে লাশ ফেলে দেয়া হতো।

গণহত্যার সময়কাল ছিল প্রতিরাতে গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ‘অপারেশন সার্চলাইটে’র আওতায় ঢাকাজুড়ে যে গণহত্যার সূচনা হয়েছিল, তার আঁচ লাগে মিরপুরের তৎকালীন ‘লোহার পুলেও’।

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ ব্রিজটি একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গণহত্যার প্রত্যক্ষ স্মারক হয়ে এখনও টিকে আছে। ব্রিজের নিচে বসবাসকারী বয়স্ক গ্রামবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, এ লোহার ব্রিজে একাত্তরের নয় মাসে লক্ষাধিক মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছেন।

যোগমায়ার বছর ৮৫। মিরপুর ব্রিজের উত্তরে ইশাকাবাদ গ্রামে তার জন্ম। একাত্তর তার কাছে ‘নোড় পারা’র সময়। তিনি বললেন, ‘নয় মাস ভইরাই নোড় পারা লাগছে। রান্ধা নাই, খাওয়া নাই। আমাগো আখড়াটাও আগুন দিয়া জ্বালাইছে ওই সময়।’

মিরপুর লোহার ব্রিজের গণহত্যা সম্পর্কে বললেন, ‘ধইরা আনতো। ধইরা আইনা ব্রিজে খাঁড়া করতো। খাঁড়া কইরা চোখ বানতো। চোখ বাইন্ধা এলা গুলি করছে। একটা কইরা চিক্কার দিছে। এলা জলের মধ্যে ফালাইছে ফেইক্কা-ফেইক্কা। লাশগুলা গাঙ দিয়া ভাসতো। প্রতিদিনই মারতো। আমাগো কালির জামাইরে পুলের ওইখান থেইকা ধইরা লয়া গেলো আর তো কোনো খবর হইলো না। কত মানুষ পইড়া গেল বাবা। মানুষ দেইখা মানুষ ডরাইছে। রান্ধা ভাত খাওন যায় নাই।’

যোগমায়ার পুত্র জীবন রাজবংশী। অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি হয়েছেন বেশ ক’বার। ষাটোর্ধ্ব এ মুক্তিযোদ্ধা এখনও তার গ্রামে সাহসী মানুষ হিসেবে সবার সমীহের পাত্র। বাল্যবন্ধু ও একাত্তরের সহযোদ্ধা রফিকের গুলিবিদ্ধ লাশ একা বহন করে আনার স্মৃতিটাই তার আনন্দ-বেদনার একমাত্র স্মৃতি!

২৯ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে মিরপুর শাহ আলী মাজারের কাছে যুদ্ধরত অবস্থায় বিহারি সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা রফিক। গোয়ালপাড়া স্কুলে তার কবর দেয়া হয়েছে।

মিরপুর লোহার ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যা সম্পর্কে ইশাকাবাদ গ্রামের এ মুক্তিযোদ্ধা বললেন, ‘সন্ধ্যার সময় দাঁড়ায়া থাকলে ব্রিজের সব দেখা যেত- মানুষ ট্রাকে ভইরা আইনা এইখানে এই লোহার ব্রিজ থেইকা ফালাইতো। এটা সন্ধ্যার পরেই করতো। প্রতিদিন দুই-তিনটা আর্মির ট্রাক আসতো। লাশ আনতো, আবার তাজাও মারতো। চিৎকার শুনতাম। বহুত লাশ দেখছি তুরাগ নদে।’

যোগমায়ার আত্মীয় শোভা রানী (৭৫) দূরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ শুনছিলেন আর বিড়বিড় করছিলেন। একসময় তিনি ক্যামেরার সামনে এসে একাত্তরে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেন- ‘না পলাইলে আমাগো মাইরা ফালাইতো বাবা। পুলের ওই মুড়া গেছি আর অমনি আগুন দিছে। পোলাপান লইয়া হপায় ওই পাড়ে গেছি আর এই পাড় থেইকা ধুমায়া গুলি। আমাগো মাইরাই ফালাইতো। মইরাই গেতাম গা। ঘরবাড়ি সব জ্বালায়া দিছে। হেইদিন (২৮ মার্চ, ১৯৭১) পুলের ওপর থন গুলি করছে- গোলাপীর জামাইয়ের খুলি উইড়া গেছিল। কী দিন গেছে বাবা!’

হিজলা গ্রামের মাঝি ফকির চাঁনের বয়স একশ’ ছুঁইছুঁই। মিরপুর লোহার ব্রিজের আশপাশেই কাটিয়েছেন এ জীবনের প্রায় পুরোটা সময়। একাত্তরে রাজাকাররা তাকে আটক করে পরে ছেড়ে দেয়। যুদ্ধের সময়টা তুরাগ নদের দক্ষিণ পাড়ে কৃষিকাজ করেছেন। আর সেখান থেকেই প্রতিদিন দেখেছেন মিরপুর লোহার ব্রিজ থেকে ফেলে দেয়া ভাসমান লাশের মিছিল।

তার কথায়- ‘রাত্রেই ফালাইতো। তহন তিন দাগের মোড়ে ক্ষেত করতাম বাপু। ব্রিজ থেকে ফালানো লাশগুলা ভাইসা উঠতো। লাশ তো বহুত দেখছি। পরিমাণ তো কইতে পারমু না। এই লোহার ব্রিজের ওপর পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকাররা সবসময় থাকতো। যুদ্ধের সময় এই ব্রিজের নিচ দিয়া নৌকা বায়া গেছি আর আইছি। লাশের দিকে কখনও তাকাই নাই। সন্দেহ করবো, ভয়ও পাইছি।’

একাত্তরের ২৫ মার্চের রাতে গাড়িচালক হাজী সালাউদ্দিনের (৭২) বিয়ের দিন-তারিখ নির্ধারিতই ছিল। ব্রিজের নিচের হিজলা গ্রামে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। মিরপুর লোহার ব্রিজের ওপরে টিউবলাইট ছিল। আশপাশের গ্রামবাসী হারিকেন ব্যবহার করত।

এ প্রসঙ্গে হাজী সালাউদ্দিনের বললেন-‘যখন নাকি টিউবলাইটটা (ব্রিজে) অফ করে দিতো, তখনই বুঝতাম যে, কিছু একটা করতাছে। তখন একটা গাড়ি আসতো আর্মির। গাড়ি কইরা যাদেরকে নিয়া আসতো, লাইন ধরাইতো ব্রিজের সঙ্গে। ঐখান থেইকা ব্যানার (বেয়নেট) দিয়া গুলি দিয়া মাইরা নদীতে পানিতে ফালাইতো। ব্রিজের ওপর যখন মারতো, তখন ব্রিজে রক্ত পড়তো। আমাদের এলাকার লোক ধইরা নিয়া ওই বালুমাটি এগুলি দিয়া ঢাকাইতো। এই ঘটনা পুরো যুদ্ধের সময় ধইরা হইছে।’

মিরপুর লোহার ব্রিজে হত্যার জন্য ধরে আনা একজন ভাগ্যগুণে ব্রিজ থেকে পড়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। হাজী সালাউদ্দিন বললেন- ‘একদিন ঘটনাচক্রে এক লোক সাহসিকতা দেখাইয়া ঐ ব্রিজের যে ফাঁকটা ছিল, ঐ অবস্থাতেই সে ফাঁকটা দিয়া পইড়া নদীতে লাফ দেয়। নদীতে জলের ওপর পইড়া ভাটিতে গিয়া ব্রিক ফিল্ডের ইটের স্টেক (দ্বীপনগর) ধইরা হামাগুড়ি দিয়া উঠে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলার পর পাশের বড়দেশী গ্রামের লোকজন নৌকা নিয়া তাকে উঠায়া আনে। ওনার বাড়ি ছিল নারায়ণগঞ্জ। উনি অফিসার ছিলেন। চাকরি কইরা বেতন নিয়া বাইর হইছিলেন। ওইখান থেইকা তারে উঠায়া নিয়া আসে। তারপর এই মিরপুর ব্রিজে এই ঘটনা।’

হিজলা গ্রামের আমসু গোয়ালের ভাই হাজী সোহরাব মিয়া (৮৫) মিরপুর লোহার ব্রিজে গণহত্যার প্রসঙ্গে বললেন- ‘গাড়ি তো প্রতিরাতে কয়েকটা আইছে। একটা মাইরা ফালায়া থুয়া গেছে, তারপর আবার আরেকটা আইছে। তহন তো বাড়িতে থাকা পারি নাই। পলায়া পলায়া মসজিদে থাইকা থাইকা এইসব দেখছি। ব্রিজের নিচে ধপ্পর কইরা আওয়াজ হইতো। বড় বড় অফিসার চাকুরিজীবীগো ধইরা আইনা এইভাবে মারছে। যুদ্ধের সময় প্রত্যেক রাত্রেই মারতো। প্রায় পাঁচ হাজার বিহারি সামনে আর পিছনে পাকিস্তানি মিলিটারি আমাগো এই হিজলা গ্রাম অ্যাটাক করে। আমার ভাইয়ের (আমসু মিয়া) হাতে গুলি লাগে। সে কোন্ডার ডাক্তারের কাছ থেইকা ব্যান্ডিজ কইরা আসার পর পাকিস্তানি মিলিটারিরা ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। পর্বত সিনেমা হলের পিছনে নিয়ে তাকে এসিড দিয়ে মুখ ঝলসে বেয়নেট দিয়ে পারায়া মাইরা ফালায়।’

মিরপুর ব্রিজের উত্তরে ইশাকাবাদ গ্রামের কৃষক হানিফ মিয়া (৭৫) মুক্তিযুদ্ধের সময় মিরপুর লোহার ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তার ভাষ্যমতে- ‘রাত্রে আমরা মসজিদের হুজুরের ঘরে পাহারা দিতাম। ওইখান থেইকা (ইশাকাবাদ মসজিদ) জানালা ফাঁক কইরা দেখতাম এক গাড়ি কইরা ইপিআর ধইরা আইনা গুলি কইরা ফালাই দিছে। মধ্যরাতে এই কাজ করতো। রাজাকাররা আছিল এই ব্রিজের গোড়ায়।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় গাড়িচালক ইমরানের বয়স ছিল ১২ বছর। তিনিও দেখেছেন, এই ব্রিজের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা। তার কথায়- ‘জবো কইরা ব্রিজের তলে ফালাইছে। কয়দিন পরে এইগুলা ভাইসা উঠতো। প্রতিদিন এইভাবে মানুষ মারছে। রাতে চিক্কার করতো ওনারা (বন্দিরা)। সকালে যাইয়া দেখতাম যে, ব্রিজের ওপরে দুনিয়ার রক্তের ছড়াছড়ি।’

পাকিস্তানের সময় থেকেই হিজলা গ্রামের মো. অহিউল্লাহ (৭০) পেট্রোল পাম্পে চাকরি করছেন। মিরপুর লোহার ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যা তিনি দেখেছেন হিজলার বড় মসজিদের মিনারে বসে। তার মতে- ‘এগুলা ছিল মিলিটারিগো ট্রাক। প্রতি গাড়িতে ২০-২৫ জন কইরা মানুষ লইয়া আইতো। হাত বান্ধা, চোখ বান্ধা আছিল। মারতো ব্যানার (বেয়নেট) দিয়া পার দিয়া। মাইরা, লাত্থি দিয়া, ব্রিজের মাঝামাঝি পিলারটায় ফাঁক আছিল, ঐ ফাঁক দিয়া ফালাই দিতো নদীতে। আমরা মসজিদের মিনারে বইসা এগুলা দেখছি।’

‘মিরপুর লোহার ব্রিজ’ শত-সহস্র শহীদের স্মৃতিবিজড়িত একটি বধ্য জলাভূমি। এখন পর্যন্ত এখানে এবিষয়ক ‘স্মারক প্রকাশনা’ বা ‘স্মৃতিস্মারক’ তৈরির কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মিরপুর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার নতুন প্রজন্ম এ গণহত্যা সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। গণহত্যা নিয়ে এখানে কোনো আলোচনাও হয় না। হিজলা

গ্রামের অশীতিপর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম মিয়া আক্ষেপের স্বরে লোহার পুরনো ব্রিজের নিচে একটি স্মৃতিফলকের দাবি জানান। তার ধারণা, ব্রিজের নিচে দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিফলক নির্মিত হলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির চরম আত্মত্যাগের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করতে পারবে।

ইমন শিকদার : গবেষক

[email protected]

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

মিরপুর লোহার পুরনো ব্রিজে গণহত্যা

 ইমন শিকদার 
১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
মিরপুর লোহার পুরনো ব্রিজ
মিরপুর লোহার পুরনো ব্রিজ

মিরপুরে তুরাগ নদের ওপর স্থাপিত লোহার পুরনো ব্রিজটি গণহত্যার একটি দ্রষ্টব্য স্থান। ১৯৭১ সালে মিরপুরের এই ‘লোহার ব্রিজ’ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। এটি ছিল ঢাকার পশ্চিম প্রান্তের একমাত্র নদীকেন্দ্রিক ‘বধ্য জলাভূমি’; যেখানে প্রায় প্রতিরাতে গাড়িবোঝাই করে বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করে ব্রিজ থেকে নদীতে লাশ ফেলে দেয়া হতো।

গণহত্যার সময়কাল ছিল প্রতিরাতে গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ‘অপারেশন সার্চলাইটে’র আওতায় ঢাকাজুড়ে যে গণহত্যার সূচনা হয়েছিল, তার আঁচ লাগে মিরপুরের তৎকালীন ‘লোহার পুলেও’।

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ ব্রিজটি একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গণহত্যার প্রত্যক্ষ স্মারক হয়ে এখনও টিকে আছে। ব্রিজের নিচে বসবাসকারী বয়স্ক গ্রামবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, এ লোহার ব্রিজে একাত্তরের নয় মাসে লক্ষাধিক মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছেন।

যোগমায়ার বছর ৮৫। মিরপুর ব্রিজের উত্তরে ইশাকাবাদ গ্রামে তার জন্ম। একাত্তর তার কাছে ‘নোড় পারা’র সময়। তিনি বললেন, ‘নয় মাস ভইরাই নোড় পারা লাগছে। রান্ধা নাই, খাওয়া নাই। আমাগো আখড়াটাও আগুন দিয়া জ্বালাইছে ওই সময়।’

মিরপুর লোহার ব্রিজের গণহত্যা সম্পর্কে বললেন, ‘ধইরা আনতো। ধইরা আইনা ব্রিজে খাঁড়া করতো। খাঁড়া কইরা চোখ বানতো। চোখ বাইন্ধা এলা গুলি করছে। একটা কইরা চিক্কার দিছে। এলা জলের মধ্যে ফালাইছে ফেইক্কা-ফেইক্কা। লাশগুলা গাঙ দিয়া ভাসতো। প্রতিদিনই মারতো। আমাগো কালির জামাইরে পুলের ওইখান থেইকা ধইরা লয়া গেলো আর তো কোনো খবর হইলো না। কত মানুষ পইড়া গেল বাবা। মানুষ দেইখা মানুষ ডরাইছে। রান্ধা ভাত খাওন যায় নাই।’

যোগমায়ার পুত্র জীবন রাজবংশী। অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি হয়েছেন বেশ ক’বার। ষাটোর্ধ্ব এ মুক্তিযোদ্ধা এখনও তার গ্রামে সাহসী মানুষ হিসেবে সবার সমীহের পাত্র। বাল্যবন্ধু ও একাত্তরের সহযোদ্ধা রফিকের গুলিবিদ্ধ লাশ একা বহন করে আনার স্মৃতিটাই তার আনন্দ-বেদনার একমাত্র স্মৃতি!

২৯ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে মিরপুর শাহ আলী মাজারের কাছে যুদ্ধরত অবস্থায় বিহারি সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা রফিক। গোয়ালপাড়া স্কুলে তার কবর দেয়া হয়েছে।

মিরপুর লোহার ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যা সম্পর্কে ইশাকাবাদ গ্রামের এ মুক্তিযোদ্ধা বললেন, ‘সন্ধ্যার সময় দাঁড়ায়া থাকলে ব্রিজের সব দেখা যেত- মানুষ ট্রাকে ভইরা আইনা এইখানে এই লোহার ব্রিজ থেইকা ফালাইতো। এটা সন্ধ্যার পরেই করতো। প্রতিদিন দুই-তিনটা আর্মির ট্রাক আসতো। লাশ আনতো, আবার তাজাও মারতো। চিৎকার শুনতাম। বহুত লাশ দেখছি তুরাগ নদে।’

যোগমায়ার আত্মীয় শোভা রানী (৭৫) দূরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ শুনছিলেন আর বিড়বিড় করছিলেন। একসময় তিনি ক্যামেরার সামনে এসে একাত্তরে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেন- ‘না পলাইলে আমাগো মাইরা ফালাইতো বাবা। পুলের ওই মুড়া গেছি আর অমনি আগুন দিছে। পোলাপান লইয়া হপায় ওই পাড়ে গেছি আর এই পাড় থেইকা ধুমায়া গুলি। আমাগো মাইরাই ফালাইতো। মইরাই গেতাম গা। ঘরবাড়ি সব জ্বালায়া দিছে। হেইদিন (২৮ মার্চ, ১৯৭১) পুলের ওপর থন গুলি করছে- গোলাপীর জামাইয়ের খুলি উইড়া গেছিল। কী দিন গেছে বাবা!’

হিজলা গ্রামের মাঝি ফকির চাঁনের বয়স একশ’ ছুঁইছুঁই। মিরপুর লোহার ব্রিজের আশপাশেই কাটিয়েছেন এ জীবনের প্রায় পুরোটা সময়। একাত্তরে রাজাকাররা তাকে আটক করে পরে ছেড়ে দেয়। যুদ্ধের সময়টা তুরাগ নদের দক্ষিণ পাড়ে কৃষিকাজ করেছেন। আর সেখান থেকেই প্রতিদিন দেখেছেন মিরপুর লোহার ব্রিজ থেকে ফেলে দেয়া ভাসমান লাশের মিছিল।

তার কথায়- ‘রাত্রেই ফালাইতো। তহন তিন দাগের মোড়ে ক্ষেত করতাম বাপু। ব্রিজ থেকে ফালানো লাশগুলা ভাইসা উঠতো। লাশ তো বহুত দেখছি। পরিমাণ তো কইতে পারমু না। এই লোহার ব্রিজের ওপর পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকাররা সবসময় থাকতো। যুদ্ধের সময় এই ব্রিজের নিচ দিয়া নৌকা বায়া গেছি আর আইছি। লাশের দিকে কখনও তাকাই নাই। সন্দেহ করবো, ভয়ও পাইছি।’

একাত্তরের ২৫ মার্চের রাতে গাড়িচালক হাজী সালাউদ্দিনের (৭২) বিয়ের দিন-তারিখ নির্ধারিতই ছিল। ব্রিজের নিচের হিজলা গ্রামে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। মিরপুর লোহার ব্রিজের ওপরে টিউবলাইট ছিল। আশপাশের গ্রামবাসী হারিকেন ব্যবহার করত।

এ প্রসঙ্গে হাজী সালাউদ্দিনের বললেন-‘যখন নাকি টিউবলাইটটা (ব্রিজে) অফ করে দিতো, তখনই বুঝতাম যে, কিছু একটা করতাছে। তখন একটা গাড়ি আসতো আর্মির। গাড়ি কইরা যাদেরকে নিয়া আসতো, লাইন ধরাইতো ব্রিজের সঙ্গে। ঐখান থেইকা ব্যানার (বেয়নেট) দিয়া গুলি দিয়া মাইরা নদীতে পানিতে ফালাইতো। ব্রিজের ওপর যখন মারতো, তখন ব্রিজে রক্ত পড়তো। আমাদের এলাকার লোক ধইরা নিয়া ওই বালুমাটি এগুলি দিয়া ঢাকাইতো। এই ঘটনা পুরো যুদ্ধের সময় ধইরা হইছে।’

মিরপুর লোহার ব্রিজে হত্যার জন্য ধরে আনা একজন ভাগ্যগুণে ব্রিজ থেকে পড়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। হাজী সালাউদ্দিন বললেন- ‘একদিন ঘটনাচক্রে এক লোক সাহসিকতা দেখাইয়া ঐ ব্রিজের যে ফাঁকটা ছিল, ঐ অবস্থাতেই সে ফাঁকটা দিয়া পইড়া নদীতে লাফ দেয়। নদীতে জলের ওপর পইড়া ভাটিতে গিয়া ব্রিক ফিল্ডের ইটের স্টেক (দ্বীপনগর) ধইরা হামাগুড়ি দিয়া উঠে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলার পর পাশের বড়দেশী গ্রামের লোকজন নৌকা নিয়া তাকে উঠায়া আনে। ওনার বাড়ি ছিল নারায়ণগঞ্জ। উনি অফিসার ছিলেন। চাকরি কইরা বেতন নিয়া বাইর হইছিলেন। ওইখান থেইকা তারে উঠায়া নিয়া আসে। তারপর এই মিরপুর ব্রিজে এই ঘটনা।’

হিজলা গ্রামের আমসু গোয়ালের ভাই হাজী সোহরাব মিয়া (৮৫) মিরপুর লোহার ব্রিজে গণহত্যার প্রসঙ্গে বললেন- ‘গাড়ি তো প্রতিরাতে কয়েকটা আইছে। একটা মাইরা ফালায়া থুয়া গেছে, তারপর আবার আরেকটা আইছে। তহন তো বাড়িতে থাকা পারি নাই। পলায়া পলায়া মসজিদে থাইকা থাইকা এইসব দেখছি। ব্রিজের নিচে ধপ্পর কইরা আওয়াজ হইতো। বড় বড় অফিসার চাকুরিজীবীগো ধইরা আইনা এইভাবে মারছে। যুদ্ধের সময় প্রত্যেক রাত্রেই মারতো। প্রায় পাঁচ হাজার বিহারি সামনে আর পিছনে পাকিস্তানি মিলিটারি আমাগো এই হিজলা গ্রাম অ্যাটাক করে। আমার ভাইয়ের (আমসু মিয়া) হাতে গুলি লাগে। সে কোন্ডার ডাক্তারের কাছ থেইকা ব্যান্ডিজ কইরা আসার পর পাকিস্তানি মিলিটারিরা ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। পর্বত সিনেমা হলের পিছনে নিয়ে তাকে এসিড দিয়ে মুখ ঝলসে বেয়নেট দিয়ে পারায়া মাইরা ফালায়।’

মিরপুর ব্রিজের উত্তরে ইশাকাবাদ গ্রামের কৃষক হানিফ মিয়া (৭৫) মুক্তিযুদ্ধের সময় মিরপুর লোহার ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তার ভাষ্যমতে- ‘রাত্রে আমরা মসজিদের হুজুরের ঘরে পাহারা দিতাম। ওইখান থেইকা (ইশাকাবাদ মসজিদ) জানালা ফাঁক কইরা দেখতাম এক গাড়ি কইরা ইপিআর ধইরা আইনা গুলি কইরা ফালাই দিছে। মধ্যরাতে এই কাজ করতো। রাজাকাররা আছিল এই ব্রিজের গোড়ায়।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় গাড়িচালক ইমরানের বয়স ছিল ১২ বছর। তিনিও দেখেছেন, এই ব্রিজের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা। তার কথায়- ‘জবো কইরা ব্রিজের তলে ফালাইছে। কয়দিন পরে এইগুলা ভাইসা উঠতো। প্রতিদিন এইভাবে মানুষ মারছে। রাতে চিক্কার করতো ওনারা (বন্দিরা)। সকালে যাইয়া দেখতাম যে, ব্রিজের ওপরে দুনিয়ার রক্তের ছড়াছড়ি।’

পাকিস্তানের সময় থেকেই হিজলা গ্রামের মো. অহিউল্লাহ (৭০) পেট্রোল পাম্পে চাকরি করছেন। মিরপুর লোহার ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যা তিনি দেখেছেন হিজলার বড় মসজিদের মিনারে বসে। তার মতে- ‘এগুলা ছিল মিলিটারিগো ট্রাক। প্রতি গাড়িতে ২০-২৫ জন কইরা মানুষ লইয়া আইতো। হাত বান্ধা, চোখ বান্ধা আছিল। মারতো ব্যানার (বেয়নেট) দিয়া পার দিয়া। মাইরা, লাত্থি দিয়া, ব্রিজের মাঝামাঝি পিলারটায় ফাঁক আছিল, ঐ ফাঁক দিয়া ফালাই দিতো নদীতে। আমরা মসজিদের মিনারে বইসা এগুলা দেখছি।’

‘মিরপুর লোহার ব্রিজ’ শত-সহস্র শহীদের স্মৃতিবিজড়িত একটি বধ্য জলাভূমি। এখন পর্যন্ত এখানে এবিষয়ক ‘স্মারক প্রকাশনা’ বা ‘স্মৃতিস্মারক’ তৈরির কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মিরপুর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার নতুন প্রজন্ম এ গণহত্যা সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। গণহত্যা নিয়ে এখানে কোনো আলোচনাও হয় না। হিজলা

গ্রামের অশীতিপর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম মিয়া আক্ষেপের স্বরে লোহার পুরনো ব্রিজের নিচে একটি স্মৃতিফলকের দাবি জানান। তার ধারণা, ব্রিজের নিচে দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিফলক নির্মিত হলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির চরম আত্মত্যাগের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করতে পারবে।

ইমন শিকদার : গবেষক

[email protected]