মুক্তিযুদ্ধকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
jugantor
মুক্তিযুদ্ধকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

  বিমল সরকার  

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ছবি: সংগৃহীত

আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। জাতির এক চরম সংকট, অনিশ্চয়তা ও ঘোর দুর্দিনে দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী সংঘটিত অত্যন্ত কঠিন এ অগ্নিপরীক্ষার সময়টিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা ধর্ম, বর্ণ, মত ও পথ যার যার- এমনসব বিশ্বাস-পরিচয়-পরিচিতি ভুলে গিয়ে সর্বস্তরের মানুষ ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে একতাবদ্ধ এবং সোচ্চার হয়ে উঠি। পরস্পর পরস্পরের হাত ধরে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

জাগরণ, জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ, দেশপ্রেম ও ভ্রাতৃত্বের এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি;’ ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ কিংবা তখনকার ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিটি বোধকরি প্রতিটি দেশ-অন্তঃপ্রাণ মানুষের কানে-মনে-হৃদয়ে আজও অনুরণিত হয়। এ অদম্য শক্তি আর দুর্দমনীয় সাহস এবং ঐক্য-চেতনার ওপর ভর করেই আমরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করি। বিশ্বসভায় অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির। বিশ্ববাসী নতুন করে পরিচিত হয় লাল-সবুজের একটি সুদৃশ্য পতাকার সঙ্গে। আহা, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে- সর্বত্র! কিন্তু বলতে ও স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই যে, সেই গৌরবমণ্ডিত ঐক্য, আনন্দ ও চেতনাটিকে স্বাধীনতা লাভের পর আমরা বেশিদিন ধরে রাখতে পারিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় টানা দশটি মাস স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়- এককথায় দেশের সর্বস্তরের সবক’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে; দিনের হিসাবে একেবারে ৩০৭ দিন। নয় মাসের যুদ্ধশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে আমাদের স্বদেশভূমি পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয়। স্বাধীনতার পর সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ শনিবার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ক্লাস শুরু করা হয়। অবশ্য স্বীকার না করে উপায় নেই, খোলা হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসতে আরও অনেক সময় লেগে যায়।

একাত্তরের মার্চ মাসের শুরুতেই বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নে অন্য সবার মতোই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবেগ-অনুভূতি এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা যেন একাকার হয়ে পড়ে। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভকারী দল আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরায় অল্পদিনের মধ্যে জাতির ভাগ্য-ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী ও আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের প্রতীক হয়ে উঠেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে সরকারি-বেসরকারি অফিস, কোর্ট-কাচারি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশদানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের (সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের) সবকিছুই একেবারে অচল হয়ে পড়ে। যুদ্ধকালীন ৯ মাস পাকিস্তান সরকার বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ‘অভ্যন্তরীণ বিবাদ’ ও ‘সবকিছুই স্বাভাবিক রয়েছে’ বলে প্রমাণ করার জন্য বলতে গেলে প্রতি সপ্তাহে অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের একটি করে জরুরি চিঠি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) খোলা রাখা ও শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের উপস্থিতিসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন অর্থাৎ বাস্তব পরিস্থিতিটি সরকারকে অবহিত করার জোর তাগাদা দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে মাসের পর মাস নিয়মিত এ কাজটি করা হয়। চাপে পড়ে এবং নানা ধরনের আশঙ্কার কথা চিন্তা করে একপ্রকার বাধ্য হয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রথমদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান খোলা রাখে বা খুলে রাখতে চেষ্টা করে; কিন্তু বাস্তবে তা ছিল খুবই নামমাত্র। চারদিকে কামানের গর্জন, বোমা ফাটার শব্দ; এলএমজি, এসএলআর, রাইফেলসহ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির ঘন ঘন গুড়ুম-গুড়ুম আওয়াজে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। প্রকাশ্যে চোখের সামনেই ঘটে চলেছে ব্যাপক লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ। এমন পরিস্থিতিতে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থীদের মনেও তখন পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণাবোধ চরম আকার ধারণ করে। ফলে কঠোর নজরদারি ও হুশিয়ারি সত্ত্বেও বেশির ভাগ অভিভাবকই অনিশ্চয়তার মাঝে সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো থেকে বিরত থাকেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অভিভাবকদের অসহায় মুখের ছবিগুলো এখনও মাঝেমধ্যে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একান্ত নিরুপায় হয়ে, প্রাণে বেঁচে থাকার দায়ে প্রথমদিকে আমরাও হাইস্কুলে গিয়েছি। কিন্তু বেশিদিন না; ছাত্রছাত্রী না আসায় শেষ পর্যন্ত স্কুল-কলেজ খোলা রাখার সরকারি চালাকি-কৌশল ও নীতি চরমভাবে ব্যর্থ হয়। শেষদিকে অবশ্য অনেক প্রতিষ্ঠানকেই, এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোকে পর্যন্ত যুদ্ধকালীন সেনা ও রাজাকার ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

দেশ পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসাগুলো একে একে খোলা হলেও সবক’টি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করতে সময় লেগেছিল আরও অন্তত এক মাস। কারণ, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে যেমন-তেমন; একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সরাসরি গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। অনেকে আবার সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলেও প্রাণ বাঁচাতে দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে, এমনকি প্রতিবেশী দেশে গিয়ে আশ্রয় নেন। প্রায় এক কোটি অসহায় মানুষের দেশের বাইরে গিয়ে শরণার্থী হওয়া! সর্বাত্মক যুদ্ধ, যুদ্ধের তাণ্ডব; সে কী বিভীষিকা! মুক্তিযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিজয়ের পর বাড়িঘরে স্বজনদের মাঝে ফিরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ফিরে আসা এবং যার যার হলে (ছাত্রাবাস) বা কর্মস্থলে এসে অবস্থান করতে স্বাভাবিকভাবেই বেশ সময় লেগে যায়। মানুষ স্বজন, সম্পদ ও বাড়িঘর-আশ্রয় হারিয়ে একেবারে দিশাহীন হয়ে পড়ে। চারদিকে কেবল হাহাকার, নেই আর নেই। বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি ঘরে ঘরে শোকের মাতম।

মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো ক্লাস শুরু হয় সুদীর্ঘ ১১ মাস অর্থাৎ ৩৪০ দিন পর (৭ মার্চ ১৯৭১ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২) ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা-পরিস্থিতিও বলতে গেলে একই রকম ছিল। অবশ্য জানুয়ারিতেই দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়। তারা ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. সারওয়ার মোর্শেদ; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. ইন্নাস আলী; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিন আহমদ; বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. কাজী আবদুর রহিম এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. এমএ নাসের। কেবল উচ্চশিক্ষাদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ-পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

 

মুক্তিযুদ্ধকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

 বিমল সরকার 
১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
মুক্তিযুদ্ধকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ছবি: সংগৃহীত

আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। জাতির এক চরম সংকট, অনিশ্চয়তা ও ঘোর দুর্দিনে দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী সংঘটিত অত্যন্ত কঠিন এ অগ্নিপরীক্ষার সময়টিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা ধর্ম, বর্ণ, মত ও পথ যার যার- এমনসব বিশ্বাস-পরিচয়-পরিচিতি ভুলে গিয়ে সর্বস্তরের মানুষ ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে একতাবদ্ধ এবং সোচ্চার হয়ে উঠি। পরস্পর পরস্পরের হাত ধরে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

জাগরণ, জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ, দেশপ্রেম ও ভ্রাতৃত্বের এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি;’ ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ কিংবা তখনকার ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিটি বোধকরি প্রতিটি দেশ-অন্তঃপ্রাণ মানুষের কানে-মনে-হৃদয়ে আজও অনুরণিত হয়। এ অদম্য শক্তি আর দুর্দমনীয় সাহস এবং ঐক্য-চেতনার ওপর ভর করেই আমরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করি। বিশ্বসভায় অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির। বিশ্ববাসী নতুন করে পরিচিত হয় লাল-সবুজের একটি সুদৃশ্য পতাকার সঙ্গে। আহা, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে- সর্বত্র! কিন্তু বলতে ও স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই যে, সেই গৌরবমণ্ডিত ঐক্য, আনন্দ ও চেতনাটিকে স্বাধীনতা লাভের পর আমরা বেশিদিন ধরে রাখতে পারিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় টানা দশটি মাস স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়- এককথায় দেশের সর্বস্তরের সবক’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে; দিনের হিসাবে একেবারে ৩০৭ দিন। নয় মাসের যুদ্ধশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে আমাদের স্বদেশভূমি পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয়। স্বাধীনতার পর সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ শনিবার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ক্লাস শুরু করা হয়। অবশ্য স্বীকার না করে উপায় নেই, খোলা হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসতে আরও অনেক সময় লেগে যায়।

একাত্তরের মার্চ মাসের শুরুতেই বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নে অন্য সবার মতোই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবেগ-অনুভূতি এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা যেন একাকার হয়ে পড়ে। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভকারী দল আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরায় অল্পদিনের মধ্যে জাতির ভাগ্য-ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী ও আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের প্রতীক হয়ে উঠেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে সরকারি-বেসরকারি অফিস, কোর্ট-কাচারি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশদানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের (সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের) সবকিছুই একেবারে অচল হয়ে পড়ে। যুদ্ধকালীন ৯ মাস পাকিস্তান সরকার বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ‘অভ্যন্তরীণ বিবাদ’ ও ‘সবকিছুই স্বাভাবিক রয়েছে’ বলে প্রমাণ করার জন্য বলতে গেলে প্রতি সপ্তাহে অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের একটি করে জরুরি চিঠি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) খোলা রাখা ও শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের উপস্থিতিসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন অর্থাৎ বাস্তব পরিস্থিতিটি সরকারকে অবহিত করার জোর তাগাদা দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে মাসের পর মাস নিয়মিত এ কাজটি করা হয়। চাপে পড়ে এবং নানা ধরনের আশঙ্কার কথা চিন্তা করে একপ্রকার বাধ্য হয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রথমদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান খোলা রাখে বা খুলে রাখতে চেষ্টা করে; কিন্তু বাস্তবে তা ছিল খুবই নামমাত্র। চারদিকে কামানের গর্জন, বোমা ফাটার শব্দ; এলএমজি, এসএলআর, রাইফেলসহ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির ঘন ঘন গুড়ুম-গুড়ুম আওয়াজে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। প্রকাশ্যে চোখের সামনেই ঘটে চলেছে ব্যাপক লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ। এমন পরিস্থিতিতে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থীদের মনেও তখন পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণাবোধ চরম আকার ধারণ করে। ফলে কঠোর নজরদারি ও হুশিয়ারি সত্ত্বেও বেশির ভাগ অভিভাবকই অনিশ্চয়তার মাঝে সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো থেকে বিরত থাকেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অভিভাবকদের অসহায় মুখের ছবিগুলো এখনও মাঝেমধ্যে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একান্ত নিরুপায় হয়ে, প্রাণে বেঁচে থাকার দায়ে প্রথমদিকে আমরাও হাইস্কুলে গিয়েছি। কিন্তু বেশিদিন না; ছাত্রছাত্রী না আসায় শেষ পর্যন্ত স্কুল-কলেজ খোলা রাখার সরকারি চালাকি-কৌশল ও নীতি চরমভাবে ব্যর্থ হয়। শেষদিকে অবশ্য অনেক প্রতিষ্ঠানকেই, এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোকে পর্যন্ত যুদ্ধকালীন সেনা ও রাজাকার ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

দেশ পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসাগুলো একে একে খোলা হলেও সবক’টি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করতে সময় লেগেছিল আরও অন্তত এক মাস। কারণ, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে যেমন-তেমন; একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সরাসরি গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। অনেকে আবার সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলেও প্রাণ বাঁচাতে দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে, এমনকি প্রতিবেশী দেশে গিয়ে আশ্রয় নেন। প্রায় এক কোটি অসহায় মানুষের দেশের বাইরে গিয়ে শরণার্থী হওয়া! সর্বাত্মক যুদ্ধ, যুদ্ধের তাণ্ডব; সে কী বিভীষিকা! মুক্তিযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিজয়ের পর বাড়িঘরে স্বজনদের মাঝে ফিরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ফিরে আসা এবং যার যার হলে (ছাত্রাবাস) বা কর্মস্থলে এসে অবস্থান করতে স্বাভাবিকভাবেই বেশ সময় লেগে যায়। মানুষ স্বজন, সম্পদ ও বাড়িঘর-আশ্রয় হারিয়ে একেবারে দিশাহীন হয়ে পড়ে। চারদিকে কেবল হাহাকার, নেই আর নেই। বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি ঘরে ঘরে শোকের মাতম।

মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো ক্লাস শুরু হয় সুদীর্ঘ ১১ মাস অর্থাৎ ৩৪০ দিন পর (৭ মার্চ ১৯৭১ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২) ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা-পরিস্থিতিও বলতে গেলে একই রকম ছিল। অবশ্য জানুয়ারিতেই দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়। তারা ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. সারওয়ার মোর্শেদ; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. ইন্নাস আলী; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিন আহমদ; বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. কাজী আবদুর রহিম এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. এমএ নাসের। কেবল উচ্চশিক্ষাদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ-পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক