যুক্তির জোর নয়, এখন চলছে জোরের যুক্তি
jugantor
যুক্তির জোর নয়, এখন চলছে জোরের যুক্তি

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম  

১৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ষণ

মানুষ ও অবলা প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য হল মানুষ মানুষকে ধোঁকা দিতে জানে। অবলা প্রাণীর সেই জ্ঞান নেই। সে যা করে তা গায়ের জোরে করে। সে সরাসরি জানান দিয়ে আক্রমণ করে বসে। এতে প্রতিপক্ষের একটি লাভ হয়, সে যুদ্ধে জড়িয়ে যায় জেতার আশায়। নয়তো সে দুর্বল হলে বা বিপদের আশঙ্কা থাকলে শুরুতেই পাততাড়ি গুটিয়ে পিছুটান দিয়ে বসে।

এখন এমন একটা সময় এসে গেছে যখন যুক্তির জোর কমে গেছে অথবা নেই। এখন সব জায়গায় জোরের যুক্তি চলে। অর্থ-বিত্ত, ধোঁকা দিয়ে জোরের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। অর্থ-বিত্ত, ধোঁকা ও তদবির থেকে দুর্নীতির নতুন শাখা-প্রশাখা গজিয়ে ওঠে।

ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন, ‘এন্ড জাস্টিফাইজ দ্য মিনস’- লক্ষ্যই উপায়ের ন্যায্যতা নির্ধারণ করে। এর অর্থ এভাবে বলা যায়- খারাপ উপায়ে হলেও ভালো লক্ষ্যার্জন বৈধ। এ উক্তিটিকে বহু জ্ঞানী-গুণীজন নেতিবাচকভাবে সমালোচনা করেছেন।

কেউ বলেন, চুরি-ডাকাতি করে অর্থ উপার্জন করে মসজিদ-মন্দির বানিয়ে দিয়েই যদি স্বর্গে যাওয়া যেত তাহলে সবাই সেটা করত। কিন্তু তা তো সবাই করেন না। কিন্তু খারাপ বলা হলেও এটাই অনেকে অনুসরণ করতে ভালোবাসে; কারণ এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়া সহজ।

বিশেষ করে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা যখন যেনতেনভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে যান তখন সেটাকে ন্যায্যতা দিতে ভালো কাজে মনোনিবেশ করেন। ভালো কাজ দিয়ে নিজের অতীতের প্রায়শ্চিত্ত করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। আমরা ঘরে-বাইরে এটাই অবলোকন করছি।

একসময় অক্ষশক্তি বেপরোয়া হয়ে উঠলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামানোর জন্য ট্রুম্যান এটম বোমা নিক্ষেপ করার কথা বলেছিলেন। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে এটম বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যুদ্ধ থেমেছিল। কিন্তু তার খারাপ রেশ আজও থেমে নেই। এখন বোমা ফেলার দরকার হয় না। একটু অসতর্ক বা অবহেলার কারণে অথবা দুর্ভাগ্যবশত যে কোনো সময় মানুষের মাথায় বোমা ফেটে যেতে পারে।

অবক্ষয়টা তাহলে কোথা থেকে শুরু হয়? মাছ পচলে মাথা থেকে পচনটা শুরু হয়ে থাকে। কোনো সমাজের দেহে পচন ধরলে তার মাথাতে আগে পচন ধরে গেছে- এটাই ভাবা স্বাভাবিক। অর্থাৎ জাতির মধ্যে দুর্বলতা ও নীচতা তার নেতার মধ্যে থেকে সংক্রমিত হয়ে থাকে।

নেতার উত্থান কীভাবে হয়েছে তার ওপর অনেকটা নির্ভর করে জাতির চলাফেরা। নেতা কিসের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে কথা বলে তার ওপর নির্ভর করে জাতির গতি-প্রকৃতি। নেতা কাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করে তার ওপর নির্ভর করে মানুষের চলমান কর্মযজ্ঞ।

ঢাবি শিক্ষার্থীর ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাকে তুলে ধরে সেদিন টিভিতে এক বক্তা বলেছিলেন- এতদিন আমরা সিরিয়াল কিলার দেখেছি, আজ শুনছি সিরিয়াল ধর্ষকের কথা। তিনি প্রকারান্তরে সামনের দু’দাঁত ভাঙা আটক ধর্ষক মজনুর কথাই বলতে চাচ্ছিলেন।

মনে হয়েছিল, বক্তা খুবই অদূরদর্শী অথবা বেশিদিন আগের কথা মনে রাখতে অপারগ। তিনি হয়তো ভুলেই গেছেন ধর্ষণের সেঞ্চুরি করা মানিকের কথা, যিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় অল্পবয়সেই ধর্ষণের সেঞ্চুরি করে ফেলেছিলেন।

এই তো ক’বছর আগে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম ন্যক্কারজনক অবস্থার কথা দেশবাসী লজ্জাবনতভাবে শুনেছিল। তার বর্ণনা একজন সিরিয়াল ধর্ষকের সমুদয় বৈশিষ্ট্যকে হার মানিয়ে দিয়েছিল। মানিক আত্মস্বীকৃত সেঞ্চুরিয়ান ধর্ষক আর মজনুকে ধর্ষণের অভিযোগে সিরিয়াল ধর্ষক হিসেবে ধরা হয়েছে।

মজনু অশিক্ষিত, টোকাই, মাদকাসক্ত; কিন্তু মানিক ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, শিক্ষিত-জ্ঞানী। পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী বাস টার্মিনালে, রেলস্টেশনে ঘুরে বেড়ানো মজনু মাসখানেক আগে তার প্রেমিকাকে এক সিএনজি অটোরিকশা চালকের সঙ্গে পালিয়ে যেতে দেখার পর আর কোনো হদিস না পেয়ে উন্মাদ হয়ে গেছে।

এ এক মাসে সে পাঁচ-ছয়টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। ধর্ষক মানিক হল সমাজের মাথা আর মজনু হল ঘুণেধরা কঙ্কালসার সমাজের ছেঁড়া তেনা। মানিকের ঘটনায় শেষমেশ কী হয়েছিল তা আজও জানা যায়নি। মজনুর বিচার কীভাবে হবে তা হয়তো পরবর্তী সময়ে জানা যাবে।

মজনু যদি সত্যি মাদকাসক্ত হয়ে থাকেন তাহলে টোকাই হয়ে সে মাদকের অর্থ জোগায় কীভাবে? সে কী ধরনের মাদকদ্রব্য সেবন করে? কোথায় সেগুলো পায়? আমাদের দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য এত শত ব্যবস্থা, এত পাহারাদার, এত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, নিরাময়কেন্দ্র- এগুলোর কাজ কী?

সেদিন একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেই ফেললেন- মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য বিয়ারকে সহজলভ্য করতে হবে। কী হাস্যকর কথা! বিয়ারে কি মাদকদ্রব্য নেই? আমাদের মতো দেশে বিয়ার কি হারাম বা নিষিদ্ধ পানীয় নয়? তিনি কি সেটা জানেন না? অর্থাৎ মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারীদের সংখ্যা ঘরে-বাইরে মাকড়সার জালের মতো বিরাজ করছে।

যে সমাজের উঁচু পর্যায় থেকে নিচু পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক মাদকসেবী রয়েছে সেখানে মাদকদ্রব্য ব্যবসা চলতেই থাকবে। মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা চলতে থাকলে এর আগমন হতেই থাকবে এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে মাদকের বিক্রি, পাচার ইত্যাদি ঘটবে। এর ফলস্বরূপ সমাজে ধর্ষণ, খুন, ছিনতাই, পর্নোগ্রাফি, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং কালচার, ঘুষ-দুর্নীতি ইত্যাদি ক্রমাগত বৃদ্ধি হতে থাকলে সেগুলো বন্ধ করবেন কীভাবে?

আগেই বলেছি- এখন যুক্তির জোর কমে গেছে অথবা নেই। সব জায়গায় জোরের যুক্তি চলে। অর্থ-বিত্ত, ধোঁকা দিয়ে জোরের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তৎপরতা চালানো হয়। অর্থ-বিত্ত, ধোঁকা ও তদবির করে অথবা তোয়াজ-তোষণের মাধ্যমে গোঁজামিল দিয়ে গল্প বানিয়ে জটিল সামাজিক সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে।

সারা বিশ্বে জটিল আর্থ-মনো-সামাজিক সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য বৈজ্ঞানিক গভীর চিন্তাপ্রসূত পেশাদারি নৈতিকতা নিয়ে শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সেবাদান প্রক্রিয়া গড়ে উঠলেও আমাদের দেশে এখনও সেটা সুদূরপরাহত। এখানে ব্যক্তি বিশেষকে খুশি করার জন্য তাৎক্ষণিকভাকে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়ার লোকের অভাব নেই।

এর ফলে দুর্নীতির নতুন শাখা-প্রশাখা গজিয়ে ওঠে। তা না হলে সামাজিক নিরাপত্তামূলক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবাকাঠামো স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সেবাদান প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে পারছে না কেন?

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান; সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

যুক্তির জোর নয়, এখন চলছে জোরের যুক্তি

 ড. মো. ফখরুল ইসলাম 
১৪ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ধর্ষণ
নিপীড়ন। প্রতীকী ছবি

মানুষ ও অবলা প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য হল মানুষ মানুষকে ধোঁকা দিতে জানে। অবলা প্রাণীর সেই জ্ঞান নেই। সে যা করে তা গায়ের জোরে করে। সে সরাসরি জানান দিয়ে আক্রমণ করে বসে। এতে প্রতিপক্ষের একটি লাভ হয়, সে যুদ্ধে জড়িয়ে যায় জেতার আশায়। নয়তো সে দুর্বল হলে বা বিপদের আশঙ্কা থাকলে শুরুতেই পাততাড়ি গুটিয়ে পিছুটান দিয়ে বসে।

এখন এমন একটা সময় এসে গেছে যখন যুক্তির জোর কমে গেছে অথবা নেই। এখন সব জায়গায় জোরের যুক্তি চলে। অর্থ-বিত্ত, ধোঁকা দিয়ে জোরের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। অর্থ-বিত্ত, ধোঁকা ও তদবির থেকে দুর্নীতির নতুন শাখা-প্রশাখা গজিয়ে ওঠে।

ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন, ‘এন্ড জাস্টিফাইজ দ্য মিনস’- লক্ষ্যই উপায়ের ন্যায্যতা নির্ধারণ করে। এর অর্থ এভাবে বলা যায়- খারাপ উপায়ে হলেও ভালো লক্ষ্যার্জন বৈধ। এ উক্তিটিকে বহু জ্ঞানী-গুণীজন নেতিবাচকভাবে সমালোচনা করেছেন।

কেউ বলেন, চুরি-ডাকাতি করে অর্থ উপার্জন করে মসজিদ-মন্দির বানিয়ে দিয়েই যদি স্বর্গে যাওয়া যেত তাহলে সবাই সেটা করত। কিন্তু তা তো সবাই করেন না। কিন্তু খারাপ বলা হলেও এটাই অনেকে অনুসরণ করতে ভালোবাসে; কারণ এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়া সহজ।

বিশেষ করে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা যখন যেনতেনভাবে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে যান তখন সেটাকে ন্যায্যতা দিতে ভালো কাজে মনোনিবেশ করেন। ভালো কাজ দিয়ে নিজের অতীতের প্রায়শ্চিত্ত করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। আমরা ঘরে-বাইরে এটাই অবলোকন করছি।

একসময় অক্ষশক্তি বেপরোয়া হয়ে উঠলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামানোর জন্য ট্রুম্যান এটম বোমা নিক্ষেপ করার কথা বলেছিলেন। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে এটম বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যুদ্ধ থেমেছিল। কিন্তু তার খারাপ রেশ আজও থেমে নেই। এখন বোমা ফেলার দরকার হয় না। একটু অসতর্ক বা অবহেলার কারণে অথবা দুর্ভাগ্যবশত যে কোনো সময় মানুষের মাথায় বোমা ফেটে যেতে পারে।

অবক্ষয়টা তাহলে কোথা থেকে শুরু হয়? মাছ পচলে মাথা থেকে পচনটা শুরু হয়ে থাকে। কোনো সমাজের দেহে পচন ধরলে তার মাথাতে আগে পচন ধরে গেছে- এটাই ভাবা স্বাভাবিক। অর্থাৎ জাতির মধ্যে দুর্বলতা ও নীচতা তার নেতার মধ্যে থেকে সংক্রমিত হয়ে থাকে।

নেতার উত্থান কীভাবে হয়েছে তার ওপর অনেকটা নির্ভর করে জাতির চলাফেরা। নেতা কিসের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে কথা বলে তার ওপর নির্ভর করে জাতির গতি-প্রকৃতি। নেতা কাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করে তার ওপর নির্ভর করে মানুষের চলমান কর্মযজ্ঞ।

ঢাবি শিক্ষার্থীর ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাকে তুলে ধরে সেদিন টিভিতে এক বক্তা বলেছিলেন- এতদিন আমরা সিরিয়াল কিলার দেখেছি, আজ শুনছি সিরিয়াল ধর্ষকের কথা। তিনি প্রকারান্তরে সামনের দু’দাঁত ভাঙা আটক ধর্ষক মজনুর কথাই বলতে চাচ্ছিলেন।

মনে হয়েছিল, বক্তা খুবই অদূরদর্শী অথবা বেশিদিন আগের কথা মনে রাখতে অপারগ। তিনি হয়তো ভুলেই গেছেন ধর্ষণের সেঞ্চুরি করা মানিকের কথা, যিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় অল্পবয়সেই ধর্ষণের সেঞ্চুরি করে ফেলেছিলেন।

এই তো ক’বছর আগে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম ন্যক্কারজনক অবস্থার কথা দেশবাসী লজ্জাবনতভাবে শুনেছিল। তার বর্ণনা একজন সিরিয়াল ধর্ষকের সমুদয় বৈশিষ্ট্যকে হার মানিয়ে দিয়েছিল। মানিক আত্মস্বীকৃত সেঞ্চুরিয়ান ধর্ষক আর মজনুকে ধর্ষণের অভিযোগে সিরিয়াল ধর্ষক হিসেবে ধরা হয়েছে।

মজনু অশিক্ষিত, টোকাই, মাদকাসক্ত; কিন্তু মানিক ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, শিক্ষিত-জ্ঞানী। পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী বাস টার্মিনালে, রেলস্টেশনে ঘুরে বেড়ানো মজনু মাসখানেক আগে তার প্রেমিকাকে এক সিএনজি অটোরিকশা চালকের সঙ্গে পালিয়ে যেতে দেখার পর আর কোনো হদিস না পেয়ে উন্মাদ হয়ে গেছে।

এ এক মাসে সে পাঁচ-ছয়টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। ধর্ষক মানিক হল সমাজের মাথা আর মজনু হল ঘুণেধরা কঙ্কালসার সমাজের ছেঁড়া তেনা। মানিকের ঘটনায় শেষমেশ কী হয়েছিল তা আজও জানা যায়নি। মজনুর বিচার কীভাবে হবে তা হয়তো পরবর্তী সময়ে জানা যাবে।

মজনু যদি সত্যি মাদকাসক্ত হয়ে থাকেন তাহলে টোকাই হয়ে সে মাদকের অর্থ জোগায় কীভাবে? সে কী ধরনের মাদকদ্রব্য সেবন করে? কোথায় সেগুলো পায়? আমাদের দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য এত শত ব্যবস্থা, এত পাহারাদার, এত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, নিরাময়কেন্দ্র- এগুলোর কাজ কী?

সেদিন একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেই ফেললেন- মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য বিয়ারকে সহজলভ্য করতে হবে। কী হাস্যকর কথা! বিয়ারে কি মাদকদ্রব্য নেই? আমাদের মতো দেশে বিয়ার কি হারাম বা নিষিদ্ধ পানীয় নয়? তিনি কি সেটা জানেন না? অর্থাৎ মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারীদের সংখ্যা ঘরে-বাইরে মাকড়সার জালের মতো বিরাজ করছে।

যে সমাজের উঁচু পর্যায় থেকে নিচু পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক মাদকসেবী রয়েছে সেখানে মাদকদ্রব্য ব্যবসা চলতেই থাকবে। মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা চলতে থাকলে এর আগমন হতেই থাকবে এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে মাদকের বিক্রি, পাচার ইত্যাদি ঘটবে। এর ফলস্বরূপ সমাজে ধর্ষণ, খুন, ছিনতাই, পর্নোগ্রাফি, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং কালচার, ঘুষ-দুর্নীতি ইত্যাদি ক্রমাগত বৃদ্ধি হতে থাকলে সেগুলো বন্ধ করবেন কীভাবে?

আগেই বলেছি- এখন যুক্তির জোর কমে গেছে অথবা নেই। সব জায়গায় জোরের যুক্তি চলে। অর্থ-বিত্ত, ধোঁকা দিয়ে জোরের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তৎপরতা চালানো হয়। অর্থ-বিত্ত, ধোঁকা ও তদবির করে অথবা তোয়াজ-তোষণের মাধ্যমে গোঁজামিল দিয়ে গল্প বানিয়ে জটিল সামাজিক সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে।

সারা বিশ্বে জটিল আর্থ-মনো-সামাজিক সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য বৈজ্ঞানিক গভীর চিন্তাপ্রসূত পেশাদারি নৈতিকতা নিয়ে শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সেবাদান প্রক্রিয়া গড়ে উঠলেও আমাদের দেশে এখনও সেটা সুদূরপরাহত। এখানে ব্যক্তি বিশেষকে খুশি করার জন্য তাৎক্ষণিকভাকে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়ার লোকের অভাব নেই।

এর ফলে দুর্নীতির নতুন শাখা-প্রশাখা গজিয়ে ওঠে। তা না হলে সামাজিক নিরাপত্তামূলক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবাকাঠামো স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সেবাদান প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে পারছে না কেন?

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান; সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাবি ছাত্রীকে ধর্ষণ