বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আচার্যের উদ্বেগ

  মুঈদ রহমান ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের ৪৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রায় ১০০টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে পদাধিকার বলে অধিষ্ঠিত আছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। একটি বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী হলেও ব্যক্তিগত আচার-আচরণে তিনি বাংলাদেশের আমজনতার কাছে একজন অত্যন্ত সমাদৃত ব্যক্তি। সাংবিধানিকভাবেই আমাদের রাষ্ট্রপতির পদটি সর্বোচ্চ সম্মানিত এবং ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নামমাত্র। এটিকে একটি আলংকারিক পদ বলা যায় এবং রাষ্ট্রপতির কর্মক্ষেত্র ও কর্মজীবন দুটোই পুরোমাত্রায় আনুষ্ঠানিকতানির্ভর। মাটি ও মানুষের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করা একজন ব্যক্তির কাছে এ জীবন খুব বেশি সুখকর হওয়ার কথা নয়। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার নিঃসঙ্গতার কথা অকপটেই বলে থাকেন। যে কোনো অনুষ্ঠানেই তাকে পূর্ব-অনুমোদিত কথা বলতে হয়। মাঝে মাঝে অনেকটা ফাঁপরে পরেই ব্যক্তিগত দু’চার লাইন কথা বলতে শুনি এবং সেসব কথার অনেকটাই রসে টইটম্বুর। সমালোচকদের অনেকেই মনে করেন, রসিকতার মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন আছে; বিশেষত রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে। আমি সমালোচকদের সঙ্গে বিরোধ না করে একটি কথাই বলতে চাই- রসিকতা একজন মানুষের মনের সরলতার প্রকাশ ঘটায়, এক্ষেত্রে মাত্রা নিয়ন্ত্রণ অনেকটা ‘টেকনিক্যাল’; যে কারণে রাষ্ট্রপতি আমাদের কাছে জটিলতা-কুটিলতাবিবর্জিত একজন সহজ-সরল মানুষ হিসেবে পরিচিত। তবে হ্যাঁ, সহজ-সরল উক্তি অনেক সময় বিব্রতকরও হতে পারে। কেননা সর্বোচ্চ পদের মানুষের মুখনিঃসৃত প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি লাইন আইন বা নির্দেশ-আদেশের সমার্থক বলে ধরে নেয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেয়া তার বক্তব্য বেশ আলোচিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে তার উৎকণ্ঠার প্রকাশ ঘটেছে। সমাবর্তনে দেয়া বক্তব্যে শিক্ষকদের প্রতি কিছু অনুযোগ, কিছু অভিযোগ অপ্রকাশিত থাকেনি। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ কেউ আচার্যের বক্তব্যকে ‘পজিটিভলি’ নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যা করেন না; তার দায়ও শিক্ষকদের ওপর চাপানো হয়েছে। এ দলটি অনেকটা মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন। তৃতীয় আরেকটি অংশ আছেন, যারা মনে করেন, উচ্চশিক্ষার বর্তমান যে হাল, এ দুর্গতির প্রকৃত কারণ উদঘাটনের ক্ষেত্রে আচার্যের বক্তব্য পূর্ণাঙ্গ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চারিত বিবরণের চেয়ে প্রকৃত অবস্থা অধিকতর ভয়াবহ। আবার অনেক কথাই প্রকৃত অবস্থার তুলনায় অতিরঞ্জন। তবে শিক্ষাঙ্গনের বাইরে থাকা অভিভাবকদের কাছে রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রায় ষোলআনাই সমাদৃত হয়েছে। আমরা সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিধায় তা আমাদের কারও কারও কাছে ‘অপূর্ণাঙ্গ’ মনে হতে পারে। আমি মনে করি, মাননীয় আচার্যের বক্তব্যে অতিসন্তুষ্টির কিছু নেই; আবার পুরোপুরি অসন্তুষ্টিরও কিছু নেই, যা প্রয়োজন তা হল- শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রকৃত সমস্যা তুলে ধরা এবং তার সমাধানে করণীয় উপায়গুলো খুঁজে বের করা।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি সান্ধ্যকোর্সের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। সান্ধ্যকোর্স চালুর শুরুতে অনেক প্রগতিশীল শিক্ষার্থীই আমার কাছে এটিকে ‘শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ’ বলে দাবি করেছিল। আমি স্বল্প ভাবনাতেই বলেছিলাম, যদি নিয়মিত ছাত্রদের প্রতি অবহেলা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত না করে তা করা হয়, তবে তাকে ‘শিক্ষার সম্প্রসারণ’ ভাবতে দোষ কোথায়। কিন্তু বছর দুই পরই আমার ভাবনা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ওই প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের ভাবনাটাই যথার্থ ছিল। দেখলাম, এটি ‘সনদ বিক্রির’ একটা বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। আর নিয়মিত ছাত্রদের প্রতি অবহেলাও চোখে পড়েছে। একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী একটা কোর্সে ৪০-৪৫টা ক্লাস করেও ৭০ শতাংশ নম্বর তুলতে পারে না; অথচ একজন সান্ধ্যকালীন শিক্ষার্থী মাত্র ৮-১০টা ক্লাস করে ৮০ শতাংশ নম্বরও পেয়ে যায়।

মানদণ্ড নিরূপণে এটি এক ধরনের বৈষম্য। বাড়তি চাপ শিক্ষকদের মানসিকতার মধ্যেও অসহিষ্ণুতার জন্ম দিচ্ছে। একজন মানুষ বিরতিহীনভাবে সারা সপ্তাহ কাজ করলে তো এমনটি হবেই। পেশাজীবী মানুষের বিশ্রাম ও বিনোদনের প্রয়োজন আছে বলেই তো সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেই বিশ্রাম-বিনোদনকে পরিহার করে কাজে নিয়োজিত থাকলে স্বাভাবিক সুস্থতায় ব্যাঘাত ঘটতে বাধ্য; কিন্তু তারপরও শিক্ষকরা সান্ধ্যকোর্স চালু রাখতে চান কেন? সেটা নিতান্তই আর্থিক স্বচ্ছলতার কথা মাথায় রেখে। এ আর্থিক স্বচ্ছলতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দু’রকম মতামত পাওয়া যায়। এক অংশ মনে করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অন্যান্য বিভাগের মানুষজন বেতনের বাইরে অধিকতর আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। শিক্ষকদের সে সুবিধা নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘গ্রেড-২’র একজন সরকারি কর্মকর্তা তার গাড়ি পরিচালন ব্যয় হিসেবে মাসে ৫০ হাজার টাকা পান, কেউ কেউ গৃহকর্মী ও বাবুর্চির সুবিধাও পান। এর কোনো একটিও একই গ্রেডের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পান না। এ যুক্তিকে একবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আরেক অংশ মনে করেন, শিক্ষকদের আর্থিক বিবেচনার চেয়ে নৈতিক বিবেচনা অধিকতর গ্রহণীয়। তারা যুক্তি দেখান, যেসব শিক্ষক এখনও নৈতিক দিক বিবেচনায় সান্ধ্যকোর্স থেকে বিরত আছেন, তারা কি না খেয়ে মরে গেছেন? কোন পর্যায়কে স্বচ্ছল বলা হবে?

তাদের যুক্তিও ফেলে দেয়ার মতো নয়। শিক্ষকতা পেশাকে ভিন্নমাত্রায় বিবেচনা করে খোদ মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের উদ্দেশে সমাবর্তনে বলেছেন, ‘আপনারা চাইলে অন্য যে কোনো লোভনীয় চাকরি বা পদে যোগ দিতে পারতেন; কিন্তু তা না করে শিক্ষকতাকে আপনারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাই, কোনো ধরনের লোভ বা প্রলোভনে না পড়ে এ পেশার মর্যাদা আপনাদের সমুন্নত রাখা উচিত। আর শিক্ষার্থীরা শুধু তখনই আপনাদের আদর্শ হিসেবে মনে করবে।’ অত্যন্ত আবেদনময়ী কথা। দুই ধরনের বক্তব্যকে আমলে নিয়ে একটি নিবেদনই করা যায়- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কিছু অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা প্রদান করে সান্ধ্যকোর্স চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হোক।

মাননীয় আচার্য ভিসিদের দুর্নীতির কথা অত্যন্ত খোলামেলাভাবেই বলেছেন। কিছু কিছু শিক্ষকের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার কথাও বলেছেন। আচার্য মহোদয়ের এ অভিযোগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে অন্তত আমার নেই। কোনো সন্দেহ নেই, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কিছু সদস্য নানা আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, এর প্রতিবাদ করতে গেলে সরকারের ওপর মহল নারাজ হয়, সরকারি ছাত্রসংগঠন লাঠিপেটা করে। আমরা যাব কোথায়? যে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভিসি হিসেবে একজন নিয়োগ পান, তার কাছে স্বচ্ছতা আশা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। একটি পরিচ্ছন্ন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভিসি নিয়োগ দেয়া উচিত বলে অনেকেই মনে করেন। তবে এখানে একটি কথা স্পষ্টভাবেই বলতে চাই, ১/১১-এর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন বর্তমান মাননীয় প্রধামন্ত্রী শেখ হসিনাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে, তখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই প্রতিবাদ করেছে এবং কারাবরণ করতেও পিছপা হয়নি। অন্য কোনো পেশার লোক সেদিন টু শব্দটিও করেনি। সেসব শিক্ষকের সেদিনের আলোকিত ভূমিকা যদি সমগ্র শিক্ষক সমাজকে আলোকিত করে না থাকে, তবে আজকের গুটিকয়েক শিক্ষকের কলঙ্কিত ভূমিকা সমগ্র শিক্ষক সমাজকে কলঙ্কিত করবে কেন? আমরা সাধারণ শিক্ষকরা এর দায়ভার নিতে নারাজ। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিচার করলে আমরাও সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান হাল বা অবস্থার সবচেয়ে বড় কারণটি কিন্তু আলোচনার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাজুক পরিস্থিতির মূল কারণ আমি মনে করি, শিক্ষকদের ন্যক্কারজনক লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি। এ রাজনীতি কোনো নীতি-আদর্শকে ধারণ করে না; স্রেফ গ্রুপিং। বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা তো অনেকটাই নিষ্ক্রিয়, মাঠে আছেন শুধুই আওয়ামীপন্থীরা। অন্য কোনো প্রতিপক্ষ না থাকায় এখন আওয়ামীরাই আওয়ামীর প্রতিপক্ষ। সুযোগ পেলেই একজন আরেকজনকে মুহূর্তের মধ্যে ‘রাজাকার’ বানিয়ে ফেলছেন। দুর্নীতিসম্পৃক্ত ভিসির কথা বাদ দিলাম। একজন ভালো ভিসিও যদি থাকেন; তারপরও একটি বিরোধী গ্রুপ থাকবে এবং তা নিজের দলেরই। একজন অপরজনকে দাবিয়ে রাখার কাজেই দিনরাত ব্যস্ত, শিক্ষকতা করার সময় কই? তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবাধ দলীয়করণ। আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, দলীয়করণের বর্তমান চিত্র অতীতের যে কোনো সময়কে হার মানাবে। এতে করে ভিন্নমতের প্রার্থীরাই যে বঞ্চিত হচ্ছেন তা নয়, সুপারিশের ঘাটতির কারণে সরকার সমর্থক যোগ্য প্রার্থীও বঞ্চিত হচ্ছেন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে এক সহকর্মীকে অপর সহকর্মীর উদ্দেশে প্রশ্ন করতে শুনলাম- তোমাদের বিভাগে কতজন শিক্ষক? পরিষ্কার জবাব শুনতে পেলাম- ৫ জন শিক্ষক আর ২৫ জন ভোটার। এ হল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের হাল। এ অবস্থা চলমান রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সার্বিক মান উন্নত করা এক ধরনের অবৈজ্ঞানিক চিন্তার বেশি কিছু নয়।

রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য ও অভিভাবক। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো নাজুক অবস্থা তাকে উৎকণ্ঠিত করবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আচার্যের কিছু অভিমতও থাকবে। আমরা আশা করব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থাকে খণ্ডিতভাবে না দেখে যেন সার্বিক বিবেচনায় নেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে একটি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা অত্যন্ত জরুরি। সে বিষয়ে দ্রুত ও আন্তরিক পদক্ষেপ কামনা করছি।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×