গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ন্যূনতম ভোট বেঁধে দেয়ার সময় এসেছে
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ন্যূনতম ভোট বেঁধে দেয়ার সময় এসেছে

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হল ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচন।

সুষ্ঠু সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সব আশ্বাসকে অকার্যকর প্রমাণিত করে অনুষ্ঠিত হল অনিয়মে ভরা ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, মাঠের বিরোধী দল বিএনপি সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে যে সংশয় প্রকাশ করেছিল, তা সত্যে পরিণত হল। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হল, দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ভোট প্রদানের এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ঢাকার দুই সিটিতেই মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা।

ডিএনসিসিতে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ২০১৯ সালের উপনির্বাচনে মেয়র পদে জয়ী ৯ মাস মেয়র পদের দায়িত্ব পালনকারী মো. আতিকুল ইসলাম এবং ডিএসসিসিতে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বি^তাকারী শেখ ফজলে নূর তাপস। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা উভয় সিটিতে একচেটিয়াভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

এ নির্বাচনে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. ভোট যন্ত্রে ভোটারদের আঙুলের ছাপ নেয়ার পর তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে সেখানে উপস্থিত ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকদের নিজেদের মার্কায় ভোট চেপে দেয়া।

খ. গোপন কক্ষে উপস্থিত হয়ে সরকার দলীয় নেতাকর্মী কর্তৃক ভোটারকে নির্দিষ্ট প্রার্থীর প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা। গ. বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া।

ঘ. বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের অনুপস্থিতির সুযোগে ইভিএমের কলাকৌশল সম্পর্কে সম্যক অবহিত ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সরকার দলীয় প্রার্থীদের অনুকূলে জাল ভোট প্রদান।

ঙ. ভোটকক্ষ, কেন্দ্রের ভেতর এবং কেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকের ব্যাজধারীদের একতরফা নিয়ন্ত্রণ। চ. ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের অস্থায়ী আনসার হিসেবে নিয়োজিত করা।

কোনো কোনো জাতীয় দৈনিকে এসব অভিযোগের বিস্তারিত ও সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

গণমাধ্যমে এসব প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এ সিটি নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। নির্বাচন কমিশনের সচিব বলেছেন, নির্বাচনের পরিবেশ অত্যন্ত ভালো ছিল। কাউকে ভোট দেয়ার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেনি।

তবে এ নির্বাচনে কম ভোট পড়ার কারণ হিসেবে তার মন্তব্য ছিল হাস্যকর। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘ছুটি পেয়ে ভোটাররা আরাম-আয়েশে থাকার কারণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট দিতে যাননি।’

কারচুপির অভিযোগ তুলে ঢাকা দুই সিটির ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভয়াবহ রকমের কারচুপি, জালিয়াতি জবরদস্তি করে নির্বাচনের রায়কে পদদলিত করে, একেবারেই তাদের দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ নির্বাচনকে প্রভাবিত করে লুট করে ফলাফল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিএনপি এর তীব্র প্রতিবাদ করছে।

বিএনপির দুই মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ন্যূনতম সুষ্ঠু কোনো ভোট হয়নি। নির্বাচনের ফলাফল মনগড়া ও সাজানো। এ ফলাফলের মাধ্যমে জনগণের প্রতিফলন ঘটেনি।

ভোটারের উপস্থিতি কম হওয়ায় নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। সিপিবি বলেছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জনগণের মধ্যে নানাভাবে ভয়ভীতি সঞ্চার করায় অধিকাংশ মানুষ ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট প্রদান করতে পারেনি।

ভোটের নামে আরেকবার নতুন ধরনের প্রহসন সংঘটিত হতে দেখল ঢাকাবাসী। জালিয়াতি, প্রহসন ও ডিজিটাল কারচুপির ফলাফল বাতিল করে নতুন করে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের দাবি করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের অনুপস্থিতি বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের হতাশা ও অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি এ সিটি নির্বাচনকে গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলে আখ্যায়িত করেছে। ঐক্য ন্যাপ বলেছে, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে সর্বাধিক কম ভোট পড়ার নজির প্রমাণ করে, ভোটারদের নির্বাচনের প্রতি অনীহা ও অনাস্থা প্রকট হয়ে উঠেছে।

এটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) বলেছে, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে কম ভোট পড়ার ঘটনা গণতন্ত্রের চরম দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে গড়ে ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী যথাক্রমে মো. আতিকুল ইসলাম এবং শেখ ফজলে নূর তাপস যথাক্রমে মাত্র ১৪ দশমিক ৮৪ এবং ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছেন।

অনেকে আবার মনে করছেন, প্রকৃত ভোটারের সমর্থন এর চেয়েও কম হবে। নজিরবিহীন কমসংখ্যক ভোটারের সমর্থন নিয়ে মেয়র পদের দায়িত্ব পালনের গ্রহণযোগ্যতা সংক্রান্ত প্রশ্ন ইতিমধ্যে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোটসহ ২৮টি দল ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও শাসক দল আওয়ামী লীগের অনেকটা একক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনের পর থেকে ভোটের প্রতি জনগণের আগ্রহ কমছে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার কারণে জনগণ নির্বাচনব্যবস্থার ওপর আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, মাঠের বিরোধী দল বিএনপি এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করলেও শাসক দলের হস্তক্ষেপে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম সংঘটিত হয়।

অনিয়মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অনিয়মটি ছিল- নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের অনুকূলে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা। এর ফলে জনগণ নির্বাচনের ওপর সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে এবং ভোট দেয়া না-দেয়াকে সমান বলে মনে করছে।

এর প্রতিফলন ঘটে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অল্পদিন পরে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনে। ওই উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ ২০১৫ সালের ডিএনসিসির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

গত বছরের ১০ মার্চ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৩৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। ইতঃপূর্বে ২০০৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৬৮ দশমিক ৩২ এবং ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৬০ দশমিক ৯৫ শতাংশ ভোটার ভোট দেন।

মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের চট্টগ্রাম-৮ আসনের নির্বাচনে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট পড়ে বলে রিটার্নিং অফিসারের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়। তবে ওই উপনির্বাচনে পরাজিত বিএনপি প্রার্থীর মতে, মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পড়লেও নির্বাচন কমিশন তা ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বলে প্রচার করে।

উপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হল, জনগণ বর্তমান দলীয় সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে ভোট প্রদানে আগ্রহী নন। তারা মনে করেন, ভোট দেয়া না-দেয়া সমান। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে জয়ী হিসেবে ঘোষণা দেয়া হবে। জনগণ নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

২২ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) যদি ৫০ শতাংশ ভোট না পড়ে, তাহলে ব্যালট পেপারে আবার ভোট গ্রহণ করা উচিত। এ জন্য নির্বাচনী বিধি-বিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি বলেন, যে কোনো নির্বাচনে শতকরা ৫০ ভাগ ভোট না পড়লে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ জন্য বিশ্বের অনেক দেশে ৫০ শতাংশের কম ভোট পড়লে আবার ভোট গ্রহণ করা হয়।

আমি পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করি বলে যারা জানেন, তাদের অনেকে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, নজিরবিহীন স্বল্পসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত কি না।

সবশেষে মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে ন্যূনতম ভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। জাতীয় নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচনে এ হার আলাদা আলাদা হতে পারে। এ জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনে সংশোধনী আনা প্রয়োজন হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ন্যূনতম ভোট বেঁধে দেয়ার সময় এসেছে

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হল ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচন।

সুষ্ঠু সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সব আশ্বাসকে অকার্যকর প্রমাণিত করে অনুষ্ঠিত হল অনিয়মে ভরা ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, মাঠের বিরোধী দল বিএনপি সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে যে সংশয় প্রকাশ করেছিল, তা সত্যে পরিণত হল। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হল, দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ভোট প্রদানের এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ঢাকার দুই সিটিতেই মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা।

ডিএনসিসিতে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ২০১৯ সালের উপনির্বাচনে মেয়র পদে জয়ী ৯ মাস মেয়র পদের দায়িত্ব পালনকারী মো. আতিকুল ইসলাম এবং ডিএসসিসিতে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বি^তাকারী শেখ ফজলে নূর তাপস। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা উভয় সিটিতে একচেটিয়াভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

এ নির্বাচনে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. ভোট যন্ত্রে ভোটারদের আঙুলের ছাপ নেয়ার পর তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে সেখানে উপস্থিত ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকদের নিজেদের মার্কায় ভোট চেপে দেয়া।

খ. গোপন কক্ষে উপস্থিত হয়ে সরকার দলীয় নেতাকর্মী কর্তৃক ভোটারকে নির্দিষ্ট প্রার্থীর প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা। গ. বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া।

ঘ. বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের অনুপস্থিতির সুযোগে ইভিএমের কলাকৌশল সম্পর্কে সম্যক অবহিত ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সরকার দলীয় প্রার্থীদের অনুকূলে জাল ভোট প্রদান।

ঙ. ভোটকক্ষ, কেন্দ্রের ভেতর এবং কেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকের ব্যাজধারীদের একতরফা নিয়ন্ত্রণ। চ. ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের অস্থায়ী আনসার হিসেবে নিয়োজিত করা।

কোনো কোনো জাতীয় দৈনিকে এসব অভিযোগের বিস্তারিত ও সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

গণমাধ্যমে এসব প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এ সিটি নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। নির্বাচন কমিশনের সচিব বলেছেন, নির্বাচনের পরিবেশ অত্যন্ত ভালো ছিল। কাউকে ভোট দেয়ার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেনি।

তবে এ নির্বাচনে কম ভোট পড়ার কারণ হিসেবে তার মন্তব্য ছিল হাস্যকর। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘ছুটি পেয়ে ভোটাররা আরাম-আয়েশে থাকার কারণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট দিতে যাননি।’

কারচুপির অভিযোগ তুলে ঢাকা দুই সিটির ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভয়াবহ রকমের কারচুপি, জালিয়াতি জবরদস্তি করে নির্বাচনের রায়কে পদদলিত করে, একেবারেই তাদের দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ নির্বাচনকে প্রভাবিত করে লুট করে ফলাফল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিএনপি এর তীব্র প্রতিবাদ করছে।

বিএনপির দুই মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ন্যূনতম সুষ্ঠু কোনো ভোট হয়নি। নির্বাচনের ফলাফল মনগড়া ও সাজানো। এ ফলাফলের মাধ্যমে জনগণের প্রতিফলন ঘটেনি।

ভোটারের উপস্থিতি কম হওয়ায় নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। সিপিবি বলেছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জনগণের মধ্যে নানাভাবে ভয়ভীতি সঞ্চার করায় অধিকাংশ মানুষ ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট প্রদান করতে পারেনি।

ভোটের নামে আরেকবার নতুন ধরনের প্রহসন সংঘটিত হতে দেখল ঢাকাবাসী। জালিয়াতি, প্রহসন ও ডিজিটাল কারচুপির ফলাফল বাতিল করে নতুন করে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের দাবি করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের অনুপস্থিতি বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের হতাশা ও অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি এ সিটি নির্বাচনকে গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলে আখ্যায়িত করেছে। ঐক্য ন্যাপ বলেছে, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে সর্বাধিক কম ভোট পড়ার নজির প্রমাণ করে, ভোটারদের নির্বাচনের প্রতি অনীহা ও অনাস্থা প্রকট হয়ে উঠেছে।

এটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) বলেছে, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে কম ভোট পড়ার ঘটনা গণতন্ত্রের চরম দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে গড়ে ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী যথাক্রমে মো. আতিকুল ইসলাম এবং শেখ ফজলে নূর তাপস যথাক্রমে মাত্র ১৪ দশমিক ৮৪ এবং ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছেন।

অনেকে আবার মনে করছেন, প্রকৃত ভোটারের সমর্থন এর চেয়েও কম হবে। নজিরবিহীন কমসংখ্যক ভোটারের সমর্থন নিয়ে মেয়র পদের দায়িত্ব পালনের গ্রহণযোগ্যতা সংক্রান্ত প্রশ্ন ইতিমধ্যে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোটসহ ২৮টি দল ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও শাসক দল আওয়ামী লীগের অনেকটা একক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনের পর থেকে ভোটের প্রতি জনগণের আগ্রহ কমছে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার কারণে জনগণ নির্বাচনব্যবস্থার ওপর আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, মাঠের বিরোধী দল বিএনপি এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করলেও শাসক দলের হস্তক্ষেপে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম সংঘটিত হয়।

অনিয়মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অনিয়মটি ছিল- নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের অনুকূলে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা। এর ফলে জনগণ নির্বাচনের ওপর সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে এবং ভোট দেয়া না-দেয়াকে সমান বলে মনে করছে।

এর প্রতিফলন ঘটে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অল্পদিন পরে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনে। ওই উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ ২০১৫ সালের ডিএনসিসির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

গত বছরের ১০ মার্চ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৩৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। ইতঃপূর্বে ২০০৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৬৮ দশমিক ৩২ এবং ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৬০ দশমিক ৯৫ শতাংশ ভোটার ভোট দেন।

মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের চট্টগ্রাম-৮ আসনের নির্বাচনে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট পড়ে বলে রিটার্নিং অফিসারের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়। তবে ওই উপনির্বাচনে পরাজিত বিএনপি প্রার্থীর মতে, মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পড়লেও নির্বাচন কমিশন তা ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বলে প্রচার করে।

উপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হল, জনগণ বর্তমান দলীয় সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে ভোট প্রদানে আগ্রহী নন। তারা মনে করেন, ভোট দেয়া না-দেয়া সমান। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে জয়ী হিসেবে ঘোষণা দেয়া হবে। জনগণ নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

২২ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) যদি ৫০ শতাংশ ভোট না পড়ে, তাহলে ব্যালট পেপারে আবার ভোট গ্রহণ করা উচিত। এ জন্য নির্বাচনী বিধি-বিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি বলেন, যে কোনো নির্বাচনে শতকরা ৫০ ভাগ ভোট না পড়লে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ জন্য বিশ্বের অনেক দেশে ৫০ শতাংশের কম ভোট পড়লে আবার ভোট গ্রহণ করা হয়।

আমি পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করি বলে যারা জানেন, তাদের অনেকে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, নজিরবিহীন স্বল্পসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত কি না।

সবশেষে মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে ন্যূনতম ভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। জাতীয় নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচনে এ হার আলাদা আলাদা হতে পারে। এ জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনে সংশোধনী আনা প্রয়োজন হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন