গণতন্ত্রের স্বার্থেই সঠিক নির্বাচন জরুরি

  মো. মইনুল ইসলাম ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোট
ফাইল ছবি

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে প্রচুর আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। গণতন্ত্রের অন্যতম একটি উপাদান (বা প্রতিষ্ঠান) হচ্ছে নির্বাচন। একটি দেশ যত গণতান্ত্রিক, ততই তার নির্বাচনী ব্যবস্থা সুদৃঢ় এবং সাবলীল; কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় বা সম্মতি নিয়েই গণতন্ত্রে একটি দেশে সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

নির্বাচন যত অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হবে, ততই নির্বাচন-বিজয়ী সেই সরকার দেশ ও বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং বৈধতা পাবে।

দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও নির্বাচনী ব্যবস্থাটি দেশে একটি স্থায়ী শক্তিশালী ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। এর জন্য বহুলাংশে দায়ী ক্ষমতাসীনরা; যাদের মধ্যে আছে রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং সামরিক শাসকরা।

দেখা গেছে, ব্যাপক গণআন্দোলনে সামরিক এবং বেসামরিক ক্ষমতালোভী শাসকদের পতন ঘটলে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলো বহুলাংশে সঠিক এবং সত্যিকার (অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ) নির্বাচন উপহার দিয়েছে।

এর প্রধান কারণ, ক্ষমতাসীনরা সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। তাই তারা নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা চালায়। এ ধরনের অপচেষ্টা থেকেই নির্বাচন লোকদেখানো ও প্রহসনমূলক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। ফলে মানুষ নির্বাচনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।

১৯৯০ সালে সামরিক সরকারের পতনের পর দেশে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের শুরু বলে গণ্য করা হয়। তখন যে সরকার ক্ষমতায় এলো, সেই বিএনপিও ক্ষমতায় থাকার মানসে পরবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবান্বিত করার ব্যাপারে ব্যাপক অপচেষ্টা চালিয়েছিল; কিন্তু গণআন্দোলনের মুখে তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।

ফলে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। তাদের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে ঐকমত্যের সরকার গঠন করে। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনের সুষ্ঠুতা এবং সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আগের দিন রাতেই ভোট হয়ে যায় বলে অভিযোগটি দেশে বেশ ভালো প্রচার পায়। বারবার নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় মানুষের মনে ভোটের ব্যাপারে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে বলা যায়।

সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক অনুপস্থিতি উপরোক্ত আস্থাহীনতার প্রতিফলন বলে ওয়াকিবহাল মহল এবং সুশীল সমাজের ধারণা। নির্বাচন ও ভোটের ব্যাপারে মানুষের এ অনীহা ও আস্থাহীনতা দেশে গণতন্ত্রের জন্য এক বড় অশনিসংকেত।

আগেই বলা হয়েছে, গতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত এবং ব্যাপক অংশগ্রহণ না থাকলে সে নির্বাচন যেমন বিশ্বাসযোগ্য ও অর্থপূর্ণ হবে না; তেমনি সে সরকার সত্যিকার প্রতিনিধিত্বমূলক হবে না। তাই সে সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নেও তৎপর হবে না।

আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দরিদ্র দেশে সবচেয়ে বড় দরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে দারিদ্র্য বিমোচন। দারিদ্র্য আমাদের জীবনে এক চরম অভিশাপ। সেই শাপমোচনের বড় ওষুধ হল অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

সেই উন্নয়নের সুফল যাতে দেশের সব মানুষ ন্যায়সঙ্গতভাবে পায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। তা না হলে শুধু ধনীর ধন বাড়বে; গরিব গরিবই থেকে যাবে।

কিন্তু এটাও সত্য, মানুষ যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন চায়, তেমনি মৌলিক, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক অধিকারগুলোরও উন্নয়ন চায়। কারণ ইংরেজি মহাজন বাক্যটি যথা Man does not live by bread alone বা মানুষ শুধু রুটি বা ভাত খেয়ে বাঁচে না।

রুটি বা ভাতে দেহরক্ষা হয়; কিন্তু মনের পরিপুষ্টি তথা মানবিক সত্তার বিকাশ ঘটে না। গণতন্ত্র মানুষের সেই মানবিক সত্তা তথা মনের চাহিদা পূরণে এবং সাংস্কৃতিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করে।

তাছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হওয়ার জন্যও গণতন্ত্র দরকার। দেখা গেছে, দীর্ঘদিন অগণতান্ত্রিক শাসন চলতে থাকলে এর বিরুদ্ধে মানুষের সঞ্চিত ক্ষোভ হঠাৎ করে গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। ফলে দেশজুড়ে বিরাট ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়।

পাকিস্তান আমলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের উচ্ছেদ ঘটে এ ধরনের গণঅভ্যুত্থানে। তার উন্নয়নের দশক বা Decade of development শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের পতনের সূচনা করে। গত কয়েক বছর ধরে সুদান ও আলজেরিয়ায় স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন এ ধরনের দৃষ্টান্ত। আমাদের দেশে এ ধরনের স্বৈরশাসন নেই।

বিদেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আমাদের মতো দেশগুলোর শাসনব্যবস্থাকে হাইব্রিড বা দোআঁশলা গণতন্ত্রের পর্যায়ে ফেলেন; যার অর্থ কিছু গণতন্ত্র এবং কিছু স্বৈরতন্ত্রের মিশ্রণ। আমাদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে নির্ভেজাল গণতন্ত্র।

আর সে আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন দেখি যখন দেশবাসী ভেজাল বা বড় ধরনের একটি পূর্ণ নির্বাচনের ব্যাপারে সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। একটি ত্রুটিপূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন শুধু দেশবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করে না; সেই সঙ্গে জাতীয় জীবনে দুর্নীতি-অনিয়ম এবং অপশক্তিগুলোকে প্রশ্রয় দেয়। এর ফলে গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ সুশাসন ও আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়।

শুরুতেই সত্যিকার একটি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে সংজ্ঞায়িত করেছি। এও বলেছি, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো মোটামুটি সত্যিকার নির্বাচন হয়েছে।

কারণ সেগুলোয় মানুষ অবাধে বা বাধাহীনভাবে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভোট দিতে পেরেছে। দলীয় ক্যাডার বা গুণ্ডা-মাস্তানরা ভোটকেন্দ্র দখল বা জালভোট দিতে পারেনি। তবে সত্যিকার নির্বাচনের জন্য টাকার দাপটের অবসান হওয়াও দরকার।

নির্বাচনে বিত্তশালীদের টাকার দাপটও একটি বড় সমস্যা। দেশে এখন নির্বাচন একটি ভীষণ ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই প্রচুর অর্থবিত্তশালী লোক ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করা বেজায় কঠিন। তাই দেখি, আমাদের সংসদগুলোয় গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী; শিক্ষিত, সুশীল সমাজের মানুষ হাতে গোনা।

এ ব্যবসায়ীরা কতটা সাধারণ মানুষের কথা সংসদে বলতে পারবে, তা যথেষ্ট প্রশ্নসাপেক্ষ। সাধারণ মানুষের সমস্যা এবং আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বরঞ্চ গণমাধ্যমে বেশি প্রকাশিত হতে দেখা যায়। লেখনী এবং বক্তব্যের মাধ্যমে গণমাধ্যমেই শিক্ষিত সচেতন এবং দেশপ্রেমিক মানুষ দেশের নানা বিষয় এবং সমস্যাবলি আলোচনা করেন এবং তুলে ধরেন।

অথচ একইভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দেশ ও মানুষের কথা সংসদে তুলে ধরবেন- এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল। নির্বাচনী ব্যবস্থার নানা ত্রুটিবিচ্যুতির কথা আগেই বলা হয়েছে। তার সঙ্গে টাকার দাপট যুক্ত হওয়ায় সংসদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ তাদের কাম্য প্রতিনিধি পাঠাতে পারে না।

তাই সংসদ থেকে প্রত্যাশিত সুফল পায় না বলে অনেকের বিশ্বাস। এর বিপরীতে বহু মানুষের বিশ্বাস যে, সংসদ সদস্যদের একটি অংশ নির্বাচনী খরচ উঠানোসহ ব্যক্তিগত ধন-সম্পদ বৃদ্ধির কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকে।

পরিশেষে এটাও বলা দরকার, নির্বাচনে টাকার খেলা শিগগির শেষ হবে বলে আশা করা যায় না। যা আশা করা যায় এবং মানুষ যা চায় তা হল, তত্ত্বাবধায়কদের মতো একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটের গড় হার হচ্ছে ২৭.১৫ শতাংশ- উত্তরে ২৫.৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণে ২৯.০০২ শতাংশ।

এটি জনগণের ব্যাপক অনাগ্রহরই প্রতিফলন। আর সেই অনাগ্রহর বড় কারণ হচ্ছে ভোটের ব্যাপারে আস্থাহীনতা। কয়েকজনকে এমনও বলতে শোনা গেছে, গিয়ে কী হবে, দেখা যাবে ভোট আগেই হয়ে গেছে।

তাই ভোটের ব্যাপারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং সে কাজটি ক্ষমতাসীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে যৌথভাবে করতে হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এটা বিশেষ জরুরি।

মো. মইনুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×