অর্থ পাচারকারীদের ফেরাতে দুদককে সফল হতেই হবে

  মুঈদ রহমান ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুদক

শিরোনামটি আকর্ষণীয় করতে বলা যেত, ‘প্রতি বছর বিদেশিরা একটি করে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের বাইরে পাচার করছেন’। আকর্ষণীয় হতো বটে তবে তা হতো আলোচ্য বিষয়ের খণ্ডিত প্রতিফলন। তাই তা থেকে বিরত রইলাম। বর্তমানে দেশের ২১ খাতে ৪৪ দেশের ২ লাখ ৫০ হাজার বিদেশি নাগরিক কাজ করছেন। এর মধ্যে কর দিচ্ছেন ৯ হাজার ৫০০ জন। বাকি ২ লাখ ৪১ হাজার অবৈধ। এরা বেতনের নামে দেশ থেকে বছরে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার করছেন, যা পদ্মা সেতুর মোট ব্যয়ের প্রায় সমান।

ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে ১২ হাজার কোটি টাকা। আর বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এ ২ লাখ ৫০ হাজার কর্মীর মাসিক আয় গড়ে ১ হাজার ৫০০ ডলার। সে হিসাবে বিদেশিদের এক বছরে মোট আয় হয় ৪৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে খরচাপাতি বাদ দিয়ে তারা ৩১৫ কোটি ডলার নিজ নিজ দেশে নিয়ে যায়। আপনি যদি ১ মার্কিন ডলার সমান ৮৫ টাকা ধরেন, তাহলে বাংলাদেশের মুদ্রায় পরিমাণটা দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা।

দেশের বাইরে যাওয়া টাকার ভেতর বৈধভাবে যাচ্ছে মাত্র ৩৯১ কোটি টাকা; বাদবাকি ২৬ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকাই অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশে বিদেশি বৈধ নাগরিকের সংখ্যা মাত্র ৮৫ হাজার ৪৮৬, যাদের মধ্যে ব্যবসায়ীর সংখ্যা সর্বাধিক ৬৭ হাজার ৮৫৩ জন। অন্যদিকে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতর বলছে, বাংলাদেশে বৈধ বিদেশির সংখ্যা মাত্র ৩৩ হাজার ৫০৪, যার মধ্যে ব্যবসায়ী আছেন ৯ হাজার ৬৬১ জন।

পার্থক্য আমলে নিয়েই গবেষকরা মনে করেন, বৈধ-অবৈধ সব মিলিয়ে বালাদেশে বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা আড়াই লাখের কম নয়। অবৈধ কর্মীদের পুরো টাকাটাই পাচার হয়ে যায়। এর মধ্যে ভারতেরই রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার নাগরিক এবং তার পরেই রয়েছে চীন। বিদেশি বৈধ নাগরিকদের বেতনের ক্ষেত্রেও অনেক তথ্য গোপন করা হয়।

টিআইবি বলছে, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বেতন দেখানো হচ্ছে মাত্র ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার ডলার। অথচ তাদের প্রকৃত বেতনের পরিমাণ ১০-১২ হাজার ডলার। কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তার বেতন দেখানো হচ্ছে মাত্র ২.৫ থেকে ৩ হাজার ডলার, যেখানে প্রকৃত অঙ্কটা হল ৮ হাজার ডলারেরও বেশি। একজন হেড অব ডায়িং যেখানে ৫ হাজার ডলার আয় করেন, সেখানে তার বেতন ১.৫ হাজার ডলারের বেশি দেখানো হচ্ছে না। বিভিন্ন কোম্পানি বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সরকারের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সরকারকেই রাজস্ববঞ্চিত করছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি যুবক বেকার।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশের ১০০ জন শিক্ষিতের মধ্যে ৪৭ জনই বেকারত্বের জ্বালা ভোগ করছে। সেক্ষেত্রে বিদেশিদের আগমন আমাদের শ্রমবাজারকে সংকুচিত করছে। তারপরও দক্ষতার বিবেচনায় তা হয়তো আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। কিন্তু অবৈধভাবে টাকা পাচার হওয়াটা কি মেনে নেয়া যায়? উপর মহলের আত্মতুষ্টির বুলিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক অবহেলায় ভয়ংকর হয়ে উঠছে; ভাবিয়ে তুলছে সচেতন নাগরিকদের।

আমরা কোনো সমস্যা চিহ্নিত করলেও তার সমাধানে আগ্রহ দেখাতে পারি না ‘ইগো’র কারণে। টিআইবির তথ্যগুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ, পরিপূর্ণ নাও হতে পারে; কিন্তু চিন্তার খোরাক জোগাতে সক্ষম। আমরা বলি ভালো, শুনি ভালো; তবে ‘তালগাছটা আমার’ হতে হবে। বিএনপি সরকারের সময়ে যখন টিআইবি বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, তখন বর্তমান সরকারি দল (সেসময়ের বিরোধী দল) বেজায় খুশি হয়েছিল। শুধু খুশি থেকেই ক্ষান্ত ছিল না, তা দেশ-বিদেশে প্রচারের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পিছপা হয়নি।

সেই টিআইবি যখন আজকে দুর্নীতির কথা বলে, তখন সরকারের উপর মহল থেকে বলা হয়ে থাকে, ‘এ প্রতিবেদন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট’। এতে করে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং প্রকৃত সমাধান হয় উপেক্ষিত। বছরওয়ারি এভাবেই উপেক্ষিত হয়ে আসছে আমাদের সব অভিযোগ আর অনুযোগ; এক অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ।

অর্থ পাচার শুধু বাংলাদেশ থেকেই হয় এমন নয়; আবার বাংলাদেশে তা সর্বোচ্চ মাত্রায় তা-ও নয়। অর্থ পাচার নিয়ে যারা গবেষণা করে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হল ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)। তাদের ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৪৮টি দেশের মধ্যে অর্থ পাচারের দিক থেকে সবচেয়ে সামনে আছে চীন, আর বাংলাদেশের অবস্থান ১৯।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৬৫১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ (১ ডলার সমান ৮৫ টাকা ধরে) প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এ পরিমাণ টাকা আমাদের চলতি বছরের মোট বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির চেয়ে তিনগুণেরও বেশি।

২০১৫ সালে অর্থ পাচার কমে দাঁড়ায় ৫৯০ কোটি ডলারে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো, নির্বাচনের বছরে পাচারের পরিমাণটা বেশি হয়; তারপর তা আবার কমে আসে। অনেকেই মনে করেন, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই এর কারণ। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, আমাদের যে রাজস্ব আদায় হয় তার ৩৬ শতাংশের সমান টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়।

টাকা কীভাবে পাচার হয়- এ প্রশ্ন অহরহই শোনা যায়। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মনে করেন, মোট পাচারের ৮০ শতাংশই হয়ে থাকে আমদানি-রফতানির কারসাজির মাধ্যমে। এটি ভয়ংকর; কিন্তু খুবই কার্যকরী প্রক্রিয়া। ১০০ টাকার পণ্যের দাম দেখানো হল ২০০ টাকা। আমাদের ব্যাংক বিদেশি কোম্পানিকে ২০০ টাকা পরিশোধ করলে বাকি ১০০ টাকা ওই কোম্পানি বাংলাদেশি ক্রেতার বিদেশি অ্যাকাউন্টে জমা করে দেয়।

আবার রফতানির বেলায় ১০০ টাকার পণ্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, বিদেশি ক্রেতা বাদবাকি ৫০ টাকা আমাদের দেশের বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে জমা করে দেয়। হুন্ডির মাধ্যমেও একটা অংশ পাচার হয়ে যায়। ভারতীয় কোনো নাগরিক যদি বাংলাদেশে এসে ১০০ টাকা খরচ করতে চান, তাহলে সে টাকা ভারত থেকে আনার প্রয়োজন নেই। তিনি টাকাটা ভারতে এ দেশে অবস্থানরত কোনো ভারতীয় কিংবা বাংলাদেশির অ্যাকাউন্টে জমা করে খালি হাতে বাংলাদেশে আসবেন এবং এ দেশে অবস্থানরত ব্যক্তি ১০০ টাকা হাতে তুলে দেবেন। এই হচ্ছে টাকা পাচারের প্রক্রিয়া।

অর্থ পাচার একটি বিশ্বব্যাপী কর্মপ্রক্রিয়া হলেও আমাদের জন্য তা অনেক বড় অভিশাপ। তথ্য-প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে পাচার করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। আমাদের পদ্মা সেতুর এখন পর্যন্ত খরচ ধরা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং মেট্রোরেলের খরচ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এ দুটি বৃহৎ প্রকল্পের মোট ব্যয় এক বছরের পাচার করা টাকার প্রায় সমান। আমরা কি এই ভার সইবার ক্ষমতা রাখি?

অবশ্যই না। অথচ আমরা আহাজারি করলে সরকারি উপর মহল থেকে বলা হয়, প্রমাণ দিন, সাক্ষ্য দিন। আমরা আমজনতা, আমাদের অধীনে তো কোনো গোয়েন্দা সংস্থা নেই। আমাদের ঘামের পয়সায় যাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দিয়েছি, এ অভিশাপ থেকে মুক্তির দায় তো তাদেরই।

সুড়ঙ্গের শেষটায় কি আলো দেখা যাচ্ছে? জানি না, তবে অবশেষে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০০ জন অর্থ পাচারকারীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইছে, চাইছে বিচারের মুখোমুখি করতে। এই ২০০ জনের সবাই ব্যাংক থেকে ঋণ করা টাকা বিদেশে পাচার করেছে এবং নিজেরাও বিদেশে ‘পাচার’ হয়ে শান্তিসুখে আছেন। এ ‘বোয়ালদের’ তালিকায় আছেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক এমডি, এনন ট্যাক্সের কর্ণধার, শেয়ার কেলেঙ্কারির এক হোতা, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান, যুবলীগ নেতা ও স্বাস্থ্য খাতের রাজা। প্রভাব ও প্রতাপশালী এ নাগরিকরা এখন লন্ডন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় পরিবার নিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন।

আমরা ভুখানাঙ্গা সেসব স্বপ্নিল জীবনের গল্প শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ি। আমাদের তো আর কিছু করার নেই; কিন্তু যাদের কিছু করার আছে, তারা কী করছেন?

এ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘যে বা যারা অবৈধভাবে ব্যাংকের বা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে তা পাচার করে বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, তাদের প্রত্যেককেই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। ইন্টারপোলসহ আন্তর্জাতিক সব আইনি টুলস-টেকনিক প্রয়োগ করে অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। দেশের সম্পদ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে। এখানে কাউকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। কতিপয় দুর্বৃত্তের কাছে দেশের মানুষ জিম্মি হতে পারে না।’

সর্বদিক বঞ্চিত একজন নাগরিক দুদক চেয়ারম্যানের কথায় আশাবাদী হতেই পারেন। কারণ তার শব্দচয়নে দৃঢ়তা আছে; কিন্তু বাস্তব অবস্থা বিচার করে ওই কথার ওপর ভরসা করা দায়। কারণ এসব মানুষ বছরের পর বছর দিনের আলোয় সব আইনকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। তাদের কোমরের শক্তির কথাটা মনে রাখতে হবে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার ব্যতিরেকে এমন অপকর্ম করা সম্ভব নয়। তবে হ্যাঁ, সরকার যদি আন্তরিক হয়, তাহলে দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে সংশয় হয়, এতদিন পর সরকার হঠাৎ করেই আন্তরিক হয়ে যাবে কি?

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১২৩ ৩৩ ১২
বিশ্ব ১৩,১০,১০২২,৭৫,০৪০৭২,৫৫৭
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×