এক কিংবদন্তির জীবনাবসান ও মূল্যায়ন
jugantor
এক কিংবদন্তির জীবনাবসান ও মূল্যায়ন

  ড. সুকোমল বড়ুয়া  

১৪ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের বৌদ্ধদের কিংবদন্তি ধর্মীয় নেতা, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিশ্বের খ্যাতিমান সংঘ মনীষা মহাসংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরো আর নেই। তিনি গত ৩ মার্চ সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার ল্যাবএইড হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৮।

বর্তমানে তার পবিত্র মরদেহ ফুলের শয্যায় শায়িত অবস্থায় আছে তারই কর্মসাধনার পীঠস্থান সবুজবাগের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে। তার পবিত্র মরদেহকে ঘিরে অগণিত শিষ্য-প্রশিষ্য এবং সেখানকার উপাসক-উপাসিকা এবং অনাথ-আশ্রমের নানা বয়সের শিক্ষার্থীরা রাত-দিন পরিচর্যা ও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

আজ তার পবিত্র মরদেহের পেটিকাবদ্ধ জাতীয় অনুষ্ঠান বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের বৌদ্ধ নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী বছরের ১৫ জানুয়ারি মহাথেরোর জন্মদিনে তার এ পবিত্র মরদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে সরকারি-বেসরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বৌদ্ধ ধর্মীয় ও বৌদ্ধ বিশ্বের নেতাদের উপস্থিতিতে।

দশ মাস সেই পেটিকাবদ্ধ শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর পবিত্র কফিনটি মমি হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে তারই সুদীর্ঘকালের কর্মতীর্থ ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের কমপ্লেক্সে। সে পর্যন্ত দেশ-বিদেশের ভক্ত ও দর্শনার্থীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তা থাকবে উন্মুক্ত।

মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হবে তারই কর্মসাধনার অন্যতম পীঠস্থান চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জের নবপণ্ডিত বৌদ্ধ বিহারে, তার জন্মজনপদ রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া গ্রামে এবং তারই শ্রামণ্য ও ভিক্ষুজীবনের পুণ্যতীর্থ তার প্রয়াত গুরু মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর জন্মস্থান হোয়ারাপাড়া গ্রামে।

ওই বিহারেই মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরো ধর্মীয় জীবন শুরু করেছিলেন। গ্রামটি বেশ বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যমণ্ডিত, যেখানে তার গুরু মহামান্য বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো ১৯০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

মাননীয় শুদ্ধানন্দের শ্রামণ্য জীবন শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। তিনি ভিক্ষুজীবনে দীক্ষিত হন ১৯৫৩ সালে। জন্মের পর ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর নাম রাখা হয়েছিল আদিত্য। ছয় মাসের মধ্যেই শিশু আদিত্য পিতৃহারা হন। মাতা রেবতীবালা আর পিতা বঙ্গচন্দ্র বড়ুয়া উভয়ে ছিলেন ধনী গৃহী, ধার্মিক ও শিক্ষানুরাগী। সে কারণেই শিশু আদিত্য লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী ছিলেন।

মায়ের যত্নে ও লালনে-পালনে নিজ প্রচেষ্টা ও কঠোর সংগ্রাম সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন এবং জীবন গড়েছিলেন। বলতে গেলে আত্মপ্রত্যয়, আকাক্সক্ষা, দৃঢ়তা ও একনিষ্ঠতার কারণেই তিনি আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এত সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, যেন তিনি বাংলাদেশসহ বৌদ্ধ বিশ্বের একটি সোনালি ইতিহাস।

তিনি ছিলেন অসম্ভব স্বপ্নচারী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। রাজকুমার সিদ্ধার্থ যেমন বুদ্ধত্ব লাভের ব্যাকুলতায় গয়ার বোধিভ্রুমমূলে কঠোর প্রতিজ্ঞা ও সংকল্পে আত্মনিবিষ্ট হয়েছিলেন, তেমনি মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরোও ধর্মীয় জীবন প্রতিষ্ঠা ও আলোকিত জীবন গড়ার লক্ষ্যে কঠোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন। তার সেই শ্রম, সাধনা, স্বপ্ন আর নিষ্ঠা ও ধ্যান সত্যিই সার্থক হয়েছে।

তাকে আজ বৌদ্ধ বিশ্ব জেনেছে, চিনেছে এবং নানাভাবে সম্মানিত করেছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত শ্লাঘার ও গৌরবের। বলতে গেলে আজ তার স্বপ্ন ও কর্ম বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। মরুদেশ আরবের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে জনৈক দার্শনিক যেমন একদিন বলেছিলেন- ‘মরু প্রান্তরে একটি শহর বা নগর সভ্যতা গড়ে তোলা যত সহজ তার চেয়ে বহু কঠিন একটি আলোকিত জীবন-ইমারত তৈরি করা।’ তাই তো শুদ্ধানন্দ আজ হয়েছেন সাধারণ থেকে অসাধারণ।

সংকট আর প্রতিকূলতার মধ্যে জীবন গড়াটাই হল সার্থকতা। তিনি তার মহাগুরু ভদন্ত বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর সান্নিধ্যে এসে জীবনকে এমনিভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। চিন্তা, স্বপ্ন, কর্ম ও সাফল্যে তার গুরুর মতো তিনিও ছিলেন অদ্বিতীয়। তিনি দেশে-বিদেশে নানা ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডে তার অসামান্য অবদান ছিল।

জাতীয় নেতৃত্বেও তিনি ছিলেন অনন্য, অসাধারণ। ঢাকাস্থ ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার ও অনাথ-আশ্রম, অতীশ ভবন, ভারতের বুদ্ধগয়াস্থ বাংলাদেশ টেম্পল, রাজগৃহে বৌদ্ধবিহার ও তীর্থযাত্রী সেবাকেন্দ্র, বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীতে পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের ভিটায় অতীশ কমপ্লেক্স, অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয় (নির্মাণের পথে) এবং তার স্বগ্রামের বিহার, প্রাইমারি ও মাধ্যমিক স্কুল ইত্যাদি নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা তারই সাক্ষ্য বহন করে।

মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরো ছিলেন অত্যন্ত উদার ও হৃদয়বান। তিনি অনাথ ও দারিদ্র্যের বন্ধুও ছিলেন। তার মধ্যে কোনো ধরনের জাত-পাত সংকীর্ণতা, সম্প্রদায়গত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দল, কুল, নিকায়গত কিংবা ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ও বৈষম্য ছিল না। বলতে গেলে তিনি ছিলেন একজন সর্বজনীন মহাপুরুষ যার স্নেহ-ভালোবাসা, প্রীতি-মমতা, সাহায্য-সহযোগিতা সবার জন্য ছিল অবারিত।

তিনি ছিলেন আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য পথিকৃৎ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ, জ্যোতিপাল, শান্তপদ মহাথেরোর মতো মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর ভূমিকাও ছিল অনন্যসাধারণ। তাই বলি, ‘পুরুষোত্তম ব্যক্তিদের জন্ম দুর্লভ। তারা সর্বত্র জন্মগ্রহণ করেন না; তারা যেখানেই জন্মগ্রহণ করেন, সেই দেশ, সেই জাতি হয় ধন্য ও গৌরবান্বিত।’

তাই তো ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর জীবনে তারই প্রতিফলন শতভাগে সফল দেখেছি। এজন্যই দার্শনিক সক্রেটিস বুদ্ধের মতো বলেছিলেন- ‘শক্তিহীন চিন্তা ও স্বপ্ন মূল্যহীন।’ মাননীয় শুদ্ধানন্দের মধ্যে ছিল অসম্ভব স্বপ্নচারী মন, দেখেছি অসাধারণ মানসিক শক্তি ও সমন্বয়তা। তাই তিনি সর্বক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন এবং সব মানুষের প্রিয়ভাজন ছিলেন।

তিব্বতের নির্বাসিত দালাইলামাসহ চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, মঙ্গোলিয়া, ভুটানসহ বিশ্বের বৌদ্ধ দেশগুলোর ধর্মীয় নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। তিনি তার জীবদ্দশায় একুশে পদকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পদক ও উপাধিতে ভূষিত হন। তার নামে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপত্য।

২০০৮ সালে প্রমথ বড়ুয়ার অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরো ট্রাস্ট ফান্ড’। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ওই ফান্ড থেকে একটি স্বর্ণপদক দেয়া হয়। আগামীতে তার জন্মদিনে একটি স্মারক বক্তৃতা প্রবর্তন করার প্রস্তাব রইল। তাহলেই তার স্মৃতি আরও অমর হয়ে থাকবে।

‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়’ তার অমর কীর্তি। সাত খণ্ডে প্রকাশিত তার এ জীবনী গ্রন্থটি দেশ-বিদেশে বেশ সমাদৃত। তাকে জানার এবং অনুসন্ধান করার জন্য গ্রন্থটি বেশ সহায়ক। তার মহাপ্রয়াণে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হল। প্রকৃতি ও পাহাড়বেষ্টিত কর্ণফুলী নদীর গা ঘেঁষা যে গ্রামে ১৯৩৩ সালের ১৫ জানুয়ারি মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর জন্ম, ২০২০ সালের ৩ মার্চ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার বিশাল, বর্ণাঢ্য ও কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি- এটাই জাগতিক বিধান, যা বৌদ্ধধর্মে ‘অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্ম দর্শন’ হিসেবে স্বীকৃত। তিনি নির্বাণগামী হোন- এ প্রার্থনায় রইল।

ড. সুকোমল বড়ুয়া : অধ্যাপক, সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

skbaruadu@gmail.com

এক কিংবদন্তির জীবনাবসান ও মূল্যায়ন

 ড. সুকোমল বড়ুয়া 
১৪ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের বৌদ্ধদের কিংবদন্তি ধর্মীয় নেতা, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিশ্বের খ্যাতিমান সংঘ মনীষা মহাসংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরো আর নেই। তিনি গত ৩ মার্চ সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার ল্যাবএইড হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৮।

বর্তমানে তার পবিত্র মরদেহ ফুলের শয্যায় শায়িত অবস্থায় আছে তারই কর্মসাধনার পীঠস্থান সবুজবাগের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে। তার পবিত্র মরদেহকে ঘিরে অগণিত শিষ্য-প্রশিষ্য এবং সেখানকার উপাসক-উপাসিকা এবং অনাথ-আশ্রমের নানা বয়সের শিক্ষার্থীরা রাত-দিন পরিচর্যা ও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

আজ তার পবিত্র মরদেহের পেটিকাবদ্ধ জাতীয় অনুষ্ঠান বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের বৌদ্ধ নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী বছরের ১৫ জানুয়ারি মহাথেরোর জন্মদিনে তার এ পবিত্র মরদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে সরকারি-বেসরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বৌদ্ধ ধর্মীয় ও বৌদ্ধ বিশ্বের নেতাদের উপস্থিতিতে।

দশ মাস সেই পেটিকাবদ্ধ শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর পবিত্র কফিনটি মমি হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে তারই সুদীর্ঘকালের কর্মতীর্থ ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের কমপ্লেক্সে। সে পর্যন্ত দেশ-বিদেশের ভক্ত ও দর্শনার্থীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তা থাকবে উন্মুক্ত।

মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হবে তারই কর্মসাধনার অন্যতম পীঠস্থান চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জের নবপণ্ডিত বৌদ্ধ বিহারে, তার জন্মজনপদ রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া গ্রামে এবং তারই শ্রামণ্য ও ভিক্ষুজীবনের পুণ্যতীর্থ তার প্রয়াত গুরু মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর জন্মস্থান হোয়ারাপাড়া গ্রামে।

ওই বিহারেই মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরো ধর্মীয় জীবন শুরু করেছিলেন। গ্রামটি বেশ বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যমণ্ডিত, যেখানে তার গুরু মহামান্য বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো ১৯০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

মাননীয় শুদ্ধানন্দের শ্রামণ্য জীবন শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। তিনি ভিক্ষুজীবনে দীক্ষিত হন ১৯৫৩ সালে। জন্মের পর ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর নাম রাখা হয়েছিল আদিত্য। ছয় মাসের মধ্যেই শিশু আদিত্য পিতৃহারা হন। মাতা রেবতীবালা আর পিতা বঙ্গচন্দ্র বড়ুয়া উভয়ে ছিলেন ধনী গৃহী, ধার্মিক ও শিক্ষানুরাগী। সে কারণেই শিশু আদিত্য লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী ছিলেন।

মায়ের যত্নে ও লালনে-পালনে নিজ প্রচেষ্টা ও কঠোর সংগ্রাম সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন এবং জীবন গড়েছিলেন। বলতে গেলে আত্মপ্রত্যয়, আকাক্সক্ষা, দৃঢ়তা ও একনিষ্ঠতার কারণেই তিনি আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এত সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, যেন তিনি বাংলাদেশসহ বৌদ্ধ বিশ্বের একটি সোনালি ইতিহাস।

তিনি ছিলেন অসম্ভব স্বপ্নচারী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। রাজকুমার সিদ্ধার্থ যেমন বুদ্ধত্ব লাভের ব্যাকুলতায় গয়ার বোধিভ্রুমমূলে কঠোর প্রতিজ্ঞা ও সংকল্পে আত্মনিবিষ্ট হয়েছিলেন, তেমনি মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরোও ধর্মীয় জীবন প্রতিষ্ঠা ও আলোকিত জীবন গড়ার লক্ষ্যে কঠোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন। তার সেই শ্রম, সাধনা, স্বপ্ন আর নিষ্ঠা ও ধ্যান সত্যিই সার্থক হয়েছে।

তাকে আজ বৌদ্ধ বিশ্ব জেনেছে, চিনেছে এবং নানাভাবে সম্মানিত করেছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত শ্লাঘার ও গৌরবের। বলতে গেলে আজ তার স্বপ্ন ও কর্ম বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। মরুদেশ আরবের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে জনৈক দার্শনিক যেমন একদিন বলেছিলেন- ‘মরু প্রান্তরে একটি শহর বা নগর সভ্যতা গড়ে তোলা যত সহজ তার চেয়ে বহু কঠিন একটি আলোকিত জীবন-ইমারত তৈরি করা।’ তাই তো শুদ্ধানন্দ আজ হয়েছেন সাধারণ থেকে অসাধারণ।

সংকট আর প্রতিকূলতার মধ্যে জীবন গড়াটাই হল সার্থকতা। তিনি তার মহাগুরু ভদন্ত বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর সান্নিধ্যে এসে জীবনকে এমনিভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। চিন্তা, স্বপ্ন, কর্ম ও সাফল্যে তার গুরুর মতো তিনিও ছিলেন অদ্বিতীয়। তিনি দেশে-বিদেশে নানা ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডে তার অসামান্য অবদান ছিল।

জাতীয় নেতৃত্বেও তিনি ছিলেন অনন্য, অসাধারণ। ঢাকাস্থ ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার ও অনাথ-আশ্রম, অতীশ ভবন, ভারতের বুদ্ধগয়াস্থ বাংলাদেশ টেম্পল, রাজগৃহে বৌদ্ধবিহার ও তীর্থযাত্রী সেবাকেন্দ্র, বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীতে পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের ভিটায় অতীশ কমপ্লেক্স, অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয় (নির্মাণের পথে) এবং তার স্বগ্রামের বিহার, প্রাইমারি ও মাধ্যমিক স্কুল ইত্যাদি নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা তারই সাক্ষ্য বহন করে।

মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরো ছিলেন অত্যন্ত উদার ও হৃদয়বান। তিনি অনাথ ও দারিদ্র্যের বন্ধুও ছিলেন। তার মধ্যে কোনো ধরনের জাত-পাত সংকীর্ণতা, সম্প্রদায়গত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দল, কুল, নিকায়গত কিংবা ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ও বৈষম্য ছিল না। বলতে গেলে তিনি ছিলেন একজন সর্বজনীন মহাপুরুষ যার স্নেহ-ভালোবাসা, প্রীতি-মমতা, সাহায্য-সহযোগিতা সবার জন্য ছিল অবারিত।

তিনি ছিলেন আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য পথিকৃৎ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ, জ্যোতিপাল, শান্তপদ মহাথেরোর মতো মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর ভূমিকাও ছিল অনন্যসাধারণ। তাই বলি, ‘পুরুষোত্তম ব্যক্তিদের জন্ম দুর্লভ। তারা সর্বত্র জন্মগ্রহণ করেন না; তারা যেখানেই জন্মগ্রহণ করেন, সেই দেশ, সেই জাতি হয় ধন্য ও গৌরবান্বিত।’

তাই তো ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর জীবনে তারই প্রতিফলন শতভাগে সফল দেখেছি। এজন্যই দার্শনিক সক্রেটিস বুদ্ধের মতো বলেছিলেন- ‘শক্তিহীন চিন্তা ও স্বপ্ন মূল্যহীন।’ মাননীয় শুদ্ধানন্দের মধ্যে ছিল অসম্ভব স্বপ্নচারী মন, দেখেছি অসাধারণ মানসিক শক্তি ও সমন্বয়তা। তাই তিনি সর্বক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন এবং সব মানুষের প্রিয়ভাজন ছিলেন।

তিব্বতের নির্বাসিত দালাইলামাসহ চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, মঙ্গোলিয়া, ভুটানসহ বিশ্বের বৌদ্ধ দেশগুলোর ধর্মীয় নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। তিনি তার জীবদ্দশায় একুশে পদকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পদক ও উপাধিতে ভূষিত হন। তার নামে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপত্য।

২০০৮ সালে প্রমথ বড়ুয়ার অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরো ট্রাস্ট ফান্ড’। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ওই ফান্ড থেকে একটি স্বর্ণপদক দেয়া হয়। আগামীতে তার জন্মদিনে একটি স্মারক বক্তৃতা প্রবর্তন করার প্রস্তাব রইল। তাহলেই তার স্মৃতি আরও অমর হয়ে থাকবে।

‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়’ তার অমর কীর্তি। সাত খণ্ডে প্রকাশিত তার এ জীবনী গ্রন্থটি দেশ-বিদেশে বেশ সমাদৃত। তাকে জানার এবং অনুসন্ধান করার জন্য গ্রন্থটি বেশ সহায়ক। তার মহাপ্রয়াণে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হল। প্রকৃতি ও পাহাড়বেষ্টিত কর্ণফুলী নদীর গা ঘেঁষা যে গ্রামে ১৯৩৩ সালের ১৫ জানুয়ারি মাননীয় শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর জন্ম, ২০২০ সালের ৩ মার্চ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার বিশাল, বর্ণাঢ্য ও কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি- এটাই জাগতিক বিধান, যা বৌদ্ধধর্মে ‘অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্ম দর্শন’ হিসেবে স্বীকৃত। তিনি নির্বাণগামী হোন- এ প্রার্থনায় রইল।

ড. সুকোমল বড়ুয়া : অধ্যাপক, সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

skbaruadu@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন