অপ্রত্যাশিত তৎপরতা

  আনোয়ার হামিদ ২৩ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকাস্থ পাকিস্তানের হাইকমিশন। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উৎস সন্ধান করতে হলে ১৯৪৮ সালে ফিরে যেতে হবে, যখন ঢাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে গোটা পাকিস্তানের (পূর্ব ও পশ্চিম) সরকারি ভাষা হবে উর্দু। তখন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে তৈরি হয় অসন্তোষ। কারণ, বাংলা ছিল পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষের মাতৃভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশে তীব্র আন্দোলন তৈরি হয়।

ভাষা আন্দোলন এবং জিন্নাহর বাংলাভাষী জনগণের ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেয়ার কারণে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কিছু ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী প্রাণ হারান। ভাষা আন্দোলন তীব্র পর্যায়ে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মের বিষয়টি গৌণ হয়ে যায়। এটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, পূর্ব পাকিস্তানে ধর্ম কখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। বিপরীতে পাকিস্তানে (পশ্চিম) সবকিছু ধর্মের চশমায় দেখা হতো এবং মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করা হতো। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ তো প্রমাণ হিসেবে সামনে আছে।

পরবর্তী সময়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পায়। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছে ভাষা। পূর্ব পাকিস্তানিরা নিজেদের বাঙালি হিসেবে পরিচয় দেয় এবং বাঙালিত্ব তাদের সংস্কৃতিকে গড়ে তোলে। পূর্ব পাকিস্তানিরা সংস্কৃতি ও শিক্ষা- উভয় দিক দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের থেকে এগিয়ে ছিল। ওই সময় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে পড়েছিল বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র।

উল্লিখিত ঘটনাগুলো এই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ যে, ঢাকার নির্দিষ্ট একটি কূটনৈতিক মিশন ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস পালনের উদ্যোগ নিয়েছে ১৬ কোটি বাঙালির আবেগের বিষয়কে বিবেচনায় না নিয়ে। তারা এ বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পাকিস্তান দিবস পালনের চেষ্টা করছে যে, ওই সময়ের তথা ১৯৪০ সালে মুসলিমরা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে। যাহোক, তারা এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে, ধর্মীয় চাল ব্যবহারের মাধ্যমে তারা কোনোকিছু অর্জন করতে পারবে না। কারণ, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের চার মূলনীতির ওপর। সুনির্দিষ্ট এ মিশনের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশে ধর্মীয় অসাম্প্রদায়িকতা ভেঙে দেয়া এবং এর প্রতিবেশীর সঙ্গে বিভক্তি তৈরি করা, মুক্তিযুদ্ধে যে প্রতিবেশীর অবদান শোধ করা সম্ভব নয়। গণহত্যার জন্য ক্ষমা না চেয়ে তারা ২৩ মার্চ উদ্যাপনের ওপর দিচ্ছে নিজেদের এজেন্ডা তুলে ধরতে, এমনকি মুজিববর্ষেও।

বাংলাদেশ এমন একটি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে, যার ইতিহাস এই উপমহাদেশে অদ্বিতীয়। এই সংগ্রামের দিকে গভীর নজর দিলে পাকিস্তানের চক্রান্ত ও তার শয়তানি কর্মকাণ্ড উন্মুক্ত হয়ে যায়। বাংলাকে বিভক্ত করার প্রথম চেষ্টা নিয়েছিল ব্রিটেন ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার বিভক্তি রেখা টেনে, যাতে পশ্চিম বাংলায় হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ আর পূর্ব বাংলায় মুসলিমরা। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্তি টেকসই হয়নি এবং ১৯১১ সালে সেটি বাতিল করা হয় কঠোর আন্দোলনের মুখে। ব্রিটেন যখন স্বাধীন ভারতের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন পুনরায় তৎকালীন অবিভক্ত ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে আবারও ভাঙার জন্য উঠেপড়ে লাগেন জিন্নাহ। জিন্নাহর তত্ত্বটি উপমহাদেশের ইতিহাসে ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ নামে ব্যাপক পরিচিত। এ পর্যায়ে জিন্নাহ সফল হলেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যেখানে ভারত ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আর পাকিস্তান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। পাকিস্তানের ছিল দুটি অংশ- পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল দুই হাজার কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ডের মাধ্যমে। ভৌগোলিক বিভক্তিই শুধু নয়, দুই পাকিস্তানের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিতেও বিভক্তি ছিল। শেষের দুটিই ছিল বেশি শক্তিশালী।

পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত ১৯৭০-৭৫ চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার রিপোর্ট অনুযায়ী, সার্বিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান সবসময় পিছিয়ে ছিল। ১৯৫০-৫১ থেকে ১৯৫৪-৫৫ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যয় করা হতো ৪৬ শতাংশ, আর বাকি সরকারি ব্যয় যেত পশ্চিমে। এটি আরও কমে ১৯৫৬-৫৭ থেকে ১৯৫৯-৬৯-এ ৩২ শতাংশে দাঁড়ায়। ১৯৫০-৫১ থেকে ১৯৬৯-৭০ পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট সরকারি ব্যয়ের মাত্র ৩৪ শতাংশ গড়ে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যয় করা হতো, যদিও পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় এ অঞ্চল বেশি ঘনবসতিপূর্ণ ছিল।

১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের রফতানি আয় ছিল ৭০ শতাংশ, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান পেত এর মাত্র ২৫ শতাংশ। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে টেক্সটাইল মিল ছিল ১১টি, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৯টি। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে টেক্সটাইল মিলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫০টিতে, যেখানে একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২৬টিতে। ১৯৭১ সালের মুদ্রা বিনিময় মান অনুযায়ী, ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তান। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক শোষণের ড্রেন হিসেবে ব্যবহার করে আর এটিই আমাদের পথ প্রদর্শন করে স্বাধীনতার। এটি পাকিস্তানের ইসলামী ভ্রাতৃত্বের ভাঁওতাবাজির আরেকটি উদাহরণ।

প্রতিবছর ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উদ্যাপন পাকিস্তানের আরেকটি ভাঁওতাবাজি। কারণ, এর মধ্য দিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের বর্বরতা মুসলিমদের দৃষ্টি থেকে আলাদা করতে চায় দেশটি, যে অপারেশন চালানো হয়েছিল ২৫-২৬ মার্চ। পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা ২৫ মার্চ রাত ১১টা ৩০ মিনিটে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে ফার্মগেটে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালিদের গণহত্যায় মেতে ওঠে। একই ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনেসও। ১টা ১৫ মিনিটে নিজের বাসভবন থেকে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়। যাহোক, নিজের গ্রেফতারের কয়েক মিনিট আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ভোররাতের দিকে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক ভবনে হামলা শুরু করে এবং অনেক ছাত্র-শিক্ষককে হত্যা করে।

সুতরাং, সংক্ষেপে বললে ধর্ম নয়, ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিপীড়নের কারণেই বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্বাধীন হয়েছে। ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে শুরু হওয়া মুজিববর্ষ অশান্তি উসকে দেয়ার পাকিস্তানের শয়তানি চক্রান্ত রুখে দিয়ে শান্তিই বয়ে আনবে, শুধু দেশে নয় গোটা উপমহাদেশে।

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উদ্যাপন নিশ্চিতভাবে ওই কূটনৈতিক মিশনের অনিষ্টকর উদ্যোগ। তারা ২৫-২৬ মার্চ রাতের পাক আর্মির বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো গণহত্যার কথা ভুলে গেছে, যা পরিচালনা করা হয়েছিল রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের সহায়তায়। যারা ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে মুজিববর্ষ উদ্যাপন করছে, সেই ১৬ কোটি বাঙালির আবেগকে তুচ্ছজ্ঞান করে এই কূটনৈতিক কোয়ার্টারটি একটি বিশেষ বাস্তবায়ন করতে চায়।

আনোয়ার হামিদ : প্রাবন্ধিক

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত