স্বদেশ ভাবনা: কমাতে হবে ধানের উৎপাদন ব্যয়

  আবদুল লতিফ মন্ডল ২৮ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার ২০১৯-২০ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ১০ লাখ টন আমন ধান ও চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ছয় লাখ ২৬ হাজার ৯৯১ টন ধান, সাড়ে ৩ লাখ টন সিদ্ধ এবং ৫০ হাজার টন আতপ চাল।

১০ মার্চ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য মোতাবেক ৫ মার্চ আমন সংগ্রহ কর্মসূচি শেষ হয়েছে। ৫ মার্চ পর্যন্ত ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৪০৭ টন সিদ্ধ চাল, ৪৩ হাজার ৪০১ টন আতপ চাল এবং ৬ লাখ ২৬ হাজার ৬৫৭ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। আমন সংগ্রহ নিয়ে ১১ মার্চ বাংলাদেশ সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক ও খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারসহ দুই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এবার আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ৬ লাখ ২৬ হাজার ৬৫৭ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আর কৃষিমন্ত্রী ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনায় বাজারের ওপর এর প্রভাব পড়েছে। এ মুহূর্তে মোটা ধান প্রায় ৮০০ টাকা। চিকনটার দাম অস্বাভাবিকভাবে একটু বেশি ১২০০/১৩০০ টাকা। কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন (যুগান্তর, ১২ মার্চ)।

খাদ্য মন্ত্রণালয় অনেক বছর পর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনেছে- এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে যে প্রশ্নটি উঠতে পারে তা হল, আমন ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের প্রথমদিকে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ধানচাষীরা চালকল মালিকদের কাছে প্রকারভেদে এক মণ ধান বিক্রি করল ৬০০-৭০০ টাকায়, আর যখন তাদের ঘরে ধান নেই, তখন প্রকারভেদে প্রতি মণ ধানের দাম ৮০০ থেকে ১৩০০ টাকা?

আবাদযোগ্য জমি আছে দেশের এমন কৃষক পরিবারগুলোকে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়- এই চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘সেন্সাস অফ এগ্রিকালচার ১৯৯৬’ রিপোর্ট অনুযায়ী যাদের নিজস্ব জমির পরিমাণ ০.০৫ থেকে ২.৪৯ একর, তারা প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষী পরিবার (households)। যারা ২.৫০ থেকে ৭.৫০ একর জমির মালিক তারা হলেন মাঝারি কৃষক পরিবার। ৭.৫০ একর এবং এর চেয়ে বেশি জমির মালিক যারা, তারা হলেন বড় কৃষক পরিবার।

উল্লিখিত শুমারি অনুযায়ী প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড় কৃষক পরিবারগুলোর সংখ্যা যথাক্রমে ৭৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। তাছাড়া রয়েছেন ভূমিহীন কৃষক। এরা বর্গা বা লিজ নিয়ে অন্যের জমি চাষ করেন। অবশ্য অনেক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীও নিজের জমি চাষ করাসহ বর্গা বা লিজ নিয়ে অন্যের জমি চাষ করেন। ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষী পরিবারগুলো ফসল উৎপাদন কর্মকাণ্ডের অন্যতম চালিকাশক্তি।

একাধিক কারণে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ধানচাষীরা সরকার নির্ধারিত ধানের দাম পান না। এক. তারা ধারদেনা করে ফসল ফলান। ধারদেনা পরিশোধ এবং সংসারের নানা অভাব-অনটন মেটাতে তাদের ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতেই ধান বিক্রি করতে হয়। নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও নানা কারণে ধান (আমন ও বোরো) কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সরকারের ধান সংগ্রহ কর্মসূচি তেমন একটা গতি পায় না।

মৌসুমের শুরুতে সরকারি ধান কেনা কর্মসূচির এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চালকল মালিকরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে কম দামে ধান কিনে বিপুল মজুদ গড়ে তোলেন। সুতরাং অন্যবারের মতো এবারও ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ধানচাষীরা আমন ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতে সরকারি সংগ্রহমূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে চালকল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। গত ১৪ নভেম্বর যুগান্তরের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘সুসংবাদ হল, দেশে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে।

দুঃসংবাদ হল, গত বছরের মতো এবারও ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা। অথচ হাট-বাজারে এখন প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৭৫ টাকায়। তার মানে প্রতি মণ ধানে কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এ হিসাবে প্রতি বিঘায় গড়ে ২৫ মণ ধান উৎপাদন হলে ধান চাষ করে লোকসান গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে ৪ হাজার টাকা।’ গত ১৮ ডিসেম্বর ‘এবারও আমন ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষক’ শীর্ষক দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বর্তমানে দেশের হাট-বাজারগুলোতে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৭০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায়। এ দরে ধান বিক্রি করে কৃষকের লোকসান হচ্ছে।’ ওই সময় অন্যান্য পত্র-পত্রিকায়ও অনুরূপ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।

২.

সরকার এবার ছয় লাখ টনের কিছুটা বেশি ধান এবং ৪ লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার চালের আকারে কী পরিমাণ আমন উৎপাদন হয়েছে সে তথ্য এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা নেই। তবে কিছুদিন আগে কৃষিমন্ত্রীর দেয়া এক বক্তব্যে জানা যায়, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার আমনের উৎপাদন গত বছরের উৎপাদনকে (১ কোটি ৫৩ লাখ টন) ছাড়িয়ে যাবে। বলা হচ্ছে, এবার আমনের উৎপাদন ১ কোটি ৬০ লাখ টনের বেশিতে দাঁড়াবে। উল্লেখ্য, এসব তথ্য চালের আকারে। একমণ ধান থেকে চালের উৎপাদন হিসাব করলে আমন ধানের উৎপাদন দাঁড়াবে কমবেশি ১ কোটি ৭৫ লাখ টন। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সরকারিভাবে ৬ লাখ টনের কিছুটা বেশি ধান এবং ৪ লাখ টন চাল সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়ায় মোট আমন উৎপাদনের ৬ শতাংশেরও নিচে। আর এবার দেশে উৎপাদিত মোট আমন ধানের তুলনায় সরকারিভাবে তা সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ শতাংশের সামান্য বেশি।

৩.

প্রচলিত অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ নীতিমালায় সরকার চাল সংগ্রহের জন্য চালকল মালিকদের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্যনীতিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য কেনার বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন চালকল মালিকরা। তারা অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। তারা অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহে চালের উচ্চমূল্য দাবি করেন এবং ধান কেনায় সরকারকে নিরুৎসাহিত করেন অথবা ধানের দাম কম রাখার জন্য সরকারকে চাপ দেন।

কারণ সরকার ধান না কিনলে বা স্বল্প পরিমাণে কিনলে ধানের দাম কম থাকে এবং তারা কম দামে ধান কিনে বিপুল মজুদ গড়তে পারেন। ধান কাটার মৌসুম শেষে যখন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে ধান মজুদ থাকে না, তখন চালকল মালিকরা মজুদ ধান চালে রূপান্তর করে চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে সরবরাহ করেন এবং সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে অবশিষ্ট চাল উচ্চমূল্যে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করেন। এতে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ধানচাষীরা শুধু ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া থেকেই বঞ্চিত হন না, ধান কাটা-মাড়াইয়ের মৌসুম শেষের কিছুদিনের মধ্যে ক্রেতায় রূপান্তরিত অধিকাংশ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ধানচাষী উচ্চদামে চাল কিনে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

সব শ্রেণির কৃষক তাদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য পাক তা সবাই চায়। তবে মোট ধানচাষীদের ৮০ শতাংশের প্রতিনিধিত্বকারী ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ধানচাষীরা যেন উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ তারাই ধান উৎপাদনের কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি।

এজন্য যা যা করা প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ১. সরকার আমন ও বোরো মৌসুমে যে পরিমাণ চাল সংগ্রহ করতে চায়, সে পরিমাণ চাল পেতে যে পরিমাণ ধান প্রয়োজন তার সবটুকু সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। ১১ মার্চের সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা আস্তে আস্তে কৃষককে ন্যায্যমূল্য দেয়ার উদ্দেশ্যে যতখানি প্রয়োজন, হয়তো একসময় সবটুকু ধানে চলে পারি, আমাদের সেই পরিকল্পনা রয়েছে।’ এটা যত তাড়াতাড়ি করা যাবে, ততই তা কৃষকের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

২. দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসে চালের ভূমিকা, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে সরকারি গুদামে চাল মজুদের পরিমাণ আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এটা করা গেলে ধানচাষীরা আরও বেশি পরিমাণে সরকারের কাছে সরাসরি ধান বিক্রি করে লাভবান হবেন। ৩. ধান থেকে রূপান্তরিত চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ, গ্রামাঞ্চলে ভূমিহীন শ্রমিক, মজুর, ধান কাটার মৌসুম শেষে চাল ক্রেতায় পরিণত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীসহ ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ চাল কিনে খায়। ধান-চালের মূল্যবৃদ্ধিতে চালকল মালিক এবং স্বল্পসংখ্যক বড় কৃষক ছাড়া অন্য সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাই সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে দরকার উৎপাদন ব্যয় হ্রাস। কারণ সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে দাম বাড়ানো হলে বাজারে দাম বেড়ে যায়। এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই ধানসহ অন্যান্য কৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। তবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় ধানের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে ধান উৎপাদনে অবকাঠামোগত সুবিধাদি, বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানো গেলে এবং কৃষি উপকরণ যেমন- উন্নতমানের বীজ, সার, আধুনিক হার্ভেস্টিং মেশিনারি কৃষকদের স্বল্পমূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে তারা কম খরচে ধান উৎপাদন করতে এবং তা কম দামে বিক্রি করতে পারবেন। এতে ধানচাষী ও ক্রেতা উভয়েই লাভবান হবেন।

সবশেষে বলতে চাই, আমন মৌসুম শেষে ধানের দাম বাড়ায় দেশের মোট কৃষক পরিবারগুলোর ৮০ শতাংশই অর্থাৎ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ধানচাষীরা লাভবান হবেন না। লাভবান হবেন মৌসুমের শুরুতে সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে বিপুল পরিমাণে ধান কিনে মজুদ করে রাখা চালকল মালিক এবং ধান কাটা-মাড়াই সময়কালে ধান বিক্রি না করা স্বল্পসংখ্যক বড় কৃষক।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত