করোনাভাইরাস: নীতিমালা জরুরি

  ড. মো. নাসির উদ্দিন ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কোনো টিকা আবিষ্কার হয়নি এবং নিরাময়ের সুনির্দিষ্ট ওষুধও নেই। প্রতিরোধই করোনা নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়।

এ ভাইরাসটি ছড়াচ্ছে মানুষ থেকে মানুষে। তাছাড়া এটি বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার।

তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে যদি সুস্থ ব্যক্তিদের থেকে আলাদা করে রাখা যায় তবে এর বিস্তার লাঘব করা যায়। যেহেতু এটি বিভিন্ন মাধ্যমে জীবিত থাকে, তাই এর বিস্তার রোধে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।

সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত ভালোভাবে হাত ধোয়া, হাত না ধুয়ে চোখ, মুখ স্পর্শ না করা, হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, জীবাণুনাশক দিয়ে বাড়ি, গাড়ি, অফিস ও চলাচলের জায়গা জীবাণুমুক্ত করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, লোক সমাগমের স্থান পরিহার করা এবং আরও বিবিধ নিয়মাবলি।

করোনা প্রতিরোধে সরকার এর মধ্যে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছে। ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও যানবাহন ছাড়া যান চলাচল বন্ধসহ সবকিছু লকডাউন করা হয়েছে। বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হচ্ছে।

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ব্যক্তি চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। জনগণকে সচেতন করার জন্য মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জনসাধারণকে প্রতিদিন করোনার আপডেট জানানো হচ্ছে। করোনার বিস্তার রোধে এ ব্যবস্থাগুলো কার্যকর হবে আশা করা যায়।

করোনা নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আক্রান্ত ব্যক্তির পরীক্ষা ও চিকিৎসা। এ বিষয়ে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যাচ্ছে- পর্যাপ্ত টেস্ট কিট না থাকা এবং শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক পরীক্ষার ব্যবস্থা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অপর্যাপ্ত পিপিই, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক দুর্বলতা। এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে করোনা উপসর্গ নিয়ে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না এবং সামাজিকভাবেও বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, যার উদাহরণ নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলার অলংকার দিঘি গ্রামের যুবক আল আমিন (২২) উপজেলা ও জেলার হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তির পর মারা যান। ডাক্তার বলেছেন, তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না (যুগান্তর, ২৯ মার্চ)।

করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির দাফন নিয়েও সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। করোনা তো কোনো ব্যক্তির ওপর ব্যক্তিগত অভিশাপ নয়। অপরদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো তাদের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।

করোনা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসায় বিশ্বের উন্নত দেশের নাজুক অবস্থার কথা বিবেচনা করে আমাদের দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও সুস্থ করার লক্ষ্যে অতি দ্রুত সমন্বিত নীতিমালা ঘোষণা করা উচিত। এ নীতিমালায় করোনা রোগীর প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা, করোনা যুদ্ধে নিয়োজিতদের প্রণোদনসহ সার্বিক বিষয়ে বিবেচনার জন্য কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করছি।

ক. সামাজিক দায়বদ্ধতা : ১. করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ও শনাক্তকরণে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে সম্পৃক্ত করতে হবে; ২. করোনা আক্রান্ত রোগীর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং আক্রান্ত রোগী মৃত্যুবরণ করলে দাফনের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নিরসনে জনপ্রতিনিধিদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে; ৩. করোনায় আক্রান্ত হলেই যে সবাই মারা যাবে না এ বিষয়ে জনসচেনতা বৃদ্ধি করতে হবে; ৪. করোনা মোকাবেলায় অর্থায়নে বিত্তবানদের আহ্বান জানাতে হবে।

খ. চিকিৎসা সংক্রান্ত : ১. যুদ্ধ করতে হলে আগে শত্রুকে চিহ্নিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে করোনার উপসর্গধারী ব্যক্তিকে টেস্ট করতে হবে। এ জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় জেলা পর্যায়ে রোগীকে টেস্ট করার কিট সরবরাহ করতে হবে; ২. মৃদু আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভর্তি না করে অন্যত্র কোথায় আইসোলেশনে থাকবে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিতে হবে;

৩. সম্ভব হলে মৃদু আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য একটি জেনারেল গাইডলাইন্স প্রদান করতে হবে; ৪. আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার এবং তা জীবাণুমুক্ত করতে হবে;

৫. অ্যাম্বুলেন্সের চালক সুনির্দিষ্ট করতে হবে। চালক ও সহায়তাকারী হিসেবে উৎসাহী স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করতে হবে; ৬. করোনা আক্রান্ত রোগীদের সহায়তায় প্রয়োজনে উৎসাহী স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করতে হবে; ৭. সম্ভব হলে জেলা পর্যায়ে করোনা আক্রান্ত গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে।

গ. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রান্ত : ১. করোনা মোকাবেলায় অ্যান্টিপেনডেমিক মেডিকেল ইউনিট গঠন; ২. এ ইউনিটের ডাক্তার ও সেবাকর্মীদের করোনা চিকিৎসা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; ৩. ডাক্তার এবং নার্সদের পিপিই প্রদানসহ শতভাগ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; ৪. বিভিন্ন পর্যায়ে অভিজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে কমবয়সী ডাক্তার ও সেবাকর্মীদের এ ইউনিটে নিয়োগ প্রদান;

৫. করোনা মোকাবেলায় ডাক্তার ও সেবাকর্মীদের সব সময় হাসপাতালে থাকতে হবে এজন্য শিফটিং ডিউটি করার লক্ষ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ প্রদান; ৬. সম্প্রতি কয়েক হাজার তরুণ ডাক্তার ইন্টার্নশিপ শেষ করেছে, প্রয়োজনে তাদের নিয়োগ দেয়া; ৭. করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার ও নার্সদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকার ব্যবস্থা করা; ৮. করোনা মোকাবেলা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও নার্সদের ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায় অগ্রাধিকার দেয়া।

ঘ. প্রশাসন সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, আনসার বাহিনী, সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগের ডাক্তার, নার্স এবং অন্য দফতরের কর্মকর্তা/কর্মচারী যারা করোনা মোকাবেলায় এবং এ সংশ্লিষ্ট কাজে সরাসরি নিয়োজিত আছেন, তাদের মধ্যে যদি কেউ কর্তব্যরত অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তবে তিনি শহীদ গণ্য হবেন এবং তাকে মৃত গণ্য না করে তার যত বছর কর্মকাল বাকি ছিল সে সময় পর্যন্ত তার চাকরি চলমান থাকবে এবং তার সব সুযোগ-সুবিধা তার প্রকৃত উত্তরাধীরা প্রাপ্ত হবেন।

ঙ. করোনা মোকাবেলায় অসামান্য অবদানের জন্য ভবিষ্যতে সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় খেতাব প্রদান।

চ. করোনা মোকাবেলায় অর্থ সংগ্রহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে আলাদা ‘করোনা রেসপন্স সলিডারিটি ফান্ড’ চালু করা যেতে পারে।

করোনা বিশ্ব মহামারী, কতদিনে এর থেকে আমার মুক্তি পাব তা কেউ জানে না। তবে করোনা প্রতিরোধের যুদ্ধে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করে তা প্রতিরোধের সম্ভাব্য সব উপায় আমাদের ব্যবহার করতে হবে।

ড. মো. নাসির উদ্দিন : অতিরিক্ত সচিব (পিআরএল)

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত