অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ

  ডা. মো. নাজমুল করিম মানিক ০৪ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনে এই প্রথম একটি নিষ্প্রাণ নিরানন্দ ঈদ পার হল। এক অদৃশ্য শত্রু সারা পৃথিবীর জনজীবন অজানা আতঙ্কে থমকে দিয়েছে। সব সামাজিক রীতিনীতি বদলে দিয়েছে। এখন আমরা আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজনকে নিমন্ত্রণ করি না; দেখলেই আঁতকে উঠি। মনে হয় অচ্ছুৎ কেউ আমাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। কী জানি এক অজানা ভয় প্রতি মুহূর্তে কুরে কুরে খাচ্ছে। কবে এই অমানিশার অন্ধকার দূর হবে- প্রতি মুহূর্তে এই হাত ধোয়ার বাতিক, নাকে-মুখে মাস্ক ছাড়া নির্ভয়ে বের হতে পারব ঘরের বাইরে।

সারা বিশ্বে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আর মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষের। বাংলাদেশেও এ পর্যন্ত প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে আর মারা গেছে প্রায় ৬০০ জন। প্রতিনিয়ত আক্রান্তের হার বেড়েই চলেছে। তেমনি বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও।

কোনো এক অদৃশ্য শত্রু, যা দেখা যায় না, অনুভব করা যায় না; অথচ নীরবে প্রলয় ঘটিয়ে সারা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে আর অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এ মহামারীর শেষ কোথায়? কোথায় এর পরিণতি ভবিতব্য জানে।

করোনাভাইরাস আরএনএ ভাইরাস হিসেবে পরিচিত। ষাটের দশকে এটি আবিষ্কৃত হয়। এ ভাইরাসটি একটি আরএনএ প্রোটিন, যার বহিরাবরণ দুই স্তরবিশিষ্ট চর্বির আবরণ দিয়ে আবৃত। বাইরের আবরণটি কাঁটাযুক্ত, যা অনেকটা মুকুটের মতো।

এ জন্য এ ভাইরাসটির নাম করোনাভাইরাস হয়েছে। ভাইরাসটি অতি ক্ষুদ্র, যা শুধু ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা যায়। আয়তনে মাত্র ১১২ থেকে ১২০ মাইক্রন। ভাইরাসটি প্রাণহীন অনুজীব মাত্র। অথচ কী বিস্ময়!

প্রাণহীন এই অণুজীবটি মানবদেহে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট কোষের সংস্পর্শে এসে ভয়ংকর প্রাণঘাতী সক্রিয় ভাইরাসে পরিণত হয়ে সংক্রমিত করে করোনা রোগ সৃষ্টি করছে। ভাইরাসটির ভেতরে আরএনএ-তে (রাইবো নিউক্লিয়িক এসিড) কিছু জিন থাকে, যা ক্ষণে ক্ষণে রূপান্তর ঘটিয়ে মারাত্মক প্রাণঘাতীরূপে বিবর্তিত হচ্ছে।

২০১৯-এর শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। এ ভাইরাসটি আগের সব ভাইরাস থেকে আকৃতি ও প্রকৃতিতে একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। একেবারেই নতুন। এ জন্য এ ভাইরাসটির নাম দেয়া হয়েছে নভেল করোনাভাইরাস, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঈড়ারফ-১৯ নামকরণ করেছে। এটা আগের সার্স ও মার্স গোত্রের ভাইরাস; সেজন্য একে সার্স কোভিড-২-ও বলা হয়।

করোনাভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হলেও সার্স বা মার্সের মতো মারাত্মক প্রাণঘাতী নয়। এ ভাইরাসটির একটি বৈশিষ্ট্য হল, এটা শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাগে সংক্রমণ করতে পারে; আবার শ্বাসযন্ত্রের নিম্নভাগ ফুসফুস ও এর এলভিওলাইকে সংক্রমিত করে। উপরিভাগে সংক্রমণ হলে হালকা কাশি, হাঁচি বা মৃদুজ্বর থাকতে পারে। আবার শ্বাসযন্ত্রের নিম্নভাগে সংক্রমণ হলে মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তখন জ্বর, কাশি ও হাঁচি, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ডায়রিয়া ও শরীর ব্যথা থাকতে পারে। অন্যান্য অঙ্গ যেমন হৃদযন্ত্র আক্রান্ত হতে পারে।

কিভাবে ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশ করে

ভাইরাসটির মুকুটের মতো অংশে এস প্রোটিন থাকে, যা শ্বাসযন্ত্রের সেসব কোষকে আক্রান্ত করে, যেখানে এসিই-২ (এনজিও টেনসিন কনভার্টিং এনজাইম ২) থাকবে। কাঁটাযুক্ত আবরণের এস প্রোটিন আক্রান্ত কোষের এসিই-২ এর সঙ্গে লেগে যায়।

এরপর মুকুটের কাঁটাগুলো খসে যায়। ফলে ভাইরাসটির আরএনএ সক্রিয় হয়। দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং এসিই-২ আবরণযুক্ত নতুন নতুন কোষকে আক্রান্ত করে। আক্রান্ত কোষের এন্ডোসোমের ভেতর আস্তানা গড়ে। এন্ডোসোম অনেকটা অম্লজাতীয়।

ফলে ভাইরাসটি দ্রুত বংশবিস্তার করতে থাকে। তাই ফুসফুস ছাড়া অন্যান্য অঙ্গে যেখানে এসিই-২ এনজাইম থাকে, সেগুলোকেও আক্রান্ত করে। ফুসফুসের এলভিওলাই ধ্বংস করে। খসেপড়া কাঁটা, ধ্বংসাবশেষ ও রক্ত দিয়ে ফুসফুসের ফাঁপা কোষগুলো পূর্ণ হয়ে অকার্যকর হতে থাকে।

ফলে শ্বাসকষ্ট হতে থাকে, কাশি হতে থাকে, রক্ত জমাট বাঁধে। অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয়। এ সময় আইসিইউ’র সহায়তা প্রয়োজন হয় নতুবা আক্রান্ত মানুষ মারা যায়। ফুসফুস ছাড়া হৃদযন্ত্রও আক্রান্ত হতে পারে। ফুসফুসের কোষ আক্রান্ত হওয়ার পর মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে থাকে; ফলে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়।

একে ইমিউন রেসপনস বা প্রতিরোধী সক্রিয়তা বলে। ঈড়ারফ-১৯-এর সংক্রমণের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমিউন রেসপনসটা অস্বাভাবিক। মানব শরীরে তৈরি অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসকে আক্রমণ করে। কিন্তু নির্দিষ্ট ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে না।

ফলে অস্বাভাবিকভাবে অ্যান্টিবডিগুলো দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে অস্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রক্তনালির দেয়ালের ছিদ্রগুলো প্রসারিত হয়ে রক্তরস রক্তনালি থেকে বের হয়ে আসে। এই অস্বাভাবিক ইমিউন সক্রিয়তাকে সাইটোকাইন স্টর্ম বলে। এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার ফলে জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও অন্য উপসর্গগুলো তীব্র হয়।

কিভাবে এলো নভেল করোনাভাইরাস

২০১৯-এর শেষদিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে বন্যপ্রাণীর বাজারে সম্ভবত বাদুড় থেকে মানব শরীরে এই ভাইরাসটি সংক্রমিত হয়। মতান্তরে, ভাইরোলজি ইন্সটিটিউট থেকে দুর্ঘটনাক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাসটি মানব শরীরে সংক্রমিত হতে পারে।

এরপর বিদ্যুৎ গতিতে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে অদৃশ্য ভাইরাসটি। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। আক্রান্ত মানুষ পরিণত হচ্ছে অচ্ছুৎ প্রাণীতে। যখনই কেউ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে, তখন থেকে আক্রান্ত মানুষটি পরিবার, সমাজ সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তবে ভয়ের বিষয় হল, যখন বেশির ভাগ আক্রান্ত মানুষ উপসর্গহীন থাকছেন এবং তারা নিজের অজান্তেই অন্যকে আক্রান্ত করছেন।

কিভাবে ছড়ায়

যেভাবেই মানব শরীরে এসে থাকুক, এখন একমাত্র মানুষ থেকেই রোগটি সংক্রমিত হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কফ হতে অন্য মানুষের নাক, মুখ ও চোখ দিয়ে সংক্রমিত হয়। সার্স কোভ-২ বাতাসে ৩ ঘণ্টা ভেসে থাকতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিকের ওপর ৭২ ঘণ্টা, স্টিলের ওপর ৪৮ ঘণ্টা, কার্ডবোডের ওপর ২৪ ঘণ্টা, তামার ওপর মাত্র ৪ ঘণ্টা থাকতে পারে।

প্রতিরোধের উপায়

স্বাস্থ্য সচেতনতা রোগটি থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করতে পারে। যেহেতু নাক, মুখ এবং চোখ দিয়ে ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশ করে; এ জন্য নাকে-মুখে মাস্ক, হাত বারে বারে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করা, হাত না ধুয়ে নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ না করলে এই রোগটির সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়।

রোগটি প্রতিরোধে সারা বিশ্ব সামাজিক দূরত্ব এবং লকডাউনকে মূল ভরসা হিসেবে গ্রহণ করেছে। হাত না মেলানো, উন্মুক্ত স্থানে হাঁচি, কাশি বা কফ থুতু না ফেলা, কোলাকুলি না করা, ভিড় বা জনসমাগম এড়িয়ে চলা এসবই করোনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশে নিষ্ফল প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও লকডাউন বা সামাজিক দূরত্ব তেমন সফল হয়নি। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র দেশে এর চেয়ে বেশি সম্ভবও নয়। তারপরও বাংলাদেশে তূলনামূলকভাবে অন্য দেশের তুলনায় সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কম।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

করোনা রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। তবে এজিথ্রোমাইসিন ও হাইড্রক্সি ক্লোরকুইন চিকিৎসা অনেকটাই কার্যকরী। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ক্লোরকুইন অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া ইভারমেকোটিন ও ডক্সিসাইক্লিন দিয়ে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া গেছে। কিছু অ্যান্টিভাইরাল রেমডেসিভির, লোপিনাভির রিটনাভির প্রভৃতি ওষুধও কোভিড-১৯ চিকিৎসায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। যদিও ফল আশানুরূপ নয়।

তবে যতক্ষণ কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে কার্যকরী ভ্যাকসিন তৈরি না হচ্ছে, অদৃশ্য শত্রুর আতঙ্ক নিয়েই আমাদের এ পৃথিবীতে বসবাস করতে হবে। যত বেশি রোগ নির্ণয় হবে, তত রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মাস্ক ও স্যানিটাইজার নিয়ে আর কতদিন আমাদের চলতে হবে, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই তা বলতে পারেন। সবাই সচেতন হোন। সুস্থ থাকুন সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায়। এ মহামারী নির্মূল হোক- সৃষ্টিকর্তার কাছে এ প্রত্যাশা সবার।

ডা. মো. নাজমুল করিম মানিক : অতিরিক্ত পরিচালক (হাসপাতাল), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত