যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতিবাদের পেছনের কারণ

  সিন কলিন্স ০৪ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশের হাতে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে এবং কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষরা খুনের শিকার হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। গত সপ্তাহজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি শহরে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড বর্তমানে বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা এ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ উসকে দিয়েছে।

যদিও পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক বাউবিনের বিরুদ্ধে থার্ড ডিগ্রি মার্ডারের অভিযোগ আনা হয়েছে; তা সত্ত্বেও রাতের পর রাত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। কারণ প্রতিবাদকারীরা কেবল সুনির্দিষ্ট এ হত্যারই প্রতিবাদ করছেন না; বরং তারা যেটি তুলে ধরছেন তা হল- বেপরোয়া পুলিশি বর্বরতার যেন কোনো শেষ নেই।

প্রকৃতপক্ষে, মানবাধিবার গ্রুপ ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্সের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পুলিশি হত্যাকাণ্ডগুলোর ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগই করা হয়নি; অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা তো বহু দূরের কথা।

বিভিন্ন পাবলিক ডাটাবেজ এবং আইন প্রয়োগকারী রেকর্ড থেকে নেয়া ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্সের অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, পুলিশের হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।

এতে দেখা গেছে, পুলিশের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকারের ঘটনা ২০১৪ সালে ছিল কিছুটা কম- ১ হাজার ৫০টি। আর ২০১৮ সালে ছিল সবচেয়ে বেশি- ১ হাজার ১৪৩টি। তুলনা হিসেবে উল্লেখ করা যায়- ২০১৮ সালে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ১ হাজার ১৪৩ জনকে।

পুলিশের হাতে প্রাণ হারানোর এ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৩ সালে হত্যার শিকার হন ১১০৬, ২০১৪ সালে ১০৫০, ২০১৫ সালে ১১০৩, ২০১৬ সালে ১০৭১, ২০১৭ সালে ১০৯৫, ২০১৮ সালে ১১৪৩ এবং ২০১৯ সালে ১০৯৮ জন।

প্রতি বছর এত মানুষের পুলিশের হাতে হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা ভালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বছরের পর বছর প্রতিবাদ ও প্রচার-প্রচারণা, সচেতনতা তৈরি, এমনকি নীতিমালায় পরিবর্তন- যেমন বডি ক্যামেরা ব্যবহার এবং সহিংসতা দূর করার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কৌশল ইত্যাদি আক্ষরিক অর্থে খুব কমই পরিবর্তন আনতে পেরেছে।

কয়েক বছরের হত্যার যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে, তা সব বর্ণ ও গোত্রের মানুষ নিয়ে করা; কিন্তু একই কথা প্রযোজ্য নৃতাত্ত্বিক তথ্য খোঁজার ক্ষেত্রেও। পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যার শিকার হওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমে এসেছে; যেমনটি কমে এসেছে শ্বেতাঙ্গদের হত্যার শিকার হওয়ার পরিসংখ্যান।

তবে ল্যাটিন আমেরিকানদের হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। পুলিশের হাতে নেটিভ আমেরিকান ও এশিয়ান আমেরিকান হত্যার ঘটনা একেবারে বন্ধ না হলেও কিছুটা কমেছে। তবে বর্ণ ও গোত্র পরিচয় অজানা আমেরিকান হত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি।

এগুলো হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এবং এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়, পুলিশের হাতে হত্যার ঘটনায় কেবল কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরাই ভোগান্তির শিকার নয়, বরং এতে সব জাতিগোষ্ঠীর আমেরিকানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন; কিন্তু কন্ট্রোলিং ফর পপুলেশন বা প্রতি মিলিয়নে হত্যার দিকে তাকালে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পুলিশের হাতে হত্যার শিকার।

এর কারণ হচ্ছে, তারা ল্যাটিন আমেরিকানদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি সম্ভাব্য হত্যার শিকার। সর্বোপরি পুলিশের হাতে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের নিরস্ত্র থাকার ঘটনা শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি এবং ল্যাটিন আমেরিকানদের চেয়ে এ হার ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।

এ ভিন্ন ধরনের চিত্র অনেকটা এমন যে, রেনো, নেভাদা, ওকলাহোমা সিটি, ওকলাহোমা এবং স্কটসডেইল ও অ্যারিজোনাসহ আটটি আমেরিকান শহরে পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ হত্যার হার গোটা আমেরিকার মোট হত্যার হারের চেয়ে বেশি।

আর দেশের ৫০টি বড় শহরের ২৭টিতে পুলিশের হত্যার হার (বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে) সহিংস অপরাধের হারের চেয়ে বেশি। কানসাস সিটি, মিসৌরি, কলাম্বাস ও ওহিও’র মতো সহিংস অপরাধ হিসেবে পুলিশের যে হত্যাকাণ্ড হিসাব করা হয়, তা সহিংস অপরাধের হারের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি হতে পারে।

এ বাস্তবতার কারণেই মানুষ প্রতিবাদ করছে। নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গদের পুলিশি হত্যার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক প্রতিবাদ হচ্ছে, যার কিছু কয়েক সপ্তাহ ধরে চলেছে। যেমন- ২০১৭ সালে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা জেসন স্টকলির হাতে অ্যান্থনি লামার স্মিথের হত্যার প্রতিবাদ হয়েছে সেন্ট লুইসে এবং ২০১৪ সালে মিশেল ব্রাউনের হত্যার পর ফার্গুসনে তীব্র প্রতিবাদ হয়েছে।

ওইসব প্রতিবাদের বাইরে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন এবং অন্যান্য মানবাধিকার সচেতনতামূলক উদ্যোগও এসেছে। আবার কিছু ঘটনা পাশ কাটিয়েও যাওয়া হয়েছে। যেমন- ২০১৫ সালে ফ্রেডি গ্রে হত্যার পর বাল্টিমোর পুলিশ বিভাগের কনসেন্ট ডিক্রি যোগ হয়েছে বিচার বিভাগের সঙ্গে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে আইনজীবীদের চাপে পড়ে নেয়া কিছু পদক্ষেপ উল্লখযোগ্য হারে পুলিশি হত্যাকাণ্ড হ্রাসে সহায়তা করেছে। ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্সের এক বিশ্লেষণে পুলিশ ইউজ অব ফোর্স প্রজেক্ট থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, বাহু দিয়ে গলা চেপে ধরা নিষিদ্ধকরণ তৎক্ষণাৎ ২২ শতাংশ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড কমিয়েছে। তবে এ কমানো যথেষ্ট নয়। প্রতিবাদও যথেষ্ট হয়নি।

ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্সের বিশ্লেষণ তাই দেখিয়েছে, অন্য গবেষণায়ও তা-ই উঠে এসেছে। যেমন- রুটজারস ইউনিভার্সিটি, মিশিগান ইউনিভার্সিটি এবং সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের গবেষণা আমার সহকর্মী ডিলান স্কট কর্তৃক সম্প্রতি বিশ্লেষিত হয়েছে।

২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ডাটা ব্যবহার করে গবেষকরা বুঝতে পেরেছেন আমেরিকান নারী-পুরুষরা পুলিশের হাতে হত্যার শিকার হওয়ার কতটা ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, পুলিশের হাতে হত্যার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে হাজারে একটি চান্স আছে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষের বেলায়, যা ন্যাশনাল সেফটি কাউন্সিলের তথ্যমতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর চেয়েও বেশি।

যদি অতীতের প্রতিবাদ-বিক্ষোভগুলো এ দুঃখজনক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে না পারে, তাহলে ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সেটি করতে পারবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে এখানে সামান্য যা ঘটবে তা হল, প্রতিবাদকারীরা এ সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে। এটিও কম কিছু নয়।

যদিও এতে অনেকে ভোট দিতে উৎসাহী হয়েছেন, ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্সের ডাটা বলছে, এসব হত্যাকাণ্ড শহরগুলোতে ঘটে থাকে বড় মাপের নেতৃত্বের ছায়াতলে এবং তাতে কোন দলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেটি খুব একটা বিবেচ্য হয় না।

অনেক বিশ্লেষক বিতর্ক করেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ ইউনিয়ন দুর্বল করার নীতি বাস্তবায়ন না হবে এবং পুলিশকে সশস্ত্র বা নিরস্ত্র করার বিষয়টি প্রেসিডেন্টের খেয়াল মোতাবেক থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন আসবে না।

পুলিশকে সামরিক অস্ত্র সরবরাহ করা বা না করার সিদ্ধান্ত স্থানীয় পর্যায়ে হয় না, এটি ফেডারেল পর্যায়ে হয়। আর পুলিশ অফিসারদের নিয়ন্ত্রণের আইনকানুন যারা তৈরি করেন, তারা পুলিশ ইউনিয়নে থাকা কর্মকর্তাদের ভোটে নির্বাচিত হন, জনগণের ভোটে নয়।

স্কট যেমনটি উল্লেখ করেছেন, পুলিশের অ্যাকশনের অভিযোগগুলো সব সময় তদন্ত করা হয় না। চাউভিনের বিরুদ্ধে ১৮টি অভিযোগ ছিল; কিন্তু তারপরও ফ্লয়েডকে হত্যার দিন পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব পালন করতে দেয়া হয়েছে।

৯৯ শতাংশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই হত্যার পর অভিযোগ পর্যন্ত আনা হয় না। পরিবর্তনের জন্য চাপ দেয়ার প্রচেষ্টা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই বললেই চলে এবং দশকের পর দশক, এমনকি শতাব্দীর হতাশা তাদের উজ্জীবিত করছে প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে। ওয়াশিংটন ডিসির একজন প্রতিবাদকারী ওলগা হল শনিবার রাতে যেমনটি বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, ‘আমরা অসুস্থ হয়ে পড়েছি। পুলিশ সদস্যরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তারা বন্য।’

ভক্স ডটকম থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

সিন কলিন্স : ভক্স ডটকমের উইকেন্ড এডিটর

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত