করোনা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

  ড. কাজী ছাইদুল হালিম ০৬ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব, সংক্রমণ, তা থেকে অসুস্থতা আবার সুস্থতা লাভ এবং চরম পর্যায়ে অনেকের মৃত্যু আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে খুব কম সময়ের মধ্যে। সময় যত যাচ্ছে আমরা আরও নতুন নতুন অনেক কিছু শিখছি- এ ভাইরাসের গতিবিধি, বৈশিষ্ট্য ও সংক্রমণের লক্ষ্য গোষ্ঠী সম্পর্কে। এ ভাইরাসে যেমন আক্রান্ত হয়েছে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু, তেমনি আক্রান্ত হয়েছেন ১০০ বছরেরও বেশি বয়সী ব্যক্তি। আবার তাদের মধ্যে অনেকে সুস্থও হয়েছেন। এদিকে সুইডিস এপিডেমিওলজিস্ট আনডেরস টেনগেলিন বলেছেন, মেয়েদের চেয়ে পুরুষরাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে। ওদিকে বাংলাদেশি এপিডেমিওলজিস্ট এবং নিপসমের প্রফেসর ডা. কাজী শফিকুল হালিম বলেন, করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হলেও রিকশাচালকরা এতে আক্রান্ত হচ্ছে না। তাহলে কি খেটে খাওয়া মানুষরা কায়িক পরিশ্রম করে বলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি? হয়তো এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার জানার জন্য আমাদের গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এখনও কথা থেকে যায়, এ ভাইরাস কোন গোষ্ঠীকে বেশি সংক্রমণ করছে এবং এর সংক্রমণজনিত জটিলতায় কারা বেশি মৃত্যুবরণ করছে? কিভাবে আমরা করোনার সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারব? রক্ষা করতে পারব সমাজ, দেশ, জাতি ও অর্থনীতিকে?

করোনা ভীতির মধ্যেও একটা আশার বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন জরিপ বলছে শিশু ও তরুণরা করোনাভাইরাসে সবচেয়ে কম আক্রান্ত হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে এরা আক্রান্ত হলেও মৃত্যুর সংখ্যা খুব কম, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূন্যের কোঠায় যেমন ফিনল্যান্ড। সেখানে এখন পর্যন্ত একজনও শিশু বা তরুণ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়নি। একইভাবে ফিনল্যান্ডে কমবয়সী (পেশাভেদে ৬৫ বা ৬৭-এর মধ্যে) মানুষদেরও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার সংখ্যা খুবই কম। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ফিনল্যান্ডে যারা মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের গড় বয়স ৮৪ বছর, যার মধ্যে ৯৬ শতাংশ দীর্ঘদিন ধরে এক বা একাধিক রোগে ভুগছিল। ফিনল্যান্ডে করোনায় মৃত বেশিরভাগ ব্যক্তির মধ্যে যে দুটি সমস্যার উপস্থিতি ছিল তা হচ্ছে ডায়াবেটিস ও স্থূলতা। একই দৃশ্য আমরা মোটামুটি বিশ্বের অন্য দেশেও দেখতে পাই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং তা থেকে মৃত্যুবরণের প্রধান লক্ষ্য গোষ্ঠী হচ্ছে- ১. বয়স্ক জনগোষ্ঠী, ২. দীর্ঘদিন ধরে এক বা একাধিক অসুখে যারা ভুগছে, ৩. যাদের ডায়াবেটিস আছে এবং ৪. যারা স্থূল।

করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই যে বিষয়টি বহুল আলোচিত হয়ে আসছে তা হল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তারা সহজেই করোনাকে জয় করতে পারছে। সমস্যা হচ্ছে তাদের নিয়ে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে যে কোনো সময় যে কোনো বয়সের যে কেউ যে কোনো স্থান থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা শুরু করতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির আলোচনায় পরে আসছি। তার আগে একটু আলোচনা করি কেন আমাদের অসুখ বা রোগ হয়। সাধারণত দুটি কারণে রোগ হয়। প্রথমত, স্বাস্থ্যবিধি না জানা বা না মানা। আর দ্বিতীয়ত, জীবাণুর আক্রমণ। করোনাভাইরাস একবার শরীরে প্রবেশ করে অসুস্থতা বা রোগ সৃষ্টি করলে ডাক্তারের পরামর্শমতোই চিকিৎসা করা উচিত, তিনি যেভাবে ওষুধ-পথ্য খেতে বলেন তেমনই খাওয়া উচিত। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, সময়মতো সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন এবং সুচিন্তা করেন, তাদের শরীরে রোগজীবাণু প্রবেশ করলেও সহজে তাদের কাবু করতে পারে না। এসব চর্চার মাধ্যমে শরীর সবল ও সতেজ হয় বলে অনেক রোগ জীবাণুর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে। তাই এরই মধ্যে অনেক খবর এসেছে যে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তারা সহজেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সেরে উঠেছে।

আপনি কিভাবে শরীরচর্চার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবেন তা একটু দেখা যাক। শরীরচর্চা অনেকভাবেই করা যায়; তবে এর নিয়মানুবর্তিতা বা এটাকে অভ্যাসে পরিণত করা নিয়েই যত সমস্যা। তবে আশার কথা হচ্ছে, একটা কাজ সেটা খারাপ বা ভালো যাই হোক না কেন, আপনি যখন সেটা বারবার করবেন তখন তা আপনার মস্তিষ্কের একটা অংশ, যার নাম ব্যাজাল গাংলিয়া, সেখানে নিবন্ধভুক্ত হয়ে যাবে; তার মানে এটা আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। এখন আপনি এটা সহজে বাদ দিতে পারবেন না। অভ্যাস ও আসক্তি কিন্তু একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ভবিষ্যতের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আপনি কিভাবে শরীরচর্চা শুরু করবেন তা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করাই ভালো। তবে আপনি ব্যায়াম বা জীবনধারার পরিবর্তন নিয়ে এগোতে পারেন যেমন- ১. প্রতি রাতে নিয়মিত দ্রুত ঘুমাতে যান; ২. ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে পানি ছাড়া অন্যকিছু মুখে না দেয়ার চেষ্টা করুন; ৩. ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও টিভি দেখা বন্ধ করুন; ৪. প্যাকেটজাত বা ফাস্টফুড যতটা সম্ভব পরিহার করুন; ৫. ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন শোয়ার ঘরের বাইরে রাখুন; ৬. সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন; ৭. সকালে উঠে একটু সময় নিয়ে অর্ধ থেকে এক লিটার পানি পান করুন; ৮. ১৫ থেকে ৩০ মিনিট মুক্ত হস্তে বা হালকা ব্যায়ামের উপকরণ দিয়ে ব্যায়াম করুন; ৯. ডি ভিটামিনের জন্য প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট শরীরে রোদ লাগান; ১০. নিয়মিত নিজে হাসুন এবং অন্যকেও হাসানোর চেষ্টা করুন; ১১. ছোটকালের কিছু কিছু শখ ফিরিয়ে আনুন, যেমন দড়ি খেলা, মাছ ধরা, বাইসাইকেল চালানো ইত্যাদি; ১২. প্রতিদিন দেশ ও দশের জন্য কিছু ভালো চিন্তা করুন; ১৩. অন্যকে ভালোবাসুন; ১৪. নিজেকে ভালোবাসুন।

রোগ নিরাময়ে ওষুধে যেমন সঙ্গে সঙ্গেই কাজ হয়, ব্যায়াম বা জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের উপকার পেতে কিন্তু সময় লাগে। তাই এর চর্চায় আপনার দরকার নিষ্ঠা ও ধৈর্য্য। মনে রাখবেন prevention is better than cure। আহারে-বিহারে সংযত থেকে, সুষম খাদ্য খেয়ে এবং নিয়মিত কিছু শরীরচর্চা করে সারা জীবন সুস্থ ও নীরোগ থাকা যায়, যে কোনো রোগ প্রতিরোধ করা যায়, যৌবন ও সৌন্দর্যও এতে দীর্ঘস্থায়ী করা যায়।

আমি যখন এ লেখাটা লিখছি তখন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত করোনা রোধে যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল তার অধিংকাশই শিথিল করা হয়েছে। অন্যদিকে করোনায় নতুন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে। আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা করোনা সংক্রমণের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপগুলো একটু দ্রুতই কি শিথিল করে ফেললেন? বিষয়টা ভেবে দেখার মতো। তবে শিথিল করার পরও সরকারের নেয়া যে পদক্ষেপগুলো এখনও আছে, তা কঠোরভাবে পালন করতে হবে। এভাবেই আমরা বাঁচব, দেশ বাঁচবে।

অন্যদের কাছ থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। ফিনল্যান্ড (জনসংখ্যা ৫.৫ মিলিয়ন) ও সুইডেন (জনসংখ্যা ১০.২ মিলিয়ন) দুটো প্রতিবেশী দেশ। করোনা সংক্রমণের শুরুতে মাত্র ৩৪ বছর বয়সী ফিনিশ নারী প্রধানমন্ত্রী করোনা সংক্রমণ রোধে রাজধানী হেলসিংকিকে দেশের অবশিষ্ট অংশ থেকে লকডাউন করাসহ অনেক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ফলে ৩০ মে পর্যন্ত ফিনল্যান্ডে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮২৬ এবং মৃতের সংখ্যা ৩১৬। গত সপ্তাহ থেকে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা এতই কম যে, লকডাউনসহ করোনা সংক্রমণ রোধে গৃহীত বেশিরভাগ পদক্ষেপ শিথিল করা হয়েছে এবং আগামীতে আরও হবে। অন্যদিকে শুরু থেকেই সুইডেন করোনা সংক্রমণকে দৈনন্দিন জীবনের একটা সাধারণ অংশ হিসেবে নেয়। ফলে ৩০ মে পর্যন্ত সুইডেনে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭১১৩ এবং মৃতের সংখ্যা ৪৩৯৫।

দেশভেদে নীতি ও কর্মপন্থার পার্থক্য হয় তা আমাদের জানা। তবে করোনা সংক্রমণ রোধে বাংলাদেশসহ প্রতিটি দেশের নীতি বা কর্মপন্থা এমন হওয়া উচিত যাতে এর দ্বারা সংক্রমণ ও প্রাণহানি দুটোই কমে। পরিশেষে বলব, করোনাভাইরাস সমূলে উৎপাটিত হয়। করোনামুক্ত একটা সুন্দর সকালের অপেক্ষায় রইলাম।

ড. কাজী ছাইদুল হালিম : ফিনল্যান্ড প্রবাসী শিক্ষক, গবেষক

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত