বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস

ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

  সুব্রত বিশ্বাস ১৭ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে পৃথিবীর। এ পরিবর্তনের ধারায় কখনও ঘূর্ণিঝড়, কখনও ভূমিকম্প, কখনও অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, কখনও বন্যা, কখনও বিভিন্ন রোগ-বালাই দুর্যোগ আকারে দেখা দিচ্ছে। মারা যাচ্ছে মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাঠের পর মাঠ ফসল। বাড়ছে খাদ্য সংকট। ঘরবাড়ি মিশে যাচ্ছে মাটির সঙ্গে। ফলে মানুষ হারাচ্ছে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে জলবায়ুর কু-প্রভাব বিশ্বে মরুকরণের একটি অন্যতম সমস্যা।

১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের পক্ষ থেকে খরা ও মরুকরণের প্রতি সোচ্চার হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। এ ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে নাইরোবিতে বিশ্ব মরুকরণবিরোধী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোয় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক সম্মেলনের পরপরই মরুকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

রিও সম্মেলনের এজেন্ডা-২১-এর প্রস্তাবটি ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের ৪৭তম অধিবেশনে গৃহীত হয় এবং ইন্টার গভর্নমেন্টাল নেগোশিয়েটিং কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি মরুকরণ সংক্রান্ত খসড়া কনভেনশন চূড়ান্ত করে। ১৯৯৪ সালের জুন মাসে কনভেনশনের দলিল চূড়ান্ত হয়। এ কনভেনশনে ৫০টি দেশ কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর ১৯৯৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় দলিলটি। বলা আবশ্যক, বাংলাদেশও এ কনভেনশন অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে খরা ও মরুকরণ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করে তুলতে ১৭ জুন পালন করা হয় বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস।

বিশ্বের জলাভূমির ৭০ শতাংশ ইতোমধ্যে হয়ে পড়েছে মরুকবলিত। এর পরিমাণ পৃথিবীর মোট ভূমির চার ভাগের এক ভাগ। নিষ্কাশনে অব্যবস্থা ও লবণাক্ততার ফলে সেচের আওতাধীন আবাদি জমির বিশাল অংশ আজ অবক্ষয়ের সম্মুখীন। সুতারাং মরুকরণ ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য এক বিশাল হুমকি। এ জন্য প্রয়োজন মরুকরণ বিস্তার রোধ। আজকের দুনিয়ার পরিবেশের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে মরুকরণ অন্যতম।

জাতিসংঘ বলেছে, পৃথিবীর প্রায় দেড়শ’ কোটি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য ক্ষয়িষ্ণু ভূমির ওপর নির্ভরশীল। আর পৃথিবীর অতি দরিদ্রদের ৪২ ভাগই বাস করে ক্ষয়ে যাওয়া এলাকায়, যারা মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছে। এ ভূমিক্ষয় জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে, যা শুধু আমাদের বেঁচে থাকার জন্যই বিপদের কারণ নয় বরং এটি আমাদের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ।

মরুকরণ যেভাবে বিশ্বব্যাপী মাথাব্যথার কারণ, তেমনি আমাদেরও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দিন দিন আমাদের ফসলি জমি কমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে গাছপালা, বন-জঙ্গল। শুকিয়ে যাচ্ছে নদীগুলো। অন্যান্য জলাধারের অবস্থাও সঙ্গিন। দিন দিন যেমন আমাদের ফসলি জমি কমছে, একই সঙ্গে খরায় উর্বরতা হারাচ্ছে জমি। সাম্প্রতিক সময়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ তিনটি দেশের একটি বাংলাদেশ। এ অবস্থায় পরিবেশের প্রতি আমাদের মনোযোগী হওয়া আবশ্যক।

জাতিসংঘের এক গবেষণা বলছে, ২০ বছর পর মানবজাতির যাবতীয় চাহিদা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। সে সময়ে বর্তমানের প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি খাদ্যের প্রয়োজন হবে। জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে, তখনকার চাহিদামতো প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য উপাদানের ঘাটতি দেখা দিয়ে সেটি সংকট সৃষ্টি করতে পারে। সেই সংকট গতি নিয়ে চলে যেতে পারে সংঘর্ষের দিকে। আর এ সংকটের একমাত্র কারণ হবে মরুকরণ ও খরা।

মরুকরণ এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হলেও এখন এটি পরিবেশ বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি আমাদের দেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আম্পান, ফণী, সিডর, আইলা ও নার্গিসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ ভাবনাকে আরও প্রবল করে তুলেছে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, আমাদের দেশও মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা বলেছেন, মরুকরণের প্রধান দুটি বিষয় হচ্ছে- একটি বিস্তৃত এলাকা ছেড়ে যদি সেখানকার মাটি অনুর্বর হতে থাকে এবং যদি নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যেতে থাকে ও বৃষ্টির অভাব ঘটে। বিগত কয়েক দশক ধরে এ লক্ষণগুলো বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে বাংলাদেশে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিজমি সংরক্ষণ, কৃষিকাজে জৈব সার ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিতকরণে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা, নদীর পানিপ্রবাহে যথাযথ উদ্যোগ, খাল-বিল ও জলাভূমিগুলো সংরক্ষণে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন তারা।

অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে দেশের কৃষিজমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। সাধারণ হিসাবে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ যদি পাঁচ ভাগ থাকে, তাহলে তা উর্বর মাটি। দেশের কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বর্তমানে এক শতাংশ। রাসায়নিক সার ব্যবহার ও শাকসবজির বদলে ধান চাষ বেশি হওয়ায় মাটি গুণাগুণ হারিয়ে অনুর্বর হয়ে পড়ছে। বর্ষা বা শীত মৌসুমে ধঞ্চে, কলাই প্রভৃতি চাষ করলে কৃষি জমির উর্বরতা বাড়ত।

কিন্তু এখন দীর্ঘদিনের সেই প্রথাগত চাষ বন্ধ। জমির অনুর্বরতা ঠেকাতে জৈব চাষের প্রতি কৃষকদের উৎসাহিত করা উচিত। কিন্তু তা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সবাই ঝুঁকছে রাসায়নিক সারের দিকে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন দেশের কৃষিজমি পুরোপুরি অনুর্বর হয়ে পড়বে, যা মরুকরণে ঝুঁকির একটি প্রধান দিক।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরাকবলিত হয়ে ক্রমান্বয়ে ভূমির অবক্ষয় হচ্ছে। বিশেষত রাজশাহী অঞ্চল এ সমস্যাকবলিত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। অত্যন্ত জরুরি হলেও বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস এ দেশে বিশেষ গুরুত্ব বিস্তার করতে পারেনি। তবে মরুকরণ রোধে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সরকারের পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিশেষভাবে গৃহীত হয়েছে, যা প্রশংসার দাবিদার। মরুকরণ বিস্তার রোধে অধিক বৃক্ষরোপণই হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

যেসব বৃক্ষ পানি ধরে রাখে এবং জমির মান অক্ষুণ্ন রাখতে পারে, সেসব বৃক্ষরোপণ করার ব্যাপারে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সবাইকে পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস পালনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কনভেনশনে গৃহীত মূল প্রস্তাবে বৃক্ষরোপণ এবং বিকল্প জ্বালানি সৃষ্টির ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আগামী ৫০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অনেকটা অংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও উপকূলীয় এলাকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত বেড়ে গিয়ে বন্যা হবে, খাদ্য উৎপাদন ৩০ ভাগ কমে গিয়ে ক্ষুধা ও গরিবের সংখ্যা বাড়িয়ে দেবে, তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে হিমালয়ের হিমবাহগুলো গলে বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে আমাদের।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট নদীর সংখ্যা ৩১০টি। এর মধ্যে মৃত ও মৃতপ্রায় নদীর সংখ্যা ১১৭টি। এদিকে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিইউএস) থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সাধারণ হিসাবে গত ৪০ বছরে শুধু তিনটি প্রধান নদী- পদ্মা, মেঘনা, যমুনাতেই এ পর্যন্ত বিলীন হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি। আর তার বিপরীতে নতুন ভূমি জেগেছে মাত্র ৩০ হাজার হেক্টর। প্রতিবছর কোনো-না-কোনো নদীর শাখা ধীরে ধীরে পলি পড়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো নদী দখল হয়ে যাচ্ছে দখলকারীদের হাতে। পরিকল্পনার অভাবেই নদীমাতৃক বাংলাদেশ থেকে এভাবে নদী হারিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ গত ২০ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ বাংলাদেশের বেশ কিছু এলাকায় আঘাত হেনেছিল। ২০০৪ সালে এ ঘূর্র্ণিঝড়ের নাম ‘আম্পান’ দিয়েছিল থাইল্যান্ড। ‘আম্পান’ শব্দের অর্থ ‘আকাশ’। কিন্তু এ আকাশ নামের ঘূর্ণিঝড়ই লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের ক্ষেতের ফসল, ঘড়বাড়ি আর তাদের লালিত স্বপ্ন।

জাতিসংঘ এ দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালনের আহ্বান জানালেও দেশে দিবসটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন হচ্ছে না। অথচ অনেক গুরুত্বহীন দিবসও সাড়ম্বরে পালিত হতে দেখা যায়। বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশে দিবসটির তাৎপর্যময় উদ্যাপন প্রত্যাশা করি। বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করুক। খরা ও মরুময়তা প্রতিরোধসহ কৃষিজমি রক্ষায় ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র যার যার অবস্থান থেকে সক্রিয় হোক- এ প্রত্যাশা থাকল।

সুব্রত বিশ্বাস : কাউন্সিলর, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত