সিডনির করোনা কড়চা

  কাজী এমদাদুল হক ২৭ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

এ তো জানা কথাই, সময় কারও জন্যই অপেক্ষা করে না। ছুটিতে ছেলেদের কাছে অল্প কিছুদিনের জন্য বেড়াতে এসে এখন দেখছি মাঝখানে চার-চারটা মাস চলে গেছে। সেই ফেব্রুয়ারিতে এসেছি। সিডনিতে দুই ছেলে একসঙ্গেই থাকে। বড় ছেলে বিয়ে করেছে, ওর সন্তান সাড়ে তিন বছরের। আমরা দাদা-দাদি এসেছি মূলত ওর সান্নিধ্যেই কাটানোর জন্য।

দুই ছেলে, বউমা আর নাতির সঙ্গে আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জন বেশ আছি। তারপরও মনের একটা অংশ পড়ে আছে দেশেই। সব খবরই পাই প্রতিদিন। এখন চব্বিশ ঘণ্টায় দেশে হাজার হাজার মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে, নিম্নবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এসব তথ্য মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। কবে যে দেশে ফিরতে পারব, সেটিও নিশ্চিত করে জানি না।

উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা ভিন্ন পরিচয় রাখতে পেরেছে করোনা মোকাবেলায়। দেশটি অল্প ক্ষতির ভেতর দিয়ে করোনাকে অনেকটাই পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। চলতি মাসের শুরু থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। মাসের পর মাস ঘরবন্দি হয়ে থাকা মানুষের সামনে সুযোগ এসেছে সপ্তাহান্তে পরিবারের সবাই মিলে বেরিয়ে পড়ার। তার মানে এই নয়, সবাই যেমন ইচ্ছা তেমন চলাফেরা করতে পারছে।

সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে মানার নির্দেশ আছে। এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটলেই টহল পুলিশ রীতিমতো জরিমানা করছে নাগরিকদের। তাই সবাই সতর্ক ও সচেতন থাকতে বাধ্য। স্কুল খুলেছে বেশকিছু, পাশাপাশি অনলাইনে পাঠদানও চলছে। এখন শিশুরাও করোনাভাইরাসটি সম্পর্কে বহু কিছু জেনে গেছে শিক্ষকদের কাছ থেকে। বলা যায়, এ বিষয়েও বিশেষ শিক্ষাদান চলছে। তাই শিশুরাও যথেষ্ট সচেতন হয়ে উঠেছে।

একটি উদাহরণ দিই। আগেই বলেছি, আমাদের নাতির বয়স সাড়ে তিন। সে নিয়মিত ডে-কেয়ার সেন্টারে যায়। আমরা বাইরে বেরোনোর সময় সে আমাদের সাবধান করে দেয় বাইরে যেন কোনো কিছু স্পর্শ না করি। এমনকি বাসায় ফিরে আসার সময় গাড়িতে ওঠার পর হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কথাও সে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। এ থেকেই অনুমান করা যায়, এ অল্প বয়সেই তাকে সচেতন করে তুলেছেন তার শিক্ষক।

এ থেকে সেখানকার শিক্ষার মান সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব। এখানে চাইনিজ, লেবানিজ ছাড়াও প্রচুর ভারতীয় ও বাংলাদেশি পরিবারের সন্তানরা স্কুল-কলেজে পড়ে। আমাদের পরম গৌরবের বিষয় হল বরাবরই এখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে ভালো ফল অর্জন করছে। লক্ষ করে দেখেছি, কোনো একটা কারণে এখানে লেবানিজরা খুবই অপ্রিয়।

এখানে সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ বিষয়ে কিছু না বললেই নয়। অপেক্ষাকৃত নির্জন রাস্তার মোড়ে ‘স্টপ’ লেখা থাকে গোলাকৃতি বোর্ডে। পুলিশ থাকুক না-থাকুক, ওসব জায়গায় গাড়ি থামানো বাধ্যতামূলক। না থামালে ৩৫০ ডলার জরিমানা করার বিধান রয়েছে। অসাবধানতাবশত আমি সমস্যায় পড়েছিলাম। থামার সংকেত আমি দেখতে পাইনি, তাই গাড়ির গতি কমেনি।

গাড়ি যথারীতি এগোতে থাকে। হঠাৎ সাইরেনের শব্দে সচকিত হই। তাকিয়ে দেখি পুলিশ আমাকে গাড়ি থামানোর সংকেত দিচ্ছে। বুঝতে পারলাম না কী ভুল করেছি, তাই কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। রাস্তার পাশে গাড়ি থামালাম। পেছনে পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে এলেন রণসজ্জায় সজ্জিত এক সুদর্শনা। ওই পুলিশ কর্মকর্তা এসে আমার কাছে দাঁড়ালেন।

আমি একপলকে দেখে বুঝতে চাইলাম তার ইউনিফর্মে কী কী যন্ত্রপাতি রয়েছে। কোমরে পিস্তল ছাড়াও আছে ওয়াকিটকি সেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করার জন্য বিশেষ যন্ত্র, শ্বাস পরীক্ষা করার জন্য ব্রেথালাইজর (মাদক সেবনকারী চালকদের ধরার জন্য), কোমরে বেল্টের সঙ্গে ঝুলছে হাতকড়া এবং টর্চলাইট, স্টপওয়াচ ছাড়াও আনুষঙ্গিক যন্ত্র। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম কথাবার্তা রেকর্ড করার জন্য বুকের কাছে সাঁটা রয়েছে ছোট্ট একটা টেপ রেকর্ডার।

প্রথমেই রূপসী পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্ন : তুমি কি ভুল করেছ? আমি তো জানি না কী ভুল করেছি! তাই সংক্ষেপে বললাম, জানি না। তখন পুলিশটি আমাকে বুঝিয়ে বললেন আমার কী ভুল হয়েছে। আমার লাইসেন্স দেখলেন তিনি, শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করতেও ভুললেন না। তারপর আমার টেলিফোন নম্বরসহ ঠিকানা লিখে নিলেন। বউমা আমার পাশের সিটেই ছিলেন। তাকেও কিছু রুটিন প্রশ্ন করা হল।

সব মিলিয়ে প্রায় দশ মিনিট লাগল ধৈর্য নিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। আমিও তার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিলাম গুছিয়ে। মনে হল আমার উত্তর তাকে সন্তুষ্ট করল। সুযোগ বুঝে আমি অনুরোধ করলাম আমার এ অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যেন আমাকে জরিমানা না করা হয়। ছোট্ট প্রত্যুত্তর পেলাম- ‘দেখি, কী করতে পারি।’

সাধারণত দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে জরিমানার কাগজ চলে আসে ঠিকানায়। কিন্তু এরই মধ্যে চার সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও সেই কাগজ এসে পৌঁছায়নি। এ কথা বলার উদ্দেশ্য হল, জরিমানা মওকুফের জন্য আমি কোনো অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করিনি, পুলিশকে উৎকোচ দিইনি। সম্ভবত কর্তব্যরত পুলিশ নিজেই অনুধাবন করেছেন, ভুলটি ছিল আমার অনিচ্ছাকৃত। তাই সেটি ক্ষমার জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।

আমার ধারণা, এখানেই আমাদের দেশ এবং একটা উন্নত দেশের মধ্যে পার্থক্য। স্বদেশে ঘুষ সংস্কৃতি বজায় রেখেছে উভয় পক্ষই। তাছাড়া সিস্টেমও অনেক সময় নাগরিককে বাধ্য করে থাকে আইনের পথ এড়িয়ে কার্যসিদ্ধির জন্য। যা হোক, একটি জাতির সার্বিক উন্নতি তো আপনা থেকে হবে না। এ জন্য প্রত্যেককেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। সাধারণত শৈশব থেকেই শিক্ষাদান খুবই কার্যকর হয়ে থাকে।

ওই যে বলছিলাম, এখানে ডে-কেয়ার থেকেই একটি শিশু সময়োপযোগী সামাজিক শিক্ষা পায়। আমরা আবেগপ্রবণ জাতি। কথায় কথায় বলি, আমি দেশকে ভালোবাসি; কিন্তু দেশকে ভালোবেসে আমরা দেশের জন্য কী অবদান রাখি? কতটুকু আত্মত্যাগ করতে পারি?

এটা সত্যি, প্রাথমিকভাবে অস্ট্রেলিয়া করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে বড় সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু ইদানীং আবারও কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এখানকার সরকারও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। এখানকার অনেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অস্ট্রেলিয়া এখন করোনা জয়ের পাশাপাশি ভাইরাসটির সঙ্গে সহাবস্থান করে তাকে মোকাবেলা করার কৌশল অবলম্বন করেই এগোতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে। সব ধরনের সাবধানতা অবলম্বন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ব্যবসা-বাণিজ্য খুলছে।

এখানে আদিবাসীর সংখ্যা অনেক, তারা প্রায়ই সমাবেশও করে। বিএলএম অর্থাৎ ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার মুভমেন্ট বেশ জোরালো। চলতি মাসেই সিডনিতে ১০ হাজারেরও বেশি অস্ট্রেলিয়াবাসী এমন সমাবেশে যোগ দিয়েছিল বলে অনলাইন নিউজে পড়েছি। সম্প্রতি আমেরিকায় পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে ওই সমাবেশ হলেও বছর পাঁচেক আগে অস্ট্রেলিয়ায় পুলিশের হেফাজতে নিহত ডেভিড ডুঙ্গয়ে জুনিয়র হত্যার প্রতিবাদও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। বিক্ষোভের মাত্র ১৫ মিনিট আগে সমাবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন আদালত।

কোর্ট অব আপিল রায় দেন যে, এ র‌্যালি আইনত বৈধ। এর মানে হল, প্রতিবাদকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করতে পারবেন। বড় সমাবেশে অংশ নেয়ার ফলে কোভিড-১৯ নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের জন্য তারা ফৌজদারি অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন না। যা হোক, এসব সমাবেশের কারণে বড় আকারে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই এখানকার সরকার এসব নিয়েও বর্তমানে বেশ উদ্বিগ্ন।

কাজী এমদাদুল হক : বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা; বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিমরাড)-এর মহাপরিচালক

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত