করোনা গবেষণা ও বাজেট

  ড. মো. মামুনুর রশীদ ৩০ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে একবার ব্রিটেনের রানী অস্ট্রেলিয়া সফরে যান। বিশেষ সম্মানে রানীকে অস্ট্রেলিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান, বিশ্ববিদ্যালয়, কিছু খামার ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দেখানো হয়। এক গৃহপালিত পশু খামারে গিয়ে তিনি দেখলেন, ডিবির মতো অচল সাদা সাদা স্তূপের সারি।

জিজ্ঞেস করলে খামারি ডিবির স্তূপে খোঁচা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তা সচল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল; লম্বা সাদা ঝাঁকড়া লোমবিশিষ্ট ভেড়ার পাল। তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন এ দৃশ্য দেখে। মনে মনে ভাবলেন তার দেশে কীভাবে এ জাতের ভেড়া জন্মানো যায়। দেশে ফিরে রানী গবেষকদের ডাকলেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে গবেষণার বর্তমান বিষয়গুলো শুনলেন এবং বললেন তার মনের অভিপ্রায়ের কথা।

রানী বললেন, ‘আমি চাই আমার দেশের ভেড়ার গায়ে অস্ট্রেলিয়ার ভেড়ার লোম’। এতে যা খরচ হবে তা আমি ব্যবস্থা করব। গবেষকরা রানীর কথায় মুগ্ধ হলেন। শুরু হল গবেষণা। গবেষকরা ব্রিটেনের ভেড়ার জাতে অস্ট্রেলিয়ার ভেড়ার লোম বৈশিষ্ট্যগুণ বহনকারী জিন স্থানান্তর করলেন। এতে লম্বা ঘন সাদা লোমবিশিষ্ট ভেড়ার জাত উদ্ভাবিত হল। ব্রিটেন পেয়ে গেল তাদের কাঙ্ক্ষিত লম্বা ঘন সাদা লোমবিশিষ্ট ভেড়ার জাত।

এতে শীতের পোশাকশিল্পে পরিবর্তন এলো। ব্রিটেনবাসী সমৃদ্ধ হলেন পোশাকশিল্পে। টিউলিপ ফুলের দেশ হল্যান্ড। ডাচ ইতিহাসে জানা যায়, টিউলিপ ফুলে ইতিবাচক ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা; এতে জিনগত পরিবর্তনে ফুলের পাপড়িতে কাঙ্ক্ষিত বর্ণবৈচিত্র্য আসে আর তা রফতানি করে হল্যান্ড অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। অন্যদিকে আমরা ভুলে যাইনি ভাইরাস ঘটিত রোগ এইডসের ভয়াবহতার কথা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নে তথা মানবসভ্যতায় এর ক্ষতিকর প্রভাব।

প্রাচীন ধারণায় দেবতাদের অসন্তুষ্টির কারণে রোগবালাই হতো বলে জানা যায়। কালক্রমে লব্ধ জ্ঞান, জ্ঞানের উৎস গ্রন্থ ও গবেষণার মাধ্যমেই প্রকৃত রোগের কারণ উৎঘাটিত হয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে নুতন নতুন জ্ঞান তৈরি হয়। প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণার বিকল্প নেই। এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কিছু গবেষণায় হঠাৎ কাকতালীয়ভাবে অভাবনীয় সাফল্য আসে। বেশির ভাগ গবেষণায় দীর্ঘসময় লাগে প্রকৃত ফল পেতে।

কৃষি সংক্রান্ত গবেষণাগুলোয় জলবায়ু ও আর্থসামাজিক বিষয়গুলো ভাবনায় থাকে। কিছু গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে টেকসই হয় অর্থাৎ যে কোনো দেশেই তা হতে পারে, যা সারা বিশ্বেই ব্যবহার উপযোগী হয়। জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত গবেষণা বিশ্বের যে কোনো দেশে হলেই সব দেশেই তা ব্যবহার উপযোগী হয়। এজন্যই গবেষণায় রিভিউ স্টাডি করতে হয়। এ প্রচেষ্টা থেকে আমরা গবেষণার মৌলিক বিষয়গুলো জানতে পারি।

জানতে পারি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণার বর্তমান অগ্রগতি, পদ্ধতি ও তার ফলাফল। এতে গবেষণার ভিত্তি তৈরি হয়। গবেষণা প্রবন্ধে- একটি আদর্শ শিরোনাম, সংশ্লিষ্ট গবেষকদের নাম, সারসংক্ষেপ, গুরুত্ব ও উদ্দেশ্যে, গবেষণায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় উপকরণ ও বিশ্লেষণযোগ্য পদ্ধতি, ফলাফল ব্যাখ্যা, আলোচনায় যুক্তি ও সমর্থন এবং তথ্যপঞ্জি সন্নিবেশিত থাকে, যা অনুধাবনযোগ্য এবং তা ভালো মানের জার্নালে প্রকাশিত হতে হয়।

আমরা অনেক সময় সাধারণ আলোচনায় বলে থাকি, আমি গবেষণা করে এটি পেয়েছি। প্রকৃতপক্ষে সেটি তার নিজস্ব চিন্তাভাবনার প্রতিফলন। এটিকে গবেষণা বলা যাবে না। এমনকি তথ্য অনুসন্ধান বা তথ্যবিশ্লেষণও গবেষণাপত্র নয়। যে কোনো দেশের বাজেট প্রণয়ন ও তা উপস্থাপনও গবেষণাপত্র নয়। সব প্রকল্পই গবেষণা নয়, তবে কোনো কোনো প্রকল্পে গবেষণা থাকতে পারে।

গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকে যেখানে অনেক সময় ও সাধনার প্রয়োজন হয়। গবেষণার প্রয়োজন নির্ণীত হয় কতগুলো মানদণ্ডের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় জাতীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন। সাধারণ নীতিমালায় গবেষণার দুটি উদ্দেশ্য- ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও সমাজ উন্নয়নের চাহিদা পূরণ করা। এজন্য তাড়াহুড়া করে গবেষণা হয় না। আর তাড়াহুড়া ও দ্রুত কাজ করা এককথা নয়। গবেষণার কাজ দ্রুত হতে পারে, তবে তাড়াহুড়া করে নয়। প্রকৃতপক্ষে অবাধ তথ্যপ্রবাহে অনেক সুবিধা তৈরি হলেও আমরা নানাভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি।

তাড়াতাড়ি ফলাফল পেতে চাই তা যেনতেনভাবেই। গবেষণায় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকবে এবং তা গবেষককেই অর্জনযোগ্য করতে হবে। এতে গবেষণার পরিবেশ, ধৈর্য, সময় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা দরকার হয়। একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে একাধিক স্থানে গবেষণায় অনর্থক সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় হয়। সেক্ষেত্রে দলবদ্ধভাবে বা টিমওয়ার্ক হওয়া উত্তম। আর গবেষণা প্রতিষ্ঠান হওয়া বাঞ্ছনীয় স্বাধীন, যাতে চাপ না থাকে প্রশাসনিক ক্ষমতার আবশ্যকতার প্রশ্ন তুলে।

গবেষণার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতার ধারণা কাজে সংকট না কমিয়ে বরং নানাভাবে বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষাও বিপর্যয় ডেকে আনে এবং অনর্থক হয়ে পড়ে যদি সেটি সংশ্লিষ্ট কর্মভিত্তিক না হয়। দেশ তার অহেতুক কর্মদক্ষতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মহীন উচ্চশিক্ষার চেয়ে অল্প শিক্ষা; কিন্তু কর্ম আছে- এমনটি হলে ভালো।

এবার সরকার করোনাবিষয়ক গবেষণায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এখন আমাদের দরকার রাষ্ট্রীয় চাহিদা নিরূপণে সরকার ও দায়িত্বশীল গবেষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আমাদের যা দরকার, তা নিয়ে কাজ করা, প্রয়োজনভিত্তিক গবেষণা করা যেখানে ইচ্ছুক প্রবীণ গবেষকরা থাকবেন গাইড হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে কর্মসম্পাদনের জন্য দরকার তরুণ শিক্ষার্থী, যারা উচ্চশিক্ষার জন্য গবেষণা করবেন।

গবেষণায় গাইড ও কর্মী শিক্ষার্থী ছাড়া সুষ্ঠু গবেষণা সম্ভব নয়। গবেষণায় নৈতিকতা রাখতে হলে নিজেকেও নৈতিক হতে হয়। নবীন শিক্ষার্থীদের থাকে অনন্ত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। এ স্বপ্ন পূরণের শক্তিই তার সফলতা। নিরলস প্রচেষ্টার মূল্য হয়তো অর্থ দিয়ে পূরণীয় নয়, তবে তার ফলাফল অমূল্য সম্পদ হিসেবে পরিবারসহ দেশকে সমৃদ্ধ করে। সেক্ষেত্রে এ শিক্ষা কার্যক্রমে তরুণদের সম্পৃক্ত রাখা যাতে তারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে তাৎক্ষণিকভাবেই অর্জনকে ব্যবহার উপোযোগী করে।

এমতাবস্থায়, কোভিড-১৯ সংক্রান্ত গবেষণায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বিষয়, হতে হবে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিরূপণ করা। বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী, সেরা গবেষণার বিষয়গুলো নির্ধারণে নূতন প্রজন্মকে কাজে লাগাতে হবে। গবেষণা প্রকল্প তৈরিতে শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যার ওপর সীমাবদ্ধ না রেখে সুদূরপ্রসারী হওয়া দরকার। কারণ হিসেবে কোনো কোনো সমস্যা সাময়িক বা কম দীর্ঘায়িত হয়।

সমস্যা দূরীভূত হলে ভুলে যায় অনেকে। কোভিড-১৯ অপেক্ষাও বেশি ক্ষতিকর রোগ আছে। যদিও সেগুলো প্যানডেমিক নয়; কিন্তু এনডেমিক অর্থাৎ সব সময়ই অধিক ক্ষতিকর। কাজেই অন্যান্য রোগের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক গবেষণা প্রয়োজন আছে।

গবেষণা বাস্তবায়নের জন্য তিন ধরনের প্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে নিম্নরূপ গবেষণার বিষয়গুলো উদাহরণ হিসেবে নেয়া যেতে পারে। কিছু কিছু হাসপাতাল সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করতে পারে। যথা : ১. আয়, স্বাস্থ্য ও রোগের লক্ষণসহ তীব্রতার সম্পর্কে ২. পুষ্টি, জীবনযাপন পদ্ধতি ও রোগের তীব্রতা সম্পর্কে ৩. রোগের বিস্তার প্রকৃতি ও ৪. অন্যান্য রোগের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক ইত্যাদি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের বিষয়গুলো হল- ১. ভাইরাসের গাঠনিক প্রকৃতি ২. শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া ও অ্যান্টিবডি উৎপাদন ৩. হোস্ট-ভাইরাস আন্তঃক্রিয়া ৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ধরন ৫. ভাইরাসের রেপলিকেশন ৬. জেনেটিক রিকম্বিনেশন ৭. ভাইরাসের ভিরুলেন্সি ৮. ভ্যাক্সিন সংক্রান্ত ইত্যাদি।

সামাজিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিষয়গুলো হল- ১. স্থান-কালে বিস্তৃত মহামারী ও ইসলামী দর্শন নিরীক্ষণ ২. কোয়ারেন্টিন, লকডাউন এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক নিরূপণ ৩. এ রোগের সঙ্গে নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ ৪. রোগ থেকে আত্ম-মুক্তি ও দুঃখ প্রসঙ্গ ৫. রোগের নিরীক্ষণে মানুষের চেতনা ও অস্থিতিশীলতার নিত্য বিশ্লেষণ ৬. মানুষের জ্ঞান, অজ্ঞতা, কামনা ও যথার্থতা ইত্যাদি সম্পর্কভিত্তিক সামাজিক গবেষণা

গবেষণাগুলো বিষয় অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে হতে পারে। যেমন- ৩-৬ মাসের, ১২ মাসের ও ১-২ বছরের গবেষণা। গবেষণার ধরন ছোট হতে পারে; কিন্তু তা হবে সঠিক ও প্রয়োগযোগ্য। গবেষণার নেতিবাচক ফলও যদি প্রামাণ্যভিত্তিক হয়, তা এড়ানো ফলটিও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ ভুল ফলাফল নিয়ে আর গবেষণা নয় এবং তা প্রয়োগযোগ্যও নয়। এটিও এক ধরনের অর্জন।

উপসংহারে বলা যায়, গবেষণা সংক্রান্ত জ্ঞান, প্রমাণ ও উজ্জ্বল গ্রন্থপঞ্জি অনুসরণ করে অনেক ভালো কিছু করা সম্ভব বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। ভাইরাস নিয়ে দেশে ও বিদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমার এ ক্ষুদ্র উপস্থাপন। দেশের মানুষের উপকারে লাগুক- এ আমার একান্ত প্রত্যাশা।

ড. মো. মামুনুর রশীদ : প্রফেসর, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত