স্বদেশ ভাবনা

পাটকলে জাতীয় স্বার্থ যেন অক্ষুণ্ন থাকে

  আবদুল লতিফ মন্ডল ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর পরিচালন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মর্মে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

তবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো সরকারি-বেসরকারি (পিপিপি) অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে নাকি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হবে, সে প্রশ্নে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও এসব পাটকলের প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে সব পাওনা পরিশোধ করে বিদায় (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এদিকে এসব পাটকলের শ্রমিকরা সরকারের এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ পাটকলের মালিক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এক তথ্য মোতাবেক, পাটশিল্পে মোট তাঁতের আনুমানিক ৬৮ শতাংশের মালিক ছিলেন তারা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানি পাটকল মালিকরা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় এসব পাটকল রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। বেসরকারি খাতে পাট ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে পাট রফতানির একচেটিয়া কর্তৃত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ পাট রফতানি সংস্থাকে। অভ্যন্তরীণভাবে পাট কেনা ও পাটপণ্য উৎপাদনের একচেটিয়া দায়িত্ব বর্তায় ৮২টি পাটকল নিয়ে গঠিত সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) ওপর; কিন্তু সংস্থাটি প্রায় জন্মলগ্ন থেকে লোকসানে রয়েছে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, গত দু’দশকে একমাত্র ২০১০-১১ অর্থবছর ছাড়া অবশিষ্ট সব অর্থবছরে সংস্থাটি লোকসানে রয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে সংস্থাটির মুনাফার পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরের লাভ-লোকসানের তথ্য পাওয়া যায়নি।

তার আগের ৫ অর্থবছরে অর্থাৎ ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭২৬, ৬৫৬, ৪৮১, ৪৯৭ ও ৫৭৩ কোটি টাকা। ১৯৭৫-পরবর্তী সরকার বিজেএমসির পাটকলগুলোর বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু করে, যা পরবর্তীকালে অব্যাহত থাকে। বেসরকারি খাতকে পাট ব্যবসার অনুমতি দেয়া হয়। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতে পাটকল ও পাট ব্যবসা চালু রয়েছে।

বর্তমানে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন পাটকলের সংখ্যা ২৬টি। আর জুট স্পিনিং মিলসহ বেসরকারি খাতে পাটকলের সংখ্যা দু’শর ওপরে। আর বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর ভাষায়, ‘দেশের পাট খাতে ব্যক্তি খাতের অংশ এখন ৯৫ শতাংশ। মাত্র ৫ শতাংশ আমাদের সরকারি মিলগুলোর’। তবে এখন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর গুরুত্ব হ্রাস পেলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা পাট খাতই ছিল দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত।

সরকারের দ্বিমুখিতা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর বর্তমান অবস্থার জন্য অনেকটা দায়ী। সরকার আগে এগুলো চালু রাখতে আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, আর এখন ‘পিপিপি বা বিকল্প উপায়ে চালু’ রাখার কথা বলছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘পাট শিল্পের গৌরব পুনরুদ্ধার’ প্রসঙ্গে বলেন, বিজেএমসিকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে মিলগুলোর সুষমকরণ, আধুনিকায়ন, প্রতিস্থাপন ও বিস্তার (বিএমআরই) করার জন্য চীন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্বাক্ষর করা হয়েছে এবং রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিজেএমসিকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে মিলগুলোর বিএমআরই করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ক্রমাগত লোকসানে থাকলেও সেগুলোর ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যস্থাপনা সম্পর্কে দিকনির্দেশনামূলক কোনো প্রস্তাব বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় রাখেননি। বরং ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তিনি পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি বৃদ্ধিতে আনন্দ প্রকাশ করেছেন এবং আগামীতে পাটের সুদিন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এখন অনেকটা হঠাৎ করেই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ‘বন্ধের’ সিদ্ধান্ত নেয়া হল।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ক্রমাগত লোকসানের জন্য যেসব কারণকে দায়ী করা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিজেএমসির ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পেশাদারি দক্ষতার অভাব, স্থায়ী শ্রমিকের আধিক্য, সময়মতো কাঁচা পাট কিনতে না পারা এবং পাট কেনায় দুর্নীতি, সংস্কারবিহীন পুরনো যন্ত্রপাতি, পাটপণ্যে বৈচিত্র্যের অভাব এবং সিবিএ-র দৌরাত্ম্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের মতো পরবর্তী সময়েও ব্যবসা-বাণিজ্যে অনভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তাদের বিজেএমসির টপ ম্যানেজমেন্টে নিয়োগের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ পর্যায়টিতে পেশাদারিত্বের অভাব রয়ে গেছে।

পাট কেনায় সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় এবং সরকারি অর্থ পেতে দেরি হওয়ায় সংস্থটি খুব কম সময় বাজার থেকে গুণগত মানসম্পন্ন পাট কিনতে পেরেছে। ফলে উৎপন্ন পণ্যের মান আশানুরূপ হয়নি। সরকার থেকে পাটকলগুলো বিএমআরই করার কথা একাধিকবার বলা হলেও বাস্তবে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে সংস্থাটির সিবিএকে ব্যবহার করেছে।

স্থায়ী প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায়ের পর এসব পাটকল কীভাবে চালু করা হবে, সে প্রশ্নে অস্পষ্টতা রয়েছে। সার্বিক বিষয়টি নিয়ে ২৫ জুন অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী বলেছেন, ‘আগে মিলগুলোকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। আমরা বিক্রি না করে জুটমিল রাখব। এমন ম্যানেজমেন্ট দেব যাতে লোক ছাঁটাই না হয়। এ শ্রমিকরা এখানেই চাকরি পাবেন। কারণ, দক্ষ শ্রমিক ছাড়া মিল চালাতে দেয়া হবে না। মিলগুলো বুঝে পাওয়ার পর টেন্ডার করা হবে। যে বেশি দেয় তাকে দেয়া হবে।’ অবশ্য তিনি এ-ও বলেছেন, ‘পিপির মাধ্যমে জুটমিল থাকবে, এটা ডিসাইডেড।’

এদিকে তিনি যুগান্তরকে বলেছেন, পাটশিল্পে সরকারের লোকসান ঠেকাতে পাটকলগুলোর স্থায়ী শ্রমিকদের দেনা-পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, পরে এগুলো পিপিপি বা বিকল্প উপায়ে চালু করা হবে। আপাতত পাটশিল্পের লোকসান কমাতে এ পথেই যেতে হচ্ছে (যুগান্তর, ২৭ জুন)। এতে বোঝা যায়, ‘বন্ধ’ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো চালুর ব্যাপারটি এখন পর্যন্ত ধোঁয়াশাপূর্ণ।

এদিকে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২৯ জুন শ্রম প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসরে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্ত মানা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন শ্রমিক নেতারা।

রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারি দলের সমর্থক জাতীয় শ্রমিক লীগের নেতারা সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিলেও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এক বছর সময় চেয়েছে সিবিএ ও নন-সিবিএ সংগ্রাম পরিষদ। এতে মনে হয়, সরকারপক্ষ সহানুভূতিশীল মনোভাব নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেলে সমস্যাটির সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে লোকসানি অবস্থা থেকে লাভজনক অবস্থায় নিয়ে যেতে এগুলোর পরিচালন ব্যবস্থাপনা পিপিপিতে ন্যস্ত করাই সমীচীন হবে। ইতোমধ্যে পরিবহন খাত, অর্থনৈতিক জোন, পর্যটন খাত, স্বাস্থ্য খাত, আবাসন ও নগরায়ণ খাত, শক্তি খাত, শিক্ষা খাত, শিল্প খাতে ৫৬টি প্রকল্প পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য নেয়া হয়েছে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯)।

তবে এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ হয় এবং রাজনৈতিক বিবেচনা যেন প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক কথায়, জাতীয় স্বার্থ যেন কোনোভাবে ক্ষুণ্ন না হয়। বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আইন ও প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন্স ফর পিপিপি প্রজেক্টস-২০১৮ যথাযথভাবে অনুসরণ করে পিপিপির মাধ্যমে দুর্দশাগ্রস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো চালু রাখা হোক- এটাই সময়ের দাবি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাত অবদান রাখুক।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত