ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস

ধাবমান শতবর্ষ পানে

  ড. সুকোমল বড়ুয়া ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯তম প্রতিষ্ঠাবাষির্কী। দেশের এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের বয়স আগামী বছর একশ’ বছর পূর্ণ হবে এবং তা উদ্যাপনের প্রস্তুতিও চলছে নানাভাবে। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, যার ঋণ কখনও শোধ করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমি গর্বিত।

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ দীর্ঘদিন স্থবির ও প্রাণহীন হয়ে আছে। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বত্র। আজ প্রতিষ্ঠাবাষির্কীতে যেখানে ছাত্রছাত্রী ও অতিথিদের সরব উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মুখরিত থাকার কথা, নানা সাজে ও রং-বেরঙের ফেস্টুনে প্রাণবন্ত থাকার কথা; সেখানে এ ক্যাম্পাস নীরব-নিস্তব্ধ। তবে মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামান তার এ বছরের সিনেটের বার্ষিক অধিবেশনে (১৪ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনসহ বছরের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক এ অধিবেশনটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা ও সংগ্রাম অনেক দীর্ঘ। নাথান কমিটির মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১২ সালের ২৭ মে বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানকে সভাপতি করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। মূলত এর দাবি ওঠে আরও আগে, ১৯০৫ সালে। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর, ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি, ১৯১৭ সালের ৬ জানুয়ারি, ১৯২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ও ১৮ মার্চ এবং সর্বশেষ ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ- এ বছর ও তারিখগুলো ছিল ঢাকা বিশ্ব^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ অঞ্চলের, বিশেষ করে তখনকার পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উচ্চশিক্ষার আলোয় আনার জন্য এবং তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন পূর্ব বাংলার তিন ক্ষণজন্মা ব্যক্তি- নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং বাংলার বাঘখ্যাত শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক।

প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটেনের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ডের আদলে এবং প্রাচীন নালন্দার কনসেপ্টে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছিল বলেই একে বলা হয়ে থাকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। তখনকার ছাত্র-শিক্ষকরাও ছিলেন সেরকম। এখনও সেই ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা আছে।

১৯২১ সালের ১ জুলাই দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর একটি একটি করে বছর পার হয়ে আজ নিরানব্বই পেরিয়ে শতবর্ষে পা রাখল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠা-পূর্বের সময়টি যদিও বেশ কষ্টের ও বেদনার ছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমাদের অর্জন ও প্রাপ্তি ছিল বেশ গৌরবের ও মর্যাদার। জ্ঞানার্জন, জ্ঞান বিতরণ, নানা সৃষ্টি, আবিষ্কার এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনন্যসাধারণ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সব যৌক্তিক আন্দোলন-সংগ্রামের পথপ্রদর্শক ও নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে আসছে। কোনো সংকট ও আন্দোলনে দেশের জনসাধারণের দৃষ্টি থাকে এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি।

দেশের সব বড় অর্জন ও গৌরবের অংশীদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আজও অম্লান। ঐতিহাসিক বটতলা, আমতলা, মধুর ক্যান্টিন, ডাকসু, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য, অপরাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, রাজু ভাস্কর্য, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ, ফ্যাকাল্টি, ইন্সটিটিউট, হল, ছাত্রাবাস, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্যুরো ইত্যাদি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবের স্বাক্ষর বহন করছে। বিদ্যা ও জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি খেলাধুলা, সংগীত, বিতর্ক, নাটক ইত্যাদি কর্মকাণ্ডেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এবং দেশের সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ও শীর্ষস্থানীয় পদগুলোয় যারা অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং রয়েছেন, তাদের অনেকেই একসময় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। মেধা, মনন, যোগ্যতায় দেশের সর্বপ্রাচীন ও সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অতীতের সুনাম ধরে রেখেছে। আগামীতেও ধরে রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।

তবে উচ্চশিক্ষায় মানুষ আলোকিত হয় এবং জ্ঞান-গরিমা ও মূল্যবোধে অনেক বড় হয়। সেই জায়গাটিতে বোধহয় এখনও আমাদের কর্মকাণ্ড কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে। জাতি এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। সেই প্রত্যাশা পূরণে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব এবং আরও বেশি সচেতন, বিদ্যা ও গবেষণামুখী এবং নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন হব-এটাই কাম্য।

প্রতিবছরের মতো আবারও বলছি- সৌন্দর্যবর্ধন ও বাইরের মানুষের পরিচিতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চারদিকে দেয়ালসহ আরও চারটি তোরণ তৈরি করা উচিত, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে সুরক্ষিত। আজ প্রতিষ্ঠাবাষির্কীতে উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও অভিবাদন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অমর হোক। বিশ্বে মানবতা প্রতিষ্ঠিত হোক।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত