মানুষ ও বসতির সামাজিক দূরত্ব সংকট

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম ০৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু রাজধানীর দালান-বস্তির কথা নাই বা বললাম। ঢাউস অট্টালিকার মাথা উঁচু করার প্রবণতা এখন দেশের সব বড় শহর ছাড়িয়ে জেলাগুলোয়ও দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর আশপাশের সব উপজেলায় বিভিন্ন কারখানা সম্প্রসারিত হওয়ায় বসতবাড়ির চাহিদা ও ভাড়া দুটিই বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তিলমাত্র জায়গা ছাড় না দিয়ে গড়ে উঠেছে উঁচু উঁচু দালানকোঠা।

নাগরিক সুবিধার ধার না ধেরেই এমন অনেক দালানে গড়ে উঠেছে দোকান, অফিস, মেসবাড়ি। কোথাও এর কোল ঘেঁষেই গজিয়ে উঠেছে ঝুপড়ি ঘর, বস্তি। এগুলোর জন্য আলাদা জোন থাকার কথা সব সময় বলা হলেও একই জোনে সবাই থাকে- সবকিছু পাওয়া যায়।

এতদিন এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন হলেও ততটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। করোনার আতঙ্ক চতুর্মুখী সমস্যা সৃষ্টি করায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। আমার এক পরিচিতজনের পাশের বাড়িটি সাত তলাবিশিষ্ট একটি বৃহৎ মেস। নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ স্বল্প ভাড়ায় সেখানে বসতি গেড়েছেন। কোনো কোনো তলায় এক কক্ষে চার-পাঁচটি বেড। তবে প্রতি বেডে ডাবল করে ঘুমানোয় এক কক্ষে থাকেন অনেকজন। টয়লেট স্বল্পতা, রান্না করার সংকট তো আছেই। ওদিকটা না ভেবে শুধু ভাবতে অবাক লাগে- করোনা সংকট মোকাবেলায় যে ধরনের ব্যক্তি-দৈহিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বারবার বলা হচ্ছে, সেটা তাদের জন্য পালন করার চিন্তা করাটাই অবান্তর। এর ওপর পাশের বাড়িতে সংক্রমণ চিহ্নিত হওয়ায় লকডাউন জারি করা হয়েছে। সেটা আরও উঁচু।

দুই বিল্ডিংয়ের মধ্যে দৈহিক দূরত্ব খুব কম। যখন পাশের বাড়িটা বানানো হয়নি, তখন এখানে জানালা খোলা রেখে প্রাকৃতিক বাতাস খেয়ে বিছানায় ঘুমানো যেত। পাশের বিল্ডিং দুই ফুট উঁচু করে ফ্লোর তৈরি করায় ওই বাড়ির জানালা থেকে এই বাড়ির বেডরুম দেখা যায়। তাই চব্বিশ ঘণ্টাই জানালা বন্ধ রাখতে হয় অথবা ভারি পর্দা টানিয়ে রাখতে হয়। ডাবল পর্দা ছাড়া এদের বেডরুমে আলো জ্বালানোই মুশকিল।

কয়েকটি ফ্লোরে উচ্চ বেতনভোগী কিছু চাকরিজীবী পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। তাদের ছোট সন্তানরা আগে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাত, কথা বলত। এখন করোনার ভয়ে ওদের মা বাসার জানালা বন্ধ করে দেয়। তারা এখন সার্বক্ষণিক এসি চালান। এজন্য বিদ্যুৎ বিল বেশি এলেও দেরিতে বিল দেয়া যাবে, এই ভেবে গত তিন মাস বকেয়া বিল দেয়া হয়নি। এজন্য এতদিন ভাবতে হয়নি। কিন্তু ৩০ জুনের মধ্যে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে- ঘোষণা আসার পর দুশ্চিন্তাটা বেড়ে গেল তার।

পাশের বাড়িতে লকডাউন জারি করার পর নতুন চিন্তা দেখা দিয়েছে। ওদের মা টিভিতে শুনেছেন- করোনাভাইরাস নাকি ছয় ফুটের বেশি দূরত্বেও সংক্রমিত হতে পারে। বাতাস দ্বারা সংক্রমিত না হলেও নাকি এরা বাতাসে ১২-১৩ ফুট উড়ে যেতে পারে। ওদের জানালায় কেউ হাঁচি-কাশি দিলে বা কেউ থুথু ফেললে এবং সে সময় তাদের জানালা যদি খোলা থাকে তাহলে কী হবে? নানা চিন্তা ওদের মায়ের মনের মধ্যে। তাই আজকাল বাচ্চারা আর জানালার ধারে যেতে পারে না। এমনকি ওদের ছাদটা পাশের বিল্ডিংয়ের ছদের চেয়ে নিচু হওয়ায় এখন এদের ছাদে খেলতে যাওয়া বারণ। এদিকে বিদ্যুৎ চলে গেলে ভ্যাপসা গরমে ত্রাহি অবস্থা শুরু হয়ে যায়। এ কেমন জীবন যন্ত্রণা!

দাদু আগে ছাদে যেতেন স্টিলের সিঁড়ির হাতল ধরে ধরে একাই। এখন ওই হাতলটা ধরতেই ভয়! স্টিলের মধ্যে নাকি করোনার জীবাণু বেশিদিন বেঁচে থাকে! ঘরে ঢুকে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে তার ভালো লাগে না। এখন হাতল ধরতেই তার গা শিউরে ওঠে! ঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে তার দু’পা ফুলে ঢোল হয়ে উঠেছে। ব্লাড সুগার বেড়ে গেছে। এমন ভীতিকর জীবন যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না তার। তিনি প্রতি রাতেই আক্ষেপ করে বলে ওঠেন- কবে যে ঘর থেকে বের হয়ে পার্কে একটু হাঁটতে যেতে পারব! ঘরের জানালা খুলেও ঘুমাতে পারি না। আমাকে তোরা গ্রামে রেখে আয়, এখানে আর পারি না।

আধুনিক অট্টালিকা গড়ে উঠেছে কবুতরের বাসার খোপের মতো। একটা বিল্ডিং থেকে অন্যটার তেমন দূরত্ব নেই। একটা ভেঙে আরেকটার গায়ে পড়লে বা আগুন লাগলে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢোকার মতো প্রশস্ত রাস্তাও রাখা হয়নি এসব এলাকায়। দাদু বলতে লাগলেন- এরই মধ্যে একদিন সর্দি-জ্বর হওয়ায় বাসার সবাই আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করে বলল- যান করোনা টেস্টটা করিয়ে আসেন। এক সকালে ছেলের গাড়িতে যেতে রাজি হলাম। পথের দৃশ্য তাকিয়ে দেখলাম- দু’মাস পর রাস্তায় গাড়ি নেমেছে। পিঁপড়ার সারির মতো গাড়ির সারি। ফুটপাতগুলোয় মানুষ আগের মতোই ঠেলাঠেলি করে চলাফেরা করছে। ড্রাইভার আমাকে হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে ছেলেকে নিয়ে অফিসে চলে গেল। লাইনে দাঁড়ালাম। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্তি বেড়ে যাচ্ছে।

সেখানে একজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হল। তিনি তাঁতীবাজার থেকে এসেছেন। গতকালও এসছিলেন। সকাল নয়টা থেকে বারোটা পর্যন্ত লইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর জানলেন আজ আর হবে না। আজও অনেক ভিড়। প্রতিদিন দেড়শ’ টেস্ট করা হয়। লাইনে চার-পাঁচশ’ মানুষ দাঁড়িয়ে ভিড় করছে, টেস্ট হবে তো? ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি দূরত্ব কেউই মানছেন না। মনে মনে ভাবলাম, এখন অনলাইনে নাকি সবকিছু করা হয়। তবে টেস্ট করানোর জন্য আগেভাগে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে সিরিয়াল নম্বর দিয়ে শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে ওইদিন টেস্টের জন্য ডাকলেই ঝামেলা চুকে যায়।

এখন লাইনে যারা দাঁড়িয়েছেন তাদের শতকরা ২২ ভাগ করোনায় পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে একজন করোনা নেগেটিভ সুস্থ মানুষেরও তো এভাবে গিজ গিজ করে লাইনে দাঁড়ানোর ফলে সংক্রমিত হওয়ার ভয় রয়েছে। এতটুকু চিন্তাও কি তাদের মাথায় আসছে না? করোনার কথা মাথায় রেখে স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখতে এ বছর স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের ৫ শতাংশ বরাদ্দ দাবি করা হলেও তা সামান্যই বাড়ানো হয়েছে। এতে স্বাস্থ্য খাত এবার গুরুত্বের দিক থেকে আট নম্বর সিরিয়ালে পিছিয়ে গেছে। এবারে ১৩৬ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় কোভিড শব্দটি ৬২ বার ও করোনাভাইরাস শব্দ দুটি ৩৬ বার উচ্চারণ করা হলেও দেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য ও আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ নেই। রোগী ও স্বজনদের করোনা চিকিৎসায় ভোগান্তি ও অপমৃত্যুর জন্য সমবেদনাটুকু জানানোর বা কোনো জবাবদিহিতার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়নি।

বড় শহরগুলোর যে কী হল- অট্টালিকা বানানো হয়েছে ঘেঁষাঘেঁষি করে। মানুষ একজন আরেকজনের গা ঘেঁষেই চলাফেরা করতে অভ্যস্ত। কনুইয়ের গুঁতো, আরেকজনের গায়ের ঘাম মাখামাখি করে বাসায় না ফিরলে নাকি আমাদের অনেকের পেটের ভাত হজম হয় না। এজন্য নাকি আমরা লাইভলি শহরে বসবাস করার খেতাবও পেয়েছি। মানুষকে দলীয় বা পশুর মতো পাল ধরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (হার্ড-ইমিউনিটি) তৈরির জন্য নাকি সবকিছু খোলা রেখে কাজ করার জন্য সীমিত চলাফেরা করতে বলা হয়েছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সীমিত চলাফেরা করে জীবিকা অন্বেষণে টিকতে পারবে না। আবার ‘হার্ড-ইমিউনিটি’ তত্ত্বানুযায়ী তারাই বেশি সংখ্যায় বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমি তো দেখছি এ অসীমের মাঝে মানুষ সীমাহীন চলাফেরা করছে। এভাবে ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আমার ডাক পড়ল। নমুনা দিয়ে দিলাম। ক’দিন পর ফোন করে ফলাফল জানাতে চাইল। ছেলের ড্রাইভারকে ফোন করলে সে কিছুক্ষণ পর আমাকে নিতে এলো।

উপরের কথাগুলো হাঁটার জন্য স্টিলের সিঁড়ি ধরে ছাদে ওঠা ওই বাসার দাদুর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে নেয়া। করোনায় পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের উপার্জন আজ ক্ষতিগ্রস্ত। সংবাদে জানা গেছে, করোনার করাল আক্রমণে ইতোমধ্যে আমাদের দেশে ৯৫ শতাংশ মানুষের উপার্জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের মানুষ বেশি, বাড়িঘরের সংখ্যাও বেশি। গ্রামের অবস্থা অনেকটা সহনশীল হলেও বড় শহরগুলো মানুষের চাপে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। এগুলোর শিল্প ও বস্তি এলাকায় মানুষ ও বসতবাড়ির পারস্পরিক সম্পর্কটা যেন দায়সারা গোছের। এগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বসবাস করা যেমন দুরূহ, করোনা প্রতিরোধ করার জন্য নির্দেশিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাও তত কঠিন।

করোনা রোগের এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। কার্যকর টিকা আবিষ্কারের কথা বহুদিন ধরে অনেকেই শোনাচ্ছেন। সেই জাদুকরী আশার কথা শুনতে শুনতে আশাহত হয়ে অনেকে পরপারে চলে গেছেন। দেশে ইতোমধ্যে দেড় লাখের উপর মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন দুই হাজারের কাছাকাছি। করোনার লক্ষণ নিয়ে মারা গেছেন আরও হাজারের ওপর। করোনা আতঙ্কে মানুষের মন ভেঙে যাওয়ার মধ্যেও অনেক দেশে বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ও দাবি শুরু হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রগুলো করোনা সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটে সারা পৃথিবীর অগণিত মানুষ এখন দিশেহারা। সামনের দিনগুলো আরও ভয়ংকর বলে অনেকে অভিমত দিয়েছেন। অনাগত সেই যুগে করোনার চেয়ে অতি ভয়ংকর কোনো মনো-সামাজিক ব্যাধি বা পরি-সামাজিক দুর্যোগ এলে হয়তো পৃথিবীতে প্রতিবাদ করার মতো কোনো মানুষকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না। তাই এখনও সময় আছে আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিজের মতো করে ভাবি ও মেনে চলি। পাশাপশি, পরিবার, সমাজ ও সমষ্টি- পরিবেশের জন্য যথাযথ উপকার করতে না পারলেও সাধ্যমতো সহযোগিতা করতে সবাই এগিয়ে আসি।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত