আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস

করোনা-পরবর্তী গ্রাম অর্থনীতি

  মো. আবুল খায়ের ০৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজ আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের সব সমবায়ী, সমবায়ের সঙ্গে জড়িত স্টেকহোল্ডারসহ সমবায়ী উৎপাদক এবং ভোক্তাদের জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এ বছর আন্তর্জাতিক সমবায় দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- Cooperatives for Climate Action. এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সমবায় সম্প্রদায়সহ সবাইকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট মোকাবেলা করে সমবায় সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ এ সংকটজনক পরিস্থিতি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে, মানুষ ও গ্রহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে ব্যাহত করছে।

করোনার কারণে সৃষ্ট মহামারী নিয়ন্ত্রণে সরকার মানুষকে ঘরে রাখতে ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধসহ নানারূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আর এ কারণে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়ে পড়েছে স্থবির। পৃথিবী সৃষ্টির পর বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা জটিল রোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রলয়, মহামারী মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। করোনা মহামারীর কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ পৃথিবীর অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা ওলটপালট করে দিয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা চেইন ভেঙে পড়েছে। আগের সব দুর্ভিক্ষের সময় বিশ্বের কোথাও কোথাও এ খাদ্য চেইন ঠিক থাকা সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল। করোনা-পরবর্তী ভঙ্গুর সাপ্লাই চেইনের কারণে বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য চাহিদা পূরণ করা হবে অত্যন্ত কঠিন কাজ। আর এ কঠিন কাজটি সহজ করার ক্ষেত্রে সমবায় অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। করোনা-পরবর্তী দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন বক্তৃতায় গুরুত্বারোপ করেছেন।

দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মোট ৪,৫৭১টি ইউনিয়নে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী সমবায় সমিতি তৈরি করে ওইসব ইউনিয়নের সব আবাদযোগ্য ও অনাবাদী জমি ওই সমিতির মাধ্যমে চাষের উপযোগী করে গড়ে তুলে খাদ্য ঘাটতির নিরসন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে। এজন্য একটি প্রকল্প তৈরি করে তার মাধ্যমে প্রতিটি সমিতিকে একটি করে অফিস বিল্ডিং দেয়া হবে, যা ১০ লাখ টাকার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা পাবলিক ওয়ার্ক বিভাগ সম্পন্ন করবে। এছাড়া সমিতির জন্য একটি প্রজেক্টর ও দুটি কম্পিউটারসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সব জমি চাষাবাদযোগ্য করার জন্য আধুনিক কৃষি যন্ত্রাংশ ক্রয় বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ প্রতিটি সমবায় প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ করা হবে। ওই ইউনিয়নের সব জমির মালিক ও ভোটার ন্যূনতম ১০০ টাকার শেয়ার ও ১০০ টাকার সঞ্চয় বাবদ বাধ্যতামূলক সমিতিতে জমা দেবে এবং সদস্যপদ লাভ করবে। এসব ইউনিয়ন খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতির জন্য অভিন্ন খাতাপত্র, সফটওয়্যার, ওয়েবসাইড ও সাইনবোর্ড প্রজেক্টের আওতায় সরবরাহ করার মাধ্যমে ইউনিয়নের সবাই মিলে একটি আধুনিক সমবায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে। এছাড়াও পরবর্তী বছরগুলোতে যাতে সমবায় প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকতে পারে সে জন্য বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক বরাবর ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল জোগানের ব্যবস্থা করতে পারলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে অতিরিক্ত খাদ্যসামগ্রী বিদেশে রফতানির সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ওইসব সমবায় সমিতির মাধ্যমে গ্রামকেন্দ্রিক উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সরকার যে টাকাটা দেবে তার জন্য ওই সমিতির একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ার সরকার পাবে। এটার প্রতিনিধি হিসেবে ওই নিবন্ধিত সমিতির কমিটিতে দুটি পদ উপজেলার বিভিন্ন দফতরের সরকারি প্রতিনিধি থাকবে, যা সংশ্লিষ্ট জেলা সমবায় অফিস এবং থানা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সমবায় অফিসের মাধ্যমে দেয়া যেতে পারে। নিবন্ধিত সমবায় সমিতিগুলো বাংলাদেশ সমবায় সমিতি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লকডাউন ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। আর এ কারণে বিশ্বের ২৪ কোটিরও বেশি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশেও। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ শ্রমিক রয়েছেন। করোনার কারণে ওইসব দেশে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফেরার জন্য অপেক্ষা করছেন। এসব বিদেশফেরত শ্রমিকের অনেকেই দেশের ভিটেবাড়ি বিক্রি করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন যদি তারা শূন্য হাতে দেশে চলে আসেন তাহলে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। এই বিদেশফেরতদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মৎস্য, কৃষি ও ফলমূল উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার জন্য সরকারি অর্থায়নে সমবায় সমিতি গঠন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে। আর এ কঠিন কাজটি সহজ করার ব্যাপারে সমবায় অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি।

করোনার কারণে কর্ম হারানো বিদেশফেরতদের নিয়ে দেশের ৬৪ জেলায় কো-অপারেটিভ সোসাইটি গঠনের মাধ্যমে তাদের উপকারভোগী নির্বাচন করে ন্যূনতম ৩ শতাংশ সুদে প্রতিজনকে ৩ লাখ টাকা প্রদানের ব্যবস্থা করে ঘূর্ণায়মাণ তহবিল গঠনের মাধ্যমে মৎস্য, কৃষি ও ফলমূল উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এসব বিদেশফেরতকে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা সহজ হবে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অনাবাদী জমি চাষযোগ্য হওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে সমবায়। বিদেশফেরতদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট উপজেলার উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা কো-অপারেটিভ সোসাইটি গঠনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। প্রকল্প সুবিধাভোগীদের ঋণ গ্রহণের ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে মাসিক ভিত্তিতে ঋণ আদায় কার্যক্রম পরিচালনা করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিদেশফেরতদের প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রকল্প দৃশ্যমান করার জন্য কো-অপারেটিভের কাঠামো তৈরিতে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে সমবায়সহ সব সেক্টর ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এদেশের নিবন্ধিত ১ লাখ ৭৭ হাজার সমবায় সমিতির এক কোটির অধিক সমবায়ীর সব কার্যক্রম গত তিন মাস বন্ধ ছিল। এসব সমবায় সমিতির বিভিন্ন উৎপাদন ও বিপণনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে দেশের দুগ্ধ উৎপাদনকারী জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড তাদের সব কার্যক্রম, বিশেষ করে জাতীয় জরুরি খাদ্য হিসেবে দুগ্ধজাত পণ্যসামগ্রী তৈরি ও বিপণন অব্যাহত রেখে দেশের এ সংকটের সময়ে হোম ডেলিভারিসহ পণ্য বিপণন করে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে।

করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সমবায় সমিতিগুলোকে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার জন্য সমবায় অধিদফতর ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল সহায়তা প্যাকেজ প্রণোদনার জন্য পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ বরাবর আবেদন দাখিল করেছে। সমবায় সমিতিগুলো এ সংক্রান্ত প্যাকেজ সহায়তা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্সাসিং স্কিমের আওতায় পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এজন্য সরকার বিভিন্নভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ মহাদুর্যোগে সমবায় সমিতিগুলো তাদের সদস্য ও সাধারণ মানুষকে প্রায় ১০ কোটি টাকা অর্থ সহায়তা প্রদান করেছে। এছাড়াও ব্যক্তি সমবায়ীরা তাদের নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।

করোনা-পরবর্তী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সমবায় অধিদফতর সমবায় পণ্য বাজারজাতকরণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে এবং ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ প্রদানে সহায়তা করার জন্য একটি বৃহৎ প্রকল্প প্রস্তুতির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সমবায় প্রতিষ্ঠান ও সমবায়ীরা এ মহাদুর্যোগ মোকাবেলা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আগের মতো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

মো. আবুল খায়ের : প্রাবন্ধিক, সমবায় অধিদফতরের কর্মকর্তা

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত