অ্যান্টিবডি টেস্ট ছাড়া দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণ কঠিন

  ডা. বুশরা তানজীম ০৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে দেশে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণে শুধু মলিকুলার টেস্ট চালু আছে। এ পদ্ধতিতে রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে সার্স-করোনাভাইরাস-২-এর আরএনএ নির্ণয় করে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করা হয়। এ মলিকুলার টেস্টটি একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং তা সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বায়োসেফটি ২+ ল্যাবরেটরি, দামি ও জটিল যন্ত্রপাতিসহ মলিকুলার বিশেষজ্ঞ জনবলের প্রয়োজন। এসব বিবেচনায় কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের জন্য শুধু অল্প কিছুসংখ্যক ল্যাবরেটরি অনুমোদিত হওয়ায় টেস্টটি করা দুর্লভ ও ব্যয়বহুল। বর্তমানে অনেকেই কোভিড-১৯-এর লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় টেস্ট করার জন্য সিরিয়াল নিতে পারছেন না। আবার টেস্টের নমুনা দেয়ার জন্য সরকারিভাবে এলাকাভিত্তিক বুথের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিচ্ছে। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিএসএমএমইউ বা বুথগুলোর প্রতিটি জায়গায় মানুষের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা বেশ দুরূহ হয়ে পড়েছে। তাই সিজন চেঞ্জের মৌসুমে যখন অনেকেরই ঠাণ্ডা জ্বরের মতো লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, যা কোভিড-১৯-এর লক্ষণগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়, তখন অনেকেই এটা কোভিড-১৯ নাকি সিজনাল ঠাণ্ডা জ্বর- এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে টেস্ট করাতে যেতে চাচ্ছেন না। তারা আশঙ্কা করছেন, সিজনাল জ্বর হলে নমুনা দিতে গিয়ে আবার করোনাভাইরাস নিয়ে না আসেন। আবার বুথ থেকে যেসব নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা থেকে টেস্টের রেজাল্ট পেতে ৩-৭ দিনের বেশি সময় লাগছে। কিন্তু কোভিড-১৯ রোগের চিকিৎসা যদি লক্ষণ প্রকাশের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে শুরু করা যায়, তাহলে রোগের জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সেক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশের পরপরই টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ এলে সেই অনুযায়ী জটিলতা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া যায়, যেমন- রক্ত জমাট বাঁধা রোধে ব্লাড থিনার এবং সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন রোধে অ্যান্টিবায়োটিকসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে রোগীদের জটিলতা কমানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই টেস্ট সংক্রান্ত জটিলতার কারণে টেস্ট না করিয়ে অনেকেই এখন সরাসরি চিকিৎসা পরামর্শের জন্য চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছেন।

বর্তমানে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে আমি আমার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি মেসেঞ্জারের মাধ্যমে মানুষকে ফ্রি চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে আসছি। কোভিড-১৯ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, দেশে চলমান টেস্টের জটিলতা এবং টেস্টের ভোগান্তি মানুষের মনে ক্ষোভ ও ভয়ের জন্ম দিয়েছে। তাই অনেকেই এখন টেস্ট করাতে ইচ্ছুক নন। অনেকেই আবার দেশের কোথায় এন্টিবডি টেস্ট হয়, তা জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, যে কোনো মূল্যেই তারা এন্টিবডি টেস্ট করতে চান। সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদাহরণ দেয়া যাক। গত ১৪ জুন সকালে ঘুম থেকে উঠেই একটি অনলাইন গ্রুপের স্বেচ্ছাসেবী একজন ডাক্তারের মেসেজের প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম। সেখানে দেখা যাচ্ছে, এক পরিবারের সাতজনের কোভিড-১৯-এর লক্ষণ ছিল, তাদের মধ্যে দু’জনের টেস্ট পজিটিভ এসেছে বিধায় বাকি পাঁচজনের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তারা টেস্ট করাননি। এরপর তারা বাসায় কোভিড-১৯-এর লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা নিয়েছেন এবং এখন তারা সুস্থ। লক্ষণ প্রকাশের ২১ দিন পর কোনো লক্ষণ না থাকায় তারা প্লাজমা দান করতে আগ্রহী। তাই জানতে চেয়েছেন তারা প্লাজমা দান করতে পারবেন কি না।

এ ঘটনাটি যদি একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা যায় তাহলে দেখা যাচ্ছে, একই পরিবারে প্রথম দু’জনের কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ টেস্টের জটিলতায় পরবর্তী পাঁচজনের লক্ষণ প্রকাশের পর তারা টেস্টই করাননি। কিন্তু যদি এন্টিবডি টেস্ট বাংলাদেশে চালু থাকত তাহলে সার্স-করোনাভাইরাস-২ এর ইমিউনোগ্লোবিউলিন-এম নির্ণয়ের মাধ্যমে এই পাঁচজনের অ্যাকটিভ ইনফেকশন শনাক্ত করা সম্ভব হতো। এই এন্টিবডি টেস্ট তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং সহজেই যে কোনো মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দিয়ে করানো সম্ভব। তাই ল্যাবগুলোয় এন্টিবডি টেস্ট সহজলভ্য হওয়ার কারণে জনগণকে কোভিড-১৯ টেস্টের জন্য ভোগান্তির শিকার হতে হতো না। আবার এই পাঁচজন যেহেতু সুস্থ হয়ে গেছেন, তাই তারা যদিওবা কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবুও এখন সুস্থ অবস্থায় তাদের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নেই বিধায় মলিকুলার টেস্টের মাধ্যমে আরএনএ পরীক্ষা করা হলে রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে। তাই তারা কোভিড-১৯ নাকি সাধারণ ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা নির্ণয় করার একমাত্র উপায় এন্টিবডি টেস্ট। যদি সার্স-করোনাভাইরাস-২-এর ইমিউনোগ্লোবিউলিন-জি এন্টিবডি পজিটিভ আসে, তাহলে বোঝা যাবে এই পাঁচজন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। আবার এই পাঁচজন এখন প্লাজমা দান করতে আগ্রহী হলেও তারা যেহেতু টেস্ট করাননি তাই (তারা সন্দেহজনক কোভিড-১৯ রোগী ছিলেন বলে ধরে নিলেও) নিশ্চিতভাবে তাদের শরীরে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে সার্স-করোনাভাইরাস-২-এর এন্টিবডি আছে কিনা সেটি বোঝা সম্ভব নয়। তাই এক্ষেত্রে এন্টিবডি টেস্টই ভরসা।

কোভিড-১৯ চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি একটি আশাব্যঞ্জক চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে সার্স-করোনাভাইরাস-২ ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরিকৃত এন্টিবডি সরাসরি সদ্য সুস্থ হয়ে ওঠা কোভিড-১৯ রোগীর রক্ত থেকে নেয়া হয়। তাই প্লাজমা দানের আগে দাতার রক্তে প্রয়োজনীয় মাত্রায় এন্টিবডি আছে কিনা সেটি দেখার জন্য এন্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে এন্টিবডি টাইটার দেখে নিতে হয়, যেমন- ১ঃ১৮০ অথবা কমপক্ষে ১ঃ১৬০ এন্টিবডি দাতার রক্তে থাকতে হবে। আবার কারও কারও জিনগত ত্রুটির কারণে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পরও প্রতিরোধী পরিমাণে এন্টিবডি তৈরি না হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সুস্থ হয়ে ওঠার পর দ্বিতীয়বার কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার কিছু কিছু খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেক্ষেত্রেও এন্টিবডি টাইটার করে ওই ব্যক্তির কতটা ইমিউন, সেটা নির্ণয় করা যেতে পারে। আবার ভ্যাকসিন দেয়ার আগেও এন্টিবডি টেস্ট করে পূর্ববর্তী সংক্রমণ দেখে নিতে হয়, কারণ ভ্যাকসিন শুধু যারা কখনোই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়নি, তাদের জন্য কার্যকর। তাই কেউ যদি ইতোমধ্যে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং লক্ষণহীন থাকায় তিনি নিজেও তা না জানেন, সেক্ষেত্রে ভ্যাকসিন দিয়ে তার কোনো উপকারে আসবে না।

পিসিআর পদ্ধতিতে টেস্ট করার জন্য বায়োসেফটি লেভেল ২+ নেগেটিভ প্রেসারের ল্যাবরেটরিতে দামি জটিল যন্ত্রপাতি, দামি টেস্ট কিটসহ মলিকুলার বায়োলজি বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। তাই প্রয়োজনের তুলনায় মলিকুলার টেস্টের সুযোগ খুবই কম এবং গ্রাম পর্যায়ে এটি অসম্ভব। আবার এন্টিবডি টেস্ট যে কোনো মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরিতে কম খরচে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দিয়ে করানো সম্ভব বিধায় এটি গ্রাম পর্যায়ে চালু করা সহজ। গ্রাম থেকে শহর পর্যায়ে এন্টিবডি টেস্ট করা না গেলে দেশে কোভিড-১৯-এর কী হারে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে এবং কমিউনিটির মানুষের শরীরে এ ভাইরাসের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা বোঝা সম্ভব নয়। এজন্য অবশ্যই এন্টিবডি টেস্টিং শুরু করতে হবে। আশঙ্কার কথা হল, কমিউনিটি সংক্রমণ হলে কমিউনিটিতে লক্ষণহীন করোনা রোগী থাকবে এবং তাদের মাধ্যমে সহজেই কমিউনিটির অন্য মানুষ, হাসপাতালের ডাক্তার ও অন্য রোগীর মধ্যে করোনা ছড়িয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে এন্টিবডি টেস্টিংই পারে কমিউনিটি সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে। যদি এলাকাভিত্তিক প্রত্যেক কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করে তাদের আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন করা না যায়, তাহলে ছোট বা বড় লকডাউন, এমনকি কারফিউ দিয়েও কোনো লাভ হবে না। এতে কেবল মানুষের দুর্ভোগই বাড়বে, ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ হবে না। তাই দেশে টেস্টের পরিধি বাড়াতে হবে এবং এক্ষেত্রে এন্টিবডি টেস্ট যত শিগগির সম্ভব চালু করতে হবে।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মলিকুলার টেস্টের পাশাপাশি এন্টিবডি টেস্টিংও হচ্ছে। মলিকুলার ও এন্টিবডি টেস্ট এ দুটি পদ্ধতিতেই ফল্স পজিটিভ বা ফল্স নেগেটিভ রেজাল্ট আসতে পারে। মলিকুলার পিসিআর পদ্ধতিতে দেশে যে কিট ব্যবহার করা হয়, তা দিয়ে পজিটিভ আসার সম্ভাবনা নাসারন্ধ্রের শ্লেষ্মায় ৬৬ শতাংশ এবং মুখের লালায় ৩৩ শতাংশের মতো। সম্প্রতি আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কয়েকটি কোম্পানির এন্টিবডি টেস্ট কিটকে অনুমোদন দিয়েছে, যার সেনসিটিভিটি ও স্পেসিফিসিটি ১০০ শতাংশের খুব কাছাকাছি। আবার বাংলাদেশে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ইতোমধ্যে এন্টিবডি ও এন্টিজেন কিট ডেভেলপ করেছে, যা এখনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

যেহেতু দেখা যাচ্ছে, একমাত্র এন্টিবডি টেস্টিংয়ের মাধ্যমে অ্যাকটিভ ইনফেকশন, পূর্ববর্তী ইনফেকশন, লক্ষণহীন সংক্রমণ, শরীরে ইমিউনিটি তথা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কিনা, প্লাজমা ডোনার সিলেকশন, ভ্যাকসিনের সিদ্ধান্ত ইত্যাদি অনেক কিছুই নির্ণয় করা সম্ভব; তাই এন্টিবডি টেস্টিং হতে পারে অনেক সমস্যার সমাধান।

ডা. বুশরা তানজীম : ক্লিনিক্যাল ভাইরোলজিস্ট; সহযোগী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত