চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ

  তারিকুল আলম ০৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ‘Industry 4.0’ নামে পরিচিতি লাভ করছে। আঠার শতকের শেষার্ধে শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়, তা-ই শিল্পবিপ্লব নামে পরিচিত। শিল্পবিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ড বিশ্বের প্রথম শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং দেশটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে এগিয়ে যায়। তাই ইংল্যান্ডকে ‘পৃথিবীর কারখানা’ বলা হয়।

সৃষ্টিলগ্ন থেকে পৃথিবীতে এ পর্যন্ত তিনটি শিল্পবিপ্লব হয়েছে। যথা- ক. প্রথম শিল্পবিপ্লব সংগঠিত হয় ১৭৬০ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে; যা উৎপাদন শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটায়। এর মূল প্রভাবক ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন এবং ফলাফল ছিল উৎপাদন শিল্পের সম্প্রসারণ। খ. দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব সংগঠিত হয় উনিশ শতকের শেষার্ধে ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে। ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কার হয়, যার মাধ্যমে উৎপাদন শিল্পে আমূল পরিবর্তন হয়। এর মূল প্রভাবক ছিল বিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার এবং ফলাফল ছিল উৎপাদন শিল্পের আমূল পরিবর্তন। গ. তৃতীয় শিল্পবিপ্লব সংগঠিত হয় ১৯৬০ সালে তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভবের ফলে। এতে বিভিন্ন ভারি ও মাঝারি শিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। এর মূল প্রভাবক ছিল কম্পিউটার ও ইন্টারনেট প্রযুক্তি এবং ফলাফল ছিল বিভিন্ন শিল্পের অভাবনীয় পরিবর্তন।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব : চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ধারণাটি ১ এপ্রিল, ২০১৩ সালে জার্মানিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবটি হবে মূলত ডিজিটাল বিপ্লব। ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে কল-কারখানাগুলোয় ব্যাপক হারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসে আমূল পরিবর্তন। আগের শিল্পবিপ্লবগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ যন্ত্রকে পরিচালনা করছে; কিন্তু চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে যন্ত্রকে উন্নত করা হয়েছে, ফলে যন্ত্র নিজেই নিজেকে পরিচালনা করছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে জীবনমান উন্নয়নে কী প্রভাব বিস্তার করবে, তা নিয়ে দুটি মতবাদ প্রচলিত আছে- ক. একদল বিশেষজ্ঞ মতবাদ দেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে মানুষের আয়ের পরিমাণ ও জীবনযাত্রার মান বাড়বে। বিশ্বের পণ্য সরবরাহ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তি আনবে ব্যাপক পরিবর্তন। ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। খ. আরেক দল বিশেষজ্ঞ মত দেন, ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বের অসমতা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষ দ্বারা সম্পন্ন অনেক কাজ রোবট দিয়ে সম্পন্ন করা হবে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সমস্যা সৃষ্টি হবে। এছাড়া শ্রমবাজারে কর্মদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে যাবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সমস্যায় ফেলে দেবে।

সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে এবং নীতিনির্ধারণের সময় ডিজিটাল বিপ্লব আনবে বড় পরিবর্তন। প্রযুক্তি বিপ্লব সরকারি সেবাগুলোকে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসবে, অপরদিকে ডিজিটালাইজেশনের সহজলভ্যতা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঝুঁকি বাড়াবে। নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবই যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করবে- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই মর্মে তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আলোচিত প্রযুক্তি : ক. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খ. ক্লাউড কম্পিউটিং গ. ইন্টারনেট অব থিংস ঘ. ব্লক চেইন প্রযুক্তি ঙ. থ্রিডি প্রিন্টিং চ. কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ছ. উন্নত মানের জিন প্র্রযুক্তি জ. বিগ ডেটা অ্যানালাইটিক ঝ. হরিজন্টাল ও ভার্টিক্যাল সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ঞ. সাইবার সিকিউরিটি ট. রোবোটিক্স।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে প্রভাববিস্তারকারী প্রযুক্তিগুলো : ক. Internet of Thinks (IoT): আমাদের চারপাশে সব বস্তু যখন নিজেদের মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করে এবং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে তা-ই ইন্টারন্টে অব থিংস। ইতোমধ্যে গুগল হোম, অ্যামাজনের আলেক্সার কথা আমরা জেনেছি; যা আপনার ও আমার বাড়ির বাতি, সাউন্ড সিস্টেম ও ফটকসহ অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনার বাসার চুলাকে একবার শিখিয়ে দেবেন কখন কী খেতে আপনি পছন্দ করেন; ধরুন বৃষ্টির দিনে আপনি খিচুড়ি খেতে চান সেটা আপনার চুলা মনে রাখবে এবং বাইরে বৃষ্টি হলেই আপনার জন্য সেদিন খিচুড়ি রান্না করে রাখবে।

খ. Cloud Computing : ক্লাউড কম্পিউটিং মানে কম্পিউটারের হার্ডডিস্কের ওপর কোনো চাপ না পড়া। যে কোনো স্টোরেজ সফটওয়্যার এবং সব ধরনের অপারেটিং সিস্টেমের কাজ চলে যাচ্ছে হার্ডডিস্কের বাইরে। শুধু ইন্টারনেট কানেকশন থাকলেই ক্লাউড সার্ভারে কানেক্ট হয়ে সব সুবিধা নেয়া যাবে। কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক নষ্ট হলেও ক্লাউড সার্ভার ডাউন হওয়ার সুযোগ থাকবে না। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের কাজগুলো যে কোনো স্থানেই বসে মোবাইলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

গ. Artificial Intelligence (AI) : একে মেশিন ইন্টেলিজেন্স বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে কম্পিউটার বিজ্ঞানের উৎকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত হল কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স যে চারটি কাজ করে তা হল ক. কথা শুনে চিনতে পারা, খ. নতুন জিনিস শেখা, গ. পরিকল্পনা করা এবং ঘ. সমস্যার সমাধান করা। বর্তমানে সব স্মার্টফোনেই আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার হচ্ছে গ্রাহকের অভ্যাস ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী কাস্টমাইজ সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাব : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শিল্প ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মানুষের কাজ দখল করে নেবে উন্নত মানের মেশিন ও রোবট, ফলে অনেক লোক তাদের কর্মসংস্থান হারাবে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৬০ শতাংশ, আসবাবপত্র শিল্পে ৫৫ শতাংশ, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য শিল্পে ৪০ শতাংশ, চামড়া ও জুতা শিল্পে ৩৫ শতাংশ এবং সেবা শিল্পে ২০ শতাংশ লোক কর্মহীন হয়ে পড়বে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরাই টিকে থাকবে। উল্লেখ্য, আমাদের দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল মাত্র ১৪ শতাংশ; কিন্তু উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, কারিগরিভাবে দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রায় ৬০ শতাংশ। তাই আমাদের এখন থেকেই একটি সুপরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশে কারিগরি দিক থেকে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ- ১. তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ২. প্রযুক্তিগত সমস্যায় উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি, ৩. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা, ৪. ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তির মধ্যে অব্যাহত সংযোগ নিশ্চিত করা এবং ৫. অটোমেশনের কারণে বহু মানুষের কাজের সুযোগ হ্রাস পাওয়া।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনা- ১. অটোমেশনের প্রভাবে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি হ্রাস, ২. উৎপাদন শিল্পে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, ৩. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে বড় পরিবর্তন, ৪. বিশেষায়িত পেশার চাহিদা বৃদ্ধি, ৫. সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।

বাংলাদেশ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব : বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অনেক অগ্রগতি করছে। বর্তমান বিশ্বের আধুনিক সব তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী দিনের প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।

আমাদের প্রস্তুতি : বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ‘এশিয়ান টাইগার’ বলে পরিচিতি পেয়ে গেছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগামী বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের হাই-টেক পার্কগুলো হবে আগামী দিনের সিলিকন ভ্যালি। বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ও ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়ন পরিষদকে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারের প্রধান সেবাগুলো, বিশেষ করে ভূমি নামজারি, জন্মনিবন্ধন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন, ভোটার আইডি কার্ড, ই-টিন সার্টিফিকেট ইত্যাদি ডিজিটাল পদ্ধতিতে নাগরিকদের সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে আরও কর্মক্ষম বাংলাদেশ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাংলাদেশ, ন্যায়সঙ্গত বাংলাদেশ এবং আরও অধিক শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পরপরই রাঙ্গামাটি পাবর্ত্য জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়াতে একটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র চালু করেছিলেন। বাংলাদেশ এখন দুটি সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে, তৃতীয় সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে কানেকটিভিটির কাজ চলছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সরকার আকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করার মাধ্যমে আগামী দিনের বিশ্বকে জানান দিচ্ছে- চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে বাংলাদেশও প্রস্তুত।

তারিকুল আলম : অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, নোয়াখালী

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত