কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল ক্রয় নাকি শুল্ক হ্রাস করে চাল আমদানি?

  ড. জাহাঙ্গীর আলম ০৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

মহামারী করোনার অভিঘাতে দেশের অর্থনীতি পর্যুদস্ত। শিল্প-কারখানার উৎপাদন স্থবির। অনেক মানুষ কর্মচ্যুত। যোগাযোগ বিঘ্নিত। পণ্যের বিপণন বিপর্যস্ত। স্তিমিত হয়ে গেছে কর্মচাঞ্চল্য। এর মধ্যেও উৎপাদনের ধারায় চলমান আছে কৃষি খাত। যথাসময়ে মাঠে নামছেন গ্রামের কৃষক। ফসলের আবাদ ও পরিচর্যা করছেন। এক সময় পাকা শস্য ঘরে তুলে আনছেন কৃষি শ্রমিক। কোথাও তেমন কোনো ছন্দপতন নেই। তবে সমস্যা হয়েছে পণ্যের বিপণনে।

কারণ যানবাহন চলাচল সীমিত। পণ্যের চাহিদা সংকুচিত। বিক্রি কমে গেছে উৎপাদিত পণ্যের। অনেক সময় বিক্রি না হওয়া সবজি ক্ষেতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অধরা থেকে গেছে পুকুরের মাছ, খামারের মুরগি ও ডিম আর গাইয়ের দুধ। যেসব কৃষক কোনোরকমে কিছু পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন, তারও ন্যায্যমূল্য পাননি। তাতে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষক।

করোনাকালে কৃষি খাতের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার ওপর কিছু ধারণা পাওয়া গেছে ব্র্যাকের একটি সমীক্ষা থেকে। সম্প্রতি প্রকাশিত ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে জানা যায়, করোনাকালের দেড় মাসে কৃষি খাতের ক্ষতি হয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। তাতে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। উল্লিখিত সময়ে শস্য খাতের ক্ষতি হয়েছে ১৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। মৎস্য খাতের ৩৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, পোলট্রি খাতের ১ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা এবং প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষতি হয়েছে ৫৮৫ কোটি টাকা। এ দেড় মাসে প্রতিটি কৃষক পরিবার গড়ে প্রায় ৩৪ হাজার টাকা গচ্চা দিয়েছে। এ পরিমাণ ক্ষতির হিসাব উঠে এসেছে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। এরপরও প্রায় এক মাস এ ক্ষতি অব্যাহত ছিল। ফলে ক্ষতির মোট পরিমাণ আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা যায়।

এবার প্রণোদনা হিসেবে কৃষককে ঋণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য ক্ষুদ্রঋণ দেয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া নিয়মিত কৃষি ঋণের আওতায় আছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। এরপরও কৃষকের অর্থায়নের সমস্যা আছে, থাকবে। কারণ সব কৃষকের জন্য কৃষি ঋণের শিকে ছিঁড়ে না। এ ঋণ কেউ পায়, কেউ পায় না। এ ক্ষেত্রে কৃষকের জন্য বড় উপকার হতে পারে নগদ সহায়তা। এর পরিমাণ যদি কৃষকপ্রতি ২ হাজার টাকা হয়; তাতে মোট টাকা লাগে প্রায় ৩ হাজার কোটি। যদি ৪ হাজার টাকা হয় তাহলে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন পড়ে। এ টাকার পরিমাণ আমাদের মোট বাজেটের তুলনায় খুবই সামান্য; মাত্র প্রায় ১ শতাংশ। একজন কৃষকের কোনো উৎপাদন মৌসুমে সার্বিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে তার কিয়দংশ নগদ সহায়তা হিসেবে কৃষককে দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। এ ধরনের উদ্যোগের পক্ষে যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে।

কৃষকের লোকসান পুষিয়ে দেয়ার আরেকটি পন্থা হল, তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। এর জন্য সরকার গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের সমর্থন মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। ভারতে বর্তমানে ২৩টি কৃষিপণ্যের সমর্থন মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বাজার দর যাতে নির্ধারিত মূল্যের নিচে নেমে না যায়, সেজন্য কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ক্রয় করে নেয় সরকার। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের ওপর ৫০ শতাংশ মুনাফা হিসাব করে কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণের দৃষ্টান্ত আছে। ভারতে মোট উৎপাদিত পণ্যের ১৫ শতাংশ ক্রয় করা হয় এরূপ পূর্বনির্ধারিত মূল্যে। বাংলাদেশে বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সমর্থন মূল্য নির্ধারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে প্রচলন আছে, ধান-চাল ও গমের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণের। এটি সাধারণত উৎপাদন খরচের ওপর ৬ থেকে ১০ শতাংশ মুনাফা দেখিয়ে নির্ধারণ করা হয়। মোট উৎপাদনের ৫ থেকে ৮ শতাংশ খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয় উৎপাদন মৌসুমে। তারও বেশির ভাগ ক্রয় করা হয় ব্যবসায়ী ও চাতালের মালিকদের কাছ থেকে। কৃষক তাতে সরাসরিভাবে তেমন লাভবান হন না। ফলে আমাদের দেশে প্রচলিত উৎপাদিত পণ্যের সংগ্রহ মূল্য স্থানীয় বাজারে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তাতে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন কৃষক। অনেক সময় উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে কৃষক তার উৎপাদন খরচটুকুও ঘরে নিয়ে আসেত পারেন না।

এবার করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলার জন্য বোরো ধান সংগ্রহের পরিমাণ বাড়িয়েছে সরকার। মোট উৎপাদনের প্রায় ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ধান ও চাল সংগ্রহের জন্য। এর মধ্যে ধান ৮ লাখ টন আর চাল ১২.২ লাখ টন। তার সঙ্গে রয়েছে গম ৮০ হাজার টন। মৌসুমের শুরুতে বাজারে ধানের দাম ছিল মণপ্রতি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। এখন তা বেড়েছে। খামারপ্রান্তে এখন ধানের দাম মণপ্রতি ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা। সরু ধানের দাম আরও বেশি। ফলে সরকার নির্ধারিত প্রতি মণ ১,০৪০ টাকার খুবই কাছাকাছি অবস্থান করছে খামারপ্রান্তে ধানের মূল্য। ফলে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে বেশি ধান নিয়ে আসছেন না কৃষক। পরিবহন খরচ যোগ করে সরকারি গুদামে ধান পৌঁছে দিয়ে তেমন লাভবান বোধ করছেন না তারা। ১৫ জুন পর্যন্ত সরকারি গুদামে ধান সংগৃহীত হয়েছে ২৬ হাজার টন। চাল পাওয়া গেছে ১ লাখ ৩৭ হাজার টন।

এবার খাদ্যশস্যের সংগ্রহ মাত্রা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। আশঙ্কা হচ্ছে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আগস্ট মাসের মধ্যে সম্ভব হবে না। মিল মালিক ও বড় চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ময়ালে ধানের দাম বেশি। আরও চার টাকা কেজিপ্রতি চালের দাম না বাড়ালে তারা সরকারকে চাল দিতে পারবেন না। এদিকে করোনার কারণে অভাবগ্রস্ত মানুষের খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটাতে বেশি করে খোলাবাজারে চাল বিক্রি করছে সরকার। ফলে দ্রুত হ্রাস পেয়েছে খাদ্যশস্যের মজুদ। গত মার্চ মাসে খাদ্য মজুদের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৬২ হাজার টন। ১৫ জুন তা নেমে এসেছে ১১ লাখ ৩৬ হাজার টনে। চালের মজুদ কমেছে প্রায় ৫ লাখ টন। সরকার চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা, প্রতি মণ ১,৪৪০ টাকা। বাজারে মোটা চালের দাম তার চেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ বিদেশ থেকে চাল আমদানির দাবি তুলছেন। বলছেন আমদানি শুল্ক হ্রাসের জন্য। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমানে দেশে চালের সরবরাহ সংকট আছে কিনা? এর সাফ জবাব, নেই। এবার করোনা সংকটের মধ্যেও হাওরের শতভাগ বোরো ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। সমতলেও শতভাগ ধান কৃষকের ঘরে উঠানো সম্ভব হয়েছে। এবার বোরো মৌসুমে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ টন চাল। এর আগে আউশ ও আমনের উৎপাদনও ভালো হয়েছিল। সব মিলে এবারের মোট চাল উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টন। তার বিপরীতে আমাদের খাদ্য চাহিদা ৩ কোটি ১০ লাখ টন চাল। দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি। অনুমান করে জনপ্রতি দৈনিক গড়ে আধা কেজি চাল প্রয়োজন ধরে নিয়ে এ হিসাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে মোট উৎপাদনের ১২ শতাংশ বীজ, অপচয় ও পশুপাখির খাদ্য হিসেবে ধরে নিলে আমাদের বর্তমান খাদ্য চাহিদা দাঁড়ায় বছরে ৩ কোটি ৫৪ লাখ ৪০ হাজার টন চাল। অর্থাৎ তাতে উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ১৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এবার এরূপ বড় আকারের খাদ্যশস্য উদ্বৃত্তের পূর্বাভাস দিয়েছে। এফএও বলছে, দেশে এবার খাদ্যশস্যের উদ্বৃত্ত হবে ২৫ লাখ টন। ইতোপূর্বে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ২ লাখ টন চাল রফতানির আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল গত আমন মৌসুমের বাম্পার ফলন নিশ্চিত হওয়ার পর। এখন ওই চাল রফতানি করা না হলেও বিদেশ থেকে চাল আমদানির কোনো যৌক্তিক কারণ আছে বলে মনে হয় না।

গ্রামাঞ্চলে এখন ধানের দাম বেড়েছে। তবে তা উৎপাদন খরচের পর্যায়েই রয়ে গেছে এখনও। মোটা চালের দামও স্বাভাবিক ৩৫-৩৬ টাকা কেজি। ঢাকায় চাল সরবরাহ করে বড় ব্যবসায়ী ও চাতালের মালিকরা। তাদের কারসাজিতে এখানে চালের দাম কিছুটা বেশি। করোনার কারণে গত এপ্রিলে পরিবহন সংকটের অজুহাতে চালের দাম বৃদ্ধি পায় কেজিপ্রতি ৫ টাকা। এখন ধানের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে অজুহাত দেখিয়ে আরও কিছু বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে চালের দাম। তবে এখনও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। মোটা চালের দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজি। সরু চাল ৫০ টাকার ওপরে। এ অবস্থায় সরকারকে ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহের চুক্তিতে আবদ্ধ ব্যবসায়ীরা আরও ৪ টাকা কেজিপ্রতি বাড়িয়ে ৪০ টাকা দরে চাল সরবরাহের বায়না ধরেছেন। যদিও তারা বোরো মৌসুমের শুরুতে অনেক কম দামে ধান কিনে গুদামজাত করেছেন। এখনও তারা সরকার নির্ধারিত ১,০৪০ টাকা মণ দরের নিচে মোটা ধান সংগ্রহ করছেন গ্রামের কৃষকের কাছ থেকে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায় থেকে চাল সংগ্রহ করা। তাতে লাভবান হবেন কৃষক। আমাদের ২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্যনীতিতে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ধান-চাল সংগ্রহের বিধান রাখা হয়েছে; কিন্তু তা না করে চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে বড় ব্যবসায়ী ও চাতালের মালিকদের কাছ থেকে। তাতে তারা সিন্ডিকেট করার সুযোগ পাচ্ছে। একচেটিয়া মুনাফা লুটে নিচ্ছে।

দেশে ধান-চালের উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও একটি মহল চলমান ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক হ্রাস করে চাল আমদানির পাঁয়তারা করেছে। এটি কোনো যৌক্তিক দাবি নয়। ভারত, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন চাল রফতানিকারী দেশে চালের রফতানি মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে কোনো খাদ্য সংকট না থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে চড়া দামে চাল আমদানি করে ভিন্ন দেশের কৃষককে আমাদের ভোক্তার কষ্টার্জিত অর্থ পাঠিয়ে দেয়া কোনো সুবিবেচনাপ্রসূত পদক্ষেপ হতে পারে না। তার চেয়ে কিছু বেশি দামে হলেও আমাদের কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কিনে সরকারি-বেসরকারি খাদ্য গুদামগুলো ভরপুর করে রাখা উচিত। তাতে কৃষকের উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে খাদ্য উৎপাদনে। করোনাকালের ক্ষতিও তারা পুষিয়ে নিতে পারবে। তবে কখনও ফসল মার খেলে এবং অভ্যন্তরীণ চালের উৎপাদন হ্রাস পেলে আমাদের হয়তো আমদানিনির্ভর হতে হবে। কিন্তু তা আমাদের কৃষকের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নয়; সীমান্তের দুয়ার অবারিত করে নয়।

ড. জাহাঙ্গীর আলম : কৃষি অর্থনীতিবিদ

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত