ভিন্ন দৃষ্টিতে করোনাকালের মূল্যায়ন

  সুব্রত বিশ্বাস ০৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় পৃথিবী নানা রকম হিংস জীবজন্তুর দখলে ছিল। ধীরে ধীরে সেই পৃথিবীর বুকে মানবসভ্যতার উন্মেষ ঘটে। আধুনিক হওয়ার লক্ষ্যে সবুজ জঙ্গল কেটে মানুষ নিজেদের আবদ্ধ করে কংক্রিটের জঙ্গলে।

এভাবে বিভিন্ন জীবজন্তুর অবাধ ঘুরে বেড়ানোর সীমানা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চারপাশে থাকা শালিক, চড়ুই, কাক, বাবুই, ফিঙেসহ নানা পাখির সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মানুষের অসচেতনতার কারণে বিভিন্ন দেশের বিস্তীর্ণ জঙ্গল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেক জীবজন্তুও। আধুনিক হওয়ার লক্ষ্যে মানুষ পরিবেশ রক্ষায় তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তার ফলাফলই কি করোনাভাইরাস?

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেনসহ অনেক সমৃদ্ধ দেশ মৃত্যুর মিছিল দেখেছে। একসঙ্গে এত মৃত্যু দেখে সমগ্র বিশ্বের মানুষের চোখেমুখে দেখা দিয়েছে আতঙ্কের ছায়া। বিভিন্ন দেশে খোঁড়া হচ্ছে গণকবরও। তাতেও হুঁশ ফেরেনি বাংলাদেশের অনেক মানুষের। ফলে দেশেও দিনে দিনে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের ও মৃত্যুর সংখ্যা। বাংলাদেশ আর্থিক দিক দিয়ে তেমন সচ্ছল নয়।

তা সত্ত্বেও সরকার দেশের জনগণের জন্য দ্রুত অনেক জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারগুলোকে দিয়েছে খাবারের নিশ্চয়তা, যেন তাদের ঘরের বাইরে আসতে না হয়। কিন্তু এত কিছু করা সত্ত্বেও অনেকে জেনেশুনে সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে ঘরের বাইরে চলাফেরা করছে। এতে শুধু সরকার নয়, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের কিছু বিবেকহীন মানুষের জন্য সারা দেশের মানুষের উৎকণ্ঠা বেড়েছে।

বর্তমান সময়ে বিশ্বের বুকে করোনা অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অতি ক্ষুদ্র এই ভাইরাস মাত্র কয়েকদিনে গোটা দুনিয়াকে স্থবির করে দিল। নোভেল করোনাভাইরাস সব পরাশক্তিকে ধরাশায়ী করে বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন অনেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সারা দুনিয়ার চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এ ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের পেছনে দিনরাত মাথা ঘামাচ্ছেন। কিন্তু ক্ষুদাতিক্ষুদ্র এ অপশক্তির তাণ্ডবও চলমান রয়েছে।

পৃথিবীর সব ভালোর কিছু খারাপ দিক থাকে। তেমনি সব খারাপের কিছু ভালো দিকও থাকে। করোনারও কিছু ভালো দিক লক্ষ করা যাচ্ছে, যাকে আমরা বলতে পারি মন্দের ভালো। এখন আমরা করোনার মন্দের ভালো দিকগুলোর প্রতি আলোকপাত করব।

এ বিপদের মুহূর্তে গোটা দুনিয়া মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। সবাই সৃষ্টিকর্তার সাহায্য কামনা করছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে মানুষ কার্যত গৃহবন্দি। খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে কেউ বের হচ্ছে না। এর ফলে কিছুদিনের জন্য বন্ধ ছিল যানবাহন ও শিল্প উৎপাদন। এরপর সীমিত পরিসরে চালু হয় যানবাহন এবং শিল্প উৎপাদন। এসব পদক্ষেপের ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা অনেক কমেছে। যান চলাচল কম থাকায় শব্দদূষণও কম হচ্ছে। বিভিন্ন রকম কলকারখানা বন্ধ থাকায় জলাশয়ে বিষাক্ত বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হচ্ছে না।

বিভিন্ন শহরের পাশের নদ-নদীর পানির দূষণও কমেছে। এতে মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণী উপকৃত হবে। অনর্থক ঘোরাফেরা, চলাচল ও পর্যটক কমে যাওয়ায় প্রকৃতির ওপরও চাপ কমেছে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির আশঙ্কাও কমেছে। সমাজে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দেশের নেতা একে অপরের কাছে সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছেন। করোনাভাইরাসের আরেকটি ইতিবাচক দিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।

করোনাকালে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও উন্নত হচ্ছে। কর্মব্যস্ততায় মানুষ, বিশেষ করে পুরুষ সদস্যরা পরিবারে সময় দিতে পারতেন না। করোনার কারণে এখন সবাই একসঙ্গে বিভিন্ন বিষয় শেয়ার করার সুযোগ পাচ্ছেন। শিশুরা মা-বাবার সান্নিধ্য পাচ্ছেন। বয়স্ক পিতা-মাতা তাদের ব্যস্ত সন্তানদের কাছে পাচ্ছেন। সবাই এখন মুখোমুখি বসে একসঙ্গে কথা বলা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার সুযোগ পাচ্ছেন। এটাকেও ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

সামাজিকভাবে শারীরিক দূরত্ব বাড়লেও কমেছে মনের দূরত্ব। একে অন্যের প্রতি সহনশীলতা আগের চেয়ে বেড়েছে। যারা দিন আনে দিন খায়, সেসব মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন অনেক সামর্থ্যবান। ঝুঁকি নিয়ে দিনের পর দিন মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন অনেক হৃদয়বান মানুষ।

আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। অনেক ভালো অভ্যাসের চর্চা আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে আগে যতটা উদাসীন ছিল মানুষ, এখন তা একেবারেই নেই।

বরং সময় নিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া, ঘড়বাড়ি, জামাকাপড় পরিষ্কার করার বিষয়ে প্রায় সবাই এখন বিশেষভাবে যত্নশীল। প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অভ্যাসের চর্চা এখন অনেকেই করছেন। এছাড়া অনেকের বদ অভ্যাস ছিল কারণে-অকারণে ঘন ঘন মুখে-নাকে হাত দেয়া, যা অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। এ বদ অভ্যাসগুলো এখন আর দেখা যাচ্ছে না। করোনার কারণে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস খুব দ্রুত তৈরি হচ্ছে ।

করোনাভাইরাসকে ঘায়েল করতে মানুষ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের চেষ্টা করছেন। এছাড়া ফলফলাদি সঠিক নিয়মে ধুয়ে তারপর খাচ্ছেন। শাকসবজিও রান্নার আগে সঠিকভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করছেন। এতে শরীর থাকছে সুস্থ আর পালিয়ে যাচ্ছে নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ।

লকডাউনের কারণে যত্রতত্র মাদকদ্রব্য পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া এখন পরিবারের সবাই সারাদিন একসঙ্গে থাকছেন। ফলে পরিবারের কোনো সদস্য আগের মতো মাদক গ্রহণ করতে পারছেন না। এই সুযোগে অনেকেই নেশা ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

এই আধুনিক যুগে গল্প-উপন্যাস পড়া একেবারে ভুলেই গিয়েছিল অনেকে। করোনার কারণে এখন মানুষ বাড়িতে বসে মনের অজান্তেই বইয়ের সেলফ থেকে ধুলো ঝেড়ে বিভিন্ন ধরনের বই- যা আগে পড়া হয়নি, সেসব পড়তে শুরু করেছেন। অনেক তরুণী, যারা আগে কখনও রান্নাবান্না করেননি, তারাও নতুন কিছু শিখছেন। আবার অনেক পরিবারের তরুণরাও রান্নাবান্না করছেন পরিবারের জন্য। আতঙ্ক ভুলে সবাই ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছেন।

মহামারী করোনার কারণে এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে না স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়ের লড়াই। এ কারণে মরতে হবে না হাজার হাজার ষাঁড়কে। তাই এই মহামারী পরিস্থিতি যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে কিছু প্রাণীর জন্য।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মাদ্রিদের লাস ভেন্তাস বুল-রিঙে প্রতিবছর উন্মত্ত ষাঁড়ের লড়াইয়ে জমজমাট থাকে চত্বর। লাখো মানুষের সমাগমে গমগম করে ভেন্যু। এবার নেই কোনো আয়োজন। অন্য বছর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে অনেক ষাঁড়ের মৃত্যু হয়েছে, এবার তা হবে না। মহামারীর দুঃসময়ে এটা নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী খবর। বিশ্বের অনেক পানশালা, জুয়ার আসর, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ এরকম বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। করোনাকালে প্রমাণ হয়েছে এসব আমোদ-প্রমোদ ছাড়াও মানুষ ভালো থাকতে পারে।

সঞ্চয় করা কতটা জরুরি, তা আবারও প্রমাণ হয়ে গেল। এছাড়া মানুষ যে সীমিত পরিসরে জীবনযাপন করতে পারে, এটাও স্পষ্ট হল। কোনো কোনো এলাকায় করোনাকালে অপরাধের মাত্রা কমেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা করোনা মোকাবেলায় দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই মুহূর্তে ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনরাত মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।

মানুষের কাছে এসব পেশার ব্যক্তিদের মর্যাদা আরও বেড়েছে। করোনার প্রভাবে আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি। তবে করোনাকালে আমাদের যেসব শিক্ষা হয়েছে, করোনা আতঙ্ক কেটে যাওয়ার পর শিক্ষার সেই ধারা সমাজে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই দেখার বিষয়।

সুব্রত বিশ্বাস : কাউন্সিলর, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত