মিঠে কড়া সংলাপ

বিদ্যুৎ বিভাগের থলেতে বিড়াল নেই তো!

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ১১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইংল্যান্ডের প্রিভি কাউন্সিলে ভারতের সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সে মামলার ফলাফলে সতীদাহ প্রথা রদ ও রহিত হওয়ার আগে ভারতের মাটিতে হিন্দু বিধবাদের কীভাবে স্বামীর চিতায় জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হতো সে কথা সবারই জানা।

তখনকার দিনে হিন্দু পুরোহিতরা সদ্য বিধবা জ্যান্ত নারীকে চিতায় পোড়ানোর সময় চিৎকার করে বলতেন, ‘সতী নারী কী জয়’! আর সেই সঙ্গে মৃত ব্যক্তির সৎকারে আসা লোকজন এত জোরে ঢাকঢোল-কাঁসিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন যে মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় ওঠানো জ্যান্ত নারীর আর্তনাদ চাপা পড়ে যেত। সদ্য বিধবা ওইসব নারীর বাঁচার আকুতির শত চেষ্টা, চিৎকার, চেঁচামেচি, কান্না, ঢাকঢোলের শব্দের মাঝে হারিয়ে যেত আর হিন্দুধর্মীয় গুরুরা তাদের আখ্যা দিতেন সতীমাতা।

অবশেষে ব্রিটিশ রাজের প্রিভি কাউন্সিলের রায়ে সতীদাহ বন্ধ হয়েছে বটে; কিন্তু বিভিন্ন অপকর্মের হোতাদের ঢাকঢোল পেটানো বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয় না। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন অপকর্ম ঢাকার জন্য আজও গলাবাজি চলে তথা ঢাকঢোল পেটানো হয়। যেমন আমাদের দেশের বিদ্যুৎ বিভাগ!

বিদ্যুৎ বিভাগ এত বেশি ঢাকঢোল পেটাতে ওস্তাদ যে, তাতে দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট-কান্না ঢাকা পড়ে যায়! বছরে বারবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিলে ঘাপলা, বিদ্যুৎ বন্ধ রেখে গ্রাহকদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা সত্ত্বেও গলাবাজি করে তারা সারা দেশকে মাত করে দেন। বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই, দেশে এখন চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, হরহামেশা এমনটি বলা হলেও বাস্তব চিত্র আলাদা।

এ বিষয়ে বর্তমান অবস্থায়ও যা বলা হচ্ছে তাও সত্যের অপলাপ মাত্র। রাজধানী ঢাকা শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও সরবরাহের তুলনায় মফস্বল শহর ও সন্নিহিত এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অত্যন্ত করুণ। জেলা শহরের পৌর এলাকাতেও দিনে ১০-১২ বার বিদ্যুৎ চলে যাওয়া নৈমিত্তিক ঘটনা। রাজধানী ঢাকার মতো জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাড়িতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রেখে বা মোটামুটি ভালো অবস্থায় রেখে বাদবাকি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগ বিমাতাসুলভ আচরণ করে চলেছে।

দিনে ১০-১২ বার, এমনকি ১৮-২০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার মতো ঘটনাও মফস্বল এলাকায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ঘটে চলেছে! আর এসব দেখার, বলার বা শোনার কেউ আছে বলেও মনে হয় না। কারণ আগেই বলা হয়েছে, যারা এ বিষয়ে কিছু বলবেন বা বলতে সক্ষম, সেসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাড়ি বা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি সন্তোষজনক। কিন্তু যারা এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বাবুদের কিছু বলতে সক্ষম নন বা যাদের কথা বিদ্যুৎ বাবুরা না শুনলেও কিছু আসে-যায় না, সেসব গণমানুষের বাড়ি ও এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ।

এ বিষয়ে পাবনা জেলা শহরের শহরতলির এক আওয়ামী লীগ নেতা খেদোক্তি করে আমাকে জানালেন, তার এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ঠিক মাগরিবের আজানের সময় বিদ্যুৎ চলে যায় এবং এ কারণে তাকে বিরোধীদলীয় লোকজনসহ নিজ দলের লোকজনেরও সমালোচনা শুনতে হয়। আবার পৌর এলাকার এক ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতির ভাষায়, তার এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আগের তুলনায় আরও খারাপ হয়েছে। আর এসব মানুষের প্রশ্ন হল, তাহলে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য এত এত বাজেট বরাদ্দ, এত এত টাকা খরচ করে কাজের কাজটি কী হল? এত টাকা কোথায় খরচ করা হল বা হচ্ছে? এসবের হিসাব কোথায়?

বলা বাহুল্য, তাদের এসব প্রশ্নের জবাব আমার জানা ছিল না বা এখনও জানা নেই। তবে এ করোনাকালীন দুঃসময়ে দীর্ঘ একটা সময় আমি পাবনার বাড়িতে কাটানোর ফলে তাদের অভিযোগের সত্যতা টের পেয়েছি। তখন দেখেছি, ভোররাতে, সকালে, দুপুরে, সন্ধ্যায়, মাঝরাতে যখন-তখন বিদ্যুৎ বাবুরা বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছেন!

আর এ অবস্থায় আমার আইপিএসটিও চার্জের অভাবে কাজ করা বন্ধ করে দিলে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় একদিন নেসকোর সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন করে এত ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনাটি বলায় তিনি সরকারি আমলাতান্ত্রিক ভাষায় বলেছিলেন, ‘হয়তো জানেন না যে, ঘুড়ি উড়ানোর সময় বিদ্যুতের তারে সুতা পড়লে বিদ্যুৎ চলে যায়।’ তার কথা শুনে বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, মাঝরাতেও বেশ কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়, তখনও কি কেউ ঘুড়ি উড়ায়?

কিন্তু তাকে সে কথা না বলে পরে প্রেস ক্লাবে একজন সাংবাদিককে বিষয়টি বলায় তিনি নিজেও এ বিষয়ে নেসকো, পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন। আর দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পাবনা বিদ্যুৎ বিভাগের ‘এই বিদ্যুৎ এলো আর এই বিদ্যুৎ গেল’- এ ধরনের খেল দেখে আমার মনেও প্রশ্ন- আমাদের জাতীয় বাজেটে সর্বাধিক গুরুত্বপ্রাপ্ত এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল এ বিভাগটি আসলেই কাজের কাজ কী করছে? আমাদের ট্যাক্সের টাকা এ বিভাগটিতে যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে তো?

নাকি পূর্ত মন্ত্রণালয়ের বালিশ কেলেঙ্কারি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পর্দা কেলেঙ্কারির মতো সেখানেও কিছু ঘটে চলেছে, যা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে! এ অবস্থায় আমার আজকের লেখাটির উদ্দেশ্য হল, বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য একটি তদন্ত সেল গঠন করে আগাগোড়া ঝাড়ফুঁক করে দেখা প্রয়োজন যে, এ বিভাগের কোথায় কী ঘটে চলেছে। আর এ কাজটির জন্য বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কেই উদ্যোগ গ্রহণ করার অনুরোধ জানাব। কারণ আমাদের মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, মন্ত্রণালয়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্বার্থান্বেষী মহল বা বিদ্যুৎ বিভাগে অন্তর্ঘাতকারী কেউ থেকে থাকলে তাদের খুঁজে বের করা প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের একার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।

সুতরাং বিদ্যুৎ বিভাগের হাজার হাজার কোটি টাকা কোথায় কীভাবে খরচ করা হয়েছে এবং হচ্ছে সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত টিম গঠন করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা যেতেই পারে। আশা করি, আমার এ লেখাটি বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের কারও নজরে পড়বে বা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কারও দৃষ্টিগোচর হবে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে এ বিভাগের বিশাল বাজেটের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি সঠিকভাবে সঠিকপথে এগিয়ে চলেছে কিনা তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আর সে কাজটি করে দেশের মানুষের সামনে বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যয় করা অর্থের সঠিকতা প্রমাণ করলে আমরা যারা পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে সরকারি কোষাগারে ট্যাক্সের টাকা জমা করি তারাসহ সারা দেশের মানুষই বিদ্যুৎ বিভাগকে সাধুবাদ জানাবেন। অন্যথায় সরকারি কোষাগারের এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজধানী ঢাকা ও শুধু মফস্বল শহর এলাকার ভিআইপিদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ঠিক রেখে বা মোটামুটি ঠিক রেখে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে না।

ইদানীং দেখা গেল, ভুতুড়ে বিলের কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু মিটার রিডারসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাময়িক শাস্তি দেয়া হয়েছে। ধারণা করা যায়, অভিযুক্ত এসব ব্যক্তি যুক্তি দেখিয়ে আবার চাকরি ফিরে পাবেন! কিন্তু তা সত্ত্বেও এ কাজটির জন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়, কারণ ওইসব ব্যক্তি চাকরি ফিরে পেলেও ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হয়ে যাবেন। কিন্তু প্রশ্নটা সেখানে নয়। প্রশ্নটা হল, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বড়সড় ঘাপলা কোথাও আছে বা হচ্ছে কিনা? বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিলের ঘাপলা তো ওপেন সিক্রেট! কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা কোথায় কখন কোন খাতে কী কাজ করে কত টাকা খরচ দেখাচ্ছেন, সেসব বিষয়েও নজরদারি করা প্রয়োজন।

মফস্বলের কোথায় কোন নির্বাহী প্রকৌশলী বা অন্য কোন কর্মকর্তা রাস্তার গাছের ডাল কেটে মাসে বা বছরে কত টাকার বিল করছেন বা লাইন মেরামত রক্ষণাবেক্ষণের নামেই বা কত টাকা খরচ করছেন অথবা একেকটি বিদ্যুতের খুঁটিতে কত টাকা খরচ হচ্ছে আর সেসব খুঁটি বা বৈদ্যুতিক তার সঠিকভাবে সঠিক স্থানে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা- এসব দেখাশোনা কে বা কারা করছেন, সে প্রশ্নটিও কিন্তু অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ বিদ্যুতের খুঁটি ও তার কালোবাজারে কিনতে পাওয়া যায়! আর বিদ্যুৎ বিভাগের একশ্রেণির লোকই তা করে থাকে।

লেখাটি আর দীর্ঘায়িত না করে উপসংহার টেনে বলতে চাই, সরকারি সংস্থা পিডিবি বিভিন্ন কোম্পানি গঠন করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন ও বিতরণের ক্ষেত্রে কতটুকু সফলতা অর্জন করেছে, দেশের মানুষের কাছে সে বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ ডেসকো, নেসকো এসব কোম্পানির প্রকৌশলী, মিটার রিডারসহ সবাই কিন্তু আমলাতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা তাদের মাধ্যমে সঠিক সেবা পাচ্ছেন এ কথাটি কিন্তু সত্যি নয়।

অন্যথায় এত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেও মানুষকে বিদ্যুৎবঞ্চিত থাকতে হবে কেন? নিশ্চয়ই বিদ্যুৎ লাইন মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি খাতে যেসব অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে বা ব্যয় দেখানো হচ্ছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না অথবা এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা বা গাফিলতি আছে। এক্ষেত্রে যেসব প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে সঠিক ক্যারিয়ার ইত্যাদি বিষয়ও জড়িত। আর তাদের সবাই যদি উপরোক্ত সব গুণেই গুণান্বিত হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে ‘বিদ্যুৎ বিভাগের থলেতে বিড়াল আছে কিনা’ সে বিষয়টিও দেখা প্রয়োজন!

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত