মানব পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে কি?

  মুঈদ রহমান ১২ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানব পাচার একটি অভিশপ্ত কর্ম হলেও এর বয়স শত বছর। বহু বছর ধরে বহু রাষ্ট্র তা প্রতিরোধের শত চেষ্টা করেও সফল হতে পারছে না। বিভিন্ন সময়ে তা আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে থাইল্যান্ডে আবিষ্কৃত হয় পাচারকৃত মানুষের গণকবর। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের পত্রিকাগুলো সরগরম হয়ে উঠেছিল তখন।

আমরা আতঙ্কে শিহরিত হয়েছিলাম এ কারণে যে, ২০০০ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের মানুষ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার নতুন পথ খোঁজে। পাচারকারীরা রুট হিসেবে থাইল্যান্ডকে বেছে নেয়। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশনের রিপোর্ট বলছে, ২০১৩ থেকে ২০১৪- এ এক বছরে বঙ্গোপসাগর দিয়ে মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে পাড়ি জমিয়েছেন ৫৩ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক যা পূর্বের বছরে ছিল মাত্র ৩৩ হাজার। অবৈধভাবে পাড়ি জমানোয় দ্রুত বৃদ্ধির হার স্বাভাবিকভাবেই থাইল্যান্ডে আবিষ্কৃত গণকবর আমাদের ভাবিয়ে তোলে।

তারপর মানব পাচার নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি। এ বছরের গোড়ার দিকে লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো আবারও সোচ্চার হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাচারকারীদের মূল হোতাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। ৬ জুন কাতার সরকার অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে এদেশের জাতীয় সংসদের একজন সদস্যকে গ্রেফতার করে। লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহীদুল ইসলাম পাপুল মানব পাচার সাম্রাজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেন। কুয়েত সরকার বিষয়টিকে এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে যে, স্পষ্টভাবে বলেছে এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না এবং দেশটি এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করেছে। এর আগে আমাদের দেশে মানব পাচারকারী হিসেবে অনেকের নাম এসেছে, তবে একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের জড়িত থাকার ঘটনা এই প্রথম। অর্থ থাকলে দেশে অনেক কিছুই যে সম্ভব, এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ পাপুল। তার কারণে আমাদের রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ৮ জুলাই এক প্রশ্নের উত্তরে সংসদনেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংসদ সদস্য পাপুল ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষকে বিদেশে নিয়ে গেছেন এবং তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন। তিনি দোষী কি না, সেটি তদন্তসাপেক্ষে বোঝা যাবে। বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে যে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন করে, তাতে মানব পাচারের সংজ্ঞাকে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। সে আইনের ৩ (১)-এ তে বলা হয়েছে- ‘মানব পাচার’ অর্থ কোনো ব্যক্তিকে-‘(ক) ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বলপ্রয়োগ করিয়া, বা (খ) প্রতারণা করিয়া বা উক্ত ব্যক্তির আর্থসামাজিক বা পরিবেশগত বা অন্য কোনো অসহায়ত্বকে (uvlnerability) কাজে লাগাইয়া, বা (গ) অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা (kind) লেনদেনপূর্বক উক্ত ব্যক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রহিয়াছে এমন ব্যক্তির সম্মতি গ্রহণ করিয়া; বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা বাহিরে যৌন শোষণ বা নিপীড়ন বা শ্রম শোষণ বা অন্য কোনো শোষণ বা নিপীড়নের (exploitation) উদ্দেশ্যে বিক্রয় বা ক্রয়, সংগ্রহ বা গ্রহণ, নির্বাসন বা স্থানান্তর, চালান বা আটক করা বা লুকাইয়া রাখা বা আশ্রয় দেওয়া (harbor)।’ সুতরাং মানব পাচারের যে সোজাসাপ্টা অর্থ আমরা বুঝি তা থেকে পাপুল সাহেব আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও নীতিমালার আলোকে তিনি নিজেকে মুক্ত করতে পারবেন না।

সংসদ সদস্য পাপুলের মানব পাচারের সংশ্লিষ্টতা প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো নতুনভাবে জেগে ওঠে; প্রকাশিত হতে থাকে মানব পাচারের ভয়ংকর সব তথ্য। সাংবাদিকদের কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে আবেগঘন কথন : ‘সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ। হারিয়ে যাওয়ার বিপদ। মৃত্যুভয়। কোনো কিছুই যেন বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারছে না হতদরিদ্র মানুষকে। মানব পাচারকারীর ফাঁদে পড়ে মৃত্যুকে কবুল করেই তারা ট্রলারে চেপে বসছে। পৌঁছে যেতে চায় স্বপ্নের ঠিকানা মালয়েশিয়ায়। এসব পথেই টেকনাফ-উখিয়াসহ সারা দেশের হাজারও তরুণ, যুবক দেশ ছেড়েছিলেন বছরপাঁচেক আগে। কারও খোঁজ মিলেছে, কারও মেলেনি।’ হাজার হাজার পরিবারের দিন কাটছে এখন কেবলই উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। বিদেশ থেকে টাকা পাওয়া তো দূরে থাক, সন্তানকেই ফিরে পাচ্ছেন না অসহায় মায়েরা। এর শেষ কোথায়, তা জানতে চায় সচেতন মানুষ।

মানব পাচারকারীর একটি বড় ও অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে। তাদের ব্যবহৃত রুটটি সমুদ্র এবং গন্তব্য হল মালয়েশিয়া। এ অঞ্চলের ৩২টিরও বেশি সমুদ্র পয়েন্ট পাচার কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হল কক্সবাজারের কাটাবানিয়া-কচুবানিয়া ঘাট। এটি এতই ব্যবহৃত যে, এ ঘাটটির অলিখিত নামকরণ করা হয়েছে ‘মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট’। এখান থেকে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের পাচার করা হয়ে থাকে। পাচারের প্রক্রিয়াটিও ভয়ংকর। প্রথমে বিনা পয়সার লোভ দেখিয়ে নৌকায় তোলা হয়। মাঝ সমুদ্রে গিয়ে আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে পণ দাবি করা হয়। তারা যদি টাকা দিতে না পারে, তাহলে শারীরিক নির্যাতন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হত্যা করে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়। এত নির্মম কাহিনীর পরও আমরা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারিনি। শোনা গেছে, পাচারকারীরা তাদের আস্তানা পরিবর্তন করে বর্তমানে পাহাড়ে অবস্থান করছে।

আমাদের দেশে একসময় মানব পাচারের অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিচার প্রক্রিয়া ছিল না। অন্য আইনের সহায়তায় বিচার সম্পাদন করা হতো; কিন্তু ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মানব পাচার প্রতিরোধে একটি পরিষ্কার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের অধীন অপরাধগুলো আমলযোগ্য, আপসের অযোগ্য এবং জামিন-অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শাস্তির বিধানগুলো লক্ষ করলে দেখা যাবে ৬ ধারায় বলা আছে, মানব পাচারের জন্য অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কমপক্ষে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে; ৭ ধারা অনুসারে সংঘবদ্ধ মানব পাচার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কমপক্ষে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা আছে; আপনি যদি ওই কর্মে কোনো ধরনের প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র বা চেষ্টা চালানোর সঙ্গে জড়িত থাকেন তাহলে ৮ ধারা অনুসারে আপনার অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে; ৯ ধারায় যা বলা আছে তা হল, জবরদস্তি বা দাসত্বমূলক শ্রম বা সেবা প্রদান করতে বাধ্য করলে অনধিক ১২ বছর যার মধ্যে কমপক্ষে ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড; ১১ ধারা অনুসারে কেউ যদি কোনো ব্যক্তিকে পতিতাবৃত্তি বা অন্য কোনো যৌন শোষণের জন্য আমদানি বা স্থানান্তর করে তাহলে ৭ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

সুতরাং মানব পাচার প্রতিরোধে আইনগত সুরক্ষা সন্তোষজনকভাবেই লিপিবদ্ধ আছে। আইনটিতে মানব পাচারের শিকার এমন ব্যক্তির প্রতি সরকারের করণীয় সম্পর্কেও বলা হয়েছে। যেমন ৩২ (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ, উদ্ধার, প্রত্যাবাসন এবং পুনর্বাসনকল্পে বিধি দ্বারা কর্মপ্রণালি তৈরি করবে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করবে।’ আবার ধারা ৩৩ (১)তে বলা আছে, ‘কোনো বাংলাদেশি নাগরিক অন্য কোনো দেশে মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হলে, সরকার সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের এবং প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় উক্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়ার সূচনা করবে।’ সুতরাং মানব পাচাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের যাবতীয় আইনি সমর্থন আমাদের নীতিমালায় আছে; কিন্তু তারপরও মানব পাচারের গতি প্রতিহত করা যাচ্ছে না কেন- এ প্রশ্ন সব মহলে। এর উত্তরে যে কথা বলা যায়, তা হল প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে শিথিলতা কিংবা আরও শক্ত করে বললে উদাসীনতা অথবা অনীহা। তবে অনেক সমালোচক বলতে চান ক্ষমতাসীনদের সংশ্লিষ্টতা।

শেষের পর্যবেক্ষণটি যথার্থ বলার অনেক যুক্তি আছে। যদি এ মুহূর্তের বাংলাদেশের কথা বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে করোনাভাইরাসের আক্রমণে আমরা দিশেহারা; করোনা পরীক্ষার সরঞ্জামাদিতে মান রক্ষা না করায় দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ; ইতালিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে করোনার ভুয়া সনদ দেয়া এবং ৯ জুলাই ইতালির পত্রিকাগুলোয় তা ফলাও করে ছাপা; করোনা পরীক্ষায় অনিয়মের দায়ে রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া- এসব অনিয়ম-অনাচার কি কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব? কখনোই নয়। একটি অন্যায় যে কেউ হঠাৎ করে ফেলতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগসাজশ ছাড়া দিনের পর দিন অন্যায় করা অসম্ভব।

বিএনপি কায়দায় আমরা সরকারের সমালোচনা করতে চাই না; কিন্তু এ কথাও মানতে হবে, পর্যাপ্ত আইন, পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থাকা সত্ত্বেও কেন তা বাস্তবায়ন-অযোগ্য হয়ে পড়ছে, এর দায় তো সরকারকে নিতেই হবে। আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার এদেশ থেকে মানব পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্তির একটি শপথ নেবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত