শিক্ষকদের করোনাকালীন দুর্দশা লাঘবে করণীয়

  ড. মাহবুব লিটু ও আরিফুর রহমান ১২ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষকতা পৃথিবীর সবচেয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী পেশা। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব এবং গবেষণায় প্রমাণিত। ২০১৯ সালের শিক্ষক মঙ্গল সূচক অনুযায়ী ৭২ শতাংশ শিক্ষক মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করেন। ৭৮ শতাংশ শিক্ষকের মধ্যে কোনো না কোনো আচরণগত, মানসিক বা শারীরিক সমস্যা দেখা যায়। জাতি গঠনে এরূপ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের প্রকৃত মর্যাদা কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? যুক্তরাজ্যের এক সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালে শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটেছে, যা আমাদের শিক্ষকদের নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। শিক্ষক যদি ঠিক না থাকেন, তবে শিক্ষাব্যবস্থাও ঠিক থাকবে না। এ কারণে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় শিক্ষকদের মানসিক অবস্থার উন্নতিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার পদক্ষেপ জরুরি? প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের চেয়ে উত্তম কিছু নেই। জাতি গড়ার সুনিপুণ কারিগর এই শিক্ষকদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমেরিকার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হেনরি এডামস বলেছিলেন, ‘একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলে, কেউ বলতে পারে না তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়।’ ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকারবিষয়ক সম্মেলনে সমাজের প্রতি শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের বেতন, পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তাসহ সব সুযোগ-সুবিধা স্বাভাবিক সময়ের মতো যে কোনো দুর্যোগেও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

একটা সময় পর্যন্ত আমাদের দেশের শিক্ষকদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। ভগ্ন কুটির, অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে শীর্ণ দেহে শিক্ষার আলো ছড়ানোয় ব্যস্ত শিক্ষক সমাজের এই চিত্র ছিল স্বাভাবিক বিষয়। এজন্যই আশরাফ সিদ্দিকী তার ‘তালেব মাস্টার’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আমি যেন সেই ভাগ্যাহত বাতিওয়ালা/ পথে পথে আলো দিয়ে বেড়াই/ কিন্তু নিজের জীবনেই অন্ধকার মালা।’

বিগত এক দশকে, বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্বে শিক্ষকদের পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটতে শুরু করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদার উন্নতি ঘটেছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সেই ধারাবাহিকতায় ছন্দপতন ঘটেছে বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে। ১৮ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কবে খুলবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তায় চার কোটি শিক্ষার্থীর পড়ালেখা একদিকে বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে শিক্ষকদের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ অমানিশা। ফলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পড়েছে হুমকির মুখে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সামাজিক মাধ্যমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী ছাড়া আর কোনো শিক্ষক-কর্মচারী ভালো নেই। কিন্ডারগার্টেন স্কুল, জাতীয়করণ না হওয়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা করোনাকালীন দুর্যোগে দুঃসহ জীবন অতিবাহিত করছেন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের বেতন-ভাতা দিয়ে চলে। করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন নিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। অধিকাংশ অভিভাবকেরই এখন বেতন দেয়ার সামর্থ্য নেই। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা বিগত কয়েক মাস ধরে কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এমনিতেই তারা স্বল্প বেতন পেতেন, সেই বেতন বন্ধ হওয়ায় এবং বাড়তি কাজ হিসেবে টিউশন ও কোচিং করিয়ে যে অর্থ আয় করতেন সেসব বন্ধ হওয়ায় তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে অনেকেই জীবিকা পরিবর্তন করছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিক্ষকদের দুর্দশার চিত্র উঠে আসছে। জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজের অনেকে পেটের দায়ে কৃষিকাজ করছেন, ভ্যান চালাচ্ছেন, ইজিবাইক চালাচ্ছেন, ফল ও সবজি বিক্রি করছেন, ভেটেরিনারি ওষুধ বিক্রি করছেন, রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন। শহর ছেড়ে অনেকে চলে গেছেন গ্রামে। কী করে সংসার চালাবেন এই চিন্তায় দিন দিন মুষড়ে পড়ছেন বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা। অর্থবিত্ত না থাকলেও শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা আছে। এ কারণে লজ্জায় তারা ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে বা মানুষের কাছে হাত পাততে পারছেন না।

দেশে ৬০ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে। এই স্কুলগুলোয় ৬ লাখের বেশি শিক্ষক কর্মরত। আছে কয়েক লাখ কর্মচারীও। মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন সংগ্রহ করতে পারছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। ফলে বেতন পাচ্ছেন না শিক্ষকরা। কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোয় শিক্ষকদের বেতন এমনিতেই খুব কম। তারা মূলত প্রাইভেট টিউশন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু করোনার কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা পড়েছেন বিপাকে। দেশের অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেনই চলে ভাড়া বাসায়। কিন্তু করোনার কারণে বাসা ভাড়া না দিতে পেরে ইতোমধ্যে অনেক স্কুল বিক্রি হয়ে গেছে। ফলে এসব স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরি হারাচ্ছেন।

এবার আসি প্রাথমিক শিক্ষক প্রসঙ্গে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ৩৬ হাজার ১৬০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে এবং দীর্ঘ ৪০ বছর পর ২০১৩ সালে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। কিন্তু বাদ পড়ে যায় ৪ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়। করোনার দুর্যোগে চরম বিপদে আছেন এসব বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী। রোজগারহীন হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন তারা। দেশের স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদেরও একই অবস্থা, ৪ হাজার ৩১২টি মাদ্রাসার ২১ হাজার শিক্ষক দুঃসহ জীবনযাপন করছেন।

করোনার করাল থাবা থেকে বাদ পড়েননি দেশের স্কুল-কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকরাও। দেশে ৭ হাজার নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ৮০ হাজার শিক্ষকসহ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন হিসেবে কর্মরত কয়েক লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। ৩৫২টি অনার্স-মাস্টার্স কলেজে রয়েছে নন-এমপিও ১০ হাজারের বেশি শিক্ষক। করোনার কারণে বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী পরিবার-পরিজন নিয়ে অতি কষ্টে দিন পার করছেন। অনেক বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কমিয়েছে, আবার অনেককে ছাঁটাই করেছে। করোনা পরিস্থিতিতে সরকার কিছু উদ্যোগ নিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সরকার ইতোমধ্যে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে ৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। শিক্ষকদের এককালীন ৫ হাজার ও কর্মচারীদের আড়াই হাজার টাকা দেয়া হবে। অন্যান্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অল্পবিস্তর সহায়তা করা হয়েছে। যেখানে তিন মাসের বেশি সময় ধরে শিক্ষকরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না, টিউশন বন্ধ; সেখানে এই টাকা, এই সহায়তা খুবই সামান্য।

শিক্ষকদের এ দুর্দশা লাঘব ছাড়া গুণগত শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। তাই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে সর্বাগ্রে এই শিক্ষকদের দুর্দশা লাঘব করতে হবে। সরকারের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার আগ পর্যন্ত জাতি গঠনের কারিগরদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রয়োজনে মাসিক বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বিনা সুদে ঋণ হিসেবে দেয়া যেতে পারে। গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নানা ধরনের প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র শিক্ষা এর বাইরে থেকে গেছে। শুধু করোনাকালীন প্রণোদনাই নয়, শিক্ষকদের উন্নয়নে নিতে হবে দুর্দশা লাঘবের টেকসই উদ্যোগ। কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোয় শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে সরকারি তত্ত্বাবধান ও অর্থ সহায়তার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বিদ্যমান সব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাকে দ্রুত জাতীয়করণের উদ্যোগ নিতে হবে। এখন সময়ের দাবি সম্পূর্ণ মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা। একই সঙ্গে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করার পাশাপাশি যেসব কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষকরা এমপিওভুক্ত নন, তাদেরও এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া উচিত। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের নামে প্রায়ই অর্থ লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া যায়। এটা যদি নিয়ন্ত্রণ করা যেত, হয়তো এসব প্রতিষ্ঠান আরও কয়েক মাস শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারত।

করোনা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে, অনেক দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতাগুলোও আমরা বুঝতে পেরেছি। এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে আমাদের ঢেলে সাজাতে হবে যেন যত দুর্যোগই আসুক, আমাদের শিক্ষক সমাজকে আর দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হবে না। তাহলেই আমরা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যেমে টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

ড. মাহবুব লিটু : সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরিফুর রহমান : শিক্ষক, আইইআর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত