চুনোপুঁটি হাজতে, রাঘববোয়ালরা কোথায়?
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
চুনোপুঁটি হাজতে, রাঘববোয়ালরা কোথায়?

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্বে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে একটি; কিন্তু বাংলাদেশে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে দুটি। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মাহমারীটির নাম করোনাভাইরাস। এটি সংক্ষেপে কোভিড-১৯ নামেও পরিচিত। আর বাংলাদেশে একসঙ্গে যে দুটি মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে তা হচ্ছে করোনা ও দুর্নীতি। বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো প্রাণসংহারী করোনাকে সামাল দিতে বেসামাল হয়ে পড়েছে।

এখন পর্যন্ত ৬ লক্ষাধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন দেড় কোটিরও বেশি মানুষ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা রাতদিন পরিশ্রম করেও এ বিচিত্র চরিত্রের ভাইরাসকে বশে আনতে পারেননি। হয়তো এক সময় এর টিকা ও ওষুধ আবিষ্কৃত হবে। তবে ততদিন আরও কত মানুষকে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে, তা আমরা জানি না।

সাধারণ দুর্নীতি আর করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতির মধ্যে কিছু বিষয়ে মিল আছে। উভয় ধরনের দুর্নীতি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশে সাধারণ দুর্নীতি বৃদ্ধির কারণ হল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে আসা, ‘অধিক উন্নয়ন ও স্বল্প গণতন্ত্র’ নীতির ওপর চলা, একতরফা নির্বাচন, ইসির দুর্বলতা, সংসদীয় দুরবস্থা, দলীয়করণকৃত আমলাতন্ত্র, মন্ত্রিসভায় পেশাদারিত্বের অভাব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুদকের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে দুর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তি বিধানে গড়িমসি করা ইত্যাদি।

আর করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতি বৃদ্ধির পেছনে এসব কারণের পরোক্ষ সক্রিয়তা থাকলেও পৃথকভাবে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার না করা, ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ম-শৃঙ্খলা না মানা, স্বাস্থ্য অধিদফতরে সুশাসন না থাকা, যত্রতত্র হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি দেয়া, যোগ্য শিক্ষকের ব্যবস্থা না করে মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা, হাসপাতালের সক্ষমতা বিচার না করে করোনা চিকিৎসার অনুমতি দেয়া ইত্যাদি।

স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে চলমান শোরগোল নতুন কিছু নয়। করোনা আবির্ভাবের আগে কি স্বাস্থ্য বিভাগ দুর্নীতিমুক্ত ছিল? তখন কি হাসপাতালের অধিকাংশ ডাক্তার রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন? সরকারি ডাক্তাররা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতেন না? মহামান্য রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় সান্ধ্যকালীন কোর্স প্রবর্তনের সমালোচনা করে এমন কোর্স বন্ধ করতে উপদেশ দিয়েছেন। আমি তার এ সমালোচনাকে অত্যন্ত যৌক্তিক মনে করি। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে ডাক্তারদের নিয়ম-নীতির মধ্যে আনতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কর্তৃক উদ্যোগ গৃহীত হতে দেখি না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, ঔষধ প্রশাসন, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রশাসন ঘিরে দুর্নীতির সিন্ডিকেট ও নৈরাজ্য দমনে উদ্যোগ নেই। গত ৪৯ বছরে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের লক্ষ্যে কিছুই করা হয়নি। শুধু এরশাদ আমলে এ খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়। প্রেসার গ্রুপ হিসেবে বিএমএ যথেষ্ট শক্তিশালী। এ কারণে সব সরকার, বিশেষ করে দুর্বল সরকারগুলো ডাক্তারদের না চটিয়ে তাদের সমর্থন পেতে চান।

আর এ সুযোগে ডাক্তার ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও গড়ে তোলেন দুর্নীতির সিন্ডিকেট। ২০১৮ সালে দুদকের এক তদন্তে দেখা যায় ২০০৯-২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগের টিকিট বিক্রির ৬০ লাখ টাকা সরকারি হিসাবে জমা না দিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের সিন্ডিকেট কীভাবে আত্মসাৎ করে (প্রথম আলো, ১৮.০৯.২০১৮)।

আরও আগে একই হাসপাতালের ওপর টিআইবি পরিচালিত একটি ডায়াগনস্টিক স্টাডিতে ট্রলি ব্যবহার, সিট বরাদ্দ, কেবিন বরাদ্দ, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ থেকে শুরু করে হাসপাতালের প্রতিটি ক্ষেত্রের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়। সব সরকারের আমলে ডাক্তার আর কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির উদাহরণ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ হাজার ডাক্তার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলে কতিপয় স্বাচিপ নেতা ও এক মন্ত্রীর দু’জন নিকটাত্মীয় নিয়োগ বাণিজ্যে নামেন। তারা চাকরিপ্রার্থী ডাক্তারদের কাছ থেকে তালিকা করে মাথাপিছু ১ থেকে ২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। ২০১০ সালে ঢামেকে ১৭১ জন তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে ১২ হাজার দরখাস্ত জমা পড়ায় শুরু হয় তদবির।

এ নিয়োগে ৫ হাজার সুপারিশকারীদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রী, এমপি, সচিব, বিএমএ নেতা, স্বাচিপ নেতা, কর্মচারী সমিতি নেতাসহ আরও অনেকে। একপর্যায়ে নিয়োগ ও তদবিরের তীব্র চাপে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ২০১০ সালে ৬ হাজার ১৩৩টি স্বাস্থ্য সহকারী পদে চাকরির লিখিত পরীক্ষায় ৪ লাখ আবেদনকারী অংশ নেন। এ নিয়োগে ২০ হাজার পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ দেখিয়ে যাবতীয় নিয়মনীতি ভেঙে মাথাপিছু ২-৫ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ১২০ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়।

বিষয়টি জানাজানি হলে সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মানিকগঞ্জ, বগুড়া, ময়মনসিংহ, পঞ্চগড়সহ কতিপয় জেলায় সিভিল সার্জন অফিস ভাংচুর করা হয়। স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ চিত্র যখন এমন, তখন করোনার জন্য বরাদ্দ, ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় দুর্নীতি হওয়া স্বাভাবিক।

পৃথিবীর কতিপয় দেশে করোনাসামগ্রী ক্রয়, উৎপাদন, রোগী ভর্তি, ইত্যাদি নিয়ে দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। নিুমানের করোনা পরীক্ষা কিট ক্রয়ের কারণে জিম্বাবুয়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী চাকরি হারিয়েছেন। তবে করোনা দুর্নীতিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এ দেশে করোনার ত্রাণ চুরি থেকে শুরু করে করোনার সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা না করে ভুয়া সনদপত্র বিক্রি করে একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করেছে।

এতে একদিকে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে, অন্যদিকে বহির্বিশ্বে ক্ষুণ্ন হয়েছে দেশের ভাবমূর্তি। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত গত ৬ জুলাই রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে বিনা লাইসেন্সে অবৈধভাবে হাসপাতাল পরিচালনা ও ভুয়া করোনা সনদপত্র বিক্রির কারণে হাসপাতালটি সিলগালা করে দেন। মামলাও করেন উত্তরা পশ্চিম থানায় ১৭ জনকে আসামি করে। এ অবস্থায় দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ‘বিগ বিজনেস ইন বাংলাদেশ: সেলিং ফেক করোনাভাইরাস সার্টিফিকেট’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ম্লান করার জন্য এর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কাজ আর কী হতে পারে?

একই কাজ করেছে জেকেজি হেলথ কেয়ার। এ প্রতিষ্ঠানটিরও বৈধতা ছিল না। অথচ অখ্যাত, অবৈধ ট্রেড লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানটি করোনার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করার মতো সেনসিটিভ কাজ বাগিয়ে নেয়। জেকেজির সিইও-র স্ত্রী ডা. সাবরিনা চৌধুরী মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কতিপয় কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে এ কাজ জোগাড় করেন।

প্রথমে তিতুমীর কলেজে একটি বুথ বসানোর কথা থাকলেও পরে এরা নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর ও নরসিংদীতে বুথ বসিয়ে মাঠকর্মীদের মাধ্যমে প্রতিদিন ৫-৬শ’ নমুনা সংগ্রহ করে। সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা না করে মিথ্যা সনদপত্র সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি দেশে করোনা বিস্তারে ভূমিকা রাখে। তাছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিনা মূল্যে করোনা পরীক্ষার নির্দেশনা উপেক্ষা করে এরা মাথাপিছু ৫ হাজার টাকা এবং বিদেশিদের কাছ থেকে ১০০ ডলার ফি নেয়।

এভাবে এরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলে ডিবির কাছে রিমান্ডে স্বীকার করেন আরিফ ও সাবরিনা চৌধুরী। ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রিমান্ডে ডা. সাবরিনা করোনা দুর্নীতিতে সহায়তাকারী কতিপয় গডফাদারের নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক সচিব, দু’জন অতিরিক্ত সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তি, একজন পরিচালক এবং স্বাচিপ ও বিএমএর চারজন চিকিৎসক। এদের কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না? কেন এদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না?

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মানিত সদস্যরা কি পারবেন এদের নাম প্রকাশ করে এসব দুর্নীতিবাজ প্রশাসক ও ডাক্তারের মুখোশ উন্মোচন করতে? নাগরিক সমাজ বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তি ধ্বংসকারী এসব দুর্নীতিবাজের নাম জানাতে চায়। অন্যদিকে প্রতারক সাহেদ করিম ১০ দিনের রিমান্ড চলাকালীন ঢাকা মহানগর উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে করোনা দুর্নীতি ছাড়াও রয়েছে জালিয়াতি ও সুন্দরী নারীঘটিত নানা কেলেঙ্কারির ঘটনা।

আমরা ভুলে যাইনি, গত বছর টেন্ডার ডন জি কে শামীমকে নিয়ে কিছুদিন মাতামাতির পর সেই ইস্যু এখন ধীর প্রক্রিয়ায় চলছে। এরপর আলোচনা হয়েছে ক্যাসিনো সম্রাট খালেদকে নিয়ে। এ বছর যুব মহিলা লীগের শামীমা নূর পাপিয়া গ্রেফতার হলে তাকে নিয়ে আবার মিডিয়া উত্তপ্ত হয়। ক্রমান্বয়ে সে ইস্যুও থিতু হয়ে গেছে। এখন সামনে এসেছে সাহেদ করিম ও ডা. সাবরিনা আরিফ। কিন্তু এ শামীম, খালেদ, পাপিয়া, সাহেদ ও সাবরিনারা একদিনে এমন পর্যায়ে আসেননি। যারা এদের প্রশ্রয় দিয়ে গড়ে তুলেছেন তারা হলেন দুর্নীতির গডফাদার। তাদের সামনে আনা দরকার। কিন্তু গডফাদাররা সামনে আসতে চান না। তারা আড়ালে থাকতে ভালোবাসেন। এবারও হয়তো তেমনই হবে।

সাহেদ ও সাবরিনাকে নিয়ে মাতামাতি চলবে আর তাদের গডফাদাররা থাকবেন অন্তরালে। আর কিছুদিন পর এ ঘটনাও ক্রমান্বয়ে স্তিমিত হয়ে আসবে। বর্তমান সরকারের সুবিধাভোগীদের অনেকে সাহেদ-সাবরিনার করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতিকে ম্রিয়মাণ করার লক্ষ্যে অন্য কতিপয় দেশের করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতি তুলে ধরছেন।

কিন্তু নাগরিক সমাজ মনে করে, অন্য দেশের করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতিকে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, বাংলাদেশের করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। দুটি কারণে এমন তুলনা কাম্য নয়। প্রথমত, অন্য দেশে করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ বিক্রির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আর দ্বিতীয়ত, অন্য দেশে করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতি হয়েছে স্বাভাবিক সময়ে। আর বাংলাদেশে এ দুর্নীতি ঘটেছে সরকার পরিচালিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ চলাকালীন।

এ সময়ে পর্দার অন্তরাল থাকা দুর্নীতির গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে দুর্নীতি কমবে না। সে ক্ষেত্রে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিণত হবে লোক দেখানো মৌখিক ঘোষণায়।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

দেশপ্রেমের চশমা

চুনোপুঁটি হাজতে, রাঘববোয়ালরা কোথায়?

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
২৫ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্বে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে একটি; কিন্তু বাংলাদেশে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে দুটি। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মাহমারীটির নাম করোনাভাইরাস। এটি সংক্ষেপে কোভিড-১৯ নামেও পরিচিত। আর বাংলাদেশে একসঙ্গে যে দুটি মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে তা হচ্ছে করোনা ও দুর্নীতি। বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো প্রাণসংহারী করোনাকে সামাল দিতে বেসামাল হয়ে পড়েছে।

এখন পর্যন্ত ৬ লক্ষাধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন দেড় কোটিরও বেশি মানুষ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা রাতদিন পরিশ্রম করেও এ বিচিত্র চরিত্রের ভাইরাসকে বশে আনতে পারেননি। হয়তো এক সময় এর টিকা ও ওষুধ আবিষ্কৃত হবে। তবে ততদিন আরও কত মানুষকে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে, তা আমরা জানি না।

সাধারণ দুর্নীতি আর করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতির মধ্যে কিছু বিষয়ে মিল আছে। উভয় ধরনের দুর্নীতি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশে সাধারণ দুর্নীতি বৃদ্ধির কারণ হল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে আসা, ‘অধিক উন্নয়ন ও স্বল্প গণতন্ত্র’ নীতির ওপর চলা, একতরফা নির্বাচন, ইসির দুর্বলতা, সংসদীয় দুরবস্থা, দলীয়করণকৃত আমলাতন্ত্র, মন্ত্রিসভায় পেশাদারিত্বের অভাব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুদকের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে দুর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তি বিধানে গড়িমসি করা ইত্যাদি।

আর করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতি বৃদ্ধির পেছনে এসব কারণের পরোক্ষ সক্রিয়তা থাকলেও পৃথকভাবে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার না করা, ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ম-শৃঙ্খলা না মানা, স্বাস্থ্য অধিদফতরে সুশাসন না থাকা, যত্রতত্র হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি দেয়া, যোগ্য শিক্ষকের ব্যবস্থা না করে মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা, হাসপাতালের সক্ষমতা বিচার না করে করোনা চিকিৎসার অনুমতি দেয়া ইত্যাদি।

স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে চলমান শোরগোল নতুন কিছু নয়। করোনা আবির্ভাবের আগে কি স্বাস্থ্য বিভাগ দুর্নীতিমুক্ত ছিল? তখন কি হাসপাতালের অধিকাংশ ডাক্তার রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন? সরকারি ডাক্তাররা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতেন না? মহামান্য রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় সান্ধ্যকালীন কোর্স প্রবর্তনের সমালোচনা করে এমন কোর্স বন্ধ করতে উপদেশ দিয়েছেন। আমি তার এ সমালোচনাকে অত্যন্ত যৌক্তিক মনে করি। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে ডাক্তারদের নিয়ম-নীতির মধ্যে আনতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কর্তৃক উদ্যোগ গৃহীত হতে দেখি না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, ঔষধ প্রশাসন, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রশাসন ঘিরে দুর্নীতির সিন্ডিকেট ও নৈরাজ্য দমনে উদ্যোগ নেই। গত ৪৯ বছরে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের লক্ষ্যে কিছুই করা হয়নি। শুধু এরশাদ আমলে এ খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়। প্রেসার গ্রুপ হিসেবে বিএমএ যথেষ্ট শক্তিশালী। এ কারণে সব সরকার, বিশেষ করে দুর্বল সরকারগুলো ডাক্তারদের না চটিয়ে তাদের সমর্থন পেতে চান।

আর এ সুযোগে ডাক্তার ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও গড়ে তোলেন দুর্নীতির সিন্ডিকেট। ২০১৮ সালে দুদকের এক তদন্তে দেখা যায় ২০০৯-২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগের টিকিট বিক্রির ৬০ লাখ টাকা সরকারি হিসাবে জমা না দিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের সিন্ডিকেট কীভাবে আত্মসাৎ করে (প্রথম আলো, ১৮.০৯.২০১৮)।

আরও আগে একই হাসপাতালের ওপর টিআইবি পরিচালিত একটি ডায়াগনস্টিক স্টাডিতে ট্রলি ব্যবহার, সিট বরাদ্দ, কেবিন বরাদ্দ, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ থেকে শুরু করে হাসপাতালের প্রতিটি ক্ষেত্রের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়। সব সরকারের আমলে ডাক্তার আর কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির উদাহরণ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ হাজার ডাক্তার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলে কতিপয় স্বাচিপ নেতা ও এক মন্ত্রীর দু’জন নিকটাত্মীয় নিয়োগ বাণিজ্যে নামেন। তারা চাকরিপ্রার্থী ডাক্তারদের কাছ থেকে তালিকা করে মাথাপিছু ১ থেকে ২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। ২০১০ সালে ঢামেকে ১৭১ জন তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে ১২ হাজার দরখাস্ত জমা পড়ায় শুরু হয় তদবির।

এ নিয়োগে ৫ হাজার সুপারিশকারীদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রী, এমপি, সচিব, বিএমএ নেতা, স্বাচিপ নেতা, কর্মচারী সমিতি নেতাসহ আরও অনেকে। একপর্যায়ে নিয়োগ ও তদবিরের তীব্র চাপে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ২০১০ সালে ৬ হাজার ১৩৩টি স্বাস্থ্য সহকারী পদে চাকরির লিখিত পরীক্ষায় ৪ লাখ আবেদনকারী অংশ নেন। এ নিয়োগে ২০ হাজার পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ দেখিয়ে যাবতীয় নিয়মনীতি ভেঙে মাথাপিছু ২-৫ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ১২০ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়।

বিষয়টি জানাজানি হলে সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মানিকগঞ্জ, বগুড়া, ময়মনসিংহ, পঞ্চগড়সহ কতিপয় জেলায় সিভিল সার্জন অফিস ভাংচুর করা হয়। স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ চিত্র যখন এমন, তখন করোনার জন্য বরাদ্দ, ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় দুর্নীতি হওয়া স্বাভাবিক।

পৃথিবীর কতিপয় দেশে করোনাসামগ্রী ক্রয়, উৎপাদন, রোগী ভর্তি, ইত্যাদি নিয়ে দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। নিুমানের করোনা পরীক্ষা কিট ক্রয়ের কারণে জিম্বাবুয়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী চাকরি হারিয়েছেন। তবে করোনা দুর্নীতিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এ দেশে করোনার ত্রাণ চুরি থেকে শুরু করে করোনার সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা না করে ভুয়া সনদপত্র বিক্রি করে একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করেছে।

এতে একদিকে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে, অন্যদিকে বহির্বিশ্বে ক্ষুণ্ন হয়েছে দেশের ভাবমূর্তি। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত গত ৬ জুলাই রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে বিনা লাইসেন্সে অবৈধভাবে হাসপাতাল পরিচালনা ও ভুয়া করোনা সনদপত্র বিক্রির কারণে হাসপাতালটি সিলগালা করে দেন। মামলাও করেন উত্তরা পশ্চিম থানায় ১৭ জনকে আসামি করে। এ অবস্থায় দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ‘বিগ বিজনেস ইন বাংলাদেশ: সেলিং ফেক করোনাভাইরাস সার্টিফিকেট’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ম্লান করার জন্য এর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কাজ আর কী হতে পারে?

একই কাজ করেছে জেকেজি হেলথ কেয়ার। এ প্রতিষ্ঠানটিরও বৈধতা ছিল না। অথচ অখ্যাত, অবৈধ ট্রেড লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানটি করোনার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করার মতো সেনসিটিভ কাজ বাগিয়ে নেয়। জেকেজির সিইও-র স্ত্রী ডা. সাবরিনা চৌধুরী মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কতিপয় কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে এ কাজ জোগাড় করেন।

প্রথমে তিতুমীর কলেজে একটি বুথ বসানোর কথা থাকলেও পরে এরা নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর ও নরসিংদীতে বুথ বসিয়ে মাঠকর্মীদের মাধ্যমে প্রতিদিন ৫-৬শ’ নমুনা সংগ্রহ করে। সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা না করে মিথ্যা সনদপত্র সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি দেশে করোনা বিস্তারে ভূমিকা রাখে। তাছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিনা মূল্যে করোনা পরীক্ষার নির্দেশনা উপেক্ষা করে এরা মাথাপিছু ৫ হাজার টাকা এবং বিদেশিদের কাছ থেকে ১০০ ডলার ফি নেয়।

এভাবে এরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলে ডিবির কাছে রিমান্ডে স্বীকার করেন আরিফ ও সাবরিনা চৌধুরী। ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রিমান্ডে ডা. সাবরিনা করোনা দুর্নীতিতে সহায়তাকারী কতিপয় গডফাদারের নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক সচিব, দু’জন অতিরিক্ত সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তি, একজন পরিচালক এবং স্বাচিপ ও বিএমএর চারজন চিকিৎসক। এদের কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না? কেন এদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না?

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মানিত সদস্যরা কি পারবেন এদের নাম প্রকাশ করে এসব দুর্নীতিবাজ প্রশাসক ও ডাক্তারের মুখোশ উন্মোচন করতে? নাগরিক সমাজ বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তি ধ্বংসকারী এসব দুর্নীতিবাজের নাম জানাতে চায়। অন্যদিকে প্রতারক সাহেদ করিম ১০ দিনের রিমান্ড চলাকালীন ঢাকা মহানগর উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে করোনা দুর্নীতি ছাড়াও রয়েছে জালিয়াতি ও সুন্দরী নারীঘটিত নানা কেলেঙ্কারির ঘটনা।

আমরা ভুলে যাইনি, গত বছর টেন্ডার ডন জি কে শামীমকে নিয়ে কিছুদিন মাতামাতির পর সেই ইস্যু এখন ধীর প্রক্রিয়ায় চলছে। এরপর আলোচনা হয়েছে ক্যাসিনো সম্রাট খালেদকে নিয়ে। এ বছর যুব মহিলা লীগের শামীমা নূর পাপিয়া গ্রেফতার হলে তাকে নিয়ে আবার মিডিয়া উত্তপ্ত হয়। ক্রমান্বয়ে সে ইস্যুও থিতু হয়ে গেছে। এখন সামনে এসেছে সাহেদ করিম ও ডা. সাবরিনা আরিফ। কিন্তু এ শামীম, খালেদ, পাপিয়া, সাহেদ ও সাবরিনারা একদিনে এমন পর্যায়ে আসেননি। যারা এদের প্রশ্রয় দিয়ে গড়ে তুলেছেন তারা হলেন দুর্নীতির গডফাদার। তাদের সামনে আনা দরকার। কিন্তু গডফাদাররা সামনে আসতে চান না। তারা আড়ালে থাকতে ভালোবাসেন। এবারও হয়তো তেমনই হবে।

সাহেদ ও সাবরিনাকে নিয়ে মাতামাতি চলবে আর তাদের গডফাদাররা থাকবেন অন্তরালে। আর কিছুদিন পর এ ঘটনাও ক্রমান্বয়ে স্তিমিত হয়ে আসবে। বর্তমান সরকারের সুবিধাভোগীদের অনেকে সাহেদ-সাবরিনার করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতিকে ম্রিয়মাণ করার লক্ষ্যে অন্য কতিপয় দেশের করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতি তুলে ধরছেন।

কিন্তু নাগরিক সমাজ মনে করে, অন্য দেশের করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতিকে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, বাংলাদেশের করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। দুটি কারণে এমন তুলনা কাম্য নয়। প্রথমত, অন্য দেশে করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ বিক্রির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আর দ্বিতীয়ত, অন্য দেশে করোনাকেন্দ্রিক দুর্নীতি হয়েছে স্বাভাবিক সময়ে। আর বাংলাদেশে এ দুর্নীতি ঘটেছে সরকার পরিচালিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ চলাকালীন।

এ সময়ে পর্দার অন্তরাল থাকা দুর্নীতির গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে দুর্নীতি কমবে না। সে ক্ষেত্রে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিণত হবে লোক দেখানো মৌখিক ঘোষণায়।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]