সুস্থতার জন্য চাই পরিশীলিত জীবনাচরণ
jugantor
সুস্থতার জন্য চাই পরিশীলিত জীবনাচরণ

  সালাহ্উদ্দিন নাগরী  

২৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের গত মাসের খবরমতে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত মহামারীর মধ্যেই চীন সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইউলিন শহরে শেষ হল দশ দিন ধরে কুকুরের মাংস খাওয়ার বার্ষিক উৎসব। এতে হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে এবং প্রচুর মাংস বিক্রি হয়।

মহামারী শুরুর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জনস্বাস্থ্যসম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশিষ্ট অণুজীব বিজ্ঞানীরা বারবার আমাদের স্মরণ ও হুশিয়ার করেছেন পশুপাখি, জীবজন্তু ও বন্যপ্রাণীর ক্লোজ কন্টাক্টে না আসার জন্য; কিন্তু তারপরও মনে হয় যথোপযুক্তভাবে সবার বোধোদয় হয়নি।

এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পশুপাখি ও জীবজন্তু থেকে গত কয়েক দশকে রোগ ছড়াচ্ছে বেশি। এদের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই এসব ভাইরাস থাকে। আর মানুষ এদের সংস্পর্শে এলে সেটি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে সর্দি, কাশি, হাঁচি বা ক্লোজ কন্টাক্টের মাধ্যমে ম্যান টু ম্যান ট্রান্সমিশন হয়ে যায়।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গত ২৫ বছরে যোগ হয়েছে ৩৫টি নতুন রোগ এবং এ পর্যন্ত ১৪০০-র বেশি জীবাণু দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এসব রোগের ৭৫-৮০ শতাংশের জন্ম বিভিন্ন প্রাণী থেকে। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশাল মেডিসিনের জনৈক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ একটি পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিভিন্ন প্রাণী থেকে ছড়ানো রোগগুলোকে বলা হয় ‘জুনোটিক ডিজিজ’।

মানুষের মধ্যে প্রাণী পোষার প্রবণতা যেমন বাড়ছে, একইসঙ্গে এসব প্রাণী থেকে মানুষ ভাইরাসে আরও বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। জীবজন্তু, পশুপাখির সঙ্গে অতিরিক্ত সংশ্রব জুনোটিক ডিজিজ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশ্বজুড়ে মানুষের যাতায়াত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে নানা প্রান্তে।

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজিস্ট দ্রিক ফেইফার বলেন, মানুষ যত বন্য জন্তুর সান্নিধ্যে থাকবে, তাদের দেহের ভাইরাসগুলো তত বেশি মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে থাকবে। জনস্বাস্থ্য ও পশু স্বাস্থ্য নিয়ে ‘ওয়ান হেলথ’ শিরোনামে গত বছরের শেষের দিকে আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর,বি, ইউনিসেফসহ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বলা হয়, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের মানুষ প্রধানত তিন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জীবজন্তু ও পশুপাখি থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আগের চেয়ে বেড়েছে।

জনঘনত্বের কারণে মানুষ ও প্রাণীর আবাসস্থলের মধ্যে এখন তেমন দূরত্ব নেই। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২০০ জন মানুষ ও ৪০০ জীবজন্তু বসবাস করে। জীবজন্তু ও মানুষের অসুখকে তাই আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। খাদ্য ও দৈনন্দিন অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য বন ও জলাশয় ধ্বংসের পাশাপাশি মানুষের যাতায়াত এবং জীবজন্তুর স্থানান্তর বেড়েছে। এতে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, টাঙ্গুয়া হাওরে অতিথি পাখির সংস্পর্শে আসছে স্থানীয় হাঁস বা দেশি পাখি। এতে দুই দিকেই ঝুঁকি বাড়ছে। এ দেশের হাঁসের কোনো রোগ অতিথি পাখির মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়াতে পারে; আবার অতিথি পাখির মাধ্যমে রোগাক্রান্ত হতে পারে এ দেশের পাখি। সরাসরি জীবজন্তু ও পশুপাখির কিছু রোগে যেমন: অ্যানথ্রাক্স, জিকা, নিপাহ, ওয়েস্ট নিল ভাইরাস, সোয়াইন-ফ্লু, বার্ড-ফ্লুতে এখন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। মানুষ সরাসরি পশুপাখির সংস্পর্শে না এলে অনেক সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমবে। তাই গবেষকরা মনে করেন, প্রাণী কিংবা মানবদেহে নতুন কোনো রোগের সংক্রমণ ঘটল কি না, তা নজরদারিতে রাখতে হবে। নতুন ভাইরাসের খোঁজ পাওয়া মাত্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

কিন্তু আমরা বিশ্ববাসী কতটা সতর্ক হয়েছি বা হচ্ছি? অনেক ক্ষেত্রে সতর্কতার বিষয়গুলো আমলেই নেয়া হচ্ছে না। এই তো সেদিনের ঘটনা। করোনাভাইরাস যখন চীনে মহামারী আকার ধারণ করে, তখন রেস্তোরাঁয় বসে এক চীনা নারীর বাদুড়ের স্যুপ খাওয়ার ছবি বিভিন্ন মিডিয়ায় আসে। এমন কী আমাদের দেশেও অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁয় মুরগি, গরু ও খাসির মাংস বলে হারাম পশুপাখির মাংস খাওয়ানোর কথাও শোনা যায়। আমাদের লোভ-লালসার কাছে নীতি-নৈতিকতা মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে।

সভ্যতার চাকা যখন সম্মুখপানে চলছে, তখন আমাদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসের কিছু কিছু বিষয় দেখে মনে হয়, আমরা আদিম যুগে ফিরে যাচ্ছি। অনেক দেশে জ্যান্ত বানরের মাথা কেটে ফুটো করে ভেতরে মসলা-মরিচ দিয়ে আমরা যেভাবে কদবেল খাই, তেমন ওরা বানরের মগজ খাচ্ছে। কুকুর, বিড়াল, সাপ ও বিভিন্ন কীটপতঙ্গ ফুটন্ত পানিতে ছেড়ে দিচ্ছে; ধড়ফড় করা প্রাণীগুলোকে ছুরি দিয়ে কেটে কেটে খাচ্ছে। এ বিষয়গুলো দেখলে গা ঘিন ঘিন করে। আমরা কোথায় যাচ্ছি? পৃথিবীতে কি ভোজ্য খাদ্যের অভাব পড়েছে? কেন এসব জীবজন্তুকে এভাবে খেতে হবে?

হাদিসে কোন কোন জীবজন্তু ও পশুপাখির মাংস খাওয়া যাবে না, তা উল্লেখ করা আছে। যেসব প্রাণীর দাঁত তীক্ষ্ণ ও ধারালো; নখও অনুরূপ এবং দাঁত ও নখ দিয়ে মাংস ছিঁড়ে খায়, এসব প্রাণীসহ কাক, চিল, প্যাঁচার মাংস খাওয়া হারাম; কিন্তু বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করে অন্য দেশ, জাতি, গোষ্ঠীর মানুষজনের দেখাদেখি আমরাও ওইসব জীবজন্তু ধরছি, শিকার করছি, হাঁড়িতে চড়াচ্ছি এবং নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনছি।

এ ধরনের বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক সচেতন মানুষ আছেন, তারা ভালোমন্দ বিচার-বিবেচনা করছেন। পদ্ধতিগতভাবে জীবনযাপন ও সুষ্ঠু খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তাই তো স্বাস্থ্য সচেতন অনেকেই হালাল খাদ্যের দিকে ঝুঁকছেন। বারাক ওবামা যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, তখন তার স্ত্রী মিশেল ওবামা এক অনুষ্ঠানে ইসলামের হালাল খাদ্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং সবাইকে তা অনুসরণ করারও অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

এখন পোশাকের ফ্যাশনে যে পরিবর্তনগুলো আসছে, তার সবই কি গ্রহণযোগ্য? অনেকেই সংক্ষিপ্ত পোশাক পরছে। শরীরে উল্কি আঁকছে, ভ্রু উৎপাটন করছে। অনেকে শরীরে পোশাকের পেইন্টিং করে বেআবরুভাবে জনসম্মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক সমুদ্রসৈকতে যেমন: ক্যালিফোর্নিয়ার ব্ল্যাকস বিচ, অস্ট্রেলিয়ার লেডি বিচ, গ্রিসের রেড বিচে পোশাক পরে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই। হায়রে নিয়তি!

পৃথিবীর যে দেশগুলোয় মহিলাদের মুখ ঢাকা (হিজাব) নিষিদ্ধ ছিল, ওসব জায়গায় এখন মুখ না ঢাকলে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। পবিত্র কোরআনের ৭নং সূরা আরাফের ২৬নং আয়াতে বলা হয়েছে- হে আদম সন্তান, আমি তোমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ দিয়েছি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার জন্য এবং শোভাবর্ধনের জন্য আর তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম। তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে যে কোনো জনসমাজের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাপন প্রণালি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। অনেক ক্ষেত্রে অন্যরাও তা বাছ-বিচার ছাড়াই গ্রহণ করছে। ফলে বিপদ ঘটছে পদে পদে। তাই নতুন কোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জনে সবাইকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।

শুধুই কি খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক-পরিচ্ছদ? আমাদের জীবনযাপনেও বিভিন্ন জীবজন্তুর নোংরা অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে। আমাদের অনেকেই, বিশেষত শিক্ষিত সমাজে দেশি-বিদেশি কুকুর পালন আভিজাত্যের লক্ষণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তাদের নিয়ে খেলা করা, ঘাড়ে তোলা, আদর করা, চুমো খাওয়া, তাদের নিয়ে জগিং ও হাঁটাহাঁটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এগুলোকে দোষণীয় হিসেবে মনেই করা হচ্ছে না।

বাসাবাড়ি, শস্যক্ষেত্র পাহারা ও শিকারের উদ্দেশ্য ছাড়া উপরোক্ত কারণে কুকুর পালন ইসলাম সমর্থন করে না। সভ্যসমাজে আমরা অনেকেই গৃহকর্মীকে ঠিকভাবে খেতে দিই না। চরম শীতেও তাদের মেঝেতেই ঘুমাতে হয়; আর কুকুর-বিড়ালের জন্য বেহিসেবি অর্থ অপচয় করছি। তাদের জন্য আলাদা ফোমের বিছানা, দামি খাবার, আরও কত আয়োজন! অনেকেই আবার এদের একই বিছানায় বুকের ভেতরে নিয়ে ঘুমাচ্ছে। এভাবে আর কত? পরিশুদ্ধ জীবনযাপন কি নির্বাসনে যাবে? আবার কি আদিম যুগে ফিরে যেতে হবে?

এ যুগে মানুষের জীবনযাপন, শিল্পপ্রযুক্তির উৎকর্ষ ও সভ্যতার বর্তমান অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই- প্রাগৈতিহাসিক যুগে শহর-বন্দর-গ্রাম হিসেবে কোনো এলাকাকে আলাদা করা যেত না। পুরো পৃথিবী ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এবং নদী-নালা, খাল-বিলে ভরপুর। মানুষ গাছের ওপরে বা মাটির গুহায় বসবাস করত। মানুষ উলঙ্গ হয়ে থাকত, শীত-গ্রীষ্মে গাছের ছাল, লতাপাতা ও পশুর চামড়া গায়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিত।

আগুনের ব্যবহার জানার আগে কাঁচা শাকসবজি, ফলমূল ও জীবজন্তুর কাঁচা মাংস খেয়ে জীবন নির্বাহ করত। আগুনের ব্যবহার শেখার পর খাদ্যদ্রব্য আগুনে পুড়িয়ে ঝলসে খেতে শিখল। কৃষিকাজ শিখল, বন-জঙ্গল সাফ করে চাষাবাদের জমি ও আবাসস্থল তৈরি করল, বুনন কাজ শিখল, আত্মমর্যাদা তৈরি হল, নিজের আবরু রক্ষা করা শুরু করল।

তখন কাঁচা শাকসবজি, জীবজন্তুর কাঁচা মাংস খাওয়া ও বেঁচে থাকার জন্য জীবজন্তুর সঙ্গে লড়াইয়ের বিকল্প ছিল না। ধীরে ধীরে মানুষ এগুলোকে অতিক্রম করেছে। প্রতিদিনই মানুষ একটু একটু করে উন্নত হয়েছে, নিজেকে শারীরিকভাবে সুস্থ ও নিরোগ রাখতে এবং রোগবাহী জীবজন্তু এবং পশুপাখির সংশ্রব ও সংশ্লিষ্টতা কমিয়ে এনেছে।

জীবনযাত্রাকে সহজ, আরামদায়ক ও উন্নত করেছে; কিন্তু কেন জানি সভ্যতার অগ্রগতির এ চাকাকে আবার উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। মানবজাতির জীবনযাপনকে বিপদসংকুল, অস্থির ও কঠিন করে তোলা হচ্ছে। নিরোগ, সুস্থ ‘ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন’কে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। লাখো বছরের মানবজাতির অর্জনগুলো নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজিস্ট পেতা হিচেন্স বলেছেন, ভবিষ্যতে প্রাণী থেকে আরও অনেক ভাইরাস মানবদেহে ছড়াতে পারে। তাই আমাদের উচিত সতর্ক হওয়া। কোনো নতুন ভাইরাস সংক্রমণের পর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কীভাবে রোগ সংক্রমণ ঠেকানো যায়, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট গাইডলাইন প্রয়োজন।

বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে ১৫ থেকে ৭৫ বছর পর্যন্ত লেগেছে, কোনোটি এখনও তৈরিই হয়নি। প্রতিষেধক আবিষ্কারের মধ্যবর্তী এ সময়টুকুতে মানবজাতিকে বাঁচতে ও বাঁচাতে হবে, জীবন এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য পরিচ্ছন্ন, পরিশীলিত ও স্বীকৃত জীবনাচরণ ছাড়া কোনো পথ নেই।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

সুস্থতার জন্য চাই পরিশীলিত জীবনাচরণ

 সালাহ্উদ্দিন নাগরী 
২৫ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের গত মাসের খবরমতে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত মহামারীর মধ্যেই চীন সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইউলিন শহরে শেষ হল দশ দিন ধরে কুকুরের মাংস খাওয়ার বার্ষিক উৎসব। এতে হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে এবং প্রচুর মাংস বিক্রি হয়।

মহামারী শুরুর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জনস্বাস্থ্যসম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশিষ্ট অণুজীব বিজ্ঞানীরা বারবার আমাদের স্মরণ ও হুশিয়ার করেছেন পশুপাখি, জীবজন্তু ও বন্যপ্রাণীর ক্লোজ কন্টাক্টে না আসার জন্য; কিন্তু তারপরও মনে হয় যথোপযুক্তভাবে সবার বোধোদয় হয়নি।

এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পশুপাখি ও জীবজন্তু থেকে গত কয়েক দশকে রোগ ছড়াচ্ছে বেশি। এদের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই এসব ভাইরাস থাকে। আর মানুষ এদের সংস্পর্শে এলে সেটি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে সর্দি, কাশি, হাঁচি বা ক্লোজ কন্টাক্টের মাধ্যমে ম্যান টু ম্যান ট্রান্সমিশন হয়ে যায়।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গত ২৫ বছরে যোগ হয়েছে ৩৫টি নতুন রোগ এবং এ পর্যন্ত ১৪০০-র বেশি জীবাণু দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এসব রোগের ৭৫-৮০ শতাংশের জন্ম বিভিন্ন প্রাণী থেকে। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশাল মেডিসিনের জনৈক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ একটি পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিভিন্ন প্রাণী থেকে ছড়ানো রোগগুলোকে বলা হয় ‘জুনোটিক ডিজিজ’।

মানুষের মধ্যে প্রাণী পোষার প্রবণতা যেমন বাড়ছে, একইসঙ্গে এসব প্রাণী থেকে মানুষ ভাইরাসে আরও বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। জীবজন্তু, পশুপাখির সঙ্গে অতিরিক্ত সংশ্রব জুনোটিক ডিজিজ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশ্বজুড়ে মানুষের যাতায়াত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে নানা প্রান্তে।

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজিস্ট দ্রিক ফেইফার বলেন, মানুষ যত বন্য জন্তুর সান্নিধ্যে থাকবে, তাদের দেহের ভাইরাসগুলো তত বেশি মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে থাকবে। জনস্বাস্থ্য ও পশু স্বাস্থ্য নিয়ে ‘ওয়ান হেলথ’ শিরোনামে গত বছরের শেষের দিকে আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর,বি, ইউনিসেফসহ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বলা হয়, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের মানুষ প্রধানত তিন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জীবজন্তু ও পশুপাখি থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আগের চেয়ে বেড়েছে।

জনঘনত্বের কারণে মানুষ ও প্রাণীর আবাসস্থলের মধ্যে এখন তেমন দূরত্ব নেই। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২০০ জন মানুষ ও ৪০০ জীবজন্তু বসবাস করে। জীবজন্তু ও মানুষের অসুখকে তাই আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। খাদ্য ও দৈনন্দিন অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য বন ও জলাশয় ধ্বংসের পাশাপাশি মানুষের যাতায়াত এবং জীবজন্তুর স্থানান্তর বেড়েছে। এতে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, টাঙ্গুয়া হাওরে অতিথি পাখির সংস্পর্শে আসছে স্থানীয় হাঁস বা দেশি পাখি। এতে দুই দিকেই ঝুঁকি বাড়ছে। এ দেশের হাঁসের কোনো রোগ অতিথি পাখির মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়াতে পারে; আবার অতিথি পাখির মাধ্যমে রোগাক্রান্ত হতে পারে এ দেশের পাখি। সরাসরি জীবজন্তু ও পশুপাখির কিছু রোগে যেমন: অ্যানথ্রাক্স, জিকা, নিপাহ, ওয়েস্ট নিল ভাইরাস, সোয়াইন-ফ্লু, বার্ড-ফ্লুতে এখন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। মানুষ সরাসরি পশুপাখির সংস্পর্শে না এলে অনেক সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমবে। তাই গবেষকরা মনে করেন, প্রাণী কিংবা মানবদেহে নতুন কোনো রোগের সংক্রমণ ঘটল কি না, তা নজরদারিতে রাখতে হবে। নতুন ভাইরাসের খোঁজ পাওয়া মাত্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

কিন্তু আমরা বিশ্ববাসী কতটা সতর্ক হয়েছি বা হচ্ছি? অনেক ক্ষেত্রে সতর্কতার বিষয়গুলো আমলেই নেয়া হচ্ছে না। এই তো সেদিনের ঘটনা। করোনাভাইরাস যখন চীনে মহামারী আকার ধারণ করে, তখন রেস্তোরাঁয় বসে এক চীনা নারীর বাদুড়ের স্যুপ খাওয়ার ছবি বিভিন্ন মিডিয়ায় আসে। এমন কী আমাদের দেশেও অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁয় মুরগি, গরু ও খাসির মাংস বলে হারাম পশুপাখির মাংস খাওয়ানোর কথাও শোনা যায়। আমাদের লোভ-লালসার কাছে নীতি-নৈতিকতা মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে।

সভ্যতার চাকা যখন সম্মুখপানে চলছে, তখন আমাদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসের কিছু কিছু বিষয় দেখে মনে হয়, আমরা আদিম যুগে ফিরে যাচ্ছি। অনেক দেশে জ্যান্ত বানরের মাথা কেটে ফুটো করে ভেতরে মসলা-মরিচ দিয়ে আমরা যেভাবে কদবেল খাই, তেমন ওরা বানরের মগজ খাচ্ছে। কুকুর, বিড়াল, সাপ ও বিভিন্ন কীটপতঙ্গ ফুটন্ত পানিতে ছেড়ে দিচ্ছে; ধড়ফড় করা প্রাণীগুলোকে ছুরি দিয়ে কেটে কেটে খাচ্ছে। এ বিষয়গুলো দেখলে গা ঘিন ঘিন করে। আমরা কোথায় যাচ্ছি? পৃথিবীতে কি ভোজ্য খাদ্যের অভাব পড়েছে? কেন এসব জীবজন্তুকে এভাবে খেতে হবে?

হাদিসে কোন কোন জীবজন্তু ও পশুপাখির মাংস খাওয়া যাবে না, তা উল্লেখ করা আছে। যেসব প্রাণীর দাঁত তীক্ষ্ণ ও ধারালো; নখও অনুরূপ এবং দাঁত ও নখ দিয়ে মাংস ছিঁড়ে খায়, এসব প্রাণীসহ কাক, চিল, প্যাঁচার মাংস খাওয়া হারাম; কিন্তু বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করে অন্য দেশ, জাতি, গোষ্ঠীর মানুষজনের দেখাদেখি আমরাও ওইসব জীবজন্তু ধরছি, শিকার করছি, হাঁড়িতে চড়াচ্ছি এবং নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনছি।

এ ধরনের বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক সচেতন মানুষ আছেন, তারা ভালোমন্দ বিচার-বিবেচনা করছেন। পদ্ধতিগতভাবে জীবনযাপন ও সুষ্ঠু খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তাই তো স্বাস্থ্য সচেতন অনেকেই হালাল খাদ্যের দিকে ঝুঁকছেন। বারাক ওবামা যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, তখন তার স্ত্রী মিশেল ওবামা এক অনুষ্ঠানে ইসলামের হালাল খাদ্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং সবাইকে তা অনুসরণ করারও অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

এখন পোশাকের ফ্যাশনে যে পরিবর্তনগুলো আসছে, তার সবই কি গ্রহণযোগ্য? অনেকেই সংক্ষিপ্ত পোশাক পরছে। শরীরে উল্কি আঁকছে, ভ্রু উৎপাটন করছে। অনেকে শরীরে পোশাকের পেইন্টিং করে বেআবরুভাবে জনসম্মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক সমুদ্রসৈকতে যেমন: ক্যালিফোর্নিয়ার ব্ল্যাকস বিচ, অস্ট্রেলিয়ার লেডি বিচ, গ্রিসের রেড বিচে পোশাক পরে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই। হায়রে নিয়তি!

পৃথিবীর যে দেশগুলোয় মহিলাদের মুখ ঢাকা (হিজাব) নিষিদ্ধ ছিল, ওসব জায়গায় এখন মুখ না ঢাকলে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। পবিত্র কোরআনের ৭নং সূরা আরাফের ২৬নং আয়াতে বলা হয়েছে- হে আদম সন্তান, আমি তোমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ দিয়েছি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার জন্য এবং শোভাবর্ধনের জন্য আর তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম। তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে যে কোনো জনসমাজের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাপন প্রণালি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। অনেক ক্ষেত্রে অন্যরাও তা বাছ-বিচার ছাড়াই গ্রহণ করছে। ফলে বিপদ ঘটছে পদে পদে। তাই নতুন কোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জনে সবাইকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।

শুধুই কি খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক-পরিচ্ছদ? আমাদের জীবনযাপনেও বিভিন্ন জীবজন্তুর নোংরা অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে। আমাদের অনেকেই, বিশেষত শিক্ষিত সমাজে দেশি-বিদেশি কুকুর পালন আভিজাত্যের লক্ষণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তাদের নিয়ে খেলা করা, ঘাড়ে তোলা, আদর করা, চুমো খাওয়া, তাদের নিয়ে জগিং ও হাঁটাহাঁটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এগুলোকে দোষণীয় হিসেবে মনেই করা হচ্ছে না।

বাসাবাড়ি, শস্যক্ষেত্র পাহারা ও শিকারের উদ্দেশ্য ছাড়া উপরোক্ত কারণে কুকুর পালন ইসলাম সমর্থন করে না। সভ্যসমাজে আমরা অনেকেই গৃহকর্মীকে ঠিকভাবে খেতে দিই না। চরম শীতেও তাদের মেঝেতেই ঘুমাতে হয়; আর কুকুর-বিড়ালের জন্য বেহিসেবি অর্থ অপচয় করছি। তাদের জন্য আলাদা ফোমের বিছানা, দামি খাবার, আরও কত আয়োজন! অনেকেই আবার এদের একই বিছানায় বুকের ভেতরে নিয়ে ঘুমাচ্ছে। এভাবে আর কত? পরিশুদ্ধ জীবনযাপন কি নির্বাসনে যাবে? আবার কি আদিম যুগে ফিরে যেতে হবে?

এ যুগে মানুষের জীবনযাপন, শিল্পপ্রযুক্তির উৎকর্ষ ও সভ্যতার বর্তমান অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই- প্রাগৈতিহাসিক যুগে শহর-বন্দর-গ্রাম হিসেবে কোনো এলাকাকে আলাদা করা যেত না। পুরো পৃথিবী ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এবং নদী-নালা, খাল-বিলে ভরপুর। মানুষ গাছের ওপরে বা মাটির গুহায় বসবাস করত। মানুষ উলঙ্গ হয়ে থাকত, শীত-গ্রীষ্মে গাছের ছাল, লতাপাতা ও পশুর চামড়া গায়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিত।

আগুনের ব্যবহার জানার আগে কাঁচা শাকসবজি, ফলমূল ও জীবজন্তুর কাঁচা মাংস খেয়ে জীবন নির্বাহ করত। আগুনের ব্যবহার শেখার পর খাদ্যদ্রব্য আগুনে পুড়িয়ে ঝলসে খেতে শিখল। কৃষিকাজ শিখল, বন-জঙ্গল সাফ করে চাষাবাদের জমি ও আবাসস্থল তৈরি করল, বুনন কাজ শিখল, আত্মমর্যাদা তৈরি হল, নিজের আবরু রক্ষা করা শুরু করল।

তখন কাঁচা শাকসবজি, জীবজন্তুর কাঁচা মাংস খাওয়া ও বেঁচে থাকার জন্য জীবজন্তুর সঙ্গে লড়াইয়ের বিকল্প ছিল না। ধীরে ধীরে মানুষ এগুলোকে অতিক্রম করেছে। প্রতিদিনই মানুষ একটু একটু করে উন্নত হয়েছে, নিজেকে শারীরিকভাবে সুস্থ ও নিরোগ রাখতে এবং রোগবাহী জীবজন্তু এবং পশুপাখির সংশ্রব ও সংশ্লিষ্টতা কমিয়ে এনেছে।

জীবনযাত্রাকে সহজ, আরামদায়ক ও উন্নত করেছে; কিন্তু কেন জানি সভ্যতার অগ্রগতির এ চাকাকে আবার উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। মানবজাতির জীবনযাপনকে বিপদসংকুল, অস্থির ও কঠিন করে তোলা হচ্ছে। নিরোগ, সুস্থ ‘ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন’কে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। লাখো বছরের মানবজাতির অর্জনগুলো নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজিস্ট পেতা হিচেন্স বলেছেন, ভবিষ্যতে প্রাণী থেকে আরও অনেক ভাইরাস মানবদেহে ছড়াতে পারে। তাই আমাদের উচিত সতর্ক হওয়া। কোনো নতুন ভাইরাস সংক্রমণের পর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কীভাবে রোগ সংক্রমণ ঠেকানো যায়, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট গাইডলাইন প্রয়োজন।

বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে ১৫ থেকে ৭৫ বছর পর্যন্ত লেগেছে, কোনোটি এখনও তৈরিই হয়নি। প্রতিষেধক আবিষ্কারের মধ্যবর্তী এ সময়টুকুতে মানবজাতিকে বাঁচতে ও বাঁচাতে হবে, জীবন এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য পরিচ্ছন্ন, পরিশীলিত ও স্বীকৃত জীবনাচরণ ছাড়া কোনো পথ নেই।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]