স্টক মার্কেটে ফ্লোর প্রাইস বিতর্কের সমাধান কোথায়

  শফিকুল ইসলাম ২৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবকালে শেয়ার মার্কেটের ক্রমাগত দরপতন ঠেকাতে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন ১৯ মার্চ থেকে ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। সে ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত দামের নিচে কোনো কোম্পানির শেয়ার ট্রেড হওয়া রহিত করা হয়, যদিও দামের ঊর্ধ্বমুখী গমনে কোনো বাধা নেই।

ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা প্রবর্তনের কয়েক দিন পরই করোনাজনিত কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণা ও লকডাউনের ফলে দেশের উভয় শেয়ারবাজার দুই মাসের বেশি বন্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পৌনে দুই মাসের মতো মার্কেটে লেনদেন চলেছে। সে অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

অধিকাংশ কোম্পানির ট্রেড নেই বা হলেও ফ্লোর প্রাইসে অতি নগণ্যসংখ্যক ট্রেড সম্পাদিত হচ্ছে। ফ্লোর প্রাইস প্রবর্তনপূর্ব সময়ে যেখানে গড়ে দৈনিক ৫০০ কোটি টাকার ওপরে ট্রেড হতো, তা কমে প্রথম কয়েক সপ্তাহে ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি নেমে আসে। অবশ্য বিগত দুই সপ্তাহে লেনদেন বেড়ে তা দৈনিক গড়ে ২০০ কোটি টাকার ওপরে গেছে। সে অঙ্কটিও মার্কেট সচল রাখার জন্য মোটেই পর্যাপ্ত নয়।

ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে-বিপক্ষে বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেট সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা বর্তমানে চরমভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। ফ্লোর প্রাইস বাতিলের পক্ষে যারা, তাদের বক্তব্য হল এটি মার্কেটের চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। তাছাড়া এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মার্কেট থেকে চলে যাচ্ছে।

অধিকন্তু স্বল্প ট্রেডের ফলে সৃষ্ট অপর্যাপ্ত কমিশন দিয়ে ব্রোকার হাউসগুলোর পরিচালনা ব্যয়ও মিটছে না; যার পরিণামে অচিরেই অনেক হাউস বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সেরূপ হলে দেশের স্টক ট্রেডিং সিস্টেম মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বিধায় ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা অবিলম্বে বাতিল করা উচিত মর্মে সে পক্ষের অভিমত।

অপরদিকে হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীসহ অনেক স্টেকহোল্ডার মনে করেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস পরিস্থিতি যেভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দারুণ অচলাবস্থা তৈরি করে চলেছে, সে অবস্থায় বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা তুলে দিলে শেয়ার মার্কেটে চরম ধস নামবে; তা বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাকে আরও প্রকট করে তুলবে।

এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরেই মন্দাক্রান্ত থাকায় এ মার্কেটে মানুষের আস্থা কম। আর ফ্লোর প্রাইস না থাকলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের যেটুকু পুঁজি অবশিষ্ট রয়েছে, তা-ও নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাই যতদিন না অধিকাংশ শেয়ারের দাম ফ্লোর প্রাইসের উপরে উঠছে, ততদিন তারা এ ব্যবস্থা পরিবর্তন করার বিপক্ষে।

ফ্লোর প্রাইস নিয়ে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার পক্ষে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ তারা যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুক না কেন, তাতে অন্তত একপক্ষ কঠিন সমালোচনা করবে। বিএসইসি’র নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এখন পর্যন্ত ফ্লোর প্রাইস বিষয়ে যৌক্তিক ও কৌশলী বক্তব্য রেখে চলেছেন।

তবে মার্কেটের বর্তমান লো ভলিউম ট্রেড আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকলে ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া বিএসইসি-এর সামনে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। কারণ বিদ্যমান অবস্থায় স্বল্প ট্রেডের ফলে অনেকেই তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। ব্রোকার হাউসগুলোর অধিকাংশই লোকসানে চলছে, যা দীর্ঘদিন টিকে থাকার মতো পরিস্থিতিতে নেই।

তবে আশার কথা হচ্ছে, বিগত দুই সপ্তাহে মার্কেটের লক্ষণ বেশ ভালো মনে হচ্ছে। প্রতিদিনই ট্রেড ভলিউম বাড়ছে এবং বেশকিছু কোম্পানির শেয়ার দাম ফ্লোর প্রাইসের উপরে উঠে এসেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এবং বাকি কোম্পানিগুলোর বড় অংশের দাম ফ্লোর প্রাইসের উপরে উঠে এলে কোনো ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই তা করা যাবে। সে অবস্থা বাজার শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য একান্তভাবে কাম্য।

তবে চাইলেই যে তা ঘটবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি আগামী মাসখানেকের মধ্যেও ওভারঅল সূচক তেমন না বাড়ে এবং অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দাম ফ্লোর প্রাইসেই আটকে থাকে তবে বিএসইসি বিকল্প উদ্ভাবণী চিন্তা করতে পারে। সেটি হতে পারে, ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর যেসব কোম্পানির শেয়ার দাম ফ্লোর প্রাইসের উপরে একাধিক দিন সন্তোষজনক ভলিউমে ট্রেড হয়েছে সেসব কোম্পানির ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ প্রথমে উঠিয়ে দেয়া যায়।

পরবর্তী সময়ে যে কোম্পানির ট্রেড ফ্লোর প্রাইসের ওপরে উঠবে তা কেইস টু কেইস ভিত্তিতে বিএসইসি ঘোষণার মাধ্যমে উন্মুক্ত করে দেবে। এতে করে এক নিমিষেই ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেয়ার মতো প্রচণ্ড ঝুঁকি থেকে মার্কেট রক্ষা পাবে। সে ব্যবস্থায় মূলত ঝুঁকিকে সহনীয় মাত্রায় ছড়িয়ে দেয়া হবে যার সাহায্যে মনস্তাত্ত্বিক (সাইকোলজিক্যাল) খারাপ প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। মার্কেট তথা বিনিয়োগকারীদের জন্য সেটা করা খুবই প্রয়োজন। আশা করি, বিএসইসি বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে এবং ফ্লোর প্রাইস বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।

নিবন্ধের শেষ পর্যায়ে ফ্লোর প্রাইসের সঙ্গেই সম্পর্কিত একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখতে চাই। তা হল আমাদের দেশে ফ্লোর প্রাইস প্রবর্তনের প্রয়োজন পড়ল কেন? অন্যান্য দেশে তার প্রয়োজন পড়ে না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর বোধকরি কঠিন নয়। আমাদের শেয়ার মার্কেটে যেরূপ আস্থাহীনতা রয়েছে তা সম্ভবত অন্য কোথাও নেই। এরূপ চরম আস্থাহীনতার কারণ কী? এ প্রশ্নের উত্তরও বোধকরি কঠিন নয়।

যে দেশে বছরের পর বছর নানা কায়দায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোভের জালে ফেলা হয়, যে দেশে অনেক যুবক আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে শেয়ার ব্যবসা করতে এসে পুঁজি হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়, যে দেশে একপ্রকার সিন্ডিকেটের নীলনকশায় কাগজসর্বস্ব লোকসানি কোম্পানির শেয়ার দাম আকাশচূড়ায় নিয়ে তারপর হঠাৎ নিচে ফেলে দেয়া হয়, সে দেশে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কতক্ষণ আস্থা ধরে রাখতে পারে!

এ দেশে মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের কদর নেই, অথচ বছরের পর বছর কোনো লভ্যাংশ দেয়া হয় না বা লোকসান হয় এরূপ স্বল্পমূলধনবিশিষ্ট কোম্পানির দাম আকাশচুম্বী থাকে, এরূপ অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গড় প্রাইস আর্নিং রেশিও (পিই) ছিল ৯-এর মতো এবং গত সপ্তাহে যা ছিল ১১-এর কাছে, সেখানে অন্তত ১৩টি কোম্পানির সর্বশেষ অডিটেড হিসাব মোতাবেক পিই রেশিও রয়েছে ১০০-এর উপরে। সোনালি পেপার নামক লোকসানি কোম্পানির পিই রেশিও হচ্ছে-২৩৮৬৬৩। সিভিওপিআরএলের প্রায় ৯৬২, সমতা লেদারের প্রায় ৩৮২, মন্নু স্টাফলারের ২৯০, কেএন্ডকিউয়ের ২৪৫, ফাইন ফুডসের ২৩০ ও রেইনউইক যগেশ্বরের ২১৪। এরকম অজস্র উদাহরণ দেয়া যায়।

মার্কেটের এমন অবস্থা হওয়ার পেছনে একদিকে যেমন অসচেতন বিনিয়োগকারীদের দায় রয়েছে, তেমনি বিএসইসি’রও দায়ও কম নয়। তাই সে অবস্থা যাতে না হয়, সেজন্য রেগুলেটরি সংস্থা হিসেবে বিএসইসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চিন্তা করতে হবে। ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের দ্বারা যেমন কোনো কোম্পানির শেয়ারমূল্য নির্ধারিত মূল্যের নিচে যাওয়ার সুযোগ নেই, তেমনিভাবে কোনো কোম্পানির দাম বৃদ্ধির সর্বোচ্চসীমা থাকা উচিত। আর তা করতে কোম্পানিগুলোর দামের সঙ্গে শেয়ারপ্রতি আয়ের লিঙ্কের শর্ত সংযুক্ত করা সঙ্গত ও যৌক্তিক।

সেটাকে বলা যায় সিলিং প্রাইস। সিলিং প্রাইস নির্ধারণের মাধ্যমে কোনো কোম্পানির সর্বোচ্চ শেয়ারমূল্য কোম্পানির নিজস্ব পিই রেশিও দ্বারা নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। ধরা যাক, কোনো কোম্পানির শেয়ারমূল্য তার পিই রেশিও ৫০-এর বেশি হতে পারবে না মর্মে সিদ্ধান্ত হল, এখন কোনো কোম্পানির বার্ষিক ইপিএস যদি ১ টাকা হয় তবে কোম্পানিটির শেয়ারমূল্য সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারবে।

যদি পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির আয় ১ টাকা থেকে বেড়ে ২ টাকা হয় তবে তার শেয়ার দামও ১০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারবে। এরূপ ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে প্রচলন করা হলে তথাকথিত সিন্ডিকেট বা জুয়াড়িরা আর বাজার ম্যানিপুলেশনে তেমন সুবিধা করতে পারবে না। এতে করে মৌলভিত্তির শেয়ারের চাহিদা বাড়বে।

তার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লাভের মুখ দেখবে এবং আস্তে আস্তে মার্কেটের প্রতি তাদের আস্থা ফিরে আসবে। আর মার্কেটের প্রতি আস্থা ফিরে এলে লিকুইডিটি তথা তারল্য সংকট থাকবে না; যার ফলে ভবিষ্যতে ফ্লোর প্রাইস আরোপের কোনো প্রয়োজনীয়তা আর দেখা দেবে না। তাই সে ব্যবস্থা প্রবর্তনে বিএসইসিকে ভেবে দেখার অনুরোধ রইল।

শফিকুল ইসলাম : অতিরিক্ত সচিব (পিআরএল)

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত