স্বদেশ ভাবনা

আঞ্চলিক বৈষম্য ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

  আবদুল লতিফ মন্ডল ২৯ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ (২০১৫-২০) ৩০ জুন অফিসিয়ালি শেষ হয়েছে। দেশের আঞ্চলিক বৈষম্য সমস্যা সমাধানের ওপর এ পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয় এবং এজন্য কিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রণীত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতেও (২০১৬-১৯) দেশের অভ্যন্তরে বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ অর্থবছরের (২০১৯-২০) বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি, যদিও তিনি ওই বাজেট বক্তৃতায় বিগত ১০ বছরে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু মৌলিক এলাকায় সরকারের সাফল্যের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০২০-২০২৫) প্রথম অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেট বক্তৃতায়ও দেশের অভ্যন্তরে আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কৌশল বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী কোনো বক্তব্য রাখেননি। তবে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দেশে আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে বৈ কমেনি।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বিগত দশক থেকে গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হারে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হলেও যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে তা হল- সব জেলা সমভাবে লাভবান হয়েছে কি না। বলা হয়, কেন্দ্রচ্যুতি বনাম সমকেন্দ্রিকতার বিশ্লেষণ থেকে এ ধারণা পাওয়া যায়- দীর্ঘসময় নিয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পশ্চাৎপদ অঞ্চলের বৈষম্য সমস্যার সমাধানে যেসব কৌশল নির্ধারণ করা হয়, সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ক. পশ্চাৎপদ অঞ্চল তহবিল গঠন, খ. অবকাঠামো ব্যবধান হ্রাস, গ. পশ্চাৎপদ জেলাগুলোতে ম্যানুফ্যাকচারিং সুবিধাবলি বৃদ্ধি, ঘ. কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং ঙ. আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়, আঞ্চলিক বৈষম্য সমস্যার সমাধানমূলক বৃহত্তর অর্থনীতিতে পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলোর অধিকতর সুবিধাদান এবং কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্বদানসহ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) একটি পৃথক তহবিল সংরক্ষণ করতে হবে। এ তহবিল থেকে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালের মতো এলাকাগুলো এ ধরনের বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু সপ্তম পরিকল্পনা মেয়াদের এডিপিগুলোতে এমন পৃথক তহবিল সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। উল্লেখ্য, দেশের পশ্চাৎপদ অঞ্চল বা বিভাগগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বৃহত্তর দিনাজপুর ও বৃহত্তর রংপুর নিয়ে গঠিত রংপুর বিভাগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস)-২০১৬ অনুযায়ী, এখানে দারিদ্র্যের হার ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১০ সালের হায়েসেও এখানে দারিদ্র্যের হার ছিল সবচেয়ে বেশি (৪২ দশমিক ৩ শতাংশ)। হায়েস-২০১৬ অনুযায়ী, দারিদ্র্যের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ। এখানে দারিদ্র্যের হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ।

২৮ দশমিক ৯ এবং ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্য হার নিয়ে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ ও খুলনা বিভাগ। ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্য হার নিয়ে বরিশাল বিভাগ রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার নির্দেশনা মোতাবেক, এডিপিতে পৃথক তহবিল সংরক্ষণ করা হলে তা এসব পশ্চাৎপদ অঞ্চলের উন্নয়নে অধিকতর গতি সঞ্চার করত।

অবকাঠামো সুবিধার উন্নয়ন পশ্চাৎপদ অঞ্চল ও জেলাগুলোর অর্থনৈতিক সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে বলে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়।

অবকাঠামো সুবিধার উন্নয়নে যেসব বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হয়, সেগুলো হল- পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে অন্যতম প্রধান পরিবহন প্রকল্প পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ ২০১৮ সালের গোড়ার দিকে সম্পূর্ণ করা, আন্তঃজেলা ও আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা, মোংলা বন্দরের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা, বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি করা এবং কৃষি ও মৎস্যপণ্য গুদামজাত করার সুযোগ বৃদ্ধি করা; যাতে কৃষকরা এ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে পারেন।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নির্ধারিত মেয়াদে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন না হলেও এটির কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, মোংলা বন্দরের সর্বোচ্চ ব্যবহার এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অবকাঠামো ব্যবধান কমিয়ে আনার নির্দেশনা থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না।

১২ বছর ধরে একটানা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১০টি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত করেছে। এগুলো মূলত সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে অবস্থিত। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখলেও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়াবে বৈ কমাবে না।

পশ্চাৎপদ জেলাগুলোয় ম্যানুফ্যাকচারিং সুবিধাবলি বৃদ্ধির নির্দেশনা ছিল সপ্তম পরিকল্পনায়। নির্দেশনায় বলা হয়, যেহেতু বেসরকারি উদ্যোক্তারা পশ্চাৎপদ জেলাগুলোতে বিনিয়োগে তেমন উৎসাহিত বোধ করেন না, তাই অন্তত প্রাথমিক স্তরে এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সরকারকেই সহায়তার হাত প্রসারিত করে এগিয়ে আসতে হবে।

নির্দেশনাগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- কর সুবিধাদান, সুদের নিু হার ও অনুরূপ অন্যান্য নীতি হস্তক্ষেপের দ্বারা পশ্চাৎপদ জেলাগুলোয় বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলোয় অগ্রাধিকার দেয়া এবং স্বল্পব্যয়ে অর্থায়ন সুবিধাসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে সরকার কর্তৃক প্রণীত একাধিক মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে (নীতি বিবৃতি ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯ এবং ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০) উপর্যুক্ত নির্দেশনাবলি বাস্তবায়নে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণের উল্লেখ নেই।

কোনো প্রশাসনিক বিভাগ বা অঞ্চলের উন্নয়নে ইকোনমিক ইউনিটের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বিবিএসের ইকোনমিক সেন্সাস-২০১৩-এ ইকোনমিক ইউনিটের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘Economic Unit is defined as a single establishment or economic household operating economic activities for profit, household gain or indirect benefit to the community’ যার অর্থ দাঁড়ায়- ইকোনমিক ইউনিট এমন একটি একক প্রতিষ্ঠান বা ইকোনমিক হাউসহোল্ড (খানা), যা হাউসহোল্ড আয় বৃদ্ধি বা কমিউনিটির পরোক্ষ সুবিধার জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। যে বিভাগ বা অঞ্চলে ইকোনমিক ইউনিটের সংখ্যা যত বেশি, সে বিভাগ বা অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য তত বেশি।

ইকোনমিক সেন্সাস-২০১৩ অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ সংখ্যক ইকোনমিক ইউনিট অবস্থিত। এর সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩৭২। অন্যদিকে রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ বা অঞ্চলে ইকোনমিক ইউনিটের সংখ্যা যথাক্রমে- ১২ লাখ ১৭ হাজার ৬৩৩, ১০ লাখ ৮৮ হাজার ২৫৫, ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৫৮১ ও ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৩৩।

পশ্চাৎপদ জেলাগুলোয় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের নির্দেশনা ছিল সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। পরিকল্পনা মেয়াদকালে যেসব পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- পশ্চাৎপদ জেলাগুলোর গ্রামাঞ্চলে কৃষিঋণ বিতরণ ও কৃষি ভর্তুকি কর্মসূচিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দান, দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকাগুলোয় ক্ষুদ্র অর্থায়ন সংস্থার কার‌্যাবলি পরিচালনায় উৎসাহ প্রদান, পরিবেশগতভাবে অরক্ষিত এলাকাগুলোয় ক্ষুদ্র অর্থায়নকে আকৃষ্ট করতে নীতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন সুবিধা দানের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোয় খামারবহির্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিকরণ।

পরিকল্পনা মেয়াদে সার্বিকভাবে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে গুরুত্ব প্রদান করা হলেও পশ্চাৎপদ অঞ্চল বা জেলাগুলোর জন্য উপর্যুক্ত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে তেমন বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা নেই। তবে প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সরকার ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ নামে একটি অভিযোজন কৌশলপত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় এবং ২০১৭ সালের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করার কথা ছিল। এটি বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে, তা জানা নেই।

পশ্চাৎপদ জেলাগুলোর শ্রমিকদের অধিক হারে প্রবাসে কাজের জন্য প্রেরণ এবং সম্ভাব্য অভিবাসীদের অনুকূলে সুবিধা দিতে বিশেষ অর্থায়ন স্কিম বাস্তবায়নের যে পদক্ষেপ নেয়ার কথা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তা বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা নেই। সবশেষে বলতে চাই, আন্তঃআঞ্চলিক বা আন্তঃবিভাগীয় অর্থনৈতিক বৈষম্য বাংলাদেশে উচ্চ দারিদ্র্য হারের অন্যতম একটি কারণ।

দেশের সব অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মোটামুটি সমতা আনা গেলে তা জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতেও সহায়ক হবে। আমাদের পরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের এটি স্মরণে রাখা দরকার।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত