চামড়ার দামে কেন এ ধস?
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
চামড়ার দামে কেন এ ধস?

  ড. আর এম দেবনাথ  

০৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বছরের দুটি দিন রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদের জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে থাকেন কারণ এ দুটি দিনের ধর্মীয় গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে আনন্দের দিক এবং ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক দিক। বলতে হয়, রোজার ঈদ মানুষ আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেনি।

কারণ করোনাভাইরাসের আক্রমণ। সারা দেশ ছিল আতঙ্কে। অর্থনীতি অচল। লকডাউন সর্বত্র। মানুষ ঘরবন্দি। এবারের কোরবানির ঈদের অবস্থাও একই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, তৎজনিত কারণে মৃত্যু তো কমেইনি; বরং এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়াবহ বন্যা। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যাকবলিত। মানুষের ঘরবাড়ি বন্যার জলের তলে। খাবার নেই, শোয়া-বসার জায়গা নেই। গবাদি পশু ভেসে যাচ্ছে।

পদ্মায় বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। পুকুরের মাছ ভেসে যাচ্ছে। হাঁস-মুরগির খামারিদের মাথায় হাত। এরই মধ্যে পবিত্র ঈদ। দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের জায়গা নেই অনেক জায়গায়। টেলিভিশনে দেখলাম নৌকায় দাঁড়িয়ে মানুষ নামাজ আদায় করছে। শিশুদের মুখে হাসি নেই।

মায়েরা খালি উনুনের সামনে। বাড়ির মালিক ছুটছে ত্রাণের খোঁজে- কোথাও যদি কিছু ত্রাণ পাওয়া যায়। বোঝাই যায়, কোরবানির ঈদ যথাযোগ্য মর্যাদায় ধর্মীয়ভাবে উদযাপিত হলেও এর আনন্দের দিক ছিল ম্লান। অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক মন্দা যথারীতি অব্যাহত।

ট্যানারির মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, এবার সার্বিকভাবে কোরবানি প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ কম হয়েছে। ঢাকায় কোরবানি হয়েছে একটু বেশি। কিন্তু ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় কোরবানি দেয়ার মতো অবস্থা ছিল না। মাটিতে দাঁড়ানোর জায়গা নেই।

কোরবানির পশুতে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবু কাগজে দেখলাম পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কিছু পশু এসেছে। কিন্তু বাজার গেছে মন্দা। বাজারে ‘ক্যাশের’ অভাব। বাংলাদেশ ব্যাংক ২৫ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছেড়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরাও তাদের পরিবারের জন্য টাকা-ডলার পাঠিয়েছেন। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। মন্দার কারণে সর্বস্বান্ত হয়েছে খামারি এবং সাধারণ গৃহস্থরা।

সারা দেশে বিপুলসংখ্যক গৃহস্থ কোরবানি উপলক্ষে পশু পালন করে। কোরবানির সময় কিছু লাভে বিক্রিই উদ্দেশ্য। এতে তাদের কিছু ‘ক্যাশের’ আমদানি হয়, যার প্রয়োজন খুব বেশি। এ মুহূর্তে মানুষ ত্রাণ দেয়- চাল-ডাল, নুন-তেল, চিড়া-মুড়ি-গুড় ইত্যাদি। কিন্তু নগদ টাকাও যে লাগে তার কথা কে বলবে? খামারি ও গৃহস্থরা মন্দা বাজারে নগদ টাকার মুখ সেভাবে দেখেনি এবার। বরাবরের মতোই তাদের বেশির ভাগ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

বন্যা ও করোনাজনিত দুর্দশার মধ্যে ‘ক্যাশের’ অভাব মানুষকে মহাবিপদে ফেলেছে। মানুষ কোরবানি দিয়েছে কম; অতএব কোরবানির চামড়া স্বাভাবিকভাবেই বাজারে কম হওয়ার কথা। চাহিদা ও সরবরাহের নীতি অনুযায়ী চামড়ার দাম বাজারে ঊর্ধ্বমুখী থাকার কথা। কিন্তু সারা দেশের যে খবর, তাতে চামড়ার কোনো ক্রেতা নেই। সত্যি-মিথ্যা বলতে পারব না- ইউটিউবে দেখলাম রাজশাহীতে ফড়িয়ারা চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দিচ্ছে।

বগুড়া, দিনাজপুর, খুলনা, নওগাঁ ও চট্টগ্রামের অবস্থাও একই। কোথাও চামড়ার কোনো ক্রেতা নেই। আছে- দাম জলের তুল্য। ফড়িয়ারা চামড়া নিয়ে ঘুরছে, কিন্তু দাম মিলছে না। ফড়িয়ারা বিনা পয়সায় কিছুদিনের জন্য চামড়া তাদের হেফাজতে রাখতেও সম্মত নয়।

যে দাম চামড়ার তা সরকার নির্ধারিত দামের তিন ভাগের একভাগও নয়। ঢাকায় পাইকাররা কিছু চামড়া কিনেছে। পাইকারদের জায়গা হচ্ছে পোস্তা। সেখানে জলের দামে তারা চামড়া কিনছে। অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। চামড়ার দাম নিয়ে যাতে হুজ্জতি না হয় এর জন্য সরকার প্রতিবছর চামড়া ব্যবসায়ী এবং ট্যানারির মালিকদের সঙ্গে বসে। আলোচনার মাধ্যমে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে। ব্যবসায়ীরা যে দাম বলে সে দামই ধরা হয়।

এবার মন্দার কথা বলে ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম গেল বছরের তুলনায় বেশ কমে নির্ধারণ করে। সরকার তা মেনে নেয়। বাণিজ্যমন্ত্রী সভা শেষে আশা প্রকাশ করেন, এবার কোরবানিদাতারা চামড়ার ন্যায্য দাম পাবেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র কী?

ব্যবসায়ী, রফতানিকারক ও ট্যানারি মালিকরা কি বাণিজ্যমন্ত্রীর কথা শুনেছেন? না, তারা তার কথার কোনো মূল্য দেননি। অথচ শুধু সভা করে দাম নির্ধারণ নয়, বাজার যাতে স্থিতিশীল থাকে, কোরবানিদাতারা যাতে চামড়া নিয়ে কোনো বিপাকে না পড়ে তার জন্য সরকার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়। বরাবরের মতো এবারও সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি ব্যাংক চামড়া ব্যবসায়ীদের টাকা দিতে চায় না। কারণ তারা টাকা পরিশোধ করেন না। বেশির ভাগই ‘ডিফল্টার’। তাও দিনের পর দিন।

এমনও বড় রফতানিকারক চামড়ার ব্যবসায়ী আছেন, যার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের পর্যন্ত অভিযোগ আছে। এতৎসত্ত্বেও সরকার উদারতা দেখিয়ে সবার জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে। এর আগে অবশ্য বকেয়া খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে বেসরকারি ব্যাংকও ১৫০ কোটি টাকার মতো ঋণের ব্যবস্থা করেছে। শুধু তা-ই নয়, ব্যবসায়ীদের চাপে কাঁচা চামড়া ও ‘ওয়েট ব্লু’ চামড়া রফতানির জন্যও অনুমতি দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের চামড়া জমা হয়ে আছে। এর জন্য তারা পাইকারদের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। এ সমস্যা সমাধানের জন্য পুনঃতফসিল যেমন করা হয়েছে, তেমনি নতুন ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়া হয়েছে।

সবই করা হয়েছে সাধারণ কোরবানিদাতা, খামারি, মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার স্বার্থে। যাতে তারা চামড়ার দামে না ঠকেন। তাদের ঠকানো না হলে একটি লাভ হয়- বাজারটা একটু চাঙ্গা হয়। এতে সব পক্ষই লাভবান হয়। কোরবানিদাতারা যেমন লাভবান হয়, তেমনি দুটো পয়সার মুখ দেখে মৌসুমি চামড়া ক্রেতা, দালাল ও ফড়িয়া শ্রেণির লোক। এছাড়া লাভবান হয় বিভিন্ন শ্রেণির লোক।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে চামড়া ব্যবসায়ীরা লোভের তাড়নায় সরকারের মন্ত্রীর কথা শোনেননি, সরকারের নির্ধারিত দাম কোরবানিদাতাদের দেননি, এমনকি সরকার যে এত সুবিধা করে দিল, তারও কোনো মর্যাদা তারা রাখলেন না।

এতে কোরবানিদাতারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হল, একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাদ্রাসা ও এতিমখানা। বিপুলসংখ্যক কোরবানিদাতা মাদ্রাসা ও এতিমখানায় কোরবানির চামড়া দান করেন, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়। এ কাজেও চামড়া ব্যবসায়ীরা সহযোগিতা করলেন না। বড় বড় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, তারা লবণ মেশানো চামড়া ঈদের ৩-৪ দিন পর থেকে কিনতে শুরু করবেন। এতে তাৎক্ষণিক বাজারে চাহিদায় বিঘ্ন ঘটে।

বড় ব্যবসায়ীরা টাকা না ছাড়লে নিচের ব্যবসায়ীরা টাকা পাবেন কোথায়? এ অবস্থার মধ্যে পড়ে এবারও চামড়ার দাম অলাভজনকই থেকে গেল। ব্যবসায়ীদের একাংশের বিবেকহীনতায় প্রতিবছর এমনটাই ঘটে। সম্ভবত এটা লক্ষ্য করেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি গত বছর (৩০.০৬.১৯) বলেছিলেন, ‘বিবেকহীন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।’ ব্যবসাকে একটা মহৎ পেশা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য ভালো ব্যবসায়ীদেরও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

চামড়ার দামে কেন এ ধস?

 ড. আর এম দেবনাথ 
০৫ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বছরের দুটি দিন রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদের জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে থাকেন কারণ এ দুটি দিনের ধর্মীয় গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে আনন্দের দিক এবং ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক দিক। বলতে হয়, রোজার ঈদ মানুষ আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেনি।

কারণ করোনাভাইরাসের আক্রমণ। সারা দেশ ছিল আতঙ্কে। অর্থনীতি অচল। লকডাউন সর্বত্র। মানুষ ঘরবন্দি। এবারের কোরবানির ঈদের অবস্থাও একই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, তৎজনিত কারণে মৃত্যু তো কমেইনি; বরং এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়াবহ বন্যা। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যাকবলিত। মানুষের ঘরবাড়ি বন্যার জলের তলে। খাবার নেই, শোয়া-বসার জায়গা নেই। গবাদি পশু ভেসে যাচ্ছে।

পদ্মায় বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। পুকুরের মাছ ভেসে যাচ্ছে। হাঁস-মুরগির খামারিদের মাথায় হাত। এরই মধ্যে পবিত্র ঈদ। দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের জায়গা নেই অনেক জায়গায়। টেলিভিশনে দেখলাম নৌকায় দাঁড়িয়ে মানুষ নামাজ আদায় করছে। শিশুদের মুখে হাসি নেই।

মায়েরা খালি উনুনের সামনে। বাড়ির মালিক ছুটছে ত্রাণের খোঁজে- কোথাও যদি কিছু ত্রাণ পাওয়া যায়। বোঝাই যায়, কোরবানির ঈদ যথাযোগ্য মর্যাদায় ধর্মীয়ভাবে উদযাপিত হলেও এর আনন্দের দিক ছিল ম্লান। অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক মন্দা যথারীতি অব্যাহত।

ট্যানারির মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, এবার সার্বিকভাবে কোরবানি প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ কম হয়েছে। ঢাকায় কোরবানি হয়েছে একটু বেশি। কিন্তু ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় কোরবানি দেয়ার মতো অবস্থা ছিল না। মাটিতে দাঁড়ানোর জায়গা নেই।

কোরবানির পশুতে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবু কাগজে দেখলাম পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কিছু পশু এসেছে। কিন্তু বাজার গেছে মন্দা। বাজারে ‘ক্যাশের’ অভাব। বাংলাদেশ ব্যাংক ২৫ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছেড়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরাও তাদের পরিবারের জন্য টাকা-ডলার পাঠিয়েছেন। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। মন্দার কারণে সর্বস্বান্ত হয়েছে খামারি এবং সাধারণ গৃহস্থরা।

সারা দেশে বিপুলসংখ্যক গৃহস্থ কোরবানি উপলক্ষে পশু পালন করে। কোরবানির সময় কিছু লাভে বিক্রিই উদ্দেশ্য। এতে তাদের কিছু ‘ক্যাশের’ আমদানি হয়, যার প্রয়োজন খুব বেশি। এ মুহূর্তে মানুষ ত্রাণ দেয়- চাল-ডাল, নুন-তেল, চিড়া-মুড়ি-গুড় ইত্যাদি। কিন্তু নগদ টাকাও যে লাগে তার কথা কে বলবে? খামারি ও গৃহস্থরা মন্দা বাজারে নগদ টাকার মুখ সেভাবে দেখেনি এবার। বরাবরের মতোই তাদের বেশির ভাগ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

বন্যা ও করোনাজনিত দুর্দশার মধ্যে ‘ক্যাশের’ অভাব মানুষকে মহাবিপদে ফেলেছে। মানুষ কোরবানি দিয়েছে কম; অতএব কোরবানির চামড়া স্বাভাবিকভাবেই বাজারে কম হওয়ার কথা। চাহিদা ও সরবরাহের নীতি অনুযায়ী চামড়ার দাম বাজারে ঊর্ধ্বমুখী থাকার কথা। কিন্তু সারা দেশের যে খবর, তাতে চামড়ার কোনো ক্রেতা নেই। সত্যি-মিথ্যা বলতে পারব না- ইউটিউবে দেখলাম রাজশাহীতে ফড়িয়ারা চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দিচ্ছে।

বগুড়া, দিনাজপুর, খুলনা, নওগাঁ ও চট্টগ্রামের অবস্থাও একই। কোথাও চামড়ার কোনো ক্রেতা নেই। আছে- দাম জলের তুল্য। ফড়িয়ারা চামড়া নিয়ে ঘুরছে, কিন্তু দাম মিলছে না। ফড়িয়ারা বিনা পয়সায় কিছুদিনের জন্য চামড়া তাদের হেফাজতে রাখতেও সম্মত নয়।

যে দাম চামড়ার তা সরকার নির্ধারিত দামের তিন ভাগের একভাগও নয়। ঢাকায় পাইকাররা কিছু চামড়া কিনেছে। পাইকারদের জায়গা হচ্ছে পোস্তা। সেখানে জলের দামে তারা চামড়া কিনছে। অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। চামড়ার দাম নিয়ে যাতে হুজ্জতি না হয় এর জন্য সরকার প্রতিবছর চামড়া ব্যবসায়ী এবং ট্যানারির মালিকদের সঙ্গে বসে। আলোচনার মাধ্যমে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে। ব্যবসায়ীরা যে দাম বলে সে দামই ধরা হয়।

এবার মন্দার কথা বলে ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম গেল বছরের তুলনায় বেশ কমে নির্ধারণ করে। সরকার তা মেনে নেয়। বাণিজ্যমন্ত্রী সভা শেষে আশা প্রকাশ করেন, এবার কোরবানিদাতারা চামড়ার ন্যায্য দাম পাবেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র কী?

ব্যবসায়ী, রফতানিকারক ও ট্যানারি মালিকরা কি বাণিজ্যমন্ত্রীর কথা শুনেছেন? না, তারা তার কথার কোনো মূল্য দেননি। অথচ শুধু সভা করে দাম নির্ধারণ নয়, বাজার যাতে স্থিতিশীল থাকে, কোরবানিদাতারা যাতে চামড়া নিয়ে কোনো বিপাকে না পড়ে তার জন্য সরকার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়। বরাবরের মতো এবারও সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি ব্যাংক চামড়া ব্যবসায়ীদের টাকা দিতে চায় না। কারণ তারা টাকা পরিশোধ করেন না। বেশির ভাগই ‘ডিফল্টার’। তাও দিনের পর দিন।

এমনও বড় রফতানিকারক চামড়ার ব্যবসায়ী আছেন, যার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের পর্যন্ত অভিযোগ আছে। এতৎসত্ত্বেও সরকার উদারতা দেখিয়ে সবার জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে। এর আগে অবশ্য বকেয়া খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে বেসরকারি ব্যাংকও ১৫০ কোটি টাকার মতো ঋণের ব্যবস্থা করেছে। শুধু তা-ই নয়, ব্যবসায়ীদের চাপে কাঁচা চামড়া ও ‘ওয়েট ব্লু’ চামড়া রফতানির জন্যও অনুমতি দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের চামড়া জমা হয়ে আছে। এর জন্য তারা পাইকারদের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। এ সমস্যা সমাধানের জন্য পুনঃতফসিল যেমন করা হয়েছে, তেমনি নতুন ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়া হয়েছে।

সবই করা হয়েছে সাধারণ কোরবানিদাতা, খামারি, মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার স্বার্থে। যাতে তারা চামড়ার দামে না ঠকেন। তাদের ঠকানো না হলে একটি লাভ হয়- বাজারটা একটু চাঙ্গা হয়। এতে সব পক্ষই লাভবান হয়। কোরবানিদাতারা যেমন লাভবান হয়, তেমনি দুটো পয়সার মুখ দেখে মৌসুমি চামড়া ক্রেতা, দালাল ও ফড়িয়া শ্রেণির লোক। এছাড়া লাভবান হয় বিভিন্ন শ্রেণির লোক।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে চামড়া ব্যবসায়ীরা লোভের তাড়নায় সরকারের মন্ত্রীর কথা শোনেননি, সরকারের নির্ধারিত দাম কোরবানিদাতাদের দেননি, এমনকি সরকার যে এত সুবিধা করে দিল, তারও কোনো মর্যাদা তারা রাখলেন না।

এতে কোরবানিদাতারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হল, একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাদ্রাসা ও এতিমখানা। বিপুলসংখ্যক কোরবানিদাতা মাদ্রাসা ও এতিমখানায় কোরবানির চামড়া দান করেন, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়। এ কাজেও চামড়া ব্যবসায়ীরা সহযোগিতা করলেন না। বড় বড় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, তারা লবণ মেশানো চামড়া ঈদের ৩-৪ দিন পর থেকে কিনতে শুরু করবেন। এতে তাৎক্ষণিক বাজারে চাহিদায় বিঘ্ন ঘটে।

বড় ব্যবসায়ীরা টাকা না ছাড়লে নিচের ব্যবসায়ীরা টাকা পাবেন কোথায়? এ অবস্থার মধ্যে পড়ে এবারও চামড়ার দাম অলাভজনকই থেকে গেল। ব্যবসায়ীদের একাংশের বিবেকহীনতায় প্রতিবছর এমনটাই ঘটে। সম্ভবত এটা লক্ষ্য করেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি গত বছর (৩০.০৬.১৯) বলেছিলেন, ‘বিবেকহীন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।’ ব্যবসাকে একটা মহৎ পেশা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য ভালো ব্যবসায়ীদেরও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক