চামড়ার দরপতন কি আগে অনুমান করা যায়নি?

  ডা. জাহেদ উর রহমান ০৬ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোরবানির প্রাণীর চামড়ার দামের পতনের পর আমাদের মিডিয়া যে ভূমিকা পালন করেছে, সেই ভূমিকাটা কি ঈদের বেশ খানিকটা আগে পালন করা যেত না? পালন করলে পরিস্থিতি এ ভয়ংকর জায়গায় যাওয়া থেকে ঠেকানো যেত নিশ্চয়ই। ঈদের পর চামড়ার দাম নিয়ে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটার পূর্বানুমান কি আমরা করতে পারতাম না?

গত বছরও ঈদের আগে সঠিক পূর্বানুমান করা যাচ্ছিল চামড়ার দামে কী ঘটতে যাচ্ছে। যুগান্তরেই গত ঈদুল আজহার আগেই আমি স্বজনতোষী পুঁজিবাদ খামচে ধরবে গরিবের চামড়াও শিরোনামে কলাম লিখে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম ঈদে চামড়ার দামে বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে।

এ বছরও ঠিক একই ধরনের একটি কলাম আমি লিখেছিলাম ভিন্ন একটি নিউজ পোর্টালে। এর মধ্যে কোনো জ্যোতিষবিদ্যার বিষয় নেই, প্রতিবছর ঈদুল আজহার আগে এমন একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয় যেটি থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় কী ঘটতে যাচ্ছে চামড়ার দাম নিয়ে। এবার ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই একই রকম পরিস্থিতি অনুমান করা যাচ্ছিল। একটু দেখে নেয়া যাক।

চামড়া শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ জানিয়েছেন, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ট্যানারি শিল্প কোনো ব্যবসা করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছোট হয়ে গেছে।

তাদের কাছ থেকে এটিও জানা যায়, এখন চামড়া শিল্প-কারখানায় জমা রয়ে গেছে ৩২০০ কোটি টাকার কাঁচা চামড়া। চামড়া কেনা নিয়ে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় থাকলেও চামড়া পাচার হওয়া রোধ করতে আবার চামড়া কেনাও নাকি তাদের ‘কর্তব্য’!

সবকিছুর সঙ্গে করোনার প্রভাবে গোটা বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, সেটাকে যুক্ত করা হলে তো এ বছর চাহিদা হয়ে যাওয়ার কথা একেবারে শূন্যের কোঠায়; কিন্তু তারপরও তারা এ বছর চামড়া কিনতে চান। তাহলে প্রশ্ন আসেই কেন তারা চান?

এবার কোরবানির ঈদ সামনে রেখে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক চামড়া ব্যবসায়ীদের নতুন করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বছরের পর বছর এ খাতে ঋণ দেয়া হয় এবং তার বড় অংশই হয়ে যায় খেলাপি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৭ কোটি টাকা; যা এ খাতে বিতরণ করা ঋণের প্রায় সাড়ে ৩৭ শতাংশ। একক খাত হিসেবে বর্তমানে চামড়া খাতে খেলাপির হারই সবচেয়ে বেশি। চামড়া খাতের খেলাপি ঋণ এ দেশের সার্বিক খেলাপি ঋণের হারের (১১.৪) প্রায় সাড়ে তিন গুণ।

এ খাতের খেলাপি ঋণের বেশির ভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, খেলাপি ঋণের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে প্রতিবছর দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা মূলধন বরাদ্দ করা হয় জনগণের করের টাকায়।

হ্যাঁ, একদিকে ঋণের টাকায় পানির দামের চামড়া কিনেন তারা, আবার সেই টাকা ব্যাংককে ফেরত না দিয়ে আত্মসাৎ করেন, এর চেয়ে ভালো ব্যবসায় আর কী হতে পারে? এ ব্যবসার জন্যই ‘চামড়া কিনব কি কিনব না’ এ খেলায় মেতে ওঠেন প্রতিটি কোরবানির ঈদের আগে।

ট্যানারি মালিকদের কথামতোই তাদের চামড়ার প্রয়োজন নেই, আবার চামড়া বেশি দামে ভারতে পাচার হয়ে যায়। সুতরাং রফতানি করা হলে দেশের তুলনায় চামড়ার অনেক ভালো মূল্য পাওয়া যাবে এটি নিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত সরকার চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।

কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় ঈদের দুই দিন আগে। এ সিদ্ধান্তের পরই বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এ সিদ্ধান্ত কোনো কাজে আসবে না।

খুব যৌক্তিক কারণও তারা জানিয়েছিলেন- বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ এ ধরনের চামড়া রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত নয়, ফলে হুট করে এ সিদ্ধান্ত নেয়াটা আখেরে কোনো কাজে আসবে না। হাতে সময় নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে এ তথ্যটা জানিয়ে দেয়া গেলে সেটা কার্যকর হতে পারত। তাই সরকারের এ সিদ্ধান্তকে একটা তুচ্ছ পলিটিক্যাল স্টান্টের বেশি কিছু মনে করার কোনো কারণ নেই।

ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে, সরকারি বছরের চামড়ার মূল্য গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে ১০ টাকা করে কমিয়ে ফেললেও সেই মূল্যের আশপাশের দামেও চামড়া বিক্রি হয়নি। ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে গরুর চামড়া, আর খাসির চামড়া ২ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হওয়ার খবর আমরা দেখেছি। আর একেবারেই বিক্রি হয়নি অসংখ্য চামড়া।

চামড়া নিয়ে এ কাণ্ডটা ঘটল এমন একসময়ে যখন চামড়ার মোটামুটি একটা ন্যায্যমূল্য এ দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য হয়ে উঠতে পারত এক অসাধারণ আশীর্বাদ। প্রেক্ষাপটটা আবার? একটু মনে করা যাক।

করোনার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়েছে এ দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ৬ কোটির বেশি মানুষের ওপরে। ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে’ সবকিছু খুলে দেয়া হলেও দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থার কাছাকাছিও নয় এখনও।

ফলে মানুষ এখনও অত্যন্ত খারাপভাবে জীবনযাপন করছে। তাদের ওপরে রয়েছে ক্ষুদ্রঋণের বকেয়া কিস্তিসহ বর্তমান কিস্তি পরিশোধের প্রচণ্ড চাপ। এ অবস্থায় এদের জন্য সরকার কী করেছে, সেটা একটু দেখে নেয়া যাক। এসব সাহায্যে কী পরিমাণ অনিয়ম এবং চুরি হয়, সেটি আমরা জানি; কিন্তু এ আলোচনার সুবিধার্থে ধরে নিই সরকারি সাহায্য বিতরণে কোনোরকম চুরি বা অনিয়ম হয়নি।

২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে বিতরণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৮৯ টন চাল। এতে উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩। উপকারভোগী লোকসংখ্যা সাত কোটি ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯৫২। অর্থাৎ তিন মাসে একজন মানুষ গড়ে চাল পেয়েছেন ২.৬২ কেজি।

প্রতিদিনের হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪.৫৫ গ্রাম। এ তিন মাসে সাধারণ ত্রাণ হিসেবে নগদ বিতরণ করা হয়েছে ৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ৫২ হাজার ৬৩৩ টাকা। এতে উপকারভোগী পরিবার সংখ্যা ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার ৭৯৪।

উপকারভোগী লোকসংখ্যা চার কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার ৪৭৩ জন। অর্থাৎ তিন মাসে একজন মানুষ গড়ে আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন ২০.৫৮ টাকা। প্রতিদিনের হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১১.৩৮ পয়সা।

এদিকে সাধারণ ছুটি শুরুর দেড় মাস পর সরকার ৫০ লাখ পরিবারকে ২৫০০ টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। যে কোনো বিচারেই এ অঙ্ক অত্যন্ত অপ্রতুল; কিন্তু সেই টাকা দিতে গিয়েও ভয়ংকর দুর্নীতির চিত্র আমাদের সামনে আসে।

তাই সেটি ঠিকঠাক করে বিতরণ করার জন্য টাকা বিতরণের গতি ধীর হয়ে যায়। আমরা অনেকেই শুনলে অবাক হব, সেই ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে ৩৪ লাখ পরিবারের কাছে এখনও টাকা পৌঁছেনি (৮ জুলাই, প্রথম আলো)।

করোনার অভিঘাতের আগে সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশের পৌনে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত। করোনার অভিঘাতে আরও প্রায় একই সংখ্যক মানুষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা সাত কোটির মতো হতে পারে বলে আমার ধারণা। কীভাবে বেঁচে আছে এ বিপুলসংখ্যক মানুষ, ভেবে দেখি কি আমরা? এ ভয়ংকর পরিস্থিতিতেই নতুন সংকট হিসেবে যুক্ত হয়েছে দেশের একটা বিরাট অংশে বন্যা।

গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এত দীর্ঘস্থায়ী এবং এত বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা আর হয়নি। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটা উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণের অপর্যাপ্ততার কথা আমরা সব সময় মিডিয়ায় দেখি। বোধগম্য কারণেই এ বছর ত্রাণের অপর্যাপ্ততার খবর আগের চেয়ে অনেক বেশি।

এ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা গরিব মানুষের কাছে একটা সহায় হতে পারত। দীর্ঘ তিন মাসে করোনার সময় সাড়ে ৪ কোটি মানুষকে যে ৮৮ কোটি টাকা সরকার দিয়েছে তার অন্তত ৪ গুণ টাকা চামড়া খাতে থেকে দরিদ্র মানুষের হাতে যেতে পারত।

এ টাকাটা আবার সরকারের নিজ তহবিল থেকেও দিতে হতো না, একজন নাগরিকের কাছ থেকে সেটা আরেক জন নাগরিকের কাছে যেত। শুধু সরকার যদি আন্তরিকভাবে সেটি নিশ্চিত করতে চাইত, তাহলে সেটি ঘটতে পারত।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত