মিঠে কড়া সংলাপ

নন্দলালের জীবনযাপন!

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ০৮ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘নন্দলাল’ কবিতাটি প্রায় সবারই পড়া। বিশেষ করে আমার বয়সীদের জন্য স্কুলে কবিতাটি পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। তো, সেই কবিতার নন্দলাল চরিত্রের মানুষটি নিজেকে নিরাপদ রাখতে সব সময় ঘরে শুয়ে-বসে জীবনযাপন করতেন। তার ধারণা, বাইরে বের হলেই যত বিপদ! তিনি কখনও ট্রেন, বাসসহ কোনো যানবাহনেই চড়তেন না; কারণ এসব যানবাহন দুর্ঘটনায় প্রতিবছর প্রচুর মানুষ মারা যায়। .

এমনকি তিনি তার নিকটাত্মীয়-স্বজনের অসুখ-বিসুখের সময়ও এই ভয়ে তাদের পাশে থাকতেন না যে, তিনিও যদি আবার সেসব রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান! এক কথায়, মৃত্যুভয়ে তিনি নিজেকে সব সময় ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতেন।

প্রকৃতির কী বিধান, নন্দলাল নামক সেই কাল্পনিক চরিত্রটিই আজ সারা পৃথিবীর মানুষকে গ্রাস করে ফেলেছে। মৃত্যুভয়ে দুনিয়ার প্রায় সব মানুষ ঘরে শুয়ে-বসে জীবনযাপন করে চলেছেন। ঘরের বাইরে বের না হলে যাদের জীবন-জীবিকায় ব্যাঘাত ঘটে বা অচল হয়ে পড়ে, বর্তমান অবস্থায় তারা বাদে প্রায় সবাই গৃহবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এসবের কারণ করোনাভাইরাস নামক ছোঁয়াচে একটি রোগ, যার প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।

এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে দুই কোটিরও বেশি মানুষ রোগটিতে আক্রান্ত এবং সাত লাখেরও বেশি মানুষ মারা গেলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের এ চরম বিকাশের যুগেও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর কোনো বিহিত করতে পারছেন না। এ বিষয়ে তাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও খোদ আমেরিকার মতো দেশেই সবচেয়ে অধিকসংখ্যক মানুষ রোগটিতে মারা গেছেন। আর এ মৃত্যুহার অব্যাহত থাকায় রোগটি যে কত মানুষের প্রাণ সংহার করবে তা বলা মুশকিল। কারণ, সমস্যাটি দীর্ঘমেয়াদি হবে বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

সারা বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশের মানুষও করোনা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় আমরাও করোনাভয়ে ভীত। আমাদের দেশেও প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন। সে তালিকায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ সবাই আছেন। আর বয়স্ক ব্যক্তিরা এ রোগে আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। কারণ, এই শ্রেণির মানুষ বয়সজনিত কারণে এমনিতেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।

এ অবস্থায় তাদের ক্ষেত্রে রোগটি অত্যন্ত ভয়ংকর, যার প্রমাণ ইতোমধ্যে আমরা পেয়েছি। বয়স্ক বা বৃদ্ধ অনেক ব্যক্তিকেই আমরা হারিয়েছি, যাদের মধ্যে কিছু শিল্পপতি, বুদ্ধিজীবীসহ এমন অনেকে আছেন যারা দেশ ও জাতিকে অনেক কিছু দিয়েছেন। এমন শিল্পপতি আছেন, যিনি দেশকে শিল্প সমৃদ্ধ করে দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাসহ উৎপাদিত পণ্য রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন।

আবার দেশের শিল্প-সাহিত্য সমৃদ্ধ করেছেন এমন বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউও করোনায় মারা গেছেন। আর বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে আল্লাহর রহমতে আমরা যারা বেঁচে আছি, তারাও ভয়ে ভয়ে আছি! এ দুঃসময়ে মানসিকভাবে আমরা কেউ ভালো নেই। মৃত্যুভয়ে নন্দলালের মতো ঘরে বসে থেকে হাঁটা চলাফেরা করতে না পারায় আমাদের শরীরের অসুখ-বিসুখও দিনের পর দিন আরও বেড়ে চলেছে। এতদিন যেসব অসুখ নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন আর তা থাকছে না।

শারীরিক স্থবিরতা, মানসিক দুশ্চিন্তা ইত্যাদি কারণে আমরা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে বসেছি। কতদিনে এ অবস্থার অবসান হবে সেই আশায় পথ চেয়ে আছি। আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চাই, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মিলিত হতে চাই। স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফেরাসহ কাজকর্ম শুরু করতে চাই। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে গৃহবন্দি জীবনযাপন করে চলেছি, অথচ আমরা নন্দলাল নই!

এ মুহূর্তে তাই আমাদের বিশেষ প্রার্থনা হল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করুন। আর মহান আল্লাহ তাদের সেই সক্ষমতা দান করুন। বিশ্ব থেকে করোনাভাইরাস নামক এ মহামারী দূরীভূত হয়ে যাক। অতঃপর পৃথিবীর মানুষকে যাতে এ ভয়ে ভীত হয়ে জীবনযাপন করতে না হয় তজ্জন্য সারা পৃথিবী একজোট হয়ে কাজ করলে ইনশাআল্লাহ আমরা নতুন এক পৃথিবীর মুখ দেখতে পাব; নতুন করে জীবন শুরু করতে পারব।

আশা করি, পৃথিবীর মানুষ নয়, করোনা পরাজিত হবে এবং অচিরেই তা হবে। আমার সন্তানরা, শিশুরা আবার আমাদের হাত ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাবে। আর সেই সঙ্গে আমরাও বাইরে যাব, বাইরের পৃথিবীর আলো-বাতাসে ঘুরব-ফিরব।

কিন্তু বর্তমান অবস্থায় করোনা নামক এ ভয়ংকর শত্রুকে পরাজিত করতে হলে আমাদের নিজেদেরও সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে। অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া, ঘরে-বাইরে এ সংক্রান্ত শিষ্টাচার মেনে চলা, মাস্ক ব্যবহার করা, অনেকে একত্রিত হয়ে জটলা সৃষ্টি না করা, হাটে-বাজারে চলাফেরায় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা ইত্যাদিসহ খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, উঠাবসায় সর্বক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা মোকাবেলায় সক্রিয় হলে দেশের সবার জন্যই তা কল্যাণ বয়ে আনবে।

কথাটা বলার কারণ হল, এ বিষয়ে অনেকেই আমরা গুরুত্বারোপ করছি না! বিশেষ করে বাজার-ঘাটে যেভাবে আমরা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলাফেরা করছি তা দেখে মনে হচ্ছে, এতসব মৃত্যু দেখেও আমাদের বোধোদয় হয়নি। ব্যাপারটা যেন এমন যে, আমার কিছু হবে না! কিন্তু ব্যাপারটা কি আসলেই তাই? এমন অসতর্কভাবে চলাফেরায় করোনাভাইরাসকেই যে ছাড় দেয়া হচ্ছে, ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, একশ্রেণির মানুষ তা কিছুতেই যেন বুঝতে চাচ্ছেন না। কারণ, তারা ধরেই নিয়েছেন, অন্যদের হলেও তার কিছু হবে না!

করোনাকাল পাঁচ মাস অতিক্রম করায় প্রায় কারও পক্ষেই এখন আর একনাগাড়ে ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয়। তাছাড়া জীবন-জীবিকার জন্য যাদের রাস্তায় নামতে হয়, অফিস-আদালতে যেতে হয়, তাদের পক্ষে তো নয়ই। সুতরাং আমরা যারা যখনই ঘরের বাইরে যাব, করোনার কথাটি যেন অবশ্যই মাথায় রাখি।

অনেককেই এ বিষয়ে গোঁয়ার্তুমি করতে দেখা যাচ্ছে, যা দেশ-জাতি তথা সারা পৃথিবীর মানুষের জন্যই ক্ষতিকর বটে। এ অবস্থায় করোনাকে রুখতে হলে, করোনার ক্ষতির যবনিকা টানতে হলে ভবিষ্যৎ পথচলায় আমাদের আরও সাবধান হওয়ার পাশাপাশি একশ্রেণির মানুষের হঠকারিতাকেও রুখতে হবে।

লেখাটির ইতি টানতে করোনা প্রতিষেধক আবিষ্কার নিয়ে গবেষণার বিষয়ে কিছু বলতে চাই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ কাজটি করে চলেছে এবং তাদের কেউ কেউ সাফল্যের দ্বারপ্রান্তেও পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে চললেও এ বিষয়ে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে বলে মনে হয় না। যদিও কোনো একটি ওষুধ কোম্পানি এ বিষয়ে একটা কিছু করার দাবি করেছিল; কিন্তু পরে আর কিছু জানা গেল না!

আর এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানটির কথা না বলাই ভালো। কারণ, তারা এসব নিয়ে ভাবেন বলে মনে হয় না! বরং কিছুদিন আগে সেখানে একজন ভেজাল করোনাসামগ্রী ব্যবসায়ীকে খুঁজে পাওয়া গেল। অথচ এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সুনাম ছিল। ছিল সারা পৃথিবীতে নাম-ডাক। সারা দেশের স্কলারদের ঠিকানা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এখনও যে নেই, তেমনটিও নয়। কিন্তু গবেষণা কার্যক্রমে তার তেমন কোনো প্রতিফলন নেই। যার ফলে কোনো রোগের প্রতিষেধক বা ওষুধ আবিষ্কারে দেশ ও জাতির পরনির্ভরতা, দৈন্যতা ঘোচানো সম্ভব হচ্ছে না। আর অদূর ভবিষ্যতে তা হবে বলেও মনে হয় না। কারণ, এ দেশের স্কলারদের মাথায়ও এখন পলিটিক্সের ভূত চেপে বসেছে! অধ্যয়ন-অধ্যাপনা শিকেয় তুলে অধিকাংশ স্কলারই বর্তমানে রাজনীতি সম্পৃক্ত।

যাক সে কথা। আমরা না হয় অন্য দেশের স্কলারদের আবিষ্কৃত প্রতিষেধক পেয়েই ধন্য হব। কিন্তু তা কতদিনে কীভাবে পাব, সেটাই বড় কথা। কারণ, করোনার বিরুদ্ধে এ প্রতিষেধকটিই এখন ভরসা। বিশেষ করে আমার মতো বয়সী মানুষ তীর্থের কাকের মতো এ ভ্যাকসিনটির আশায় পথ চেয়ে আছি।

এ রোগটির ক্ষেত্রে আমাদের বয়সের মানুষ যেহেতু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তাই এসব নিয়ে আমাদের গরজও বেশি। আজ পাঁচ মাস ধরে ঘরে বসে থেকে দেখেছি এবং বুঝেছি এ জীবন কোনো জীবন নয়, এভাবে নন্দলালের মতো জীবনযাপন করা অর্থহীন।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত