ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ কেন
jugantor
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ কেন

  মুঈদ রহমান  

০৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘এই মণিহার আমায়, নাহি সাজে’- রবীন্দ্রনাথের সেই বিনয়ের দিন বোধহয় আর নেই। এখন বিষয়টি এমন হয়েছে যে, কেউ কেউ মনে করেন এই ‘মণিহার’ কেবল আমারই সাজে, অন্য কারও নয়। আমার পর্যবেক্ষণটি সব জায়গার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হলেও এ সময়ের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তা খাটে।

চার বছরের মাথায় এসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে। কারণটা ওই ‘মণিহার’; বর্তমান উপাচার্য চাইছেন মেয়াদ শেষে আরেক দফা স্বপদে বহাল থাকতে আর তার প্রতিপক্ষ চাইছেন ওই পদ থেকে সরিয়ে দিতে। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২তম ভিসি হিসেবে যোগদান করেন প্রফেসর ড. মো. হারুন-উর-রশীদ আসকারী।

সেই হিসেবে ২০ আগস্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা; কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মাস আগে থেকেই ভিসি পক্ষের লোকজন দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে ‘স্তুতি’ প্রচারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তাই দেখে প্রতিপক্ষও মাঠে নেমে পড়ে; প্রতিবাদ করার লক্ষ্যে কুষ্টিয়া শহরে মানববন্ধন কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়। পরিস্থিতির সার্বিক বিবেচনায় যা বলা যায় তা হল, যারা ৪ বছর ধরে নানা বিষয়ে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন তারা ভিসির অপসারণ চাইছেন, আর যারা ৪ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা ভোগ করেছেন তারা ভিসির এক্সটেনশন চাইছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রকৃত পক্ষে এটি হচ্ছে আওয়ামী সমর্থকদের মধ্যকার দলীয় কোন্দল, যে বিরোধে ভিসি জড়িয়ে গেছেন।

যারা ‘স্তুতি’ প্রচার করছেন এবং যারা অভিযোগ করছেন, উভয়েই অতিরঞ্জনের দোষে দুষ্ট। সবচেয়ে দুঃখজনক হল, একপর্যায়ে আক্রমণগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেছে, উঠে এসেছে সম্ভ্রমের প্রশ্ন। দুই পক্ষের কারও সঙ্গেই ভিসি ইস্যুতে আমার যোগাযোগ নেই, তারপরও আমার এক বন্ধুতুল্য সহকর্মী বললেন এ সময়ে কিছু একটা বলতে। কী কারণে বলা উচিত সে ব্যাপারে কিছু না বললেও সেটি আমার বুঝতে বাকি রইল না। প্রথমত, আমার বলার পেছনে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ থাকার কথা নয়। কারণ, বর্তমান সময়ে ভিসি হওয়ার অন্যতম গুণাবলি হল, সরকারি দলের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য হওয়া, সরকারি দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেনদরবার করা এবং সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ‘মিষ্টিভাব’ বজায় রাখা।

এ চারটি ‘গুণের’ কোনোটিই আমার নেই। তাছাড়া রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় যারা জীবিত আছেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এবং কমরেড খালেকুজ্জামান আমার শ্রদ্ধার শীর্ষস্থানটি দখল করে আছেন, তাদের সম্পর্কের বিনিময়ে আমি বাংলাদেশের কোনো পদ গ্রহণ করব না। অতএব ভিসি হওয়ার সব পথ আমার জন্য বন্ধ। তাই একটি নৈতিক অবস্থানে থেকে কথা বলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আমার মেধার সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেকেই একাডেমিক্যালি আমাকে টপকে গেছেন; কিন্তু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের তারিখ বিবেচনা করলে আমি ‘মুরুব্বি’র দলে; এ স্বল্প পুঁজিকে কেন্দ্র করেও কিছু বলা যায়। তবে পৃথিবীর যে কোনো মতামতই কারও না কারও পক্ষে যায়। জ্ঞানসমুদ্রে আমার আকার একফোঁটা জলসমও নয়; কিন্তু যদি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, আল ফারাবি এমনকি বিংশ শতকের বার্ট্রান্ড রাসেল এবং হালের নোয়াম চমস্কির কথাও আলোচনায় আনেন, তাহলেও সবার মন জয় করতে পারবেন না, কারও না কারও কাছে তা পক্ষপাত মনে হবে।

যারা বলছেন, এ ভিসির আগে দায়িত্ব নেয়া ১১ জন ভিসির কেউই পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারেননি, তাদের কথা হয়তো সময়ের বিবেচনায় সত্য। তবে কেউ যদি এর দ্বারা কারও যোগ্যতাকে খাটো করতে চান তাহলে দু’কথা আসবে। একানব্বই-পরবর্তী যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে তার প্রতিটিই ভিসি নিয়োগ দিয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ভিসি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছিলেন এরশাদ সরকারের আমলে। একানব্বই সালে বিএনপি এসে তাকে সরিয়ে দিয়েছে। অসন্তোষ কিছুটা হলেও সরকার পরিবর্তন না হলে ওনার মতো শক্ত হাতের ভিসিকে আন্দোলন করে সরানো যেত না। এটাকে কি ব্যর্থতা বলা যায়? চতুর্থ ভিসি অধ্যাপক এনামুল হক বিএনপির নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি।

ছিয়ানব্বই সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার কি স্বপদে বহাল থাকার কথা? থাকতে পারেননি। পঞ্চম ভিসি অধ্যাপক কায়েস উদ্দিন বছর দুয়েক এখানে কাজ করার পর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে চলে যান ঢাকায়। এটা কি কায়েস স্যারের ব্যর্থতা? ষষ্ঠ ভিসি অধ্যাপক লুৎফর রহমানকে নিয়োগ দেয় আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে তার পরদিনই পদত্যাগ করে চলে যান, তাকে কেউ যেতে বলেননি। এটা কি তার ব্যর্থতা? নবম ভিসি অধ্যাপক ফয়েজ মুহাম্মদ সিরাজ বিএনপির ভিসি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কোনো ধরনের প্রতিবাদ ছাড়াই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ঢাকায় চলে যান। এটি কি ফয়েজ স্যারের ব্যর্থতা? তবে হ্যাঁ, নিজের সমর্থিত সরকার দ্বারা অপসারিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির ১ জন, বিএনপির ৩ জন এবং আওয়ামী লীগের ২ জন ভিসি। সুতরাং ঢালাওভাবে ১১ জন ভিসিকে ব্যর্থ করার প্রয়োজন আছে কি? অপরকে অবমূল্যায়ন না করে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়া যায় না। আরেকটি অতিরঞ্জনের বিষয় হল উন্নয়ন নিয়ে। বলা হচ্ছে প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কথা।

এ বিষয়ে আমরা বর্তমান ভিসিকে সাধুবাদ জানাতে কার্পণ্য করিনি; কিন্তু কোনো একটি মহল যদি আমাদের সৌজন্যকে হীনস্বার্থে ব্যবহার করতে চায় তাহলে কথা আছে। মেগা প্রকল্পে বরাদ্দের সিদ্ধান্ত সরকারের নেয়া, তা এককভাবে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির আদায়কৃত নয়। সে বিবেচনায় দেশের প্রায় ৭টি বিশ্ববিদ্যালয়কে এ ধরনের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিস্যাটা একটু কম বলেই মনে করেন অনেকে।

এ খাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। আর পূর্বেকার ভিসিদের সঙ্গে তুলনা করে উন্নয়নের কথা? উন্নয়ন হচ্ছে একটি চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অগ্রগতি ঘটে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে আমরা ‘পদ্মা সেতুর’ বাস্তবায়নের কথা কল্পনাতেও আনতে পারিনি; কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে তা বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। তার মানে কি এই যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর চাইতেও বলিষ্ঠ এবং দক্ষ? উন্নয়ন সর্বদাই সময় ও আর্থিক সঙ্গতির ওপর নির্ভর করে। কোনো শিক্ষিতজনের কাছে কোনো অসম তুলনা প্রত্যাশিত নয়। অতিরঞ্জন মানুষের প্রকৃত যোগ্যতাকে মলিন করে ফেলে, বিতর্কের জন্ম দেয়।

ভিসির যারা অপসারণ দাবি করছেন, তারা তাকে সরাসরি ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়েছেন। যদি তাদের প্রশ্ন করা হয়, এ অভিযোগ ব্যক্তি আসকারীর জন্য যথার্থ কি না, তাহলে জবাবটা আসবে, নিজে দুর্নীতি করা আর অপরকে দুর্নীতি করার সুযোগ দেয়া সমার্থক। সেই অর্থে আইনের ভাষায় যদি কেউ বলেন, ‘মাইট বি কনভিক্টেড ফর ব্যাড অ্যাসোসিয়েটস’, তাহলে তার সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন হয়ে যাবে। কেননা ২ বছর ধরে যেসব অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে তার সন্তোষজনক সুরাহা আজও হয়নি। অনেকেই মনে করেন, এখানে প্রশ্রয়ের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা মানুষের সে দায় তো নিতেই হবে।

একদল চাইছে অপসারণ, আরেক দল চাইছে এক্সটেনশন। আরেকটি নীরব পক্ষ আছে, যারা এ দুটোর কোনোটিই চাইছে না; তারা চাইছে মেয়াদ শেষে ভিসির একটি সম্মানজনক প্রস্থান। তাদের যুক্তি হল, ভালোর তো শেষ নেই। বর্তমান ভিসি যদি বিগত ১১ ভিসির তুলনায় ভালো হন, তাহলে আগামী ভিসিও তো বর্তমানের চাইতে ভালো হতে পারেন। তাছাড়া আমরা জানি, বর্তমান সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে শিক্ষক রাজনীতি চলছে তার সম্পূর্ণটাই ক্ষমতা ও পদ-পদবিকেন্দ্রিক। সবাই ক্ষমতার স্বাদ পেতে চায়। সেই সুযোগের কথা বিবেচনা করে একজনকে কেবল একবারই সুযোগ দিয়ে অন্যদের পথ পরিষ্কার করা এবং সম্ভব হলে মেয়াদ কমিয়ে ২ বছর করা। তাতে ফুল দেয়া-নেয়া করতে করতেই মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, দুর্নীতির সুযোগ থাকবে কম।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এখন ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ চলে গেছে। একদল ভাবছে এ ভিসিকে না রাখতে পারলে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, অপর দল ভাবছে ভিসিকে সরাতে না পারলে তাদের মাটিতে পিষিয়ে মারা হবে। আমি এসব কিছুই ভাবছি না; নচিকেতার গানের লাইনটি আমার মনে আছে,- ‘একদিন ঝড় থেমে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে।’

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ কেন

 মুঈদ রহমান 
০৯ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘এই মণিহার আমায়, নাহি সাজে’- রবীন্দ্রনাথের সেই বিনয়ের দিন বোধহয় আর নেই। এখন বিষয়টি এমন হয়েছে যে, কেউ কেউ মনে করেন এই ‘মণিহার’ কেবল আমারই সাজে, অন্য কারও নয়। আমার পর্যবেক্ষণটি সব জায়গার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হলেও এ সময়ের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তা খাটে।

চার বছরের মাথায় এসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে। কারণটা ওই ‘মণিহার’; বর্তমান উপাচার্য চাইছেন মেয়াদ শেষে আরেক দফা স্বপদে বহাল থাকতে আর তার প্রতিপক্ষ চাইছেন ওই পদ থেকে সরিয়ে দিতে। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২তম ভিসি হিসেবে যোগদান করেন প্রফেসর ড. মো. হারুন-উর-রশীদ আসকারী।

সেই হিসেবে ২০ আগস্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা; কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মাস আগে থেকেই ভিসি পক্ষের লোকজন দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে ‘স্তুতি’ প্রচারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তাই দেখে প্রতিপক্ষও মাঠে নেমে পড়ে; প্রতিবাদ করার লক্ষ্যে কুষ্টিয়া শহরে মানববন্ধন কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়। পরিস্থিতির সার্বিক বিবেচনায় যা বলা যায় তা হল, যারা ৪ বছর ধরে নানা বিষয়ে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন তারা ভিসির অপসারণ চাইছেন, আর যারা ৪ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা ভোগ করেছেন তারা ভিসির এক্সটেনশন চাইছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রকৃত পক্ষে এটি হচ্ছে আওয়ামী সমর্থকদের মধ্যকার দলীয় কোন্দল, যে বিরোধে ভিসি জড়িয়ে গেছেন।

যারা ‘স্তুতি’ প্রচার করছেন এবং যারা অভিযোগ করছেন, উভয়েই অতিরঞ্জনের দোষে দুষ্ট। সবচেয়ে দুঃখজনক হল, একপর্যায়ে আক্রমণগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেছে, উঠে এসেছে সম্ভ্রমের প্রশ্ন। দুই পক্ষের কারও সঙ্গেই ভিসি ইস্যুতে আমার যোগাযোগ নেই, তারপরও আমার এক বন্ধুতুল্য সহকর্মী বললেন এ সময়ে কিছু একটা বলতে। কী কারণে বলা উচিত সে ব্যাপারে কিছু না বললেও সেটি আমার বুঝতে বাকি রইল না। প্রথমত, আমার বলার পেছনে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ থাকার কথা নয়। কারণ, বর্তমান সময়ে ভিসি হওয়ার অন্যতম গুণাবলি হল, সরকারি দলের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য হওয়া, সরকারি দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেনদরবার করা এবং সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ‘মিষ্টিভাব’ বজায় রাখা।

এ চারটি ‘গুণের’ কোনোটিই আমার নেই। তাছাড়া রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় যারা জীবিত আছেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এবং কমরেড খালেকুজ্জামান আমার শ্রদ্ধার শীর্ষস্থানটি দখল করে আছেন, তাদের সম্পর্কের বিনিময়ে আমি বাংলাদেশের কোনো পদ গ্রহণ করব না। অতএব ভিসি হওয়ার সব পথ আমার জন্য বন্ধ। তাই একটি নৈতিক অবস্থানে থেকে কথা বলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আমার মেধার সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেকেই একাডেমিক্যালি আমাকে টপকে গেছেন; কিন্তু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের তারিখ বিবেচনা করলে আমি ‘মুরুব্বি’র দলে; এ স্বল্প পুঁজিকে কেন্দ্র করেও কিছু বলা যায়। তবে পৃথিবীর যে কোনো মতামতই কারও না কারও পক্ষে যায়। জ্ঞানসমুদ্রে আমার আকার একফোঁটা জলসমও নয়; কিন্তু যদি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, আল ফারাবি এমনকি বিংশ শতকের বার্ট্রান্ড রাসেল এবং হালের নোয়াম চমস্কির কথাও আলোচনায় আনেন, তাহলেও সবার মন জয় করতে পারবেন না, কারও না কারও কাছে তা পক্ষপাত মনে হবে।

যারা বলছেন, এ ভিসির আগে দায়িত্ব নেয়া ১১ জন ভিসির কেউই পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারেননি, তাদের কথা হয়তো সময়ের বিবেচনায় সত্য। তবে কেউ যদি এর দ্বারা কারও যোগ্যতাকে খাটো করতে চান তাহলে দু’কথা আসবে। একানব্বই-পরবর্তী যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে তার প্রতিটিই ভিসি নিয়োগ দিয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ভিসি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছিলেন এরশাদ সরকারের আমলে। একানব্বই সালে বিএনপি এসে তাকে সরিয়ে দিয়েছে। অসন্তোষ কিছুটা হলেও সরকার পরিবর্তন না হলে ওনার মতো শক্ত হাতের ভিসিকে আন্দোলন করে সরানো যেত না। এটাকে কি ব্যর্থতা বলা যায়? চতুর্থ ভিসি অধ্যাপক এনামুল হক বিএনপির নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি।

ছিয়ানব্বই সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার কি স্বপদে বহাল থাকার কথা? থাকতে পারেননি। পঞ্চম ভিসি অধ্যাপক কায়েস উদ্দিন বছর দুয়েক এখানে কাজ করার পর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে চলে যান ঢাকায়। এটা কি কায়েস স্যারের ব্যর্থতা? ষষ্ঠ ভিসি অধ্যাপক লুৎফর রহমানকে নিয়োগ দেয় আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে তার পরদিনই পদত্যাগ করে চলে যান, তাকে কেউ যেতে বলেননি। এটা কি তার ব্যর্থতা? নবম ভিসি অধ্যাপক ফয়েজ মুহাম্মদ সিরাজ বিএনপির ভিসি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কোনো ধরনের প্রতিবাদ ছাড়াই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ঢাকায় চলে যান। এটি কি ফয়েজ স্যারের ব্যর্থতা? তবে হ্যাঁ, নিজের সমর্থিত সরকার দ্বারা অপসারিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির ১ জন, বিএনপির ৩ জন এবং আওয়ামী লীগের ২ জন ভিসি। সুতরাং ঢালাওভাবে ১১ জন ভিসিকে ব্যর্থ করার প্রয়োজন আছে কি? অপরকে অবমূল্যায়ন না করে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়া যায় না। আরেকটি অতিরঞ্জনের বিষয় হল উন্নয়ন নিয়ে। বলা হচ্ছে প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কথা।

এ বিষয়ে আমরা বর্তমান ভিসিকে সাধুবাদ জানাতে কার্পণ্য করিনি; কিন্তু কোনো একটি মহল যদি আমাদের সৌজন্যকে হীনস্বার্থে ব্যবহার করতে চায় তাহলে কথা আছে। মেগা প্রকল্পে বরাদ্দের সিদ্ধান্ত সরকারের নেয়া, তা এককভাবে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির আদায়কৃত নয়। সে বিবেচনায় দেশের প্রায় ৭টি বিশ্ববিদ্যালয়কে এ ধরনের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিস্যাটা একটু কম বলেই মনে করেন অনেকে।

এ খাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। আর পূর্বেকার ভিসিদের সঙ্গে তুলনা করে উন্নয়নের কথা? উন্নয়ন হচ্ছে একটি চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অগ্রগতি ঘটে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে আমরা ‘পদ্মা সেতুর’ বাস্তবায়নের কথা কল্পনাতেও আনতে পারিনি; কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে তা বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। তার মানে কি এই যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর চাইতেও বলিষ্ঠ এবং দক্ষ? উন্নয়ন সর্বদাই সময় ও আর্থিক সঙ্গতির ওপর নির্ভর করে। কোনো শিক্ষিতজনের কাছে কোনো অসম তুলনা প্রত্যাশিত নয়। অতিরঞ্জন মানুষের প্রকৃত যোগ্যতাকে মলিন করে ফেলে, বিতর্কের জন্ম দেয়।

ভিসির যারা অপসারণ দাবি করছেন, তারা তাকে সরাসরি ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়েছেন। যদি তাদের প্রশ্ন করা হয়, এ অভিযোগ ব্যক্তি আসকারীর জন্য যথার্থ কি না, তাহলে জবাবটা আসবে, নিজে দুর্নীতি করা আর অপরকে দুর্নীতি করার সুযোগ দেয়া সমার্থক। সেই অর্থে আইনের ভাষায় যদি কেউ বলেন, ‘মাইট বি কনভিক্টেড ফর ব্যাড অ্যাসোসিয়েটস’, তাহলে তার সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন হয়ে যাবে। কেননা ২ বছর ধরে যেসব অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে তার সন্তোষজনক সুরাহা আজও হয়নি। অনেকেই মনে করেন, এখানে প্রশ্রয়ের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা মানুষের সে দায় তো নিতেই হবে।

একদল চাইছে অপসারণ, আরেক দল চাইছে এক্সটেনশন। আরেকটি নীরব পক্ষ আছে, যারা এ দুটোর কোনোটিই চাইছে না; তারা চাইছে মেয়াদ শেষে ভিসির একটি সম্মানজনক প্রস্থান। তাদের যুক্তি হল, ভালোর তো শেষ নেই। বর্তমান ভিসি যদি বিগত ১১ ভিসির তুলনায় ভালো হন, তাহলে আগামী ভিসিও তো বর্তমানের চাইতে ভালো হতে পারেন। তাছাড়া আমরা জানি, বর্তমান সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে শিক্ষক রাজনীতি চলছে তার সম্পূর্ণটাই ক্ষমতা ও পদ-পদবিকেন্দ্রিক। সবাই ক্ষমতার স্বাদ পেতে চায়। সেই সুযোগের কথা বিবেচনা করে একজনকে কেবল একবারই সুযোগ দিয়ে অন্যদের পথ পরিষ্কার করা এবং সম্ভব হলে মেয়াদ কমিয়ে ২ বছর করা। তাতে ফুল দেয়া-নেয়া করতে করতেই মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, দুর্নীতির সুযোগ থাকবে কম।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এখন ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ চলে গেছে। একদল ভাবছে এ ভিসিকে না রাখতে পারলে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, অপর দল ভাবছে ভিসিকে সরাতে না পারলে তাদের মাটিতে পিষিয়ে মারা হবে। আমি এসব কিছুই ভাবছি না; নচিকেতার গানের লাইনটি আমার মনে আছে,- ‘একদিন ঝড় থেমে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে।’

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়