এক কোটি শিশুশিক্ষার্থীর দায় কে নেবে?
jugantor
এক কোটি শিশুশিক্ষার্থীর দায় কে নেবে?

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বরাবরই অগোছাল। নানা রকম রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। মন্ত্রী আসেন, মন্ত্রী যান। ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় হয়। বড়দের জন্য আলাদা।

তারপরও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার করতে যাচ্ছি, তবু শিক্ষার ক্ষেত্রে সুস্থির নীতিমালা তৈরি করতে পারলাম না। বরাবরই বলা হয় শিশুশিক্ষার ভিত শক্ত না হলে পরবর্তী শিক্ষার কাঠামো সবল হতে পারে না। সরকার যে শিশুশিক্ষার দিকে দৃষ্টি দেয় না, তেমন নয়। দেশজুড়ে অনেক অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে। চমৎকার সব প্রাইমারি স্কুলে ইমারত গড়া হয়েছে। শিক্ষাপদ্ধতি ‘আধুনিক’ করা হয়েছে।

শিক্ষকরাও অনেক পরিশ্রম করছেন। প্রাইমারি স্কুল সমাপনী পরীক্ষাকে পাবলিক পরীক্ষায় উন্নীত করা হয়েছে। কাজে লাগুক বা না লাগুক, খুদে শিক্ষার্থীরা এখন সার্টিফিকেটধারী হচ্ছে। ওদেরও বড়দের মতো কোচিং করার ব্যবস্থা করা হয়েছে! কত যত্নে ওদের জন্য গাইডবই লেখা হচ্ছে! শিশুশিক্ষার্থীর গুরুত্বই যেন বেড়ে গেছে।

সরকারি ভাষ্যমতে, পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা দিয়ে শিশুশিক্ষার্থীরা এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার ভীতি কমাতে পারবে। আমাদের মতো নয়, আমরা দারুণ ভীতি নিয়েই বোধহয় পরীক্ষা দিতাম!- এমন সব অদ্ভুত যুক্তিও শুনতে হচ্ছে। এমনি করে সবই হচ্ছে; কিন্তু এতসব কার্যক্রম লাগসই হচ্ছে কি না, সে পর্যালোচনা সম্ভবত করা হচ্ছে না।

করোনাকালের একটি বাস্তবতা দেখে বিস্মিত এবং হতাশ হতে হচ্ছে। কোভিডের বন্দিত্বদশায় শিক্ষাকে সচল রাখার জন্য সরকার ও শিক্ষাবিদরা নানা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অনলাইন পদ্ধতিতে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। যদিও এটি এক ধরনের জোড়াতালিই বটে।

তা ছাড়া কী বা করার আছে। আমি দেখেছি সামর্থ্যরে কারণেই সম্ভবত নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনলাইনের সাফল্য বেশি। ভার্চুয়াল ক্লাসে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীই উপস্থিত থাকে; কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজে তেমনটি নয়। এখানে গড়ে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতে পারছে না। তবুও ব্যবস্থাপনাটি মন্দের ভালো।

সরকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা প্রণোদনাও দিচ্ছে; কিন্তু একেবারে যেন ভুলে গেছে প্রায় এক কোটি শিশুশিক্ষার্থী এবং এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১৫ লক্ষ শিক্ষকের কথা। হ্যাঁ, আমি দেশজুড়ে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কথা বলছি। এ ধারার অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়মনীতি মেনে নিবন্ধিতও।

২০১৬ সালে একটি পরিসংখ্যান বেরিয়েছিল জাতীয় দৈনিকে। তাতে দেখা যায়, তখন দেশে প্রায় ৬৫ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিল। এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে এক লাখ পেরিয়ে যাবে। সাধারণ অনুমানে বলা যায়, এসব স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটির কম নয়। এ এক কোটি শিক্ষার্থীর পড়ানোর দায়িত্ব তো রাষ্ট্রকেই নিতে হতো।

এ দায় লাঘব করে দিয়েছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো। স্কুল পরিচালনা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়ায় সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। অর্থাৎ সরকারকে বিশাল আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। এ করোনাকালে এমপিওভুক্ত নয়, এমন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের একবার সরকার ‘আর্থিক সাহায্য’ করেছিল।

সেই বাজেটের কিছু অর্থ বেঁচে যাওয়ায় বেনবেইজের তালিকাভুক্ত মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানো হয় এমন হাতেগোনা কিছুসংখ্যক কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের সামান্য আর্থিক সাহায্য করা হয়। সাধারণত ছাত্র বেতনের ওপর ভিত্তি করেই এসব স্কুল পরিচালিত হয়ে থাকে। সরকার শুধু বিনামূল্যে বই বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ করে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সংকটেও এ এক কোটি শিশুশিক্ষার্থীর ব্যাপারে সরকার তথা মন্ত্রণালয়ের কোনো দায়িত্ব নেই। আমি বেশ কয়েকটি নামি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষকদের কাছে জেনেছি, এ করোনাকালে সরকারি প্রাইমারি ও হাইস্কুলের শিক্ষা ও পরীক্ষা কার্যক্রম চালানোর জন্য যে গাইডলাইন দেয়া হয়েছে, এসব স্কুলের জন্য তা-ও নেই।

এ ধরনের স্কুলের একাধিক প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি তারা উপজেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন; কিন্তু এসব অফিসের কর্মকর্তারা কোনো পথ দেখাতে পারেননি। অর্থাৎ এ এক কোটি শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের কোনো গাইডলাইন নেই। তাহলে কি এ দেশের সন্তান হয়ে এরা ব্রাত্যজন!

অথচ এসব স্কুলে পিইসি-জেএসসি পরীক্ষার সনদ একইভাবে সরকার থেকে দেয়া হচ্ছে। আবার অবাক করা বিষয় হচ্ছে, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরকারি অর্থায়নে ‘বঙ্গমাতা গোল্ডকাপে’ অংশ নিতে পারলেও এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষার্থী এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এতে শিশুশিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিষণ্ন হয়ে পড়ে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবক সবাই এখন চরম হতাশায় কালাতিপাত করছেন।

শিক্ষা গবেষণার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখি বলে এবং শিশুশিক্ষার্থীদের নিয়ে আমার বিশেষ ভাবনার কথা মাঝেমধ্যে লিখি বলেই হয়তো এ ধারার স্কুলের নানা অনুষ্ঠানে আমাকে মাঝেমধ্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি ওদের শিক্ষা কার্যক্রম কাছে থেকে দেখার সুযোগ পাই। দেখেছি একই অঞ্চলের অনেক কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে ছাত্রছাত্রী পাওয়ার জন্য হলেও একটি প্রতিযোগিতা থাকে।

এ সুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে প্রতিটি স্কুলই চায় শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে। স্কুলে শৃঙ্খলা বজায়, জাতীয় দিবসগুলো উদযাপন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায়ও একটি প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে এ ধারার অনেক স্কুলই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অনেকটা এগিয়ে আছে। তাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এলাকায় অভিভাবকদের অনেকে তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি না করে এ ধারার কিন্ডারগার্টেন কাম-মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ভর্তি করেন।

আমি তো মনে করি, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের চেয়ে অনেক মেধাবী আর চৌকস শিক্ষক এসব স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। একথা শুনে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা ভুল বুঝবেন না। এক্ষেত্রে আমার একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমত, প্রাইমারি স্কুলে এখনও যা বেতন কাঠামো তাতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনো মেধাবী ফলাফল করা শিক্ষার্থীরা (ব্যতিক্রম বাদে) প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন না।

সরকারি প্রাইমারি স্কুলের যেসব মেধাবী শিক্ষক আছেন তাদেরও অনেক হতাশা আছে। আবার নিয়োগ পরীক্ষার ফাঁক গলে প্রভাবশালীদের তদবিরে অনেককে শিক্ষক হিসেবে নিতে হয়। এদের সবাইকে দিয়ে ঠিক শিক্ষকতাটি অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে না।

উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশে পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য পার্টটাইম চাকরির ব্যবস্থা নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে টিউশন করে খরচ চালায়। এরকম চৌকস মেধাবী অনার্স-মাস্টার্সে পড়া ছেলেমেয়ে অল্প বেতন হলেও সানন্দে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোয় শিক্ষকতা করে থাকেন। অনেকে বেকারত্বের কারণেও এসব স্কুলে শিক্ষকতা করেন। আমি দেখেছি এদের অনেকেই আদর্শিক চিন্তায় ও নিজেদের গড়ে তোলার জন্য এসব স্কুলে আনন্দের সঙ্গে গভীর মমতায় শিক্ষকতা করেন। ফলে শিক্ষার গুণগত মানের প্রতিফলন দেখা যায়।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধের এ কঠিন সময়ে যে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করি, লক্ষ করেছি সার্টিফিকেট ভালো থাকলেও ঠিকমতো নার্সিং না হওয়ার ভিত্তিতে দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে অনেকেরই। এমন বাস্তবতায় মাঝে মাঝে কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রী পেয়ে যাই যারা কিন্ডারগার্টেন কাম-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেছিল।

আমি একবার গাজীপুরের এক নামি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে গিয়েছিলাম। অবাক হয়েছিলাম, বই আর ক্রেস্ট পুরস্কারের পাশাপাশি পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করায় কৃতী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হিসেবে ১৫টি কম্পিউটার দেয়া হয়েছিল। জানলাম প্রতি বছরই ওরা এভাবে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে। খুব আনন্দ-উৎসবের সঙ্গে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে থাকে এসব প্রতিষ্ঠান।

কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর অঞ্চলভেদে সমিতি রয়েছে। তারা প্রতিবছর যার যার অঞ্চলে প্রাইমারি বৃত্তি দিয়ে থাকে। এমন এক বৃত্তিপ্রদান অনুষ্ঠানে একবার সোনারগাঁয়ের কাছে মদনপুর গিয়েছিলাম। বিশাল আয়োজন। বিভিন্ন স্কুল থেকে আসা শত শত ছাত্রছাত্রী শৃঙ্খলার সঙ্গে মাঠে বসেছিল। এর আগে হয়েছিল বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। দু’ঘণ্টা লাগল ওদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে।

এভাবেই কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা ছাড়া একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুশিক্ষার্থী আমাদের মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে। এরা প্রত্যেকেই জাতির সম্পদ। তাহলে কি সরকারের কোনো দায় থাকবে না এসব শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি?

করোনাকালের বন্দিজীবনের ছয় মাস কেটে গেল। স্কুল খোলা না থাকায় ছাত্র-বেতন নেই। শিক্ষক-কর্মচারীদেরও ঠিকমতো বেতন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাদের সংসার আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ আছে; কিন্তু মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।

বলা হয়, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি আমরা। অথচ অর্থের অভাবে আমাদের বিপুলসংখ্যক শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শিক্ষক-কর্মচারী আর তাদের পরিবার পেটে পাথর বেঁধেছেন। বেশ কিছুদিন আগে খবরের কাগজে দেখলাম উপায় না দেখে এমন একজন শিক্ষক কলম, চিরুনি ফেরি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। আমার এক বন্ধু জানালেন তার চেনা এক শিক্ষক এখন রিকশাচালক।

আমাদের তো মনে হয় সরকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি সামান্য কমাতে পারলেও সেই অর্থে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আমরা আশা করব, বিমাতাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি না রেখে বিধায়করা কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর পাশে দাঁড়াবেন এবং যুগোপযোগী নীতিনির্ধারণ করবেন।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

এক কোটি শিশুশিক্ষার্থীর দায় কে নেবে?

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বরাবরই অগোছাল। নানা রকম রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। মন্ত্রী আসেন, মন্ত্রী যান। ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় হয়। বড়দের জন্য আলাদা।

তারপরও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার করতে যাচ্ছি, তবু শিক্ষার ক্ষেত্রে সুস্থির নীতিমালা তৈরি করতে পারলাম না। বরাবরই বলা হয় শিশুশিক্ষার ভিত শক্ত না হলে পরবর্তী শিক্ষার কাঠামো সবল হতে পারে না। সরকার যে শিশুশিক্ষার দিকে দৃষ্টি দেয় না, তেমন নয়। দেশজুড়ে অনেক অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে। চমৎকার সব প্রাইমারি স্কুলে ইমারত গড়া হয়েছে। শিক্ষাপদ্ধতি ‘আধুনিক’ করা হয়েছে।

শিক্ষকরাও অনেক পরিশ্রম করছেন। প্রাইমারি স্কুল সমাপনী পরীক্ষাকে পাবলিক পরীক্ষায় উন্নীত করা হয়েছে। কাজে লাগুক বা না লাগুক, খুদে শিক্ষার্থীরা এখন সার্টিফিকেটধারী হচ্ছে। ওদেরও বড়দের মতো কোচিং করার ব্যবস্থা করা হয়েছে! কত যত্নে ওদের জন্য গাইডবই লেখা হচ্ছে! শিশুশিক্ষার্থীর গুরুত্বই যেন বেড়ে গেছে।

সরকারি ভাষ্যমতে, পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা দিয়ে শিশুশিক্ষার্থীরা এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার ভীতি কমাতে পারবে। আমাদের মতো নয়, আমরা দারুণ ভীতি নিয়েই বোধহয় পরীক্ষা দিতাম!- এমন সব অদ্ভুত যুক্তিও শুনতে হচ্ছে। এমনি করে সবই হচ্ছে; কিন্তু এতসব কার্যক্রম লাগসই হচ্ছে কি না, সে পর্যালোচনা সম্ভবত করা হচ্ছে না।

করোনাকালের একটি বাস্তবতা দেখে বিস্মিত এবং হতাশ হতে হচ্ছে। কোভিডের বন্দিত্বদশায় শিক্ষাকে সচল রাখার জন্য সরকার ও শিক্ষাবিদরা নানা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অনলাইন পদ্ধতিতে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। যদিও এটি এক ধরনের জোড়াতালিই বটে।

তা ছাড়া কী বা করার আছে। আমি দেখেছি সামর্থ্যরে কারণেই সম্ভবত নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনলাইনের সাফল্য বেশি। ভার্চুয়াল ক্লাসে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীই উপস্থিত থাকে; কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজে তেমনটি নয়। এখানে গড়ে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতে পারছে না। তবুও ব্যবস্থাপনাটি মন্দের ভালো।

সরকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা প্রণোদনাও দিচ্ছে; কিন্তু একেবারে যেন ভুলে গেছে প্রায় এক কোটি শিশুশিক্ষার্থী এবং এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১৫ লক্ষ শিক্ষকের কথা। হ্যাঁ, আমি দেশজুড়ে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কথা বলছি। এ ধারার অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়মনীতি মেনে নিবন্ধিতও।

২০১৬ সালে একটি পরিসংখ্যান বেরিয়েছিল জাতীয় দৈনিকে। তাতে দেখা যায়, তখন দেশে প্রায় ৬৫ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিল। এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে এক লাখ পেরিয়ে যাবে। সাধারণ অনুমানে বলা যায়, এসব স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটির কম নয়। এ এক কোটি শিক্ষার্থীর পড়ানোর দায়িত্ব তো রাষ্ট্রকেই নিতে হতো।

এ দায় লাঘব করে দিয়েছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো। স্কুল পরিচালনা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়ায় সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। অর্থাৎ সরকারকে বিশাল আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। এ করোনাকালে এমপিওভুক্ত নয়, এমন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের একবার সরকার ‘আর্থিক সাহায্য’ করেছিল।

সেই বাজেটের কিছু অর্থ বেঁচে যাওয়ায় বেনবেইজের তালিকাভুক্ত মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানো হয় এমন হাতেগোনা কিছুসংখ্যক কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের সামান্য আর্থিক সাহায্য করা হয়। সাধারণত ছাত্র বেতনের ওপর ভিত্তি করেই এসব স্কুল পরিচালিত হয়ে থাকে। সরকার শুধু বিনামূল্যে বই বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ করে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সংকটেও এ এক কোটি শিশুশিক্ষার্থীর ব্যাপারে সরকার তথা মন্ত্রণালয়ের কোনো দায়িত্ব নেই। আমি বেশ কয়েকটি নামি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষকদের কাছে জেনেছি, এ করোনাকালে সরকারি প্রাইমারি ও হাইস্কুলের শিক্ষা ও পরীক্ষা কার্যক্রম চালানোর জন্য যে গাইডলাইন দেয়া হয়েছে, এসব স্কুলের জন্য তা-ও নেই।

এ ধরনের স্কুলের একাধিক প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি তারা উপজেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন; কিন্তু এসব অফিসের কর্মকর্তারা কোনো পথ দেখাতে পারেননি। অর্থাৎ এ এক কোটি শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের কোনো গাইডলাইন নেই। তাহলে কি এ দেশের সন্তান হয়ে এরা ব্রাত্যজন!

অথচ এসব স্কুলে পিইসি-জেএসসি পরীক্ষার সনদ একইভাবে সরকার থেকে দেয়া হচ্ছে। আবার অবাক করা বিষয় হচ্ছে, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরকারি অর্থায়নে ‘বঙ্গমাতা গোল্ডকাপে’ অংশ নিতে পারলেও এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষার্থী এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এতে শিশুশিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিষণ্ন হয়ে পড়ে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবক সবাই এখন চরম হতাশায় কালাতিপাত করছেন।

শিক্ষা গবেষণার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখি বলে এবং শিশুশিক্ষার্থীদের নিয়ে আমার বিশেষ ভাবনার কথা মাঝেমধ্যে লিখি বলেই হয়তো এ ধারার স্কুলের নানা অনুষ্ঠানে আমাকে মাঝেমধ্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি ওদের শিক্ষা কার্যক্রম কাছে থেকে দেখার সুযোগ পাই। দেখেছি একই অঞ্চলের অনেক কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে ছাত্রছাত্রী পাওয়ার জন্য হলেও একটি প্রতিযোগিতা থাকে।

এ সুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে প্রতিটি স্কুলই চায় শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে। স্কুলে শৃঙ্খলা বজায়, জাতীয় দিবসগুলো উদযাপন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায়ও একটি প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে এ ধারার অনেক স্কুলই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অনেকটা এগিয়ে আছে। তাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এলাকায় অভিভাবকদের অনেকে তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি না করে এ ধারার কিন্ডারগার্টেন কাম-মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ভর্তি করেন।

আমি তো মনে করি, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের চেয়ে অনেক মেধাবী আর চৌকস শিক্ষক এসব স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। একথা শুনে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা ভুল বুঝবেন না। এক্ষেত্রে আমার একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমত, প্রাইমারি স্কুলে এখনও যা বেতন কাঠামো তাতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনো মেধাবী ফলাফল করা শিক্ষার্থীরা (ব্যতিক্রম বাদে) প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন না।

সরকারি প্রাইমারি স্কুলের যেসব মেধাবী শিক্ষক আছেন তাদেরও অনেক হতাশা আছে। আবার নিয়োগ পরীক্ষার ফাঁক গলে প্রভাবশালীদের তদবিরে অনেককে শিক্ষক হিসেবে নিতে হয়। এদের সবাইকে দিয়ে ঠিক শিক্ষকতাটি অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে না।

উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশে পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য পার্টটাইম চাকরির ব্যবস্থা নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে টিউশন করে খরচ চালায়। এরকম চৌকস মেধাবী অনার্স-মাস্টার্সে পড়া ছেলেমেয়ে অল্প বেতন হলেও সানন্দে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোয় শিক্ষকতা করে থাকেন। অনেকে বেকারত্বের কারণেও এসব স্কুলে শিক্ষকতা করেন। আমি দেখেছি এদের অনেকেই আদর্শিক চিন্তায় ও নিজেদের গড়ে তোলার জন্য এসব স্কুলে আনন্দের সঙ্গে গভীর মমতায় শিক্ষকতা করেন। ফলে শিক্ষার গুণগত মানের প্রতিফলন দেখা যায়।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধের এ কঠিন সময়ে যে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করি, লক্ষ করেছি সার্টিফিকেট ভালো থাকলেও ঠিকমতো নার্সিং না হওয়ার ভিত্তিতে দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে অনেকেরই। এমন বাস্তবতায় মাঝে মাঝে কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রী পেয়ে যাই যারা কিন্ডারগার্টেন কাম-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেছিল।

আমি একবার গাজীপুরের এক নামি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে গিয়েছিলাম। অবাক হয়েছিলাম, বই আর ক্রেস্ট পুরস্কারের পাশাপাশি পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করায় কৃতী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হিসেবে ১৫টি কম্পিউটার দেয়া হয়েছিল। জানলাম প্রতি বছরই ওরা এভাবে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে। খুব আনন্দ-উৎসবের সঙ্গে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে থাকে এসব প্রতিষ্ঠান।

কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর অঞ্চলভেদে সমিতি রয়েছে। তারা প্রতিবছর যার যার অঞ্চলে প্রাইমারি বৃত্তি দিয়ে থাকে। এমন এক বৃত্তিপ্রদান অনুষ্ঠানে একবার সোনারগাঁয়ের কাছে মদনপুর গিয়েছিলাম। বিশাল আয়োজন। বিভিন্ন স্কুল থেকে আসা শত শত ছাত্রছাত্রী শৃঙ্খলার সঙ্গে মাঠে বসেছিল। এর আগে হয়েছিল বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। দু’ঘণ্টা লাগল ওদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে।

এভাবেই কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা ছাড়া একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুশিক্ষার্থী আমাদের মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে। এরা প্রত্যেকেই জাতির সম্পদ। তাহলে কি সরকারের কোনো দায় থাকবে না এসব শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি?

করোনাকালের বন্দিজীবনের ছয় মাস কেটে গেল। স্কুল খোলা না থাকায় ছাত্র-বেতন নেই। শিক্ষক-কর্মচারীদেরও ঠিকমতো বেতন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাদের সংসার আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ আছে; কিন্তু মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।

বলা হয়, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি আমরা। অথচ অর্থের অভাবে আমাদের বিপুলসংখ্যক শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শিক্ষক-কর্মচারী আর তাদের পরিবার পেটে পাথর বেঁধেছেন। বেশ কিছুদিন আগে খবরের কাগজে দেখলাম উপায় না দেখে এমন একজন শিক্ষক কলম, চিরুনি ফেরি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। আমার এক বন্ধু জানালেন তার চেনা এক শিক্ষক এখন রিকশাচালক।

আমাদের তো মনে হয় সরকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি সামান্য কমাতে পারলেও সেই অর্থে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আমরা আশা করব, বিমাতাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি না রেখে বিধায়করা কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর পাশে দাঁড়াবেন এবং যুগোপযোগী নীতিনির্ধারণ করবেন।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]