দেশের চাহিদা মেটানোর পর রফতানি করা যেতে পারে
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
দেশের চাহিদা মেটানোর পর রফতানি করা যেতে পারে

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে উৎপাদিত কাঁচা পাট রফতানি নিয়ে একদিকে কাঁচা পাট রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ), অন্যদিকে বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) এবং বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) সরকারের কাছে পরস্পরবিরোধী দাবি উত্থাপন করেছে।

যখন বিজেএ কাঁচা পাট রফতানির ওপর কোনো শুল্ক আরোপ না করার জন্য এবং কাঁচা পাটকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করে এর রফতানিতে আর্থিক প্রণোদনার জন্য সরকারের কাছে দাবি উত্থাপন করেছে, তখন বিজেএমএ ও বিজেএসএ খরা, অতিবন্যা ও করোনা মহামারীর কারণে দেশে পাটের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্তত এক বছরের জন্য কাঁচা পাট রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছে এবং একইসঙ্গে প্রতি টন কাঁচা পাট রফতানির ওপর উচ্চহারে রফতানি শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে।

বিজেএর দাবির সমর্থনে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো হল: ১. এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এ দেশ থেকে কাঁচা পাট রফতানি হচ্ছে এবং কাঁচা পাট রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত হচ্ছে।

২. দেশে উৎপাদিত পাটের দুই-তৃতীয়াংশ অভ্যন্তরীণ জুট মিলে ব্যবহৃত হওয়ার পর অবশিষ্ট অব্যবহৃত কাঁচা পাট বিদেশে সরাসরি রফতানি করা হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। ৩. কাঁচা পাট রফতানি করা না হলে পাটের দাম কমে যাবে। এতে পাটচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং পাট চাষে নিরুৎসাহী হয়ে পড়বেন।

অন্যদিকে বিজেএমএ ও বিজেএসএর যুক্তিগুলো হল: এক. দেশে বছরে সাধারণত গড়ে ৭৫ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদিত হয়। তবে খরা, অতিবন্যা ও করোনা মহামারীর কারণে চলতি বছর উৎপাদিত হবে প্রায় ৫৫ লাখ বেল। অথচ দেশে পাটশিল্পের জন্যই প্রয়োজন হবে ৬০ লাখ বেল কাঁচা পাট। আর গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য দরকার হবে ৫ লাখ বেল। প্রতিবছর কাঁচা পাট রফতানি হয় ৮-১০ লাখ বেল।

এখন রফতানির কারণে কাঁচা পাটের অভাবে পাটকল বন্ধ হলে শ্রমিক-কর্মচারীরা চাকরি হারাবেন। এতে দেশের ব্যাংক, অর্থলগ্নি এবং বীমা প্রতিষ্ঠানও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। দুই. কাঁচা পাট সরবরাহ ঘাটতির কারণে পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রেতারা পাটপণ্য ব্যবহার থেকে সরে দাঁড়াবেন, যা হবে দেশের পাটশিল্পের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। তিন. ভারত বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করলেও কাঁচা পাটের ওপর শুল্ক আরোপ করেনি।

পাটপণ্য উৎপাদনে প্রয়োজন উন্নত মানের কাঁচা পাট। চলতি বছর ভারতে কাঁচা পাটের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কম হওয়ায় তারা আমাদের উন্নত মানের কাঁচা পাট পেতে উৎসুক হয়ে আছে। তাই সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেয়া হলে কাঁচা পাট ভারতে চলে যাবে এবং দেশীয় পাটকলগুলোর জন্য কাঁচা পাট পাওয়া যাবে না।

উপর্যুক্ত যুক্তি দেখিয়ে বিজেএমএ ও বিজেএসএ অন্তত এক বছরের জন্য দেশ থেকে কাঁচা পাট রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছে এবং একইসঙ্গে কাঁচা পাটের ওপর টনপ্রতি ২৫০ মার্কিন ডলার রফতানি শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে।

যে ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ গঠিত, প্রাচীনকাল থেকে সেখানে উন্নত মানের পাটের চাষ হয়ে আসছে। ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন পূর্ব বাংলা উৎকৃষ্ট মানের কাঁচা পাটের প্রধান উৎপাদনকারী হলেও বাংলায় প্রথম পাটকল স্থাপিত হয় পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর তীরে কলকাতার কাছে বিশড়ায়, অর্থাৎ ডান্ডিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাটের সুতা পাকানোর কাজ শুরুর ২০ বছর পর।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান নাম নিয়ে পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। সব পাটকল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়ায় পূর্ব পাকিস্তান কাঁচা পাট বাজারজাত করার ব্যাপারে সমস্যার সম্মুখীন হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ী বাওয়া গ্রুপ এবং আদমজী পরিবার পঞ্চাশের দশকের শুরুতে নারায়ণগঞ্জে পাটকল স্থাপনের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান বহুলাংশে খুঁজে পাওয়া যায়।

১৯৫১-৭০ সময়কালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত পাট ও পাটজাতসামগ্রী পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাটকল মালিকরা মূলত পাকিস্তানি হওয়ায় এসব পাটকল রাষ্ট্রীকরণ করা হয়। বেসরকারি খাতে পাট ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া হয়। অভ্যন্তরীণভাবে পাট কেনা ও পাটপণ্য উৎপাদনের দায়িত্ব বর্তায় নবগঠিত বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) ওপর।

পাট রফতানির একচেটিয়া দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ পাট রফতানি সংস্থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্যে অনভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তাদের এসব পাটকলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রদান, দুর্নীতি, মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির উদ্ভব এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এ খাতে বিপর্যয় দেখা দেয়।

১৯৭৫-পরবর্তী সরকার বিজেএমসির আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর বিরাষ্ট্রীকরণ শুরু করে, যা পরবর্তীকালে অব্যাহত থাকে। বেসরকারি খাতকে পাটকল স্থাপন ও পাট ব্যবসার অনুমতি দেয়া হয়। ক্রমাগত লোকসানের কারণে সরকার সম্প্রতি বিজেএমসির আওতাধীন ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে।

এগুলো কী পদ্ধতিতে এবং কখন চালু করা হবে তা অনিশ্চিত, যদিও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ইতঃপূর্বে একাধিকবার বলেছিলেন, এগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) চালু করা হবে। বর্তমানে শুধু বেসরকারি খাতে পাটকল ও পাট ব্যবসা চালু রয়েছে। স্পিনিং মিলসহ বেসরকারি খাতে পাটকলের সংখ্যা দু’শর ওপর। দেশের পাট খাতে ব্যক্তি খাতের অংশ এখন ৯৫ শতাংশ।

উপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হল- আশির দশক থেকে বেসরকারি খাতে পাটকল স্থাপন এবং এগুলোর সংখ্যা বর্তমানে দু’শ ছাড়িয়ে যাওয়ায় পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও তা দেশীয় পাটকলের চাহিদা মিটিয়ে রফতানির জন্য তেমন অবশিষ্ট থাকে না। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত পাটের পরিমাণ ছিল ৪৬.০৯ লাখ বেল, যা ৮.৩৮ লাখ টনের সমান।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫.৫৮ লাখ বেলে, যা টনের আকারে ১৩.৭৪ লাখ টন। ২০১০ সালে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের ফলে দেশে ও বিদেশে পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজেএমএ ও বিজেএসএর দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশীয় পাটশিল্পের জন্য ৬০ লাখ বেল এবং গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য ৫ লাখ বেল কাঁচা পাট দরকার হয়। ফলে ৮-১০ লাখ বেল কাঁচা পাট রফতানির জন্য অবশিষ্ট থাকে। সংস্থা দুটির মতে, খরা, অতিবন্যা ও করোনা মহামারীর কারণে চলতি বছর উৎপাদিত হবে প্রায় ৫৫ লাখ বেল। অর্থাৎ দেশীয় পাটকলগুলোর চাহিদা মিটবে না।

দেশীয় পাটকলে তৈরি পাটজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমে বাড়ছে। দেশে ও বিদেশে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে আয় হয় ৮০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০১৭-১৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে কাঁচা পাট রফতানি করে ২৩০ মার্কিন ডলার আয় হয়, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ১৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

পাটপণ্য তৈরি একটা শ্রমঘন শিল্প এবং এতে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়, যা কাঁচা পাট ব্যবসায় বহুলাংশে অনুপস্থিত। তবে যে বিষয়টি স্বীকার করতে হয় তা হল, কাঁচা পাট রফতানিতে কৃষক ভালো দাম পান। তাই সরকারের উচিত হবে বিভিন্ন মানের কাঁচা পাটের দাম এমনভাবে নির্ধারণ করে দেয়া যাতে উৎপাদন ব্যয় মেটানোর পরও পাটচাষীরা লাভবান হন। এতে পাটকল মালিক এবং পাট ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে পাটচাষীদের কাছ থেকে কম দামে কাঁচা পাট কেনার সুযোগ পাবেন না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পাটচাষীর উন্নতি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তার ইচ্ছার বাস্তব রূপ দিতে হবে। তাই দেশের বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী মিলগুলোর চাহিদা মেটানোর আগে ভারত বা অন্য কোনো দেশে কাঁচা পাট রফতানি নয়। দেশের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত থাকলেই কাঁচা পাট রফতানি করা যেতে পারে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

স্বদেশ ভাবনা

দেশের চাহিদা মেটানোর পর রফতানি করা যেতে পারে

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে উৎপাদিত কাঁচা পাট রফতানি নিয়ে একদিকে কাঁচা পাট রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ), অন্যদিকে বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) এবং বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) সরকারের কাছে পরস্পরবিরোধী দাবি উত্থাপন করেছে।

যখন বিজেএ কাঁচা পাট রফতানির ওপর কোনো শুল্ক আরোপ না করার জন্য এবং কাঁচা পাটকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করে এর রফতানিতে আর্থিক প্রণোদনার জন্য সরকারের কাছে দাবি উত্থাপন করেছে, তখন বিজেএমএ ও বিজেএসএ খরা, অতিবন্যা ও করোনা মহামারীর কারণে দেশে পাটের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্তত এক বছরের জন্য কাঁচা পাট রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছে এবং একইসঙ্গে প্রতি টন কাঁচা পাট রফতানির ওপর উচ্চহারে রফতানি শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে।

বিজেএর দাবির সমর্থনে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো হল: ১. এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এ দেশ থেকে কাঁচা পাট রফতানি হচ্ছে এবং কাঁচা পাট রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত হচ্ছে।

২. দেশে উৎপাদিত পাটের দুই-তৃতীয়াংশ অভ্যন্তরীণ জুট মিলে ব্যবহৃত হওয়ার পর অবশিষ্ট অব্যবহৃত কাঁচা পাট বিদেশে সরাসরি রফতানি করা হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। ৩. কাঁচা পাট রফতানি করা না হলে পাটের দাম কমে যাবে। এতে পাটচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং পাট চাষে নিরুৎসাহী হয়ে পড়বেন।

অন্যদিকে বিজেএমএ ও বিজেএসএর যুক্তিগুলো হল: এক. দেশে বছরে সাধারণত গড়ে ৭৫ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদিত হয়। তবে খরা, অতিবন্যা ও করোনা মহামারীর কারণে চলতি বছর উৎপাদিত হবে প্রায় ৫৫ লাখ বেল। অথচ দেশে পাটশিল্পের জন্যই প্রয়োজন হবে ৬০ লাখ বেল কাঁচা পাট। আর গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য দরকার হবে ৫ লাখ বেল। প্রতিবছর কাঁচা পাট রফতানি হয় ৮-১০ লাখ বেল।

এখন রফতানির কারণে কাঁচা পাটের অভাবে পাটকল বন্ধ হলে শ্রমিক-কর্মচারীরা চাকরি হারাবেন। এতে দেশের ব্যাংক, অর্থলগ্নি এবং বীমা প্রতিষ্ঠানও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। দুই. কাঁচা পাট সরবরাহ ঘাটতির কারণে পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রেতারা পাটপণ্য ব্যবহার থেকে সরে দাঁড়াবেন, যা হবে দেশের পাটশিল্পের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। তিন. ভারত বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করলেও কাঁচা পাটের ওপর শুল্ক আরোপ করেনি।

পাটপণ্য উৎপাদনে প্রয়োজন উন্নত মানের কাঁচা পাট। চলতি বছর ভারতে কাঁচা পাটের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কম হওয়ায় তারা আমাদের উন্নত মানের কাঁচা পাট পেতে উৎসুক হয়ে আছে। তাই সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেয়া হলে কাঁচা পাট ভারতে চলে যাবে এবং দেশীয় পাটকলগুলোর জন্য কাঁচা পাট পাওয়া যাবে না।

উপর্যুক্ত যুক্তি দেখিয়ে বিজেএমএ ও বিজেএসএ অন্তত এক বছরের জন্য দেশ থেকে কাঁচা পাট রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছে এবং একইসঙ্গে কাঁচা পাটের ওপর টনপ্রতি ২৫০ মার্কিন ডলার রফতানি শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে।

যে ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ গঠিত, প্রাচীনকাল থেকে সেখানে উন্নত মানের পাটের চাষ হয়ে আসছে। ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন পূর্ব বাংলা উৎকৃষ্ট মানের কাঁচা পাটের প্রধান উৎপাদনকারী হলেও বাংলায় প্রথম পাটকল স্থাপিত হয় পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর তীরে কলকাতার কাছে বিশড়ায়, অর্থাৎ ডান্ডিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাটের সুতা পাকানোর কাজ শুরুর ২০ বছর পর।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান নাম নিয়ে পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। সব পাটকল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়ায় পূর্ব পাকিস্তান কাঁচা পাট বাজারজাত করার ব্যাপারে সমস্যার সম্মুখীন হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ী বাওয়া গ্রুপ এবং আদমজী পরিবার পঞ্চাশের দশকের শুরুতে নারায়ণগঞ্জে পাটকল স্থাপনের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান বহুলাংশে খুঁজে পাওয়া যায়।

১৯৫১-৭০ সময়কালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত পাট ও পাটজাতসামগ্রী পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাটকল মালিকরা মূলত পাকিস্তানি হওয়ায় এসব পাটকল রাষ্ট্রীকরণ করা হয়। বেসরকারি খাতে পাট ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া হয়। অভ্যন্তরীণভাবে পাট কেনা ও পাটপণ্য উৎপাদনের দায়িত্ব বর্তায় নবগঠিত বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) ওপর।

পাট রফতানির একচেটিয়া দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ পাট রফতানি সংস্থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্যে অনভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তাদের এসব পাটকলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রদান, দুর্নীতি, মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির উদ্ভব এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এ খাতে বিপর্যয় দেখা দেয়।

১৯৭৫-পরবর্তী সরকার বিজেএমসির আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর বিরাষ্ট্রীকরণ শুরু করে, যা পরবর্তীকালে অব্যাহত থাকে। বেসরকারি খাতকে পাটকল স্থাপন ও পাট ব্যবসার অনুমতি দেয়া হয়। ক্রমাগত লোকসানের কারণে সরকার সম্প্রতি বিজেএমসির আওতাধীন ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে।

এগুলো কী পদ্ধতিতে এবং কখন চালু করা হবে তা অনিশ্চিত, যদিও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ইতঃপূর্বে একাধিকবার বলেছিলেন, এগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) চালু করা হবে। বর্তমানে শুধু বেসরকারি খাতে পাটকল ও পাট ব্যবসা চালু রয়েছে। স্পিনিং মিলসহ বেসরকারি খাতে পাটকলের সংখ্যা দু’শর ওপর। দেশের পাট খাতে ব্যক্তি খাতের অংশ এখন ৯৫ শতাংশ।

উপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হল- আশির দশক থেকে বেসরকারি খাতে পাটকল স্থাপন এবং এগুলোর সংখ্যা বর্তমানে দু’শ ছাড়িয়ে যাওয়ায় পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও তা দেশীয় পাটকলের চাহিদা মিটিয়ে রফতানির জন্য তেমন অবশিষ্ট থাকে না। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত পাটের পরিমাণ ছিল ৪৬.০৯ লাখ বেল, যা ৮.৩৮ লাখ টনের সমান।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫.৫৮ লাখ বেলে, যা টনের আকারে ১৩.৭৪ লাখ টন। ২০১০ সালে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের ফলে দেশে ও বিদেশে পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজেএমএ ও বিজেএসএর দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশীয় পাটশিল্পের জন্য ৬০ লাখ বেল এবং গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য ৫ লাখ বেল কাঁচা পাট দরকার হয়। ফলে ৮-১০ লাখ বেল কাঁচা পাট রফতানির জন্য অবশিষ্ট থাকে। সংস্থা দুটির মতে, খরা, অতিবন্যা ও করোনা মহামারীর কারণে চলতি বছর উৎপাদিত হবে প্রায় ৫৫ লাখ বেল। অর্থাৎ দেশীয় পাটকলগুলোর চাহিদা মিটবে না।

দেশীয় পাটকলে তৈরি পাটজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমে বাড়ছে। দেশে ও বিদেশে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে আয় হয় ৮০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০১৭-১৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে কাঁচা পাট রফতানি করে ২৩০ মার্কিন ডলার আয় হয়, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ১৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

পাটপণ্য তৈরি একটা শ্রমঘন শিল্প এবং এতে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়, যা কাঁচা পাট ব্যবসায় বহুলাংশে অনুপস্থিত। তবে যে বিষয়টি স্বীকার করতে হয় তা হল, কাঁচা পাট রফতানিতে কৃষক ভালো দাম পান। তাই সরকারের উচিত হবে বিভিন্ন মানের কাঁচা পাটের দাম এমনভাবে নির্ধারণ করে দেয়া যাতে উৎপাদন ব্যয় মেটানোর পরও পাটচাষীরা লাভবান হন। এতে পাটকল মালিক এবং পাট ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে পাটচাষীদের কাছ থেকে কম দামে কাঁচা পাট কেনার সুযোগ পাবেন না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পাটচাষীর উন্নতি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তার ইচ্ছার বাস্তব রূপ দিতে হবে। তাই দেশের বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী মিলগুলোর চাহিদা মেটানোর আগে ভারত বা অন্য কোনো দেশে কাঁচা পাট রফতানি নয়। দেশের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত থাকলেই কাঁচা পাট রফতানি করা যেতে পারে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]