অনাবাদি জমিতে ফল চাষে আসতে পারে ব্যাপক সাফল্য

  এম এ হাসেম ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার আওতাধীন প্রায় ১৫টি চিনিকল চালু রয়েছে বর্তমানে। ওইসব চিনিকলে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা ১০ হাজারের উপর।

বাংলাদেশের চিনিকলগুলো বছরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন চিনি উৎপাদন করতে সক্ষম এবং ওই চিনি উৎপাদন খরচ মিলভেদে প্রতি কেজি ওভারহেডসহ ৭৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তারপরও উৎপাদিত চিনি বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী মিলগেটে ৬০ টাকা প্রতি কেজি ধার্য করার পরও চিনি অবিক্রীত রয়েছে।

তাছাড়া ভালো রিফাইন হয় না বিধায় চিনি বিক্রি হয় না। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার আওতাধীন চিনিকলগুলোয় উৎপাদিত চিনি ভালোভাবে রিফাইন না হওয়ায় অনেকেই দেশীয় কর্পোরেশনের চিনিকলগুলোর চিনি খায় না। দেশে যে কয়টি বেসরকারি সুগার রিফাইনারি রয়েছে, সেগুলো দেশের চাহিদা পূরণ করে রফতানিও করতে পারবে।

সম্প্রতি (২৪ এপ্রিল ২০২০) একটি জাতীয় পত্রিকার রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন শ্রমিকের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ২১০ কোটি টাকা অপরিশোধিত রয়েছে। তাছাড়া আখ চাষিদের পাওনা রয়েছে ১৬১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২০ অনুযায়ী, শুধু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন লোকসান করেছে ৫১৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সেটি বাড়তে বাড়তে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী ৯৮২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত সুগার মিলে সরকারের প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার লোকসান হয়েছে।

দেশে বছরে ১৮ থেকে ২০ লাখ টন চিনি আমদানি করা হলেও কর্পোরেশনের উৎপাদিত মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন চিনিও বাজারে বিক্রি করা যাচ্ছে না। কারণ চিনির কোয়ালিটি খুবই খারাপ। এ চিনি কেউ কিনতে রাজি নয়। বাংলাদেশে বেসরকারি উদ্যোগে চারটি চিনি রিফাইনারি মিল পুরো দেশের আমদানিকৃত চিনির বাইরে দেশের চাহিদা পূরণ করে এবং বিদেশেও রফতানি করে।

বাস্তবে দেশের চিনিকলগুলো বছরে ৪ থেকে সর্বোচ্চ ৫ মাস চালু থাকে। আর বাকি ৭ মাসই শ্রমিক-কর্মচারী কোনো কর্ম ছাড়াই বেতন-ভাতাদি গ্রহণ করে থাকে। এতে দেশের বিপুল অঙ্কের অর্থের ঘাটতি হচ্ছে। বছরের পর বছর ঋণের বোঝা বড় হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, ঠাকুরগাঁও জেলায় অবস্থিত ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস্ লি. ১৯৫৮-৫৯ সালে স্থাপিত হয়। ওই মিলের ট্রেনিং কমপ্লেক্স, হাইস্কুল, ক্লাব, মেডিকেল সেন্টার, ফ্যামিলি কোয়ার্টার, সিঙ্গেল কোয়ার্টার ও মিল এরিয়ার পরিমাণ ২৮৮৮.৫৯ একর।

এছাড়া মিল জোন এলাকায় আখ চাষাবাদের জন্য ৪৫,৮০০+২৮৮৮.৫৯ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১৪,৫০০ একর জমিতে প্রতি বছর আখ চাষ করা হয়ে থাকে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় থেকে যায়।

এভাবে দেশের ১৫টি চিনিকলেরই হাজার হাজার একর জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চিনির মিল বন্ধ করে সেখানে ফলের চাষ করা হলে বছরে সরকার ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা লোকসান থেকে অব্যাহতি পাবে।

বাংলাদেশ প্রতিবছর বিদেশ থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ফল আমদানি করে থাকে। এসব ফলের মধ্যে রয়েছে আঙুর, বেদানা, আপেল, কমলা, মোছাম্বি, নাশপাতি, হানিডিউ মিলান, রেড মিলান, সাম্মাম, স্ট্রবেরি, ড্রাগন, সব ধরনের খেজুরসহ বিভিন্ন জাতের ফল। এতে দেশের বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিভিন্ন জাতের ফল চাষাবাদের জায়গা রয়েছে।

শুধু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতা এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উদ্যোগী করতে পারলেই ওইসব বিদেশি ফলের চাষাবাদ দেশেই করা সম্ভব। এসব জমিতে ফলের চাষ করা হলে লোকসান থেকে লাভের পরিমাণ বেশি হবে। কাজেই আমার অনুরোধ, দয়া করে সুগার মিল বন্ধ করে ফলের চাষ করা হোক।

যথাযথ কর্তৃপক্ষ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সুগার মিল বন্ধ করে সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের আখ চাষাবাদের পুরো জায়গায় বিদেশি ফলের চাষাবাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এতে দেশের অর্থ দেশেই থাকবে।

বিদেশ থেকে ফল আমদানি করতে গিয়ে যে বিপুল অঙ্কের বিদেশি অর্থ অপচয় হয় তা রোধ হবে।

এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ কৃষিক্ষেত্রে দেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসতে পারে এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি। এ ব্যাপারে দেশের বড় বড় শিল্প বিনিয়োগকারীরও সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

এমএ হাসেম : সাবেক সংসদ সদস্য; চেয়ারম্যান, পারটেক্স গ্রুপ

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত