নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অনেককে বেপরোয়া করে তোলে
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অনেককে বেপরোয়া করে তোলে

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান অবস্থায় সারা বিশ্বের মানবসমাজ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে চলেছে। করোনা মহামারীর কারণে গোটা বিশ্বেই এখন দুঃসময়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখন গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং আমেরিকায় এ পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ শিশু করোনায় আক্রান্ত। এ সবকিছু বিচার-বিবেচনায় বলতেই হয়, সারা বিশ্বে এখনও করোনার জয়জয়কার!

আর করোনার এ জয়রথ থামাতে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যকর্মীরা যেমন হিমশিম খাচ্ছেন, তেমনি রোগটির প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাও নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, পৃথিবীর সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষের জন্য এ রোগটির রক্ষাকবচ হিসেবে একটি সফল টিকাই এখন একমাত্র ভরসা।

গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হিসেবে আমাদের বাংলাদেশ এ রোগটির ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পেলেও এ দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কম নয়। পরীক্ষা কম হচ্ছে বলে রোগীর সংখ্যাও কম মনে হচ্ছে। আবার পরিসংখ্যানে মৃত্যুর যে সংখ্যা উল্লেখ করা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। কারণ, সারা দেশের আনাচে-কানাচে করোনা উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনা পরিসংখ্যানের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় দৈনিক কমপক্ষে পঁচিশ হাজার মানুষের নমুনা পরীক্ষা করাসহ করোনা উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনাগুলো বিবেচনায় না নিলে বর্তমান পরিসংখ্যানের সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। এ বিষয়ে ভারতের উদাহরণই যথেষ্ট। সে দেশে দৈনিক যে অনুপাতে করোনা পরীক্ষা হয়, আমাদের দেশে সেই অনুপাতে পরীক্ষা তো দূরের কথা, আমরা তার ধারেকাছেও নেই! ১৭ কোটি মানুষের দেশে গত ছয়-সাত মাস ধরে যেভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তা আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি।

আর করোনা রোগী শনাক্ত করে পরীক্ষার আওতায় আনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর হটলাইনের নামে যে টেলিফোন নম্বর দিয়ে রেখেছে, সেখানে ফোন করলে দেখা যাবে বিষয়টি এক ধরনের তামাশা ছাড়া কিছু নয়! কারণ, সেখানে একটি রেকর্ড ফিট করে রেখে বলা হচ্ছে, শিগগির একজন ডাক্তার কথা বলবেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। একই কথা বারবার বলে চার-সাড়ে চার মিনিট পর লাইনটা কেটে দেয়া হয়। বিষয়টি অনেকের কাছে শোনার পর বিভিন্ন সময়ে আমি নিজে অন্তত পাঁচবার ফোন করে ওই একই কাণ্ড ঘটতে দেখেছি।

যদিও স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে দৈনিক পঞ্চাশ-ষাট হাজার ফোনকলের কথা অহরহ বলা হয়ে থাকে, কিন্তু বিষয়টি একটি শুভংকরের ফাঁকি! এ অবস্থায় করোনা পরীক্ষার জন্য এখন বেসরকারি হাসপাতালগুলো সুযোগ পেয়ে একেকজনের কাছ থেকে পাঁচ-সাত হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর সবার পক্ষে ওই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে করোনা পরীক্ষা করানো সম্ভব না হওয়ায় অনেকের উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করাচ্ছেন না। অনেকেই শেষ মুহূর্তে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

এখন প্রশ্ন হল, এতদিন পরও কেন ব্যাপক হারে করোনা পরীক্ষা শুরু করা হল না, বা শুরু করা গেল না? করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে কেন আমাদের দেশটি পৃথিবীর তলানিতে? নাকি সরকারি আমলানির্ভরতার জন্য এমনটি ঘটেছে; স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আমলাতান্ত্রিক মনোভাবই এ জন্য দায়ী? আমাদের এত কীসের অভাব যে, করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান এতটা নিচে? নাকি দেশের মানুষ ও সরকারকে ফলস পজিশনে ফেলার এটি একটি পাঁয়তারা?

এমনও তো হতে পারে, দেশে এখন করোনার তেমন প্রভাব নেই, করোনা বিতাড়িত প্রায়- এমনটি বলে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়া হল; আর তাতে শিশুসহ লাখ লাখ শিক্ষার্থী করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়ল। কারণ, একবার তো বলাই হল, ‘করোনার টিকা লাগবে না, এমনিতেই করোনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’ আমাদের মনে হয় সে কথাটিও এখানে প্রাসঙ্গিক।

আবার বিশেষায়িত করোনা হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের আবাসিক সুবিধা বাতিল করার মাধ্যমেও বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, এসব হাসপাতালের আর প্রয়োজন নেই! আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছি না, এসব হঠকারী সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে? নাকি এসব কাজেও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে?

বর্তমান অবস্থায় এসব নিয়ে আরও কিছু বলা উচিত বলে মনে করি। কারণ, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু সরকারি কর্তাব্যক্তি তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক অঘটনের জন্ম দিয়েছেন এবং কেউ কেউ এখনও তা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু দেশের অবস্থা অপেক্ষাকৃত শান্ত হওয়ায় এ ধরনের অনেক ঘটনাই সরকারপ্রধান বা সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের পক্ষে জানা বা বোঝা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষ করে দু-একজন মন্ত্রীসহ অনেক আমলা-কর্মচারী এমন কিছু করে চলেছেন, মাঝে মাঝে যার ছিটেফোঁটা মাত্র প্রকাশ পাওয়ায় সেসব ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিচ্ছেন। যেমন, টেকনাফের ঘটনা। সেদিন সেখানে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নিহত না হলে কিন্তু এতগুলো থলের বিড়াল বেরিয়ে আসত না। অথচ অকুস্থলের সন্নিহিত এলাকায় দীর্ঘদিন শত শত মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সরকারি প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা; বর্তমানে যা একের পর এক প্রকাশ পাচ্ছে।

কিন্তু ঘটনা তো শুধু একটি নয়। দেশের আপাতত এ শান্তশিষ্ট পরিবেশেও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কোনো কোনো কর্তাব্যক্তি দ্বারা মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমি এখানে আমার জানামতে দু-একটি ঘটনার উল্লেখ করেই আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই।

খুব বড় একজন শিল্পপতি, যিনি বছরে কমপক্ষে এক-দেড় হাজার কোটি টাকার পণ্য রফতানি করেন, তার একটি গুদাম পুড়ে যাওয়ায় বন্ডেড মালামাল পাশের গোডাউনে রাখেন এবং মেরামত শেষে যথাসময়ে আগের গোডাউনে পণ্য ঢোকাতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে বিরাট অঙ্কের টাকা জরিমানা করা হয়! মনে অনেক কষ্ট নিয়ে তিনি ঘটনাটি আমাকে বলার পাশাপাশি বললেন, গত ত্রিশ বছর তিনি সরকারকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের কর প্রদান করেন এবং বর্তমানে প্রায় বিশ হাজার লোক তার শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অথচ সামান্য একটু ভুলকেও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হল না। আর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করলেন, সরকার রাজস্ব বিভাগকে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়ায় তারা কোনো বাছবিচার ছাড়াই এসব করে চলেছে!

২. সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তি টেলিফোনে অনেকক্ষণ কথা বলে তার মনের ঝাল ঝেড়ে বললেন, ‘আপনারা যারা পত্রিকায় লেখালেখি করেন তারাও তেলমারা নীতি অনুসরণ করে চলেছেন। কারণ, আপনাদের প্রায় সব লেখাই একদেশদর্শী, আসল কথা তুলে ধরতে আপনারাও ভয় পান।’ তার এসব কথার কী জবাব দেব তা ভেবে না পাওয়ায় একটু আমতা আমতা করে বললাম, ভাই আমাদের লেখায় কী আসে-যায়, আর এসব পড়েনই বা কয়জন? বিশেষ করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমাদের লেখার কথা পৌঁছায় বলে মনে হয় না।

আমার কথার জবাবে তিনি বললেন, ‘বলেন কী, এত বড় বড় সব পত্রিকার লেখার বিষয়বস্তু সরকারের উঁচু মহলে পৌঁছায় না, তাহলে পত্রিকা সরকারের তৃতীয় স্তম্ভ হয় কী করে?’ সে মুহূর্তে তার কথার জুতসই কোনো জবাব মুখে না আসায় তাকে বললাম, আরও কিছু বলার থাকলে বলে ফেলুন। তিনিও দেরি না করে বললেন, ‘দেখুন, আমি মোহাম্মদপুর থাকি। আমার এলাকার যেসব লোক বাসে চেপে গাবতলী এসে নামেন তাদের অনেকেই আমার বাসায় ওঠেন; যাদের মধ্যে কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা। আমার বয়স সত্তরের বেশি হওয়ায় আমি এসব মুক্তিযোদ্ধার সবাইকে চিনি।

অথচ এমন একজন মুক্তিযোদ্ধারই গেজেট ও সনদ বাতিল করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই একাত্তর সাল থেকে যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সে সময় থেকেই যাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জানি ও চিনি, সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে বিভিন্ন সময়ে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মাননা দেয়া হয়েছে, অথচ হিংসা-বিদ্বেষ, দলাদলি, শত্রুতা-পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি কারণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়ায় তার গেজেট ও সনদ বাতিল করা হয়েছে!’ তার এসব কথার জবাবে বললাম, এ ক্ষেত্রে কার কী করার আছে? আমার জবাবে ভদ্রলোক এবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ‘এই তো বলেছিলাম না, আমরা সবাই তেলমারা নীতি গ্রহণ করাতেই এসব অন্যায় কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে, হিন্দু মহিলাদের নাম রাজাকারের তালিকায় ওঠানো হয়েছিল, এমনকি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর নামও রাজাকার হিসেবে দেখানো হয়েছিল, আর এসবের বিরুদ্ধে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ায় শুধু তখনই সরকারের টনক নড়েছিল। কিন্তু আমার পরিচিত এ মুক্তিযোদ্ধার জন্য তো তোলপাড় করার কেউ নেই। তাকে তো আদালতে যেতে হবে। কারণ, একমাত্র আদালতই তাকে ন্যায়বিচার দিতে পারেন।’

আমার চেয়েও বয়সে বড় এবং বেশ সম্মানিত একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি আমাকে এসব বলায়, আমি চুপচাপ তার কথা শোনার পর তাকে বলি, এসব শুনে আমি কী করব বলুন? আমার কথায় তিনি এবার আরও একটু সাবলীলভাবে বললেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ২০০০ সালে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করিয়ে ২০০১ সালে প্রায় চল্লিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সনদে সবুজ কালিতে নিজ হাতে প্রতিস্বাক্ষর করে যাদের হাতে সনদ তুলে দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বা সংসদের সিদ্ধান্ত ছাড়া সেসব সনদ বাতিল করা হচ্ছে কেমন করে? এটা তো পরিষ্কারভাবে আইনের শাসনের ব্যত্যয়! তাছাড়া আমার জানামতে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিস্বাক্ষরিত সনদগুলো বাতিল না করার জন্যও বলে রেখেছেন।’

সুধী পাঠক, লেখাটি আর দীর্ঘায়িত না করে উপসংহার টেনে বলতে চাই, আমার পাঠকরা জানেন আমার লেখায় কোনো একদেশদর্শিতা নেই; লেখার সময় একজন কলাম লেখক হিসেবে যা লেখা উচিত কিছুটা সাহসের সঙ্গেই তা লিখি। লেখালেখির ক্ষেত্রে আমার একমাত্র দুর্বলতার জায়গা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; কোনো দল বা গোষ্ঠী নয়।

এ অবস্থায় আমার মোহাম্মদপুরের বন্ধুর সমালোচনা মাথা পেতে নিয়ে আমার অক্ষমতাটুকুর জন্য ক্ষমা চাই। সেইসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিস্বাক্ষরিত সনদ তার অনুমোদন বা অনুমতি ছাড়া বাতিল করা কতটুকু আইন বা ন্যায়সঙ্গত, সে বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহলকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই।

আর সবশেষে বলতে চাই, অতীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু আমলা বা মন্ত্রীর অদূরদর্শিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অতি ব্যবহারের কারণে সময়ে সময়ে অনেক সরকারকেই খেসারত দিতে হয়েছে। সুতরাং ইংরেজ পলিটিশিয়ান লর্ড অ্যাকটনের ‘Absolute power corrupts absolutely’ উক্তিটি মনে রেখে পথচলাই ভালো। দেশের কোথাও কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার বা অতি ব্যবহার করছেন কি না, সদা-সর্বদা সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত বলেই মনে করি।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অনেককে বেপরোয়া করে তোলে

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান অবস্থায় সারা বিশ্বের মানবসমাজ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে চলেছে। করোনা মহামারীর কারণে গোটা বিশ্বেই এখন দুঃসময়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখন গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং আমেরিকায় এ পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ শিশু করোনায় আক্রান্ত। এ সবকিছু বিচার-বিবেচনায় বলতেই হয়, সারা বিশ্বে এখনও করোনার জয়জয়কার!

আর করোনার এ জয়রথ থামাতে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যকর্মীরা যেমন হিমশিম খাচ্ছেন, তেমনি রোগটির প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাও নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, পৃথিবীর সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষের জন্য এ রোগটির রক্ষাকবচ হিসেবে একটি সফল টিকাই এখন একমাত্র ভরসা।

গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হিসেবে আমাদের বাংলাদেশ এ রোগটির ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পেলেও এ দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কম নয়। পরীক্ষা কম হচ্ছে বলে রোগীর সংখ্যাও কম মনে হচ্ছে। আবার পরিসংখ্যানে মৃত্যুর যে সংখ্যা উল্লেখ করা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। কারণ, সারা দেশের আনাচে-কানাচে করোনা উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনা পরিসংখ্যানের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় দৈনিক কমপক্ষে পঁচিশ হাজার মানুষের নমুনা পরীক্ষা করাসহ করোনা উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনাগুলো বিবেচনায় না নিলে বর্তমান পরিসংখ্যানের সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। এ বিষয়ে ভারতের উদাহরণই যথেষ্ট। সে দেশে দৈনিক যে অনুপাতে করোনা পরীক্ষা হয়, আমাদের দেশে সেই অনুপাতে পরীক্ষা তো দূরের কথা, আমরা তার ধারেকাছেও নেই! ১৭ কোটি মানুষের দেশে গত ছয়-সাত মাস ধরে যেভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তা আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি।

আর করোনা রোগী শনাক্ত করে পরীক্ষার আওতায় আনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর হটলাইনের নামে যে টেলিফোন নম্বর দিয়ে রেখেছে, সেখানে ফোন করলে দেখা যাবে বিষয়টি এক ধরনের তামাশা ছাড়া কিছু নয়! কারণ, সেখানে একটি রেকর্ড ফিট করে রেখে বলা হচ্ছে, শিগগির একজন ডাক্তার কথা বলবেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। একই কথা বারবার বলে চার-সাড়ে চার মিনিট পর লাইনটা কেটে দেয়া হয়। বিষয়টি অনেকের কাছে শোনার পর বিভিন্ন সময়ে আমি নিজে অন্তত পাঁচবার ফোন করে ওই একই কাণ্ড ঘটতে দেখেছি।

যদিও স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে দৈনিক পঞ্চাশ-ষাট হাজার ফোনকলের কথা অহরহ বলা হয়ে থাকে, কিন্তু বিষয়টি একটি শুভংকরের ফাঁকি! এ অবস্থায় করোনা পরীক্ষার জন্য এখন বেসরকারি হাসপাতালগুলো সুযোগ পেয়ে একেকজনের কাছ থেকে পাঁচ-সাত হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর সবার পক্ষে ওই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে করোনা পরীক্ষা করানো সম্ভব না হওয়ায় অনেকের উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করাচ্ছেন না। অনেকেই শেষ মুহূর্তে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

এখন প্রশ্ন হল, এতদিন পরও কেন ব্যাপক হারে করোনা পরীক্ষা শুরু করা হল না, বা শুরু করা গেল না? করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে কেন আমাদের দেশটি পৃথিবীর তলানিতে? নাকি সরকারি আমলানির্ভরতার জন্য এমনটি ঘটেছে; স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আমলাতান্ত্রিক মনোভাবই এ জন্য দায়ী? আমাদের এত কীসের অভাব যে, করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান এতটা নিচে? নাকি দেশের মানুষ ও সরকারকে ফলস পজিশনে ফেলার এটি একটি পাঁয়তারা?

এমনও তো হতে পারে, দেশে এখন করোনার তেমন প্রভাব নেই, করোনা বিতাড়িত প্রায়- এমনটি বলে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়া হল; আর তাতে শিশুসহ লাখ লাখ শিক্ষার্থী করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়ল। কারণ, একবার তো বলাই হল, ‘করোনার টিকা লাগবে না, এমনিতেই করোনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’ আমাদের মনে হয় সে কথাটিও এখানে প্রাসঙ্গিক।

আবার বিশেষায়িত করোনা হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের আবাসিক সুবিধা বাতিল করার মাধ্যমেও বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, এসব হাসপাতালের আর প্রয়োজন নেই! আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছি না, এসব হঠকারী সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে? নাকি এসব কাজেও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে?

বর্তমান অবস্থায় এসব নিয়ে আরও কিছু বলা উচিত বলে মনে করি। কারণ, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু সরকারি কর্তাব্যক্তি তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক অঘটনের জন্ম দিয়েছেন এবং কেউ কেউ এখনও তা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু দেশের অবস্থা অপেক্ষাকৃত শান্ত হওয়ায় এ ধরনের অনেক ঘটনাই সরকারপ্রধান বা সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের পক্ষে জানা বা বোঝা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষ করে দু-একজন মন্ত্রীসহ অনেক আমলা-কর্মচারী এমন কিছু করে চলেছেন, মাঝে মাঝে যার ছিটেফোঁটা মাত্র প্রকাশ পাওয়ায় সেসব ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিচ্ছেন। যেমন, টেকনাফের ঘটনা। সেদিন সেখানে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নিহত না হলে কিন্তু এতগুলো থলের বিড়াল বেরিয়ে আসত না। অথচ অকুস্থলের সন্নিহিত এলাকায় দীর্ঘদিন শত শত মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সরকারি প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা; বর্তমানে যা একের পর এক প্রকাশ পাচ্ছে।

কিন্তু ঘটনা তো শুধু একটি নয়। দেশের আপাতত এ শান্তশিষ্ট পরিবেশেও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কোনো কোনো কর্তাব্যক্তি দ্বারা মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমি এখানে আমার জানামতে দু-একটি ঘটনার উল্লেখ করেই আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই।

খুব বড় একজন শিল্পপতি, যিনি বছরে কমপক্ষে এক-দেড় হাজার কোটি টাকার পণ্য রফতানি করেন, তার একটি গুদাম পুড়ে যাওয়ায় বন্ডেড মালামাল পাশের গোডাউনে রাখেন এবং মেরামত শেষে যথাসময়ে আগের গোডাউনে পণ্য ঢোকাতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে বিরাট অঙ্কের টাকা জরিমানা করা হয়! মনে অনেক কষ্ট নিয়ে তিনি ঘটনাটি আমাকে বলার পাশাপাশি বললেন, গত ত্রিশ বছর তিনি সরকারকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের কর প্রদান করেন এবং বর্তমানে প্রায় বিশ হাজার লোক তার শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অথচ সামান্য একটু ভুলকেও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হল না। আর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করলেন, সরকার রাজস্ব বিভাগকে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়ায় তারা কোনো বাছবিচার ছাড়াই এসব করে চলেছে!

২. সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তি টেলিফোনে অনেকক্ষণ কথা বলে তার মনের ঝাল ঝেড়ে বললেন, ‘আপনারা যারা পত্রিকায় লেখালেখি করেন তারাও তেলমারা নীতি অনুসরণ করে চলেছেন। কারণ, আপনাদের প্রায় সব লেখাই একদেশদর্শী, আসল কথা তুলে ধরতে আপনারাও ভয় পান।’ তার এসব কথার কী জবাব দেব তা ভেবে না পাওয়ায় একটু আমতা আমতা করে বললাম, ভাই আমাদের লেখায় কী আসে-যায়, আর এসব পড়েনই বা কয়জন? বিশেষ করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমাদের লেখার কথা পৌঁছায় বলে মনে হয় না।

আমার কথার জবাবে তিনি বললেন, ‘বলেন কী, এত বড় বড় সব পত্রিকার লেখার বিষয়বস্তু সরকারের উঁচু মহলে পৌঁছায় না, তাহলে পত্রিকা সরকারের তৃতীয় স্তম্ভ হয় কী করে?’ সে মুহূর্তে তার কথার জুতসই কোনো জবাব মুখে না আসায় তাকে বললাম, আরও কিছু বলার থাকলে বলে ফেলুন। তিনিও দেরি না করে বললেন, ‘দেখুন, আমি মোহাম্মদপুর থাকি। আমার এলাকার যেসব লোক বাসে চেপে গাবতলী এসে নামেন তাদের অনেকেই আমার বাসায় ওঠেন; যাদের মধ্যে কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা। আমার বয়স সত্তরের বেশি হওয়ায় আমি এসব মুক্তিযোদ্ধার সবাইকে চিনি।

অথচ এমন একজন মুক্তিযোদ্ধারই গেজেট ও সনদ বাতিল করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই একাত্তর সাল থেকে যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সে সময় থেকেই যাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জানি ও চিনি, সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে বিভিন্ন সময়ে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মাননা দেয়া হয়েছে, অথচ হিংসা-বিদ্বেষ, দলাদলি, শত্রুতা-পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি কারণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়ায় তার গেজেট ও সনদ বাতিল করা হয়েছে!’ তার এসব কথার জবাবে বললাম, এ ক্ষেত্রে কার কী করার আছে? আমার জবাবে ভদ্রলোক এবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ‘এই তো বলেছিলাম না, আমরা সবাই তেলমারা নীতি গ্রহণ করাতেই এসব অন্যায় কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে, হিন্দু মহিলাদের নাম রাজাকারের তালিকায় ওঠানো হয়েছিল, এমনকি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর নামও রাজাকার হিসেবে দেখানো হয়েছিল, আর এসবের বিরুদ্ধে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ায় শুধু তখনই সরকারের টনক নড়েছিল। কিন্তু আমার পরিচিত এ মুক্তিযোদ্ধার জন্য তো তোলপাড় করার কেউ নেই। তাকে তো আদালতে যেতে হবে। কারণ, একমাত্র আদালতই তাকে ন্যায়বিচার দিতে পারেন।’

আমার চেয়েও বয়সে বড় এবং বেশ সম্মানিত একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি আমাকে এসব বলায়, আমি চুপচাপ তার কথা শোনার পর তাকে বলি, এসব শুনে আমি কী করব বলুন? আমার কথায় তিনি এবার আরও একটু সাবলীলভাবে বললেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ২০০০ সালে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করিয়ে ২০০১ সালে প্রায় চল্লিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সনদে সবুজ কালিতে নিজ হাতে প্রতিস্বাক্ষর করে যাদের হাতে সনদ তুলে দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বা সংসদের সিদ্ধান্ত ছাড়া সেসব সনদ বাতিল করা হচ্ছে কেমন করে? এটা তো পরিষ্কারভাবে আইনের শাসনের ব্যত্যয়! তাছাড়া আমার জানামতে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিস্বাক্ষরিত সনদগুলো বাতিল না করার জন্যও বলে রেখেছেন।’

সুধী পাঠক, লেখাটি আর দীর্ঘায়িত না করে উপসংহার টেনে বলতে চাই, আমার পাঠকরা জানেন আমার লেখায় কোনো একদেশদর্শিতা নেই; লেখার সময় একজন কলাম লেখক হিসেবে যা লেখা উচিত কিছুটা সাহসের সঙ্গেই তা লিখি। লেখালেখির ক্ষেত্রে আমার একমাত্র দুর্বলতার জায়গা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; কোনো দল বা গোষ্ঠী নয়।

এ অবস্থায় আমার মোহাম্মদপুরের বন্ধুর সমালোচনা মাথা পেতে নিয়ে আমার অক্ষমতাটুকুর জন্য ক্ষমা চাই। সেইসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিস্বাক্ষরিত সনদ তার অনুমোদন বা অনুমতি ছাড়া বাতিল করা কতটুকু আইন বা ন্যায়সঙ্গত, সে বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহলকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই।

আর সবশেষে বলতে চাই, অতীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু আমলা বা মন্ত্রীর অদূরদর্শিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অতি ব্যবহারের কারণে সময়ে সময়ে অনেক সরকারকেই খেসারত দিতে হয়েছে। সুতরাং ইংরেজ পলিটিশিয়ান লর্ড অ্যাকটনের ‘Absolute power corrupts absolutely’ উক্তিটি মনে রেখে পথচলাই ভালো। দেশের কোথাও কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার বা অতি ব্যবহার করছেন কি না, সদা-সর্বদা সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত বলেই মনে করি।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস