কার্যকর সংসদ বলতে আসলে কী বোঝায়
jugantor
কার্যকর সংসদ বলতে আসলে কী বোঝায়

  রুমিন ফারহানা  

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের গণতন্ত্র আর শাসন পদ্ধতির আলোচনায় ‘কার্যকর সংসদ’ শব্দগুলো খুব শোনা যায়; কিন্তু শব্দ দুটো দিয়ে যা বোঝানো হয়, তা আসলে এ শব্দগুলোর মানে না। একটি রাষ্ট্রের সংসদ যদি সত্যিকার অর্থেই কার্যকর বোঝাতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সব আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ইত্যাদি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা সংসদের। অতি জরুরি শর্ত হচ্ছে সেই সংসদে ক্ষমতাসীন দল যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না; সংসদে সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারবে।

কার্যকর সংসদ বলতে আমাদের দেশে বোঝানো হয় এমন একটি সংসদ, যেখানে বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংসদ সদস্য আছে এবং যারা সরকারের আইন প্রণয়ন এবং নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সংসদকে মুখর করে রাখেন। এ রকম সংসদকেও আমার অন্তত কার্যকর সংসদ বলতে আপত্তি আছে।

সংসদের ৭০ অনুচ্ছেদ বর্তমান অবস্থায় রেখে কোনোভাবেই একটা কার্যকর সংসদ নিশ্চিত করা সম্ভব না। ৭০ অনুচ্ছেদটি দেখে নেয়া যাক- কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না। শুধুমাত্র একটি ভোট কম থাকলেও সম্মিলিত বিরোধী দল চাইলেও সরকারের পদক্ষেপ নেয়া বন্ধ রাখা সম্ভব না।

বিদ্যমান সিস্টেমে সংসদে বিরোধী দলকে ইচ্ছামতো কথা বলতে দিলেও সরকারের ন্যূনতম ক্ষতি নেই। সরকার যেমন ইচ্ছা তেমন পদক্ষেপ নিয়ে যেতে পারবে। বিরোধী দলকে ইচ্ছামতো কথা বলতে এবং বিরোধিতা করতে দিলে কার্যকর সংসদের একটি বিভ্রম তৈরি হয় মাত্র; কিন্তু সেই বিভ্রমও কি চাইছে সরকার?

সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে বিএনপি নেয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে শপথ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিএনপি যখন সংসদের শপথ নেয়নি, তখন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং দলের বড় বড় নেতা দফায় দফায় বলেছিলেন, বিএনপি সংসদে গেলে তাদের অনেক সময় দেয়া হবে-তাদের বক্তব্য উত্থাপন করার জন্য।

এ সংসদে আমার এক বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। সংসদের ‘ডি ফ্যাক্টো’ প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পরও আমাদের ঠিকমতো সময় দেয়া হয় না। জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণসম্পন্ন বিষয় নিয়ে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ ধারা অনুযায়ী বক্তব্য প্রদানের সুযোগ খুব কম দেয়া হয়। ৪২ ধারায় প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগও আমাদের অনেক কম হয়।

প্রতিটি সংসদ অধিবেশনের সময় আমি অন্তত ৫০টি প্রশ্ন জমা দিই; কিন্তু সেখান থেকে প্রশ্ন গ্রহণ করা হয় ৮-১০টি। এবার সংসদ খুবই সংক্ষিপ্ত হবে-এ কারণে জমা দিয়েছিলাম ১০টি প্রশ্ন। এর মধ্যে এসেছে সাতটি। এবার এক নতুন উপসর্গ দেখা গেল, যেটি আগের কোনো অধিবেশনে হয়নি। সাতটি প্রশ্নের মধ্যে সবই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। পরিবর্তনের ধরনটা বোঝানোর জন্য চারটি প্রশ্ন আমি নিচে দিলাম। এর মধ্যে (ক)-তে আছে সংসদে যেভাবে প্রশ্নটা এসেছে, আর(খ)-তে আছে আমি যেভাবে প্রশ্নটা জমা দিয়েছিলাম-সেটি।

১. (ক) অর্থ (আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ) মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী করোনায় প্রচণ্ড রকম সংকটে পড়িয়াছে এসএমই খাত। প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা দেশের এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের পরিকল্পনা কী? (খ) করোনায় প্রচণ্ড রকম সংকটে পড়েছে এসএমই খাত। সরকারের তথাকথিত প্রণোদনার ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ এসএমই খাতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।

সেই প্রণোদনা ঘোষণার তিন মাস পর গত মাসের তথ্য অনুযায়ী বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২০৬ কোটি টাকা। এ টাকাও বাস্তবে এসএমই খাত পেয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এদিকে করোনা সংকটের আগেই দেশের ব্যাংকাররা জানিয়েছিলেন সরকারের চাপিয়ে দেয়া ৯ শতাংশ সুদে এসএমই খাতকে কোনোভাবেই তারা ঋণ দিতে পারবেন না। প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা দেশের এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের পরিকল্পনা কী?

২. (ক) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ (স্বাস্থ্যসেবা) বিভাগ মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কি, রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবাকে কি ধাপে ধাপে পুরো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে আগাইয়া যাইতেছে? (খ) করোনা এ দেশের একেবারে ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রকাশিত করেছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে করোনা এটিও প্রমাণ করেছে জনগণকে সন্তোষজনক স্বাস্থ্যসেবা দিতে হলে স্বাস্থ্যসেবা কখনোই বেসরকারি পর্যায়ে থাকা উচিত না।

এ বাস্তবতা অনেক আগেই উপলব্ধি করে আমার দল বেশ কয়েক বছর আগেই তার ভিশন ২০৩০-এ জনগণের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের শাসনামলে ঘটছে ঠিক উল্টোটা- ২০১৪ সালে চিকিৎসায় ব্যক্তিগত খরচ ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৭২ শতাংশে পৌঁছেছে। আওয়ামী শাসনামলে রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবাকে কি ধাপে ধাপে পুরো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে?

৩. (ক) আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক (আইন ও বিচার বিভাগ) মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কি, সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করিয়া সমাজের সর্বস্তরের মতামত নিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করিবে কি না। (খ) আইসিটি অ্যাক্টের বিতর্কিত ৫৭ ধারাকে ভেঙে যখন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২ ধারাগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হল, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল সরকার আসলে কঠোরভাবে ভিন্নমত দমন করা চালিয়ে যাবে।

সরকারের সেই চেষ্টা এমনকি থেমে থাকেনি করোনার এ চরম দুঃসময়েও। সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, এমনকি কার্টুনিস্টকেও গ্রেফতার করা হয়েছে এ আইনে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নামের এ নিপীড়ক আইন বাতিল করে সমাজের সব স্টেকহোল্ডারের মতামত নিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করবে কি?

৪. (ক) বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কি, ঈদুল আজহার দুই দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানাইয়াছিল কাঁচা এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়া হইবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ বছর চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি করার কারণ কী? (খ) ঈদুল আজহার দুই দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিলেন কাঁচা এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়া হবে। ঠিক তখনই বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল- এ পর্যায়ে এ ঘোষণা দিয়ে কোনো লাভ হবে না, ফল পেতে চাইলে এ ঘোষণা আরও অনেক আগেই দেয়া উচিত ছিল। তাই এ ঘোষণাকে একটা নিছক আইওয়াশ মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। গত বছরও চামড়া নিয়ে একই পরিস্থিতি হয়েছিল। তাহলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বছর চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত দিতে এই দেরি করেছে কার স্বার্থে? কার স্বার্থে করোনার এ চরম দুঃসময়েও রাষ্ট্রীয় ত্রাণ না পাওয়া গরিব মানুষ তার হকবঞ্চিত হল?

শুরুতেই উল্লেখ করে রাখা দরকার, আমি প্রতি অধিবেশনে ঠিক এভাবেই প্রশ্ন জমা দিই এবং অবিকৃতভাবেই প্রশ্নগুলো আসত। এবার আমাকে জানানো হয়েছে আমার প্রশ্ন দীর্ঘ হয়েছে, তাই তারা এভাবে পরিবর্তন করেছে। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি একটি প্রশ্নের ন্যূনতম প্রেক্ষাপট উল্লেখ না করা হলে সে প্রশ্নের কোনো গুরুত্ব থাকে না। শেষ প্রশ্নটা দিয়েই ব্যাপারটা বুঝে নেয়া যাক। এ বছর কাঁচা এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত দেরিতে দেয়ায় সংকটটা কী হয়েছে, কেন এ রফতানির সিদ্ধান্ত অনেক আগে দেয়া ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই প্রেক্ষাপট না বললে এ প্রশ্ন করা অর্থহীন।

একজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে আমার ‘ক্ষমতার দৌড়’ আমি জানি। কিন্তু আমি সব সময় চেষ্টা করেছি কথা বলার মতো যতটুকু স্পেস যেখানে পাওয়া যায়, সেটার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করব আমি। সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলার একটা আলাদা গুরুত্ব এ দেশের মানুষের কাছে আছে। এতে মিডিয়ার মনোযোগ বেশি থাকে বলে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়।

পরিপূর্ণভাবে আমার প্রশ্ন উত্থাপিত হলে এবং সেটার সন্তোষজনক জবাব না দিতে পারলে (আমি নিশ্চিত সেই জবাব তাদের কাছে নেই) কী ক্ষতি হতো সরকারের? সরকারের পতন হতো? কিংবা নিদেনপক্ষে সরকার দুর্বল হয়ে পড়ত? মানুষ সরকারকে দুয়ো দিত? দিলেই বা কী?

দশম সংসদের কার্যত কোনো বিরোধী দল ছিল না। সেটি না থাকার কারণে বিরোধীদের সমালোচনা সহ্য করার চর্চা এবং মানসিকতা একেবারে শেষ হয়ে গেছে সরকারি দলের। বর্তমানে অফিশিয়াল প্রধান বিরোধী দলটি গত এবং বর্তমান সংসদে যেভাবে আচরণ করছে সেটিকে আর যাই হোক সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতি হিসেবে চালানো যায় না।

সংসদের ‘ডি ফ্যাক্টো’ প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে কথা বলতে দিলে সরকারের পক্ষে ভীষণ প্রশ্নবিদ্ধ সংসদটি কিছুটা হলেও ‘কার্যকর’ আছে-এ বিভ্রম জনগণের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বিভ্রমটা তো তৈরি করার কথা জনগণের কাছে। ক্ষমতাসীন দলটি এখন আর ‘কার্যকর সংসদের’ বিভ্রমও তৈরি করতে আগ্রহী নয়। বিএনপির প্রতি সংসদের বাইরে এবং ভেতরে তাদের আচরণ সেটাই প্রমাণ করে।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহ-সম্পাদক, বিএনপি

কার্যকর সংসদ বলতে আসলে কী বোঝায়

 রুমিন ফারহানা 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের গণতন্ত্র আর শাসন পদ্ধতির আলোচনায় ‘কার্যকর সংসদ’ শব্দগুলো খুব শোনা যায়; কিন্তু শব্দ দুটো দিয়ে যা বোঝানো হয়, তা আসলে এ শব্দগুলোর মানে না। একটি রাষ্ট্রের সংসদ যদি সত্যিকার অর্থেই কার্যকর বোঝাতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সব আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ইত্যাদি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা সংসদের। অতি জরুরি শর্ত হচ্ছে সেই সংসদে ক্ষমতাসীন দল যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না; সংসদে সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারবে।

কার্যকর সংসদ বলতে আমাদের দেশে বোঝানো হয় এমন একটি সংসদ, যেখানে বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংসদ সদস্য আছে এবং যারা সরকারের আইন প্রণয়ন এবং নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সংসদকে মুখর করে রাখেন। এ রকম সংসদকেও আমার অন্তত কার্যকর সংসদ বলতে আপত্তি আছে।

সংসদের ৭০ অনুচ্ছেদ বর্তমান অবস্থায় রেখে কোনোভাবেই একটা কার্যকর সংসদ নিশ্চিত করা সম্ভব না। ৭০ অনুচ্ছেদটি দেখে নেয়া যাক- কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না। শুধুমাত্র একটি ভোট কম থাকলেও সম্মিলিত বিরোধী দল চাইলেও সরকারের পদক্ষেপ নেয়া বন্ধ রাখা সম্ভব না।

বিদ্যমান সিস্টেমে সংসদে বিরোধী দলকে ইচ্ছামতো কথা বলতে দিলেও সরকারের ন্যূনতম ক্ষতি নেই। সরকার যেমন ইচ্ছা তেমন পদক্ষেপ নিয়ে যেতে পারবে। বিরোধী দলকে ইচ্ছামতো কথা বলতে এবং বিরোধিতা করতে দিলে কার্যকর সংসদের একটি বিভ্রম তৈরি হয় মাত্র; কিন্তু সেই বিভ্রমও কি চাইছে সরকার?

সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে বিএনপি নেয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে শপথ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিএনপি যখন সংসদের শপথ নেয়নি, তখন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং দলের বড় বড় নেতা দফায় দফায় বলেছিলেন, বিএনপি সংসদে গেলে তাদের অনেক সময় দেয়া হবে-তাদের বক্তব্য উত্থাপন করার জন্য।

এ সংসদে আমার এক বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। সংসদের ‘ডি ফ্যাক্টো’ প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পরও আমাদের ঠিকমতো সময় দেয়া হয় না। জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণসম্পন্ন বিষয় নিয়ে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ ধারা অনুযায়ী বক্তব্য প্রদানের সুযোগ খুব কম দেয়া হয়। ৪২ ধারায় প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগও আমাদের অনেক কম হয়।

প্রতিটি সংসদ অধিবেশনের সময় আমি অন্তত ৫০টি প্রশ্ন জমা দিই; কিন্তু সেখান থেকে প্রশ্ন গ্রহণ করা হয় ৮-১০টি। এবার সংসদ খুবই সংক্ষিপ্ত হবে-এ কারণে জমা দিয়েছিলাম ১০টি প্রশ্ন। এর মধ্যে এসেছে সাতটি। এবার এক নতুন উপসর্গ দেখা গেল, যেটি আগের কোনো অধিবেশনে হয়নি। সাতটি প্রশ্নের মধ্যে সবই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। পরিবর্তনের ধরনটা বোঝানোর জন্য চারটি প্রশ্ন আমি নিচে দিলাম। এর মধ্যে (ক)-তে আছে সংসদে যেভাবে প্রশ্নটা এসেছে, আর(খ)-তে আছে আমি যেভাবে প্রশ্নটা জমা দিয়েছিলাম-সেটি।

১. (ক) অর্থ (আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ) মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী করোনায় প্রচণ্ড রকম সংকটে পড়িয়াছে এসএমই খাত। প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা দেশের এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের পরিকল্পনা কী? (খ) করোনায় প্রচণ্ড রকম সংকটে পড়েছে এসএমই খাত। সরকারের তথাকথিত প্রণোদনার ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ এসএমই খাতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।

সেই প্রণোদনা ঘোষণার তিন মাস পর গত মাসের তথ্য অনুযায়ী বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২০৬ কোটি টাকা। এ টাকাও বাস্তবে এসএমই খাত পেয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এদিকে করোনা সংকটের আগেই দেশের ব্যাংকাররা জানিয়েছিলেন সরকারের চাপিয়ে দেয়া ৯ শতাংশ সুদে এসএমই খাতকে কোনোভাবেই তারা ঋণ দিতে পারবেন না। প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা দেশের এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের পরিকল্পনা কী?

২. (ক) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ (স্বাস্থ্যসেবা) বিভাগ মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কি, রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবাকে কি ধাপে ধাপে পুরো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে আগাইয়া যাইতেছে? (খ) করোনা এ দেশের একেবারে ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রকাশিত করেছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে করোনা এটিও প্রমাণ করেছে জনগণকে সন্তোষজনক স্বাস্থ্যসেবা দিতে হলে স্বাস্থ্যসেবা কখনোই বেসরকারি পর্যায়ে থাকা উচিত না।

এ বাস্তবতা অনেক আগেই উপলব্ধি করে আমার দল বেশ কয়েক বছর আগেই তার ভিশন ২০৩০-এ জনগণের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের শাসনামলে ঘটছে ঠিক উল্টোটা- ২০১৪ সালে চিকিৎসায় ব্যক্তিগত খরচ ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৭২ শতাংশে পৌঁছেছে। আওয়ামী শাসনামলে রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবাকে কি ধাপে ধাপে পুরো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে?

৩. (ক) আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক (আইন ও বিচার বিভাগ) মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কি, সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করিয়া সমাজের সর্বস্তরের মতামত নিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করিবে কি না। (খ) আইসিটি অ্যাক্টের বিতর্কিত ৫৭ ধারাকে ভেঙে যখন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২ ধারাগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হল, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল সরকার আসলে কঠোরভাবে ভিন্নমত দমন করা চালিয়ে যাবে।

সরকারের সেই চেষ্টা এমনকি থেমে থাকেনি করোনার এ চরম দুঃসময়েও। সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, এমনকি কার্টুনিস্টকেও গ্রেফতার করা হয়েছে এ আইনে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নামের এ নিপীড়ক আইন বাতিল করে সমাজের সব স্টেকহোল্ডারের মতামত নিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করবে কি?

৪. (ক) বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কি, ঈদুল আজহার দুই দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানাইয়াছিল কাঁচা এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়া হইবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ বছর চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি করার কারণ কী? (খ) ঈদুল আজহার দুই দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিলেন কাঁচা এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়া হবে। ঠিক তখনই বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল- এ পর্যায়ে এ ঘোষণা দিয়ে কোনো লাভ হবে না, ফল পেতে চাইলে এ ঘোষণা আরও অনেক আগেই দেয়া উচিত ছিল। তাই এ ঘোষণাকে একটা নিছক আইওয়াশ মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। গত বছরও চামড়া নিয়ে একই পরিস্থিতি হয়েছিল। তাহলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বছর চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত দিতে এই দেরি করেছে কার স্বার্থে? কার স্বার্থে করোনার এ চরম দুঃসময়েও রাষ্ট্রীয় ত্রাণ না পাওয়া গরিব মানুষ তার হকবঞ্চিত হল?

শুরুতেই উল্লেখ করে রাখা দরকার, আমি প্রতি অধিবেশনে ঠিক এভাবেই প্রশ্ন জমা দিই এবং অবিকৃতভাবেই প্রশ্নগুলো আসত। এবার আমাকে জানানো হয়েছে আমার প্রশ্ন দীর্ঘ হয়েছে, তাই তারা এভাবে পরিবর্তন করেছে। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি একটি প্রশ্নের ন্যূনতম প্রেক্ষাপট উল্লেখ না করা হলে সে প্রশ্নের কোনো গুরুত্ব থাকে না। শেষ প্রশ্নটা দিয়েই ব্যাপারটা বুঝে নেয়া যাক। এ বছর কাঁচা এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত দেরিতে দেয়ায় সংকটটা কী হয়েছে, কেন এ রফতানির সিদ্ধান্ত অনেক আগে দেয়া ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই প্রেক্ষাপট না বললে এ প্রশ্ন করা অর্থহীন।

একজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে আমার ‘ক্ষমতার দৌড়’ আমি জানি। কিন্তু আমি সব সময় চেষ্টা করেছি কথা বলার মতো যতটুকু স্পেস যেখানে পাওয়া যায়, সেটার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করব আমি। সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলার একটা আলাদা গুরুত্ব এ দেশের মানুষের কাছে আছে। এতে মিডিয়ার মনোযোগ বেশি থাকে বলে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়।

পরিপূর্ণভাবে আমার প্রশ্ন উত্থাপিত হলে এবং সেটার সন্তোষজনক জবাব না দিতে পারলে (আমি নিশ্চিত সেই জবাব তাদের কাছে নেই) কী ক্ষতি হতো সরকারের? সরকারের পতন হতো? কিংবা নিদেনপক্ষে সরকার দুর্বল হয়ে পড়ত? মানুষ সরকারকে দুয়ো দিত? দিলেই বা কী?

দশম সংসদের কার্যত কোনো বিরোধী দল ছিল না। সেটি না থাকার কারণে বিরোধীদের সমালোচনা সহ্য করার চর্চা এবং মানসিকতা একেবারে শেষ হয়ে গেছে সরকারি দলের। বর্তমানে অফিশিয়াল প্রধান বিরোধী দলটি গত এবং বর্তমান সংসদে যেভাবে আচরণ করছে সেটিকে আর যাই হোক সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতি হিসেবে চালানো যায় না।

সংসদের ‘ডি ফ্যাক্টো’ প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে কথা বলতে দিলে সরকারের পক্ষে ভীষণ প্রশ্নবিদ্ধ সংসদটি কিছুটা হলেও ‘কার্যকর’ আছে-এ বিভ্রম জনগণের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বিভ্রমটা তো তৈরি করার কথা জনগণের কাছে। ক্ষমতাসীন দলটি এখন আর ‘কার্যকর সংসদের’ বিভ্রমও তৈরি করতে আগ্রহী নয়। বিএনপির প্রতি সংসদের বাইরে এবং ভেতরে তাদের আচরণ সেটাই প্রমাণ করে।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহ-সম্পাদক, বিএনপি