কালো মেঘে পর্যটন
jugantor
বিশ্ব পর্যটন দিবস
কালো মেঘে পর্যটন

  ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবিশ্বাস্য দুর্বার গতিতে এগোচ্ছিল বিশ্ব পর্যটন। ১৯৫০ সালে যেখানে মাত্র ২ কোটি ৫০ লাখ পর্যটক সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়িয়েছিল আর মোট ট্যুরিজম রিসিপ্ট ছিল মাত্র ২০০ কোটি ডলার, সেখানে ২০১৮ সালে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি পর্যটক আর মোট ট্যুরিজম রিসিপ্ট ছিল ১.৩ ট্রিলিয়ন (১৩০ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার। এভাবে এগিয়ে যেতে পারলে আশা করা হচ্ছিল ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রতি দু’জনের একজন অন্য দেশ সফরে বের হবেন। অর্থাৎ প্রায় ৪১৭ কোটি পর্যটক পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াবেন।

সঙ্গত কারণেই নীতিনির্ধারক ও পরিবেশবাদীরা ছিলেন অত্যন্ত শঙ্কিত। পর্যটকদের পদচারণায় যেভাবে পরিবেশ, ইকোলজি এবং বায়োডাইভারসিটি নষ্ট হচ্ছে, তাতে পরিবেশবাদীরা আতঙ্কিত- আজ থেকে তিরিশ বছর পর এই পৃথিবী কি আদৌ বাসযোগ্য থাকবে? অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ, পানির অভাব, দূষিত বাতাস, দূষিত নদী, খাল, সমুদ্র, খাদ্যের ওপর চাপ, অপ্রতুল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি এখনই অনেক পর্যটন স্থানের বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু না, প্রকৃতি যেমন আমাদের বাঁচতে শেখায়, ঠিক তেমনি প্রকৃতি মানুষের অত্যাচার থেকে নিজেকে বাঁচানোর পথ তৈরি করে নেয়। আমাদের যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, তোমরা আমাদের অতিথি; অতিথির মতোই থাকো, প্রভু হয়ে যেও না। সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস যেন প্রতিশোধ নিতে এসেছে মানুষের ওপর। ব্যবসা, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ হেন কোনো খাত নেই যেটা করোনাভাইরাস তছনছ করে দেয়নি। বিশ্ব পর্যটন সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে। জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা (UNWTO) তার হিসাবে বলছে, এ বছর করোনাভাইরাসের ছোবলে আন্তর্জাতিক পরিব্রাজকের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে শতকরা ৮০ ভাগ কম হবে। আন্তর্জাতিক পর্যটন রিসিপ্ট ১.২ ট্রিলিয়ন পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এরই মাঝে সরাসরি প্রায় ১২ কোটি পর্যটনসেবী তাদের চাকরি হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল হয়েছে বিপর্যস্ত। তাদের লোকসানের পরিমাণ এ হিসাবের মধ্যে আসেনি।

সার্বিক অর্থে বলা যায়, পর্যটন আজ একটি বিধ্বস্ত শিল্প। অন্যান্য শিল্প হয়তোবা অদূর ভবিষ্যতে তাদের করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসবে; কিন্তু পর্যটন শিল্পের পক্ষে এত দ্রুত পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। কারণ পর্যটন হল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। আর এ সম্পর্কে চিড় ধরিয়েছে কোভিড-১৯। বিশ্ব পর্যটন সংস্থাও মনে হয় দিগ্ভ্রান্ত। একের পর এক প্রেস রিলিজ দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুশিয়ারি জারি করেছে, এ করোনার উপদ্রব নাকি আগামী দু’বছরও চলতে পারে। শুধু তাই নয়, আমাদের নাকি এ করোনা নিয়েই থাকতে হতে পারে। কোভিড-১৯ এমনই একটা মহামারী, যা মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব সৃষ্টি করেছে, বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে। এখন আমরা মানুষের সঙ্গে হাত মেলাই না, কোলাকুলি করি না, হাতে হাত ধরে চলি না, মুখ থেকে মুখোশ খুলি না, একটু পরপরই স্যানিটাইজার দিয়ে হাতকে ভাইরাসমুক্ত রাখার চেষ্টা করি, কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কথা বলি না, যতটুকু পারা যায় দূরত্ব বজায় রেখে চলি। এগুলো তো পর্যটনের ভাষা নয়। পর্যটন হচ্ছে হৃদয়ের সংযোগ, পর্যটন হচ্ছে বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা, পর্যটন হচ্ছে হৃদয় নিংড়ানো আতিথেয়তার পরশ। কিন্তু কোভিড-১৯ এ সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সব স্বাস্থ্যরক্ষা বিধি মেনে আমাদের চেষ্টা করতে হবে পর্যটন নামের নদীতে জোয়ার আনার।

তবে কাজটি খুব সহজ নয়। আগেই বলেছি বিশ্ব পর্যটন সংস্থা মনে হচ্ছে মারাত্মক বিভ্রান্তিতে ভুগছে। সম্ভবত তারা বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে এ বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাবে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে এসেছে, তা হল এ অবস্থা থেকে পর্যটনকে উদ্ধার করতে ডোমেস্টিক ট্যুরিজম বা অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ওপর জোর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যটনের সুদিন ফিরে আসতে আমাদের অপেক্ষা করতে হতে পারে অনেকদিন।

এ মুহূর্তে কী করা যেতে পারে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে না পেরে বিশ্ব পর্যটন সংস্থা হঠাৎ করে এবারের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে দিল- ‘Tourism and Rural Development’ (পর্যটন ও গ্রামীণ উন্নয়ন)। আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগের অনেক আলোচিত বস্তাপচা প্রতিপাদ্য ‘রুরাল ডেভেলপমেন্ট’, যা কনসেপ্ট হিসেবেই থেকে গেল। পর্যটন দিয়ে গ্রামোন্নয়ন- এ ধরনের ফাঁকা বুলিতে কাজ হয় না। তাই অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হল, অনেক মডেল তৈরি করা হল। শেষ পর্যন্ত গ্রামোন্নয়নের জন্য (অথবা বিশেষ কোনো এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য) একটা মডেলই মোটামুটি কার্যক্ষম হিসেবে বিবেচিত হল। সেটা হচ্ছে কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম বা সংক্ষেপে সিবিটি।

পর্যটনের বৈশিষ্ট্যই হল পর্যটকদের জন্য একটা বা একের অধিক আকর্ষণ থাকতে হবে। তা সে প্রাকৃতিক হোক কিংবা মনুষ্য সৃষ্ট হোক অথবা সংস্কৃতি হোক। আমাদের নতুন নতুন অথচ আকর্ষণীয় পর্যটন পণ্যের সৃষ্টি করতে হবে। বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামকেই তো আমরা পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে পারব না। সেটা সম্ভবও নয়। তাই আমাদের প্রয়োজন পর্যটন আকর্ষণসমৃদ্ধ এলাকা চিহ্নিতকরণ। সেখানে সরকার ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম কীভাবে গড়ে তোলা যায়, আমাদের নীতিনির্ধারকরা তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করতে পারেন।

আমরা যে সিদ্ধান্তই নেই না কেন, আমাদের মাথায় রাখতেই হবে করোনাভাইরাসের ধ্বংসযজ্ঞের কথা। সুতরাং যে কোনো ধরনের পরিকল্পনার সময় করোনাভাইরাসের প্রভাবে আগামী দিনে ট্যুরিজম কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে তা পর্যবেক্ষণ করে দেখা একান্ত জরুরি।

এখন পর্যন্ত পর্যটকদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব ছিল আমন্ত্রণকারী দেশের। নিরাপত্তা বলতে আমরা প্রধানত বুঝতাম শারীরিক নিরাপত্তা। আগামী দিনের পর্যটকরা নিরাপত্তা বলতে শুধু শারীরিক নিরাপত্তা গণ্য করবে না, তারা তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তারও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খেয়াল করবে। ফলে তারা ভ্রমণস্থান নির্বাচনের সময় এ বিষয়টি সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন থাকবে। এখন পর্যটকরা বেশি ভিড় এড়ানোর চিন্তাভাবনা করবে। তারা খুঁজবে শান্ত, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, যে কারণে এখন ভেনিজুয়েলা, চিলিসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর কিছু কিছু শান্ত কোলাহলমুক্ত প্রকৃতি সমৃদ্ধ স্থান আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমাদেরও খুঁজে দেখতে হবে নতুন নতুন শান্ত কোলাহলমুক্ত গন্তব্য স্থান।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হল আমাদের পর্যটন স্থানগুলোর জন্য TCC বা Tourist Carrying Capacity নির্ধারণ করা। একটা স্থানে কতজন পর্যটক গেলে সেখানকার মানুষ বিরক্ত হবে না, পরিবেশের ক্ষতি হবে না, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে না, পানির অভাব হবে না, এয়ারপলুশন হবে না- এগুলো আমাদের নির্ণয় করতে হবে। আমাদের অনেক পর্যটনস্থান বিপর্যয়ের মুখে পড়ার কারণই হল ‘ওভার ট্যুরিজম’। পর্যটকদের যে কোনো স্থানে যাওয়ার অধিকার থাকতেই পারে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থের কারণে কিছু কিছু অসুরক্ষিত স্থানে পর্যটকদের যাওয়া সীমাবদ্ধ করতেই হবে। এজন্য কিছু আর্থিক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। পৃথিবীর বহু দেশেই অনেক পর্যটন আকর্ষণীয় স্থান সুরক্ষার জন্য পর্যটকদের ‘পলিউটারস পে’ নামে লেভি দিতে হয়। আমাদের সেন্টমার্টিন দ্বীপ এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। আমরা আজ থেকে ৬ বছর আগে এক গবেষণায় বের করেছিলাম, সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোনোমতেই প্রতিদিন দু’হাজারের বেশি মানুষ যেতে দেয়া ঠিক নয়। পর্যটকরা অবশ্যই সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাবে। তবে প্রতি পর্যটককে মাথাপিছু লেভি দিতে হবে। সরকারই ঠিক করবে তার পরিমাণ কতটুকু হবে। অর্জিত সেই অর্থ দিয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হবে।

করোনা-পরবর্তী সময় অথবা করোনার প্রভাব থাকা অবস্থায় আমরা ধীরে ধীরে আমাদের পর্যটন স্থানগুলো পর্যটকদের জন্য সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দিতে পারি। প্রাথমিকভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ পর্যটন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থাও প্রাথমিকভাবে অভ্যন্তরীণ পর্যটন নিয়েই কাজ শুরু করার উপদেশ দিয়েছে। আপাতত আমাদের বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন নেই। কারণ বাংলদেশ এখন ‘নিরাপদ’ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। আর পরিপূর্ণভাবে বিশ্বব্যাপী এয়ার নেটওয়ার্কও চালু হয়নি। এ ছাড়া বিদেশি পর্যটকরা এখন গন্তব্যস্থান খুঁজে নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। সুতরাং আমাদের এখন সার্বিকভাবে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের দিকেই খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে অভ্যন্তরীণ পর্যটন সঠিকভাবে চালু করা এখন সচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং কাজ।

পরিশেষে বলতে চাই, পর্যটনের মাধ্যমে গ্রামোন্নয়ন থিমটিকে শুধু অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা কার্যকর করার জন্য এগিয়ে আসুন। নতুনভাবে পর্যটন পরিকল্পনাগুলো ঢেলে তৈরি করুন। গ্রামভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন পর্যটন কর্মকাণ্ডের উদ্ভাবন করুন। দেশি পর্যটক দিয়েই শুরু হোক আমাদের আগামীর পর্যটন।

ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান : অধ্যাপক, ম্যারিটাইম ট্যুরিজম বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ম্যারিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ব পর্যটন দিবস

কালো মেঘে পর্যটন

 ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবিশ্বাস্য দুর্বার গতিতে এগোচ্ছিল বিশ্ব পর্যটন। ১৯৫০ সালে যেখানে মাত্র ২ কোটি ৫০ লাখ পর্যটক সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়িয়েছিল আর মোট ট্যুরিজম রিসিপ্ট ছিল মাত্র ২০০ কোটি ডলার, সেখানে ২০১৮ সালে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি পর্যটক আর মোট ট্যুরিজম রিসিপ্ট ছিল ১.৩ ট্রিলিয়ন (১৩০ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার। এভাবে এগিয়ে যেতে পারলে আশা করা হচ্ছিল ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রতি দু’জনের একজন অন্য দেশ সফরে বের হবেন। অর্থাৎ প্রায় ৪১৭ কোটি পর্যটক পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াবেন।

সঙ্গত কারণেই নীতিনির্ধারক ও পরিবেশবাদীরা ছিলেন অত্যন্ত শঙ্কিত। পর্যটকদের পদচারণায় যেভাবে পরিবেশ, ইকোলজি এবং বায়োডাইভারসিটি নষ্ট হচ্ছে, তাতে পরিবেশবাদীরা আতঙ্কিত- আজ থেকে তিরিশ বছর পর এই পৃথিবী কি আদৌ বাসযোগ্য থাকবে? অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ, পানির অভাব, দূষিত বাতাস, দূষিত নদী, খাল, সমুদ্র, খাদ্যের ওপর চাপ, অপ্রতুল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি এখনই অনেক পর্যটন স্থানের বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু না, প্রকৃতি যেমন আমাদের বাঁচতে শেখায়, ঠিক তেমনি প্রকৃতি মানুষের অত্যাচার থেকে নিজেকে বাঁচানোর পথ তৈরি করে নেয়। আমাদের যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, তোমরা আমাদের অতিথি; অতিথির মতোই থাকো, প্রভু হয়ে যেও না। সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস যেন প্রতিশোধ নিতে এসেছে মানুষের ওপর। ব্যবসা, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ হেন কোনো খাত নেই যেটা করোনাভাইরাস তছনছ করে দেয়নি। বিশ্ব পর্যটন সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে। জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা (UNWTO) তার হিসাবে বলছে, এ বছর করোনাভাইরাসের ছোবলে আন্তর্জাতিক পরিব্রাজকের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে শতকরা ৮০ ভাগ কম হবে। আন্তর্জাতিক পর্যটন রিসিপ্ট ১.২ ট্রিলিয়ন পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এরই মাঝে সরাসরি প্রায় ১২ কোটি পর্যটনসেবী তাদের চাকরি হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল হয়েছে বিপর্যস্ত। তাদের লোকসানের পরিমাণ এ হিসাবের মধ্যে আসেনি।

সার্বিক অর্থে বলা যায়, পর্যটন আজ একটি বিধ্বস্ত শিল্প। অন্যান্য শিল্প হয়তোবা অদূর ভবিষ্যতে তাদের করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসবে; কিন্তু পর্যটন শিল্পের পক্ষে এত দ্রুত পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। কারণ পর্যটন হল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। আর এ সম্পর্কে চিড় ধরিয়েছে কোভিড-১৯। বিশ্ব পর্যটন সংস্থাও মনে হয় দিগ্ভ্রান্ত। একের পর এক প্রেস রিলিজ দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুশিয়ারি জারি করেছে, এ করোনার উপদ্রব নাকি আগামী দু’বছরও চলতে পারে। শুধু তাই নয়, আমাদের নাকি এ করোনা নিয়েই থাকতে হতে পারে। কোভিড-১৯ এমনই একটা মহামারী, যা মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব সৃষ্টি করেছে, বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে। এখন আমরা মানুষের সঙ্গে হাত মেলাই না, কোলাকুলি করি না, হাতে হাত ধরে চলি না, মুখ থেকে মুখোশ খুলি না, একটু পরপরই স্যানিটাইজার দিয়ে হাতকে ভাইরাসমুক্ত রাখার চেষ্টা করি, কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কথা বলি না, যতটুকু পারা যায় দূরত্ব বজায় রেখে চলি। এগুলো তো পর্যটনের ভাষা নয়। পর্যটন হচ্ছে হৃদয়ের সংযোগ, পর্যটন হচ্ছে বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা, পর্যটন হচ্ছে হৃদয় নিংড়ানো আতিথেয়তার পরশ। কিন্তু কোভিড-১৯ এ সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সব স্বাস্থ্যরক্ষা বিধি মেনে আমাদের চেষ্টা করতে হবে পর্যটন নামের নদীতে জোয়ার আনার।

তবে কাজটি খুব সহজ নয়। আগেই বলেছি বিশ্ব পর্যটন সংস্থা মনে হচ্ছে মারাত্মক বিভ্রান্তিতে ভুগছে। সম্ভবত তারা বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে এ বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাবে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে এসেছে, তা হল এ অবস্থা থেকে পর্যটনকে উদ্ধার করতে ডোমেস্টিক ট্যুরিজম বা অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ওপর জোর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যটনের সুদিন ফিরে আসতে আমাদের অপেক্ষা করতে হতে পারে অনেকদিন।

এ মুহূর্তে কী করা যেতে পারে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে না পেরে বিশ্ব পর্যটন সংস্থা হঠাৎ করে এবারের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে দিল- ‘Tourism and Rural Development’ (পর্যটন ও গ্রামীণ উন্নয়ন)। আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগের অনেক আলোচিত বস্তাপচা প্রতিপাদ্য ‘রুরাল ডেভেলপমেন্ট’, যা কনসেপ্ট হিসেবেই থেকে গেল। পর্যটন দিয়ে গ্রামোন্নয়ন- এ ধরনের ফাঁকা বুলিতে কাজ হয় না। তাই অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হল, অনেক মডেল তৈরি করা হল। শেষ পর্যন্ত গ্রামোন্নয়নের জন্য (অথবা বিশেষ কোনো এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য) একটা মডেলই মোটামুটি কার্যক্ষম হিসেবে বিবেচিত হল। সেটা হচ্ছে কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম বা সংক্ষেপে সিবিটি।

পর্যটনের বৈশিষ্ট্যই হল পর্যটকদের জন্য একটা বা একের অধিক আকর্ষণ থাকতে হবে। তা সে প্রাকৃতিক হোক কিংবা মনুষ্য সৃষ্ট হোক অথবা সংস্কৃতি হোক। আমাদের নতুন নতুন অথচ আকর্ষণীয় পর্যটন পণ্যের সৃষ্টি করতে হবে। বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামকেই তো আমরা পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে পারব না। সেটা সম্ভবও নয়। তাই আমাদের প্রয়োজন পর্যটন আকর্ষণসমৃদ্ধ এলাকা চিহ্নিতকরণ। সেখানে সরকার ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম কীভাবে গড়ে তোলা যায়, আমাদের নীতিনির্ধারকরা তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করতে পারেন।

আমরা যে সিদ্ধান্তই নেই না কেন, আমাদের মাথায় রাখতেই হবে করোনাভাইরাসের ধ্বংসযজ্ঞের কথা। সুতরাং যে কোনো ধরনের পরিকল্পনার সময় করোনাভাইরাসের প্রভাবে আগামী দিনে ট্যুরিজম কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে তা পর্যবেক্ষণ করে দেখা একান্ত জরুরি।

এখন পর্যন্ত পর্যটকদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব ছিল আমন্ত্রণকারী দেশের। নিরাপত্তা বলতে আমরা প্রধানত বুঝতাম শারীরিক নিরাপত্তা। আগামী দিনের পর্যটকরা নিরাপত্তা বলতে শুধু শারীরিক নিরাপত্তা গণ্য করবে না, তারা তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তারও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খেয়াল করবে। ফলে তারা ভ্রমণস্থান নির্বাচনের সময় এ বিষয়টি সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন থাকবে। এখন পর্যটকরা বেশি ভিড় এড়ানোর চিন্তাভাবনা করবে। তারা খুঁজবে শান্ত, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, যে কারণে এখন ভেনিজুয়েলা, চিলিসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর কিছু কিছু শান্ত কোলাহলমুক্ত প্রকৃতি সমৃদ্ধ স্থান আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমাদেরও খুঁজে দেখতে হবে নতুন নতুন শান্ত কোলাহলমুক্ত গন্তব্য স্থান।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হল আমাদের পর্যটন স্থানগুলোর জন্য TCC বা Tourist Carrying Capacity নির্ধারণ করা। একটা স্থানে কতজন পর্যটক গেলে সেখানকার মানুষ বিরক্ত হবে না, পরিবেশের ক্ষতি হবে না, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে না, পানির অভাব হবে না, এয়ারপলুশন হবে না- এগুলো আমাদের নির্ণয় করতে হবে। আমাদের অনেক পর্যটনস্থান বিপর্যয়ের মুখে পড়ার কারণই হল ‘ওভার ট্যুরিজম’। পর্যটকদের যে কোনো স্থানে যাওয়ার অধিকার থাকতেই পারে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থের কারণে কিছু কিছু অসুরক্ষিত স্থানে পর্যটকদের যাওয়া সীমাবদ্ধ করতেই হবে। এজন্য কিছু আর্থিক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। পৃথিবীর বহু দেশেই অনেক পর্যটন আকর্ষণীয় স্থান সুরক্ষার জন্য পর্যটকদের ‘পলিউটারস পে’ নামে লেভি দিতে হয়। আমাদের সেন্টমার্টিন দ্বীপ এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। আমরা আজ থেকে ৬ বছর আগে এক গবেষণায় বের করেছিলাম, সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোনোমতেই প্রতিদিন দু’হাজারের বেশি মানুষ যেতে দেয়া ঠিক নয়। পর্যটকরা অবশ্যই সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাবে। তবে প্রতি পর্যটককে মাথাপিছু লেভি দিতে হবে। সরকারই ঠিক করবে তার পরিমাণ কতটুকু হবে। অর্জিত সেই অর্থ দিয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হবে।

করোনা-পরবর্তী সময় অথবা করোনার প্রভাব থাকা অবস্থায় আমরা ধীরে ধীরে আমাদের পর্যটন স্থানগুলো পর্যটকদের জন্য সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দিতে পারি। প্রাথমিকভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ পর্যটন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থাও প্রাথমিকভাবে অভ্যন্তরীণ পর্যটন নিয়েই কাজ শুরু করার উপদেশ দিয়েছে। আপাতত আমাদের বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন নেই। কারণ বাংলদেশ এখন ‘নিরাপদ’ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। আর পরিপূর্ণভাবে বিশ্বব্যাপী এয়ার নেটওয়ার্কও চালু হয়নি। এ ছাড়া বিদেশি পর্যটকরা এখন গন্তব্যস্থান খুঁজে নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। সুতরাং আমাদের এখন সার্বিকভাবে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের দিকেই খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে অভ্যন্তরীণ পর্যটন সঠিকভাবে চালু করা এখন সচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং কাজ।

পরিশেষে বলতে চাই, পর্যটনের মাধ্যমে গ্রামোন্নয়ন থিমটিকে শুধু অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা কার্যকর করার জন্য এগিয়ে আসুন। নতুনভাবে পর্যটন পরিকল্পনাগুলো ঢেলে তৈরি করুন। গ্রামভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন পর্যটন কর্মকাণ্ডের উদ্ভাবন করুন। দেশি পর্যটক দিয়েই শুরু হোক আমাদের আগামীর পর্যটন।

ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান : অধ্যাপক, ম্যারিটাইম ট্যুরিজম বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ম্যারিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়