ঘুরে দাঁড়াক পর্যটন শিল্প
jugantor
বিশ্ব পর্যটন দিবস
ঘুরে দাঁড়াক পর্যটন শিল্প

  জিয়াউল হক হাওলাদার  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই পর্যটন অভীষ্ট (SDG) অর্জনের ১৭টির মধ্যে ৩টি শর্ত হচ্ছে- আগামী ২০৩০ সালে (অভীষ্ট-১) সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্যের অবসান; (অভীষ্ট-২) ক্ষুধার অবসান; খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার; (অভীষ্ট-৮) সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং শোভন কর্মসুযোগ সৃষ্টি এবং স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। আর এর জন্য বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন- থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালদ্বীপ, নেপাল, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, কিউবা, সাইপ্রাস, মরিশাস, সেন্ট নেভিস অ্যান্ড কিটসসহ অন্যান্য ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে পর্যটন যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্যবিমোচনে এক অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও পর্যটন উন্নয়ন ও এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ বেকারত্ব দূরীকরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বাস্তবতায় বিশ্বের আর্থসামাজিক কাঠামোয় দ্রুত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব যথার্থই টের পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এখনও মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। বিশ্ব পর্যটন দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়- ‘Tourism and Rural Development’ অর্থাৎ ‘পর্যটন ও গ্রামীণ উন্নয়ন’, যা বৈশ্বিক ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’ (এসডিজি) অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। পর্যটন শিল্পের যথাযথ উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্যবিমোচনে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করছি, গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার কতটুকু উন্নয়ন করতে পারছি এবং ভবিষ্যতে করতে পারব, সেটিই হচ্ছে এবারকার উপজীব্য।

এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশ তথা এশিয়া, আফ্রিকাসহ বিশ্বের সব গ্রামপ্রধান দেশের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রতিটি গ্রামকে বানাতে হবে একেকটি পর্যটন গন্তব্য বা ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন। এসব গন্তব্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বেড়াতে যাবে; ফলে গ্রাম এলাকায় আর্থিক কর্মকাণ্ডসহ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যদূরীকরণ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গাকরণসহ গ্রামগুলোয় শহরের সেবা পৌঁছানের জন্য গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ট্যুরিজমের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আমাদের গ্রামের যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এখানে প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ- গাইডিং, কুকিং, ইন্টারপ্রিটেশনসহ নানা প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন পর্যটন আকর্ষণীয় এলাকার যুব ও যুব মহিলাদের কুকিং, গাইডিং এবং হাইজিনসহ বিভিন্ন শর্ট কোর্সে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।

গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থাকে চাঙ্গা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের চেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন। গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আর্থিক সচ্ছলতাসহ তাদের স্থায়ী উপার্জনের পথ সুগম হবে। এজন্য ছোট ছোট পর্যটন উদ্যোক্তাকে সহজ শর্তে সরকারি ঋণ প্রদান করা যেতে পারে।

গ্রামীণ পর্যটন শিল্প উন্নয়নের জন্য গ্রামাঞ্চলে অনেক ঐতিহ্যগত দিক রয়েছে। যেগুলো হচ্ছে গ্রাম্য সমাজব্যবস্থা, চিরায়ত পদ্ধতিতে কৃষিজমি চাষাবাদ, চিরায়ত লোকসঙ্গীত, দেশীয় খাবার প্রস্তুত প্রক্রিয়া- চিড়া, মুড়ি, খই, খেজুরের পায়েস, মাঠা ইত্যাদি। এগুলোই পর্যটকরা দেখতে চায়, উপভোগ করতে চায়। এসব পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ও তা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক প্রাইভেট ট্যুর অপারেটররা গ্রামীণ জীবনযাপন (Traditional Life Style) পর্যটকদের দেখানোর জন্য গ্রামে নিয়ে যান। এতে গ্রামীণ জনগণের তেমন উপকার হয় না; গ্রামীণ জনগণের কাছে পর্যটন বেনিফিট পৌঁছানো যায় না। এসব কাজের জন্য দরকার গ্রামীণ মানুষেরই সক্রিয় অংশগ্রহণ। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন। একজন গ্রামীণ নারী যখন খই বা মুড়ি তৈরি করে, তার দৃশ্য কিংবা একজন গ্রামীণ কৃষকের ধান কাটার দৃশ্য, খেজুর গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামানোর দৃশ্য পর্যটকদের যারা দেখিয়ে আয় করেন, তাদের উচিত ওই আয়ের একটি অংশ ওই নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের- যারা পর্যটন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করল, তাদের হাতে দেয়া। এতে করে তাদের আয় বাড়বে এবং বাঁচার তাগিদে অন্যান্য স্বাভাবিক কাজকর্মের পাশাপাশি পর্যটন কর্মকাণ্ড চালাবে।

বাংলাদেশে গ্রামীণ পর্যটন শিল্প উন্নয়নের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ভাগ করে কাজ করা যায় যেমন- ফার্মিং ট্যুরিজম, ইকো-ট্যুরিজম, গ্রিন ট্যুরিজম ইত্যাদি। ফার্মিং ট্যুরিজমের মধ্যে গ্রামবাংলার স্বকীয় কৃষি খামার ও জমি চাষাবাদ পদ্ধতি, ফসল কাটার দৃশ্য, সেচ প্রণালী, ফসল তোলা, গ্রামীণ মহিলাদের ধান শুকানো, ধান উড়ানো এবং ধানভানার দৃশ্যই হচ্ছে এর অন্যতম আকর্ষণ। ইকো-ট্যুরিজম হতে পারে গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি, নদী-নালা, খাল-বিল, দেশীয় মাছ, পশু-পাখিসহ নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র্য। গ্রামীণ ট্যুরিজমের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গ্রিন ট্যুরিজম। অনেক বিদেশি বাংলাদেশের অবারিত সবুজের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। গ্রিন ট্যুরিজমের সব উপাদানই বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যমান। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত সব ঋতুতে বাংলাদেশ সবুজে আচ্ছাদিত থাকে। সবুজের প্রাণচাঞ্চল্য বরফাচ্ছন্ন দেশের অনেক পর্যটককে আন্দোলিত করে। অনেক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের মানুষ বাংলাদেশের আবহমান সবুজ-শ্যামল গ্রামীণ জনপদ ভালোবাসেন, দেখতে আসেন।

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ঢাকার আশপাশের জেলাসহ ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হালুয়াঘাট, সিলেট এবং সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করা যেতে পারে। এসব জেলায় এমনিতেই পর্যটন শিল্প যথেষ্ট উন্নয়ন ও বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। পার্বত্য জেলাগুলোয় বিদ্যমান প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই কোনো ভারি শিল্প স্থাপন করা যাবে না। এসব জেলার প্রাকৃতিক দৃশ্য ও স্থানীয় জনগণের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নই একমাত্র পথ। পর্যটন শিল্প ঘিরে ব্যাপক কর্মসংস্থান, আর্থিক প্রবাহ ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। তবে এসব জেলায় স্থানীয় সম্প্রদায়- যেসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে, তাদের দূরে রেখে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখানে প্রতিটি জাতিসত্তারই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণ রয়েছে। এখানে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করতে হলে স্থানীয় যে কয়টি জাতিসত্তা রয়েছে, তাদেরই পর্যটন সম্পদের মালিকানা প্রদান ও মালিকানা বোধ (Sense of Ownership) জাগ্রত করতে হবে। মূলত তারাই আর্থিক আয় ও নতুন নতুন কর্মসংস্থানের তাগিদে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন পণ্যকে রক্ষা করবে।

বাংলাদেশে গ্রামীণ পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ পরিকল্পনা অবশ্যই থাকতে হবে। পরিবেশের ক্ষতি করে যেমন গ্রামীণ পর্যটন শিল্প হবে না; আবার শুধু পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিলেও পর্যটনের উন্নয়ন হবে না। বিষয়টি পরিপূরক। গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করতে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকারের বিনা সুদে ঋণ কিংবা সহজ শর্তে ঋণ প্রদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন- গ্রামে যারা পিঠা বা পায়েস, দই ইত্যাদি তৈরি করে বাজারে কিংবা পর্যটকদের কাছে বিক্রি করবে, তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যগুলো স্বাস্থ্যসম্মত ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য অর্থের প্রয়োজন। সহজ শর্তে বা বিনা সুদে ঋণ তাদের নিশ্চয়ই আরও কর্মতৎপর ও সত্যিকারের টেকসই উন্নয়নের দিকে পরিচালিত। গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন হলে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ও অনেক ধরনের ছোট এবং মাঝারি উদ্যোক্তা যেমন- চিড়া-মুড়ি-খই-দই প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা, পিঠা-পায়েস-মোয়া প্রস্তুতকারক, হস্তশিল্প (বাঁশ, বেত, হোগলা) প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী ইত্যাদি অনেক উদ্যোক্তার সৃষ্টি হবে। তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য সহজ শর্তে সরকারি ঋণ প্রয়োজন।

এখানে এরকম ধারণা আছে- পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ঘটলে গ্রামীণ পরিবেশ ও সংস্কৃতি বিনষ্ট হবে। আসলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য পরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটক সবার দায়িত্ব পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যটন পণ্য বাঁচিয়ে রাখা। একে অবশ্য Responsible Tourism বলা হয়। ইকো-ট্যুরিজম, গ্রিন ট্যুরিজম, নেচার ট্যুরিজম এসবই Responsible Tourism-এর অংশ।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যদূরীকরণ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যদূরীকরণের দিকে আমরা যথাযথ নজর দিলে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন ত্বরান্বিত হবে।

জিয়াউল হক হাওলাদার : ভ্রমণ লেখক ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ

বিশ্ব পর্যটন দিবস

ঘুরে দাঁড়াক পর্যটন শিল্প

 জিয়াউল হক হাওলাদার 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই পর্যটন অভীষ্ট (SDG) অর্জনের ১৭টির মধ্যে ৩টি শর্ত হচ্ছে- আগামী ২০৩০ সালে (অভীষ্ট-১) সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্যের অবসান; (অভীষ্ট-২) ক্ষুধার অবসান; খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার; (অভীষ্ট-৮) সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং শোভন কর্মসুযোগ সৃষ্টি এবং স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। আর এর জন্য বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন- থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালদ্বীপ, নেপাল, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, কিউবা, সাইপ্রাস, মরিশাস, সেন্ট নেভিস অ্যান্ড কিটসসহ অন্যান্য ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে পর্যটন যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্যবিমোচনে এক অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও পর্যটন উন্নয়ন ও এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ বেকারত্ব দূরীকরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বাস্তবতায় বিশ্বের আর্থসামাজিক কাঠামোয় দ্রুত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব যথার্থই টের পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এখনও মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। বিশ্ব পর্যটন দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়- ‘Tourism and Rural Development’ অর্থাৎ ‘পর্যটন ও গ্রামীণ উন্নয়ন’, যা বৈশ্বিক ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’ (এসডিজি) অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। পর্যটন শিল্পের যথাযথ উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্যবিমোচনে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করছি, গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার কতটুকু উন্নয়ন করতে পারছি এবং ভবিষ্যতে করতে পারব, সেটিই হচ্ছে এবারকার উপজীব্য।

এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশ তথা এশিয়া, আফ্রিকাসহ বিশ্বের সব গ্রামপ্রধান দেশের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রতিটি গ্রামকে বানাতে হবে একেকটি পর্যটন গন্তব্য বা ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন। এসব গন্তব্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বেড়াতে যাবে; ফলে গ্রাম এলাকায় আর্থিক কর্মকাণ্ডসহ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যদূরীকরণ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গাকরণসহ গ্রামগুলোয় শহরের সেবা পৌঁছানের জন্য গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ট্যুরিজমের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আমাদের গ্রামের যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এখানে প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ- গাইডিং, কুকিং, ইন্টারপ্রিটেশনসহ নানা প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন পর্যটন আকর্ষণীয় এলাকার যুব ও যুব মহিলাদের কুকিং, গাইডিং এবং হাইজিনসহ বিভিন্ন শর্ট কোর্সে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।

গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থাকে চাঙ্গা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের চেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন। গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আর্থিক সচ্ছলতাসহ তাদের স্থায়ী উপার্জনের পথ সুগম হবে। এজন্য ছোট ছোট পর্যটন উদ্যোক্তাকে সহজ শর্তে সরকারি ঋণ প্রদান করা যেতে পারে।

গ্রামীণ পর্যটন শিল্প উন্নয়নের জন্য গ্রামাঞ্চলে অনেক ঐতিহ্যগত দিক রয়েছে। যেগুলো হচ্ছে গ্রাম্য সমাজব্যবস্থা, চিরায়ত পদ্ধতিতে কৃষিজমি চাষাবাদ, চিরায়ত লোকসঙ্গীত, দেশীয় খাবার প্রস্তুত প্রক্রিয়া- চিড়া, মুড়ি, খই, খেজুরের পায়েস, মাঠা ইত্যাদি। এগুলোই পর্যটকরা দেখতে চায়, উপভোগ করতে চায়। এসব পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ও তা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক প্রাইভেট ট্যুর অপারেটররা গ্রামীণ জীবনযাপন (Traditional Life Style) পর্যটকদের দেখানোর জন্য গ্রামে নিয়ে যান। এতে গ্রামীণ জনগণের তেমন উপকার হয় না; গ্রামীণ জনগণের কাছে পর্যটন বেনিফিট পৌঁছানো যায় না। এসব কাজের জন্য দরকার গ্রামীণ মানুষেরই সক্রিয় অংশগ্রহণ। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন। একজন গ্রামীণ নারী যখন খই বা মুড়ি তৈরি করে, তার দৃশ্য কিংবা একজন গ্রামীণ কৃষকের ধান কাটার দৃশ্য, খেজুর গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামানোর দৃশ্য পর্যটকদের যারা দেখিয়ে আয় করেন, তাদের উচিত ওই আয়ের একটি অংশ ওই নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের- যারা পর্যটন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করল, তাদের হাতে দেয়া। এতে করে তাদের আয় বাড়বে এবং বাঁচার তাগিদে অন্যান্য স্বাভাবিক কাজকর্মের পাশাপাশি পর্যটন কর্মকাণ্ড চালাবে।

বাংলাদেশে গ্রামীণ পর্যটন শিল্প উন্নয়নের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ভাগ করে কাজ করা যায় যেমন- ফার্মিং ট্যুরিজম, ইকো-ট্যুরিজম, গ্রিন ট্যুরিজম ইত্যাদি। ফার্মিং ট্যুরিজমের মধ্যে গ্রামবাংলার স্বকীয় কৃষি খামার ও জমি চাষাবাদ পদ্ধতি, ফসল কাটার দৃশ্য, সেচ প্রণালী, ফসল তোলা, গ্রামীণ মহিলাদের ধান শুকানো, ধান উড়ানো এবং ধানভানার দৃশ্যই হচ্ছে এর অন্যতম আকর্ষণ। ইকো-ট্যুরিজম হতে পারে গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি, নদী-নালা, খাল-বিল, দেশীয় মাছ, পশু-পাখিসহ নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র্য। গ্রামীণ ট্যুরিজমের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গ্রিন ট্যুরিজম। অনেক বিদেশি বাংলাদেশের অবারিত সবুজের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। গ্রিন ট্যুরিজমের সব উপাদানই বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যমান। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত সব ঋতুতে বাংলাদেশ সবুজে আচ্ছাদিত থাকে। সবুজের প্রাণচাঞ্চল্য বরফাচ্ছন্ন দেশের অনেক পর্যটককে আন্দোলিত করে। অনেক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের মানুষ বাংলাদেশের আবহমান সবুজ-শ্যামল গ্রামীণ জনপদ ভালোবাসেন, দেখতে আসেন।

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ঢাকার আশপাশের জেলাসহ ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হালুয়াঘাট, সিলেট এবং সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করা যেতে পারে। এসব জেলায় এমনিতেই পর্যটন শিল্প যথেষ্ট উন্নয়ন ও বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। পার্বত্য জেলাগুলোয় বিদ্যমান প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই কোনো ভারি শিল্প স্থাপন করা যাবে না। এসব জেলার প্রাকৃতিক দৃশ্য ও স্থানীয় জনগণের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নই একমাত্র পথ। পর্যটন শিল্প ঘিরে ব্যাপক কর্মসংস্থান, আর্থিক প্রবাহ ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। তবে এসব জেলায় স্থানীয় সম্প্রদায়- যেসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে, তাদের দূরে রেখে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখানে প্রতিটি জাতিসত্তারই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণ রয়েছে। এখানে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করতে হলে স্থানীয় যে কয়টি জাতিসত্তা রয়েছে, তাদেরই পর্যটন সম্পদের মালিকানা প্রদান ও মালিকানা বোধ (Sense of Ownership) জাগ্রত করতে হবে। মূলত তারাই আর্থিক আয় ও নতুন নতুন কর্মসংস্থানের তাগিদে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন পণ্যকে রক্ষা করবে।

বাংলাদেশে গ্রামীণ পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ পরিকল্পনা অবশ্যই থাকতে হবে। পরিবেশের ক্ষতি করে যেমন গ্রামীণ পর্যটন শিল্প হবে না; আবার শুধু পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিলেও পর্যটনের উন্নয়ন হবে না। বিষয়টি পরিপূরক। গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করতে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকারের বিনা সুদে ঋণ কিংবা সহজ শর্তে ঋণ প্রদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন- গ্রামে যারা পিঠা বা পায়েস, দই ইত্যাদি তৈরি করে বাজারে কিংবা পর্যটকদের কাছে বিক্রি করবে, তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যগুলো স্বাস্থ্যসম্মত ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য অর্থের প্রয়োজন। সহজ শর্তে বা বিনা সুদে ঋণ তাদের নিশ্চয়ই আরও কর্মতৎপর ও সত্যিকারের টেকসই উন্নয়নের দিকে পরিচালিত। গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন হলে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ও অনেক ধরনের ছোট এবং মাঝারি উদ্যোক্তা যেমন- চিড়া-মুড়ি-খই-দই প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা, পিঠা-পায়েস-মোয়া প্রস্তুতকারক, হস্তশিল্প (বাঁশ, বেত, হোগলা) প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী ইত্যাদি অনেক উদ্যোক্তার সৃষ্টি হবে। তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য সহজ শর্তে সরকারি ঋণ প্রয়োজন।

এখানে এরকম ধারণা আছে- পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ঘটলে গ্রামীণ পরিবেশ ও সংস্কৃতি বিনষ্ট হবে। আসলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য পরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটক সবার দায়িত্ব পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যটন পণ্য বাঁচিয়ে রাখা। একে অবশ্য Responsible Tourism বলা হয়। ইকো-ট্যুরিজম, গ্রিন ট্যুরিজম, নেচার ট্যুরিজম এসবই Responsible Tourism-এর অংশ।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যদূরীকরণ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। গ্রামীণ পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যদূরীকরণের দিকে আমরা যথাযথ নজর দিলে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন ত্বরান্বিত হবে।

জিয়াউল হক হাওলাদার : ভ্রমণ লেখক ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ