সত্য হলেও বিশ্বাস করানো কঠিন হবে
jugantor
সত্য হলেও বিশ্বাস করানো কঠিন হবে

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সরকারের প্রতি আমাদের বিশেষ কৃতজ্ঞতা এজন্য যে, এ সরকার গণমাধ্যমবান্ধব। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সবচেয়ে বেশি পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল সম্প্রচারে এসেছে। গণমাধ্যম নিয়ে যে বিতর্ক নেই তেমন নয়। অনেক পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের পরিচালকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী হন। সেভাবে তাদের সম্পাদকীয় নীতিমালা তৈরি হয়।

তেমন হলে সত্য অনেক সময় প্রচ্ছন্ন থাকে। দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে মনোযোগ থাকে বেশি। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, গণমাধ্যম মতপ্রকাশের মুক্ত অঙ্গন বলে সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন থাকাটা নিন্দনীয় নয়। যুগ যুগ ধরে তেমনটিই ছিল। সমস্যা হয় তখনই, যখন দেশের প্রতি ভালোবাসা না থেকে শুধু অন্ধ দলপ্রেম থাকে। তবে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল রাজনীতি নানা গণমাধ্যমে বিভিন্ন মতের প্রতিফলনকে স্বাগতই জানাই। গণতান্ত্রিক সরকার তো এ মত-দ্বিমতকে স্বাগতই জানাবে।

কারণ এসব সূত্র থেকেই সরকার স্বচ্ছ আয়নার মতো দেশের সংকট-সম্ভাবনাকে দেখতে পায়। এতে সরকারের নীতিনির্ধারণ সহজ হয়ে যায়। এই যে আওয়ামী লীগ সরকার এত পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দিল তার মানে এই নয় যে, সরকারযন্ত্র আশা করবে এসব গণমাধ্যম শুধু সরকারের গুণগান করতে থাকবে। তেমনটি করলে সরকারের তো কোনো লাভ হল না।

সরকার তার নিজস্ব গোপন সংস্থা থেকে খবর সংগ্রহ করে ঠিকই; কিন্তু তা কি যথেষ্ট? না হলে দীর্ঘদিন থেকে কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপের অত্যাচারে অতিষ্ঠ থাকতে হতো না মানুষকে। অথবা বিশ হাজার টাকা বেতনের সরকারি কর্মচারী প্রকাশ্যে বছরের পর বছর দুর্নীতি করতে পারত না। সবার সামনে মূর্তিমান ত্রাস হয়ে শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যেতে পারত না। পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের রিপোর্টে তোলপাড় হওয়ার আগেই সরকারযন্ত্র এসব প্রতিবিধানের ব্যবস্থা নিতে পারত।

ঘুষ, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে সময়ের বাস্তবতায় মনে হয়- প্রচারমাধ্যম যদি তাদের রিপোর্ট আর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তুলে না ধরত তাহলে অন্য কোনো সরকারি সংগঠনের দৃষ্টি পড়ত না এসব অন্যায়ের দিকে। তাহলে আমরা দিনে দিনে গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যেতাম। আর সরকারেরও ক্ষতি হতো। এ নিপীড়িত মানুষের সামনে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমে যেত।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জিডিপি বৃদ্ধির কারণে মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য আসত ঠিকই; কিন্তু আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কারণে বিপন্ন মানুষের সামনে তাৎক্ষণিক কষ্টটাই বড় হয়ে যেত। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গি দমনের মতো কয়েকটি ভিন্ন ধারার ভয়ংকর সংকট থেকে আমাদের অনেকটা মুক্ত করার কৃতিত্ব দেখাতে পারলেও প্রতিদিনের যাপিত জীবনের সংকট- যেমন অঞ্চলভিত্তিক নানা নামের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণ, নিয়ন্ত্রণহীন সড়ক দুর্ঘটনার মতো সংকট থেকে মানুষকে কতটা মুক্তি দিতে পেরেছে?

সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট চৌকস। তারা মুক্ত ক্ষমতা পেলে অনেক সংকটেরই সফল মোকাবেলা করতে পারত। কিন্তু রাজনীতিকরা যাই বলুন না কেন, সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময়ই তাদের হাত-পা বাঁধা।

তাছাড়া অন্যায়-দুর্নীতি এসব বাহিনীর অনেকের মধ্যে যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনস্তাত্ত্বিক শক্তিও কমে যায়। পত্রিকার এক রিপোর্টে দেখলাম, মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে ইউএনও, এসি-ল্যান্ডরা সবসময় হুমকির মুখে থাকছেন। দখলবাজ রাজনৈতিক নেতা আর স্থানীয় ক্ষমতাশালীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই তোপের মুখে পড়তে হয় তাদের।

সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে একসময় যখন বাস্তবতার মিল পাওয়া যায় না, তখন মানুষের মধ্যে ধোঁয়াশা আরও বেড়ে যায়। তখন সরকারি বক্তব্য সঠিক হলেও তা মানুষকে বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অস্বাস্থ্যকর হয়ে আছে অনেক কাল থেকেই। কেনাকাটায় ভয়ানক দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে মাঝেমাঝেই রিপোর্ট প্রকাশিত হতো কাগজে।

দু’দিন আগে গণমাধ্যমের রিপোর্টে দেখা গেল কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৯ কোটি টাকার কেনাকাটায় ৫ কোটি টাকাই হাওয়া। আবার নিয়ম থাকলেও স্টোরে এন্ট্রি করে না রাখায় সন্দেহ পোষণ করা হচ্ছে সব যন্ত্রপাতি আদৌ বাস্তবে আছে কিনা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কেনাকাটার দুর্নীতি নিয়ে অতীতেও অনেক রিপোর্ট বেরিয়েছে। কিন্তু কতটা এর প্রতিবিধানে সরকার ভূমিকা রেখেছে তা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়নি। মানুষ বিশ্বাস করে এত বিশাল চুরি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়করা একাই করেন না, হয়তো এদের মাথার ওপর শক্তিশালী ছাতা রয়েছে।

মানুষ জেনেছে, বিএনপি-আওয়ামী লীগ সব পর্বেই যার যার দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের নেতাকর্মীরাই দাপটের ছড়ি ঘোরাতেন। তাই কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি মুক্তির চেষ্টার কোনো অবকাশ ছিল বলে মনে হয়নি। দিনে দিনে এ দুর্নীতির আখড়া মহিরুহে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবেলায় সাফল্যের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ ধন্যবাদ জানানোর যথার্থতা রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আমাদের দেশে করোনা মোকাবেলার সাফল্য বেশি। এখন এ সত্যটিও কিন্তু সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। কারণ ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতির ‘মহাভারত’ যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

নিবন্ধন বাতিল হওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে মন্ত্রীর উপস্থিতিতে করোনা চিকিৎসার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করার ঘটনা তো এখন পুরনো হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের পিওন আবজালের শতকোটি টাকার সম্পদ সংগ্রহের কথা উন্মোচন করেছে সংবাদমাধ্যম। এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে সঙ্গত প্রশ্নটি দাঁড়াতেই পারে- এ পিওন একদিনে তো এ সম্পদ সংগ্রহ করেনি।

একজন পিওন যদি উপর থেকে উৎসাহ না পায়, তাহলে এমন আজদাহা হয়ে উঠে কী করে? সংবাদপত্র হইচই বাধানোর আগে কেন অধিদফতরের কর্তাদের এসব অন্যায় নজরে এলো না? কেন গোয়েন্দা বা দুদক নড়েচড়ে উঠল না, এ প্রশ্ন থেকেই যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং বর্তমান স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক সম্প্রতি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এক জাতীয় দৈনিকে। এর আগে মালেক তার দীর্ঘদিনের ড্রাইভার ছিলেন। তিনি জানালেন, মালেকের অপকীর্তি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।

তিনি নিজেকে ক্লিন ইমেজের মানুষ বলে দাবি করলেন। হয়তো তার কথাই ঠিক। কিন্তু মানুষের মনে কতগুলো প্রশ্ন থেকেই যাবে। এই যে দীর্ঘদিন ধরে মালেক স্বাস্থ্য অধিদফতরে দাপটের রাজত্ব করেছে, এত আত্মীয়স্বজনের নিয়োগ দিয়েছে- অথচ তাদের নিয়োগকর্তা তো মালেক হতে পারে না। ধরে নিই এসব নিয়োগ অতিরিক্ত মহাপরিচালক মহোদয়ের দায়িত্বে আসার আগেই হয়েছিল।

তাই বলে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কিছু জানবেন না? এত অর্থসম্পদের মালিক হল মালেক, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে থাকল পরিবার-পরিজনসহ অথচ নীরব দর্শক হয়ে রইলেন তিনি বা তারা। আমাদের মনে হয় দেশের প্রশাসন এখন এক নাজুক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাই কারও ওপরই নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্যায়-দুর্নীতিতে মূল চেইনটিই বোধহয় দুর্বল হয়ে গেছে; তাই চেইন অব কমান্ডের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে।

এরপর সংবাদমাধ্যম উন্মোচন করল ড্রাইভার মালেকের রূপকথা। তার দাপটে পরিবারের একগুচ্ছ সদস্য চাকরি পেয়ে গেল স্বাস্থ্য বিভাগে। বিপুল অর্থবিত্ত আর সম্পত্তি যেমন কালো পথে অর্জন করলেন, তেমনি একাধিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে থাকলেন। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্তারা কোনো খবরও রাখলেন না! এসব কথা মানুষ কেমন করে বিশ্বাস করবে?

আর কেনই বা প্রশ্ন রাখবে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা আর দুদক গণমাধ্যম হইচই করার আগে তৎপর কেন হল না? সাভারে সরকারি দলের নেতার পুত্র মিজানুর খুন করে ফেলল কিশোরী নীলা রায়কে। পত্রিকার রিপোর্টে জানলাম তার গ্যাং সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে অনেকদিন থেকে। কেউ কেউ অত্যাচারিত হয়ে বাড়ি বিক্রি করে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। মিজানুরের সন্ত্রাসের খবর মেয়র ও পুলিশের জানা।

এখন তো প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে সন্ত্রাসী দল এত প্রবল হয়ে পড়ল কেমন করে? পুলিশ শুরুতেই এদের টুঁটি ধরত পারলে কিশোরী নীলা রায়কে জীবন দিতে হতো না। তাহলে এ খুনের দায় কাদের দেয়া হবে? শুধু কি মিজানুরকে? আমি আরেক লেখায় বলেছিলাম, এত যে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতের কথা শুনি, খুনোখুনির কথা প্রকাশ্যে আসে, পকেটে অস্ত্র নিয়ে মোটরসাইকেলে মহড়া দেয় কিশোর ছেলেরা; অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের উচ্ছেদ করতে পারছে না।

কারণ এসব গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা। এরপর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যখন বলা হয়- সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স রয়েছে, তখন সাধারণ মানুষ এসব কথার ওপর বিশ্বাস রাখে কেমন করে!

বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো দুর্বলতা সরকার কেন দেখাতে পারছে, তা এক বিস্ময়। পেঁয়াজ নিয়ে এ সংকট তো এখন যেন ফি বছরের কেচ্ছা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সামাল দেয়ার জন্য যথেষ্ট সচেষ্ট বলছে।

কথা হয়তো সত্য; কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করে কেমন করে! চালে পরিপূর্ণ আড়ত আর দোকান। কোথাও ঘাটতি নেই। তারপরও হঠাৎ করে মিলাররা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারে কেজিতে চার-পাঁচ টাকা বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় জিম্মি সাধারণ মানুষ কি সরকারের আস্থায় বিশ্বাস রাখতে পারে?

আমাদের বর্তমান সরকারকে অথর্ব সরকার বলা যাবে না। বরং একটি সচল সরকার। দেশকে আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের সচল সড়কে এনে দাঁড় করিয়েছে। চারদিকের পরিবেশ যদি নির্ঝঞ্ঝাট থাকে, তাহলে ক্রমে আলোর দিকে এগিয়ে চলা সম্ভব।

তবে সন্ত্রাস আর দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ না করে কুসুমাস্তীর্ণ সড়ক প্রত্যাশা করা যায় না। এখন ওপেন সিক্রেট যে, সব অন্যায়ের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সক্রিয় শক্তি হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবের শক্তি; যা শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। এসবের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকারের অর্জনের সাফল্য সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

সত্য হলেও বিশ্বাস করানো কঠিন হবে

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সরকারের প্রতি আমাদের বিশেষ কৃতজ্ঞতা এজন্য যে, এ সরকার গণমাধ্যমবান্ধব। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সবচেয়ে বেশি পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল সম্প্রচারে এসেছে। গণমাধ্যম নিয়ে যে বিতর্ক নেই তেমন নয়। অনেক পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের পরিচালকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী হন। সেভাবে তাদের সম্পাদকীয় নীতিমালা তৈরি হয়।

তেমন হলে সত্য অনেক সময় প্রচ্ছন্ন থাকে। দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে মনোযোগ থাকে বেশি। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, গণমাধ্যম মতপ্রকাশের মুক্ত অঙ্গন বলে সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন থাকাটা নিন্দনীয় নয়। যুগ যুগ ধরে তেমনটিই ছিল। সমস্যা হয় তখনই, যখন দেশের প্রতি ভালোবাসা না থেকে শুধু অন্ধ দলপ্রেম থাকে। তবে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল রাজনীতি নানা গণমাধ্যমে বিভিন্ন মতের প্রতিফলনকে স্বাগতই জানাই। গণতান্ত্রিক সরকার তো এ মত-দ্বিমতকে স্বাগতই জানাবে।

কারণ এসব সূত্র থেকেই সরকার স্বচ্ছ আয়নার মতো দেশের সংকট-সম্ভাবনাকে দেখতে পায়। এতে সরকারের নীতিনির্ধারণ সহজ হয়ে যায়। এই যে আওয়ামী লীগ সরকার এত পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দিল তার মানে এই নয় যে, সরকারযন্ত্র আশা করবে এসব গণমাধ্যম শুধু সরকারের গুণগান করতে থাকবে। তেমনটি করলে সরকারের তো কোনো লাভ হল না।

সরকার তার নিজস্ব গোপন সংস্থা থেকে খবর সংগ্রহ করে ঠিকই; কিন্তু তা কি যথেষ্ট? না হলে দীর্ঘদিন থেকে কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপের অত্যাচারে অতিষ্ঠ থাকতে হতো না মানুষকে। অথবা বিশ হাজার টাকা বেতনের সরকারি কর্মচারী প্রকাশ্যে বছরের পর বছর দুর্নীতি করতে পারত না। সবার সামনে মূর্তিমান ত্রাস হয়ে শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যেতে পারত না। পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের রিপোর্টে তোলপাড় হওয়ার আগেই সরকারযন্ত্র এসব প্রতিবিধানের ব্যবস্থা নিতে পারত।

ঘুষ, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে সময়ের বাস্তবতায় মনে হয়- প্রচারমাধ্যম যদি তাদের রিপোর্ট আর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তুলে না ধরত তাহলে অন্য কোনো সরকারি সংগঠনের দৃষ্টি পড়ত না এসব অন্যায়ের দিকে। তাহলে আমরা দিনে দিনে গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যেতাম। আর সরকারেরও ক্ষতি হতো। এ নিপীড়িত মানুষের সামনে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমে যেত।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জিডিপি বৃদ্ধির কারণে মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য আসত ঠিকই; কিন্তু আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কারণে বিপন্ন মানুষের সামনে তাৎক্ষণিক কষ্টটাই বড় হয়ে যেত। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গি দমনের মতো কয়েকটি ভিন্ন ধারার ভয়ংকর সংকট থেকে আমাদের অনেকটা মুক্ত করার কৃতিত্ব দেখাতে পারলেও প্রতিদিনের যাপিত জীবনের সংকট- যেমন অঞ্চলভিত্তিক নানা নামের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণ, নিয়ন্ত্রণহীন সড়ক দুর্ঘটনার মতো সংকট থেকে মানুষকে কতটা মুক্তি দিতে পেরেছে?

সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট চৌকস। তারা মুক্ত ক্ষমতা পেলে অনেক সংকটেরই সফল মোকাবেলা করতে পারত। কিন্তু রাজনীতিকরা যাই বলুন না কেন, সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময়ই তাদের হাত-পা বাঁধা।

তাছাড়া অন্যায়-দুর্নীতি এসব বাহিনীর অনেকের মধ্যে যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনস্তাত্ত্বিক শক্তিও কমে যায়। পত্রিকার এক রিপোর্টে দেখলাম, মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে ইউএনও, এসি-ল্যান্ডরা সবসময় হুমকির মুখে থাকছেন। দখলবাজ রাজনৈতিক নেতা আর স্থানীয় ক্ষমতাশালীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই তোপের মুখে পড়তে হয় তাদের।

সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে একসময় যখন বাস্তবতার মিল পাওয়া যায় না, তখন মানুষের মধ্যে ধোঁয়াশা আরও বেড়ে যায়। তখন সরকারি বক্তব্য সঠিক হলেও তা মানুষকে বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অস্বাস্থ্যকর হয়ে আছে অনেক কাল থেকেই। কেনাকাটায় ভয়ানক দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে মাঝেমাঝেই রিপোর্ট প্রকাশিত হতো কাগজে।

দু’দিন আগে গণমাধ্যমের রিপোর্টে দেখা গেল কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৯ কোটি টাকার কেনাকাটায় ৫ কোটি টাকাই হাওয়া। আবার নিয়ম থাকলেও স্টোরে এন্ট্রি করে না রাখায় সন্দেহ পোষণ করা হচ্ছে সব যন্ত্রপাতি আদৌ বাস্তবে আছে কিনা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কেনাকাটার দুর্নীতি নিয়ে অতীতেও অনেক রিপোর্ট বেরিয়েছে। কিন্তু কতটা এর প্রতিবিধানে সরকার ভূমিকা রেখেছে তা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়নি। মানুষ বিশ্বাস করে এত বিশাল চুরি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়করা একাই করেন না, হয়তো এদের মাথার ওপর শক্তিশালী ছাতা রয়েছে।

মানুষ জেনেছে, বিএনপি-আওয়ামী লীগ সব পর্বেই যার যার দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের নেতাকর্মীরাই দাপটের ছড়ি ঘোরাতেন। তাই কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি মুক্তির চেষ্টার কোনো অবকাশ ছিল বলে মনে হয়নি। দিনে দিনে এ দুর্নীতির আখড়া মহিরুহে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবেলায় সাফল্যের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ ধন্যবাদ জানানোর যথার্থতা রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আমাদের দেশে করোনা মোকাবেলার সাফল্য বেশি। এখন এ সত্যটিও কিন্তু সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। কারণ ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতির ‘মহাভারত’ যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

নিবন্ধন বাতিল হওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে মন্ত্রীর উপস্থিতিতে করোনা চিকিৎসার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করার ঘটনা তো এখন পুরনো হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের পিওন আবজালের শতকোটি টাকার সম্পদ সংগ্রহের কথা উন্মোচন করেছে সংবাদমাধ্যম। এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে সঙ্গত প্রশ্নটি দাঁড়াতেই পারে- এ পিওন একদিনে তো এ সম্পদ সংগ্রহ করেনি।

একজন পিওন যদি উপর থেকে উৎসাহ না পায়, তাহলে এমন আজদাহা হয়ে উঠে কী করে? সংবাদপত্র হইচই বাধানোর আগে কেন অধিদফতরের কর্তাদের এসব অন্যায় নজরে এলো না? কেন গোয়েন্দা বা দুদক নড়েচড়ে উঠল না, এ প্রশ্ন থেকেই যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং বর্তমান স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক সম্প্রতি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এক জাতীয় দৈনিকে। এর আগে মালেক তার দীর্ঘদিনের ড্রাইভার ছিলেন। তিনি জানালেন, মালেকের অপকীর্তি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।

তিনি নিজেকে ক্লিন ইমেজের মানুষ বলে দাবি করলেন। হয়তো তার কথাই ঠিক। কিন্তু মানুষের মনে কতগুলো প্রশ্ন থেকেই যাবে। এই যে দীর্ঘদিন ধরে মালেক স্বাস্থ্য অধিদফতরে দাপটের রাজত্ব করেছে, এত আত্মীয়স্বজনের নিয়োগ দিয়েছে- অথচ তাদের নিয়োগকর্তা তো মালেক হতে পারে না। ধরে নিই এসব নিয়োগ অতিরিক্ত মহাপরিচালক মহোদয়ের দায়িত্বে আসার আগেই হয়েছিল।

তাই বলে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কিছু জানবেন না? এত অর্থসম্পদের মালিক হল মালেক, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে থাকল পরিবার-পরিজনসহ অথচ নীরব দর্শক হয়ে রইলেন তিনি বা তারা। আমাদের মনে হয় দেশের প্রশাসন এখন এক নাজুক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাই কারও ওপরই নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্যায়-দুর্নীতিতে মূল চেইনটিই বোধহয় দুর্বল হয়ে গেছে; তাই চেইন অব কমান্ডের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে।

এরপর সংবাদমাধ্যম উন্মোচন করল ড্রাইভার মালেকের রূপকথা। তার দাপটে পরিবারের একগুচ্ছ সদস্য চাকরি পেয়ে গেল স্বাস্থ্য বিভাগে। বিপুল অর্থবিত্ত আর সম্পত্তি যেমন কালো পথে অর্জন করলেন, তেমনি একাধিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে থাকলেন। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্তারা কোনো খবরও রাখলেন না! এসব কথা মানুষ কেমন করে বিশ্বাস করবে?

আর কেনই বা প্রশ্ন রাখবে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা আর দুদক গণমাধ্যম হইচই করার আগে তৎপর কেন হল না? সাভারে সরকারি দলের নেতার পুত্র মিজানুর খুন করে ফেলল কিশোরী নীলা রায়কে। পত্রিকার রিপোর্টে জানলাম তার গ্যাং সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে অনেকদিন থেকে। কেউ কেউ অত্যাচারিত হয়ে বাড়ি বিক্রি করে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। মিজানুরের সন্ত্রাসের খবর মেয়র ও পুলিশের জানা।

এখন তো প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে সন্ত্রাসী দল এত প্রবল হয়ে পড়ল কেমন করে? পুলিশ শুরুতেই এদের টুঁটি ধরত পারলে কিশোরী নীলা রায়কে জীবন দিতে হতো না। তাহলে এ খুনের দায় কাদের দেয়া হবে? শুধু কি মিজানুরকে? আমি আরেক লেখায় বলেছিলাম, এত যে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতের কথা শুনি, খুনোখুনির কথা প্রকাশ্যে আসে, পকেটে অস্ত্র নিয়ে মোটরসাইকেলে মহড়া দেয় কিশোর ছেলেরা; অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের উচ্ছেদ করতে পারছে না।

কারণ এসব গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা। এরপর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যখন বলা হয়- সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স রয়েছে, তখন সাধারণ মানুষ এসব কথার ওপর বিশ্বাস রাখে কেমন করে!

বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো দুর্বলতা সরকার কেন দেখাতে পারছে, তা এক বিস্ময়। পেঁয়াজ নিয়ে এ সংকট তো এখন যেন ফি বছরের কেচ্ছা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সামাল দেয়ার জন্য যথেষ্ট সচেষ্ট বলছে।

কথা হয়তো সত্য; কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করে কেমন করে! চালে পরিপূর্ণ আড়ত আর দোকান। কোথাও ঘাটতি নেই। তারপরও হঠাৎ করে মিলাররা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারে কেজিতে চার-পাঁচ টাকা বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় জিম্মি সাধারণ মানুষ কি সরকারের আস্থায় বিশ্বাস রাখতে পারে?

আমাদের বর্তমান সরকারকে অথর্ব সরকার বলা যাবে না। বরং একটি সচল সরকার। দেশকে আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের সচল সড়কে এনে দাঁড় করিয়েছে। চারদিকের পরিবেশ যদি নির্ঝঞ্ঝাট থাকে, তাহলে ক্রমে আলোর দিকে এগিয়ে চলা সম্ভব।

তবে সন্ত্রাস আর দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ না করে কুসুমাস্তীর্ণ সড়ক প্রত্যাশা করা যায় না। এখন ওপেন সিক্রেট যে, সব অন্যায়ের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সক্রিয় শক্তি হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবের শক্তি; যা শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। এসবের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকারের অর্জনের সাফল্য সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]