উন্নয়নের রূপকার
jugantor
উন্নয়নের রূপকার

  মো. জাহাঙ্গীর আলম  

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তিনি একজন মমতাময়ী মা। মায়ের পরম আদর ও ভালোবাসা দিয়ে তিনি তিলে তিলে আমাদের গড়ে তুলেছেন। মায়ের কাছে একজন সন্তান তার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, বিশ্বাস ও সম্ভাবনার কথা খুব সহজে বলতে পারে। আমি যখন এ মমতাময়ী মায়ের কাছে গিয়েছি, তখন আমার মন আবেগাপ্লুত হয়েছে।

তার কাছ থেকে আমি শিখেছি দেশকে কীভাবে গড়ে তুলতে হয়, মানুষকে পরম আদরে কীভাবে কাছে টেনে নিতে হয়। যতবার তার স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কাছাকাছি গিয়েছি, ততবার জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি মানুষের ভেতরে প্রবেশ করে মানুষকে বুঝতে পারেন।

কেউ যদি তার কাছে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে যায়, তা তিনি জীবনের গভীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন। একইভাবে কেউ যদি নিজের স্বার্থের উদ্দেশ্যে তার কাছে যায়, সেটিও তিনি বুঝতে পারেন। এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি তার ভেতর-বাইরে বিরাজমান। এ থেকে আমি শিখেছি কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে ভালো-মন্দকে কীভাবে যাচাই করে দেশকে এগিয়ে নিতে হয়।

খুব সাদাসিধে জীবন তার। সেখানে নিজের কোনো স্বার্থ নেই। কেবল আছে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ত্যাগ আর ত্যাগ। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মা, বাবা, ভাইসহ তিনি হারিয়েছেন পরিবারের সব সদস্যকে। ভাগ্যক্রমে তিনি ও তার বোন শেখ রেহানা বেঁচে যান। দুঃসহ সেই দিনগুলোর কথা আজও তার মনকে বেদনায় ভারাক্রান্ত করে তোলে।

ঘাতকের নির্মম বুলেটের প্রতিটি আঘাত তার জীবনকে থমকে দেয়। কিন্তু তারপরও তো পিতার সোনার বাংলা তাকে গড়তে হবে। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে সুদীর্ঘ ৬ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। বাধা এসেছে অনেক; কিন্তু মানুষের ভালোবাসার শক্তিতে সে বাধা কখনও প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দেশে ফিরে একের পর এক অপশক্তির বিরুদ্ধে তিনি লড়ে গেছেন; কিন্তু সোনার বাংলা গড়ার বিশ্বাস কখনও হারাননি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনে দিনে রাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন। জনমানুষের নেতা হতে হলে যে রাজপথের কর্মী হতে হয়, তা তিনি আমাদের শিখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করেছেন। এভাবে ক্রমাগত সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার আত্মবিশ্বাস আমাদের মধ্যে গড়ে তুলেছেন।

সততার শক্তিতে আমাদের উজ্জীবিত হতে অনুপ্রাণিত করেছেন। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে লড়ার কর্মকৌশল তিনি গ্রহণ করেছেন। অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বারবার তার জীবন বিপন্ন হয়েছে।

কিন্তু তিনি মৃত্যুকে কখনও ভয় করেননি; বরং জনগণের কল্যাণে তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, দেশের হাল ধরেছেন। উন্নয়নের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে তার চিন্তাশীলতার প্রয়োগ ঘটেনি। এ চিন্তাশীলতা তিনি নিজের মধ্যে না রেখে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি নতুন নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে চলেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হল ভিন্ন ভিন্ন ধারার নেতৃত্বের মাধ্যমে উন্নয়নের বিবিধ ধারাকে একত্রিত করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। করোনার মতো মহামারী নিয়ে সারা বিশ্ব যেখানে কর্মকৌশল গ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বের গুণাবলিতে সফল হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিন করোনা মোকাবেলায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেননি তিনি। তার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশলকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

একজন সাধারণ ভিক্ষুক থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। দুর্নীতিবাজ যতই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হোক না কেন, দুর্নীতিকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। ‘গ্রাম হোক শহর’- এ নতুন ধারণা তিনিই আমাদের দিয়েছেন। তিনি আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন। এর ফলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে ৮ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হয়েছে। অফিস-আদালতে ই-নথি কার্যক্রম সফলভাবে চালু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নিরলসভাবে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাজ করে চলেছেন। দিনরাতের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা তিনি দেশকে নিয়ে ভাবেন। দেশের মানুষকে নিয়ে ভাবেন। নতুন নতুন ভাবনা সৃষ্টি করে কীভাবে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা যায়, তা কেবল তার মতো একজন মহান নেতাই ভাবতে পারেন। এর আগে যা কেউ কখনও ভাবেনি তা তিনি ভেবেছেন।

ভিশন ২০২১ ও ভিশন ২০৪১-এর মতো দূরদর্শী ভাবনা তার চিন্তাধারা থেকেই উৎসারিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদরের কন্যা ধীরে ধীরে কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে দেশরত্ন, দেশরত্ন থেকে বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ভোগের রাজনীতি ত্যাগ করে ত্যাগের রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করে যেতে হয়।

তিনি বিশ্ব পরিমণ্ডলে মেধা, সাহসিকতা, মানবিকতার মূল শক্তি হয়ে উঠেছেন। দক্ষ কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে কীভাবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থরক্ষা করা যায়, সেটি আমরা তার কাছ থেকে শিখেছি।

তিনি মানবতার নেত্রী। মানুষের দুঃখ-কষ্টে তিনি কাঁদেন। আবেগে আপ্লুত হন। আপন করার এক মহতী শক্তি তার মধ্যে বিরাজমান। তিনি তার বিশাল ভালোবাসা ও উদারতার ছায়ায় মানুষকে বিপদে-আপদে রক্ষা করে চলেছেন। ব্রিটিশ পত্রিকার ভাষ্যমতে তিনি ‘মাদার অব হিউমিনিটি’। রোহিঙ্গা ইস্যুতে গার্ডিয়ান পত্রিকায় বলা হয়েছে- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে বিশাল মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন তা বিরল।

২০১৩ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হোসে ম্যানুয়েল সান্তোষ শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বমানবতার বিবেক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী কৈলাস সত্যার্থী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বমানবতার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় তার সুদূরপ্রসারী কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়ন্স আ দি আর্থ’ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। ২০১৭ সালে সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা সংস্থা দ্য স্টাটিস্টিকস ইন্টারন্যাশনাল নিজেদের করা জরিপের ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

দেশি-বিদেশি অপশক্তির প্ররোচনায় দাতা সংস্থা যখন পদ্মা সেতু তৈরি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তখনও আমাদের সাহসী প্রধানমন্ত্রী পথ হারাননি। তিনি নিজেদের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু গড়ার সংকল্প গ্রহণ করেন। যেটি একদিন অনেকেই অসম্ভব স্বপ্ন বলেই মনে করত, তা আজ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাস্তবায়ন এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন প্রাণপ্রিয় নেত্রীর সফল নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন বেড়ে প্রায় ২১ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪৭ থেকে বেড়ে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। আশা করা যাচ্ছে, মুজিববর্ষের এ মাহেন্দ্রক্ষণে এটি শতভাগে পরিণত হবে।

জননিরাপত্তা বেষ্টনীর ধারণা তিনিই আমাদের দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তৃণমূল মানুষের কাছে উন্নয়নের বিভিন্ন উপাদানকে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। রাজধানী এবং রাজধানীর বাইরে, বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে বিবেচনায় এনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, আইটি পার্কসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে নেত্রীর দক্ষ নেতৃত্বে।

মেগা প্রকল্পে নতুন নতুন ধারণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তাশীলতা থেকে উৎসারিত হয়ে আজ সফল হতে চলেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, অসংখ্য ফ্লাইওভার, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটসহ নানামুখী উদ্যোগ।

চিকিৎসাসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার ধারণা নেত্রীর উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি থেকে এসেছে। এর ফলে শতভাগ শিশুকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় এনে শিশু মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হয়েছে।

এর সঙ্গে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩ বছরে। শিশুদের শিক্ষাকে আনন্দের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার ধারণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দিয়েছেন। বছরে প্রথম দিনে এখন বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় বই উৎসব। শিক্ষানীতিতেও যুক্ত হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের নতুন নতুন বিজ্ঞানভিত্তিক উপাদান। সমুদ্রের জলসীমা জয় করা সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে।

এ জলসীমা ব্যবহার করে ব্লু-ইকোনমি নীতিমালার ভিত্তিতে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার বিশ্বাস তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সাফল্যের সঙ্গে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের এগিয়ে নিয়েছেন। এ শত বছরব্যাপী পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা, নদীভাঙন, নদীশাসন, নদী-ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামের পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে; যা তার দূরদর্শী ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন।

বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বাংলাদেশকে তারই কন্যা আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করে দিয়েছেন। বাঙালি জাতির কাণ্ডারি শেখ হাসিনার দ্বারাই কেবল সম্ভব এতগুলো কাজ একসঙ্গে করা। ৭৪ বছরে এসেও তিনি রাত-দিন কাজ করছেন দেশ ও দেশের মানুষের জন্য।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায়ের পর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয় তার দিনের কর্মসূচি। আমাদের প্রয়োজনে, এ জাতির প্রয়োজনে তাকে ভালো থাকতেই হবে। তিনি ভালো থাকলে পথ হারাবে না বাংলাদেশ।

অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম : মেয়র, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন

উন্নয়নের রূপকার

 মো. জাহাঙ্গীর আলম 
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তিনি একজন মমতাময়ী মা। মায়ের পরম আদর ও ভালোবাসা দিয়ে তিনি তিলে তিলে আমাদের গড়ে তুলেছেন। মায়ের কাছে একজন সন্তান তার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, বিশ্বাস ও সম্ভাবনার কথা খুব সহজে বলতে পারে। আমি যখন এ মমতাময়ী মায়ের কাছে গিয়েছি, তখন আমার মন আবেগাপ্লুত হয়েছে।

তার কাছ থেকে আমি শিখেছি দেশকে কীভাবে গড়ে তুলতে হয়, মানুষকে পরম আদরে কীভাবে কাছে টেনে নিতে হয়। যতবার তার স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কাছাকাছি গিয়েছি, ততবার জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি মানুষের ভেতরে প্রবেশ করে মানুষকে বুঝতে পারেন।

কেউ যদি তার কাছে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে যায়, তা তিনি জীবনের গভীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন। একইভাবে কেউ যদি নিজের স্বার্থের উদ্দেশ্যে তার কাছে যায়, সেটিও তিনি বুঝতে পারেন। এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি তার ভেতর-বাইরে বিরাজমান। এ থেকে আমি শিখেছি কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে ভালো-মন্দকে কীভাবে যাচাই করে দেশকে এগিয়ে নিতে হয়।

খুব সাদাসিধে জীবন তার। সেখানে নিজের কোনো স্বার্থ নেই। কেবল আছে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ত্যাগ আর ত্যাগ। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মা, বাবা, ভাইসহ তিনি হারিয়েছেন পরিবারের সব সদস্যকে। ভাগ্যক্রমে তিনি ও তার বোন শেখ রেহানা বেঁচে যান। দুঃসহ সেই দিনগুলোর কথা আজও তার মনকে বেদনায় ভারাক্রান্ত করে তোলে।

ঘাতকের নির্মম বুলেটের প্রতিটি আঘাত তার জীবনকে থমকে দেয়। কিন্তু তারপরও তো পিতার সোনার বাংলা তাকে গড়তে হবে। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে সুদীর্ঘ ৬ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। বাধা এসেছে অনেক; কিন্তু মানুষের ভালোবাসার শক্তিতে সে বাধা কখনও প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দেশে ফিরে একের পর এক অপশক্তির বিরুদ্ধে তিনি লড়ে গেছেন; কিন্তু সোনার বাংলা গড়ার বিশ্বাস কখনও হারাননি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনে দিনে রাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন। জনমানুষের নেতা হতে হলে যে রাজপথের কর্মী হতে হয়, তা তিনি আমাদের শিখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করেছেন। এভাবে ক্রমাগত সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার আত্মবিশ্বাস আমাদের মধ্যে গড়ে তুলেছেন।

সততার শক্তিতে আমাদের উজ্জীবিত হতে অনুপ্রাণিত করেছেন। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে লড়ার কর্মকৌশল তিনি গ্রহণ করেছেন। অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বারবার তার জীবন বিপন্ন হয়েছে।

কিন্তু তিনি মৃত্যুকে কখনও ভয় করেননি; বরং জনগণের কল্যাণে তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, দেশের হাল ধরেছেন। উন্নয়নের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে তার চিন্তাশীলতার প্রয়োগ ঘটেনি। এ চিন্তাশীলতা তিনি নিজের মধ্যে না রেখে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি নতুন নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে চলেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হল ভিন্ন ভিন্ন ধারার নেতৃত্বের মাধ্যমে উন্নয়নের বিবিধ ধারাকে একত্রিত করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। করোনার মতো মহামারী নিয়ে সারা বিশ্ব যেখানে কর্মকৌশল গ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বের গুণাবলিতে সফল হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিন করোনা মোকাবেলায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেননি তিনি। তার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশলকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

একজন সাধারণ ভিক্ষুক থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। দুর্নীতিবাজ যতই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হোক না কেন, দুর্নীতিকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। ‘গ্রাম হোক শহর’- এ নতুন ধারণা তিনিই আমাদের দিয়েছেন। তিনি আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন। এর ফলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে ৮ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হয়েছে। অফিস-আদালতে ই-নথি কার্যক্রম সফলভাবে চালু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নিরলসভাবে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাজ করে চলেছেন। দিনরাতের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা তিনি দেশকে নিয়ে ভাবেন। দেশের মানুষকে নিয়ে ভাবেন। নতুন নতুন ভাবনা সৃষ্টি করে কীভাবে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা যায়, তা কেবল তার মতো একজন মহান নেতাই ভাবতে পারেন। এর আগে যা কেউ কখনও ভাবেনি তা তিনি ভেবেছেন।

ভিশন ২০২১ ও ভিশন ২০৪১-এর মতো দূরদর্শী ভাবনা তার চিন্তাধারা থেকেই উৎসারিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদরের কন্যা ধীরে ধীরে কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে দেশরত্ন, দেশরত্ন থেকে বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ভোগের রাজনীতি ত্যাগ করে ত্যাগের রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করে যেতে হয়।

তিনি বিশ্ব পরিমণ্ডলে মেধা, সাহসিকতা, মানবিকতার মূল শক্তি হয়ে উঠেছেন। দক্ষ কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে কীভাবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থরক্ষা করা যায়, সেটি আমরা তার কাছ থেকে শিখেছি।

তিনি মানবতার নেত্রী। মানুষের দুঃখ-কষ্টে তিনি কাঁদেন। আবেগে আপ্লুত হন। আপন করার এক মহতী শক্তি তার মধ্যে বিরাজমান। তিনি তার বিশাল ভালোবাসা ও উদারতার ছায়ায় মানুষকে বিপদে-আপদে রক্ষা করে চলেছেন। ব্রিটিশ পত্রিকার ভাষ্যমতে তিনি ‘মাদার অব হিউমিনিটি’। রোহিঙ্গা ইস্যুতে গার্ডিয়ান পত্রিকায় বলা হয়েছে- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে বিশাল মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন তা বিরল।

২০১৩ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হোসে ম্যানুয়েল সান্তোষ শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বমানবতার বিবেক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী কৈলাস সত্যার্থী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বমানবতার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় তার সুদূরপ্রসারী কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়ন্স আ দি আর্থ’ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। ২০১৭ সালে সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা সংস্থা দ্য স্টাটিস্টিকস ইন্টারন্যাশনাল নিজেদের করা জরিপের ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

দেশি-বিদেশি অপশক্তির প্ররোচনায় দাতা সংস্থা যখন পদ্মা সেতু তৈরি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তখনও আমাদের সাহসী প্রধানমন্ত্রী পথ হারাননি। তিনি নিজেদের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু গড়ার সংকল্প গ্রহণ করেন। যেটি একদিন অনেকেই অসম্ভব স্বপ্ন বলেই মনে করত, তা আজ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাস্তবায়ন এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন প্রাণপ্রিয় নেত্রীর সফল নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন বেড়ে প্রায় ২১ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪৭ থেকে বেড়ে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। আশা করা যাচ্ছে, মুজিববর্ষের এ মাহেন্দ্রক্ষণে এটি শতভাগে পরিণত হবে।

জননিরাপত্তা বেষ্টনীর ধারণা তিনিই আমাদের দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তৃণমূল মানুষের কাছে উন্নয়নের বিভিন্ন উপাদানকে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। রাজধানী এবং রাজধানীর বাইরে, বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে বিবেচনায় এনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, আইটি পার্কসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে নেত্রীর দক্ষ নেতৃত্বে।

মেগা প্রকল্পে নতুন নতুন ধারণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তাশীলতা থেকে উৎসারিত হয়ে আজ সফল হতে চলেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, অসংখ্য ফ্লাইওভার, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটসহ নানামুখী উদ্যোগ।

চিকিৎসাসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার ধারণা নেত্রীর উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি থেকে এসেছে। এর ফলে শতভাগ শিশুকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় এনে শিশু মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হয়েছে।

এর সঙ্গে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩ বছরে। শিশুদের শিক্ষাকে আনন্দের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার ধারণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দিয়েছেন। বছরে প্রথম দিনে এখন বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় বই উৎসব। শিক্ষানীতিতেও যুক্ত হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের নতুন নতুন বিজ্ঞানভিত্তিক উপাদান। সমুদ্রের জলসীমা জয় করা সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে।

এ জলসীমা ব্যবহার করে ব্লু-ইকোনমি নীতিমালার ভিত্তিতে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার বিশ্বাস তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সাফল্যের সঙ্গে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের এগিয়ে নিয়েছেন। এ শত বছরব্যাপী পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা, নদীভাঙন, নদীশাসন, নদী-ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামের পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে; যা তার দূরদর্শী ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন।

বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বাংলাদেশকে তারই কন্যা আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করে দিয়েছেন। বাঙালি জাতির কাণ্ডারি শেখ হাসিনার দ্বারাই কেবল সম্ভব এতগুলো কাজ একসঙ্গে করা। ৭৪ বছরে এসেও তিনি রাত-দিন কাজ করছেন দেশ ও দেশের মানুষের জন্য।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায়ের পর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয় তার দিনের কর্মসূচি। আমাদের প্রয়োজনে, এ জাতির প্রয়োজনে তাকে ভালো থাকতেই হবে। তিনি ভালো থাকলে পথ হারাবে না বাংলাদেশ।

অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম : মেয়র, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন