উপর্যুপরি বন্যা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কষ্ট বাড়িয়েছে
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
উপর্যুপরি বন্যা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কষ্ট বাড়িয়েছে

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে দারিদ্র্যের হারে প্রথম ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা উত্তরাঞ্চলের যথাক্রমে রংপুর বিভাগ ও রাজশাহী বিভাগে চতুর্থ দফায় আঘাত হেনেছে বন্যা।

জুন-আগস্ট সময়ে দেশের মধ্যাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দফায় দফায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চল নতুন করে বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবে এমনিতেই যখন উত্তরাঞ্চলের মানুষ কৃষি ছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে দুঃখ-কষ্টের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে, তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চতুর্থ দফায় বন্যা এ অঞ্চলের মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

২৭ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রংপুর অঞ্চলে কয়েক দফা বন্যায় কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগের কয়েক দফা বন্যায় রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় কৃষিতে ১৭২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান বন্যায় রংপুর জেলায় ৭০০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১ হাজার ১৬৫, কুড়িগ্রামে ৫ হাজার ১৩৪, লালমনিরহাটে ১ হাজার ৩৬ এবং নীলফামারীতে ২১০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। পত্রিকাটির ২৮ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ১১ ঘণ্টার প্রবল বর্ষণে রংপুর সিটির ৩৩টি ওয়ার্ডের ৯০ ভাগ এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধসহ জনগণের নানা দুর্ভোগের চিত্র ফুটে উঠেছে।

পত্রিকাটির একই তারিখের অন্য এক প্রতিবেদনে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমারসহ ১৬টি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও ভাঙনে রংপুর বিভাগের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, কুড়িগ্রাম, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, সৈয়দপুর, ঘোড়াঘাট ইত্যাদি স্থানে আমন ফসল, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির বিশদ বর্ণনা রয়েছে।

২৭ সেপ্টেম্বর আরেকটি দৈনিকের (প্রথম আলো) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রাম, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে এরই মধ্যে ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে।

অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবেছে। নদীভাঙনে এক সপ্তাহে কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দুই শতাধিক ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা বিলীন হয়েছে। যমুনা নদীতে পানি বাড়ায় রাজশাহী বিভাগের বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চরাঞ্চলের ছয়শ’র বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এ মৌসুমে এর আগে দু’দফায় বন্যায় নাকাল হয়েছে তারা। এবার নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে ভাঙন। বসতি, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি হারিয়ে দিশেহারা দুর্গম এসব চরের হাজারও মানুষ। জেলার শেরপুর উপজেলার ২৫ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় রোপা আমন ও সবজির বিস্তীর্ণ মাঠ এখন পানিতে নিমজ্জিত।

প্রাচীনকাল থেকে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন কৃষি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে আবাদি জমির পরিমাণ যথাক্রমে ২৮ লাখ ৫৮ হাজার ৭০৪ হেক্টর এবং ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬৪ হেক্টর। দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ রংপুর বিভাগ বা অঞ্চলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ আবাদি জমি থাকলেও সেখানকার কৃষি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ এ অঞ্চলে ফসলি জমির মাত্র ১৫ শতাংশ সেচের আওতায় এসেছে, যখন ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগে যথাক্রমে ৯৫, ৭৯, ৭৪, ৫৮ ও ৫০ শতাংশ আবাদি জমি সেচ সুবিধার আওতায় রয়েছে। সেচ সুবিধা বাড়ানো গেলে রংপুর অঞ্চলে শস্যের উৎপাদনশীলতা ও নিবিড়তা আরও বাড়বে, যা কৃষকদের আয় বাড়াতে সহায়ক হবে। তাছাড়া ফসলের উৎপাদন বাড়লেও উন্নত বিপণন ব্যবস্থার অভাবে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ফলে তাদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না।

উত্তরাঞ্চলের রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে দফায় দফায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি হল আমন ফসলের ক্ষতি। বিশেষ করে চতুর্থ দফা বন্যায় যে হাজার হাজার হেক্টর জমির আমন ফসল ডুবে গেছে, সেসব জমিতে নতুন করে আমন চারা লাগানোর জন্য যেমন চারা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তেমনি নেই চারা লাগানোর সময়।

এতে উত্তরাঞ্চলে আমনের উৎপাদন হ্রাস পাবে, যা একদিকে জাতীয় চাল উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং অন্যদিকে ধারদেনা করে ধান উৎপাদনে নিয়োজিত ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা চাষীদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

দেশের উত্তরাঞ্চলটি যুগ যুগ ধরে শিল্প খাতে রয়ে গেছে অনুন্নত। ইংরেজ আমলের কথা বাদ দিলেও পাকিস্তান আমলে শিল্প খাতে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, তা ছিল ভারী শিল্প খাতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা এবং দুটি বড় সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সহজগম্য না থাকায় সঙ্গত কারণে উত্তরাঞ্চলে বৃহৎ শিল্পের প্রসার ঘটেনি। বাংলাদেশ আমলেও এখানে বড় বা মাঝারি ধরনের শিল্পের তেমন প্রসার ঘটেনি। অবকাঠামোগত সুবিধার অভাব, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎপ্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা, পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের অভাবে উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে গ্যাসভিত্তিক শিল্প স্থাপনে শিল্পোদ্যোক্তারা বড় ও মাঝারি শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসছেন না।

বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় গ্যাসভিত্তিক ইউরিয়া সার কারখানা, সিরামিক শিল্প, ওষুধ শিল্প, তৈরি পোশাকশিল্প, অটো অ্যাসেম্বলি শিল্প ইত্যাদি গড়ে উঠতে পারছে না। ফলে বাড়ছে না সেখানকার মানুষের কর্মসংস্থান, লাঘব হচ্ছে না তাদের আর্থিক দুরবস্থা। বলার অপেক্ষা রাখে না, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে দারিদ্র্য হারে শীর্ষে রয়েছে বৃহত্তর দিনাজপুর ও বৃহত্তর রংপুর নিয়ে গঠিত রংপুর বিভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬ অনুযায়ী সেখানে দারিদ্র্যের হার ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১০ সালের হায়েসেও সেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল সবচেয়ে বেশি (৪২ দশমিক ৩ শতাংশ)।

দারিদ্র্র্যের হারে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে পাঁচটিই রংপুর বিভাগে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রাম অবস্থিত রংপুর বিভাগেই। সেখানে দারিদ্র্যের হার ৭০ শতাংশের উপরে, যা সরকার স্বীকৃত দারিদ্র্য হারের (২৪.৩ শতাংশ) প্রায় তিনগুণ। হায়েস ২০১৬ অনুযায়ী দারিদ্র্যের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ। সেখানে দারিদ্র্যের হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২৮ দশমিক ৯ এবং ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্য হার নিয়ে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ। ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্য হার নিয়ে বরিশাল বিভাগ রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে।

আশ্বিন-কার্তিক মাসে উত্তরাঞ্চলে কৃষি শ্রমিকদের তেমন একটা কাজ থাকে না। বিশেষ করে এ অঞ্চলে বহুল প্রচলিত মরা কার্তিকে বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় তারা পরিবারের সদস্যদের কোনো রকমে জীবনধারণের জন্য বড় কৃষকদের কাছে অন্য সময়ের তুলনায় অর্ধেক দামে আগাম শ্রম বিক্রি করে দেন। আমন ধান কাটার মৌসুমে অগ্রিম শ্রম বিক্রির কাজ করে দেন।

সুতরাং চরম দারিদ্র্য তাদের নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে এ বছর করোনা মহামারীর কারণে তারা দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে কাজ করতে যেতে পারছেন না। তাদের দরকার নগদ অর্থের। ক্রয়ক্ষমতার অভাবে তারা বাজার থেকে সংগ্রহ করতে পারছেন না প্রয়োজনীয় খাবার। তারা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

উত্তরাঞ্চলের বন্যার্তদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব। মিডিয়ার খবর অনুযায়ী এসব রোগের সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব ঘটেছে দেশের দরিদ্রতম জেলা কুড়িগ্রামে। সুচিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দুর্বল হয়ে পড়বে, যা কর্মক্ষম শ্রমশক্তির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৫-২০) স্বীকার করা হয়েছে যে, দীর্ঘ সময় নিয়ে দেশে আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে। আঞ্চলিক বৈষম্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে উত্তরাঞ্চল। দেশের আটটি বিভাগের দারিদ্র্যের হারের তালিকায় উত্তরাঞ্চলের দুটি বিভাগ রংপুর ও রাজশাহীর যথাক্রমে প্রথম ও তৃতীয় স্থান দখল এর জ্বলন্ত প্রমাণ। বৈষম্যে ভোগা পশ্চাৎপদ অঞ্চলের সমস্যাগুলোর সমাধানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেশকিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ক. পশ্চাৎপদ অঞ্চল তহবিল গঠন, খ. অবকাঠামো ব্যবধান হ্রাস, গ. পশ্চাৎপদ জেলাগুলোতে ম্যানুফ্যাকচারিং সুবিধাবলি বৃদ্ধি, ঘ. কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং ঙ. আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি।

এসব কৌশল বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা নেই। এসব কৌশল বাস্তবায়িত হলে পশ্চাৎপদ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে গতি আসবে। এতে এ অঞ্চলের মানুষ বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেঙে না পড়ে তা মোকাবেলার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাবে। তবে এ মুহূর্তে সরকারের উচিত হবে এ বছরের শেষ বন্যায় (সম্ভবত) ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চলের মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

স্বদেশ ভাবনা

উপর্যুপরি বন্যা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কষ্ট বাড়িয়েছে

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে দারিদ্র্যের হারে প্রথম ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা উত্তরাঞ্চলের যথাক্রমে রংপুর বিভাগ ও রাজশাহী বিভাগে চতুর্থ দফায় আঘাত হেনেছে বন্যা।

জুন-আগস্ট সময়ে দেশের মধ্যাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দফায় দফায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চল নতুন করে বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবে এমনিতেই যখন উত্তরাঞ্চলের মানুষ কৃষি ছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে দুঃখ-কষ্টের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে, তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চতুর্থ দফায় বন্যা এ অঞ্চলের মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

২৭ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রংপুর অঞ্চলে কয়েক দফা বন্যায় কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগের কয়েক দফা বন্যায় রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় কৃষিতে ১৭২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান বন্যায় রংপুর জেলায় ৭০০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১ হাজার ১৬৫, কুড়িগ্রামে ৫ হাজার ১৩৪, লালমনিরহাটে ১ হাজার ৩৬ এবং নীলফামারীতে ২১০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। পত্রিকাটির ২৮ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ১১ ঘণ্টার প্রবল বর্ষণে রংপুর সিটির ৩৩টি ওয়ার্ডের ৯০ ভাগ এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধসহ জনগণের নানা দুর্ভোগের চিত্র ফুটে উঠেছে।

পত্রিকাটির একই তারিখের অন্য এক প্রতিবেদনে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমারসহ ১৬টি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও ভাঙনে রংপুর বিভাগের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, কুড়িগ্রাম, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, সৈয়দপুর, ঘোড়াঘাট ইত্যাদি স্থানে আমন ফসল, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির বিশদ বর্ণনা রয়েছে।

২৭ সেপ্টেম্বর আরেকটি দৈনিকের (প্রথম আলো) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রাম, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে এরই মধ্যে ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে।

অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবেছে। নদীভাঙনে এক সপ্তাহে কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দুই শতাধিক ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা বিলীন হয়েছে। যমুনা নদীতে পানি বাড়ায় রাজশাহী বিভাগের বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চরাঞ্চলের ছয়শ’র বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এ মৌসুমে এর আগে দু’দফায় বন্যায় নাকাল হয়েছে তারা। এবার নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে ভাঙন। বসতি, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি হারিয়ে দিশেহারা দুর্গম এসব চরের হাজারও মানুষ। জেলার শেরপুর উপজেলার ২৫ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় রোপা আমন ও সবজির বিস্তীর্ণ মাঠ এখন পানিতে নিমজ্জিত।

প্রাচীনকাল থেকে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন কৃষি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে আবাদি জমির পরিমাণ যথাক্রমে ২৮ লাখ ৫৮ হাজার ৭০৪ হেক্টর এবং ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬৪ হেক্টর। দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ রংপুর বিভাগ বা অঞ্চলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ আবাদি জমি থাকলেও সেখানকার কৃষি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ এ অঞ্চলে ফসলি জমির মাত্র ১৫ শতাংশ সেচের আওতায় এসেছে, যখন ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগে যথাক্রমে ৯৫, ৭৯, ৭৪, ৫৮ ও ৫০ শতাংশ আবাদি জমি সেচ সুবিধার আওতায় রয়েছে। সেচ সুবিধা বাড়ানো গেলে রংপুর অঞ্চলে শস্যের উৎপাদনশীলতা ও নিবিড়তা আরও বাড়বে, যা কৃষকদের আয় বাড়াতে সহায়ক হবে। তাছাড়া ফসলের উৎপাদন বাড়লেও উন্নত বিপণন ব্যবস্থার অভাবে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ফলে তাদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না।

উত্তরাঞ্চলের রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে দফায় দফায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি হল আমন ফসলের ক্ষতি। বিশেষ করে চতুর্থ দফা বন্যায় যে হাজার হাজার হেক্টর জমির আমন ফসল ডুবে গেছে, সেসব জমিতে নতুন করে আমন চারা লাগানোর জন্য যেমন চারা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তেমনি নেই চারা লাগানোর সময়।

এতে উত্তরাঞ্চলে আমনের উৎপাদন হ্রাস পাবে, যা একদিকে জাতীয় চাল উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং অন্যদিকে ধারদেনা করে ধান উৎপাদনে নিয়োজিত ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা চাষীদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

দেশের উত্তরাঞ্চলটি যুগ যুগ ধরে শিল্প খাতে রয়ে গেছে অনুন্নত। ইংরেজ আমলের কথা বাদ দিলেও পাকিস্তান আমলে শিল্প খাতে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, তা ছিল ভারী শিল্প খাতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা এবং দুটি বড় সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সহজগম্য না থাকায় সঙ্গত কারণে উত্তরাঞ্চলে বৃহৎ শিল্পের প্রসার ঘটেনি। বাংলাদেশ আমলেও এখানে বড় বা মাঝারি ধরনের শিল্পের তেমন প্রসার ঘটেনি। অবকাঠামোগত সুবিধার অভাব, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎপ্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা, পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের অভাবে উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে গ্যাসভিত্তিক শিল্প স্থাপনে শিল্পোদ্যোক্তারা বড় ও মাঝারি শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসছেন না।

বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় গ্যাসভিত্তিক ইউরিয়া সার কারখানা, সিরামিক শিল্প, ওষুধ শিল্প, তৈরি পোশাকশিল্প, অটো অ্যাসেম্বলি শিল্প ইত্যাদি গড়ে উঠতে পারছে না। ফলে বাড়ছে না সেখানকার মানুষের কর্মসংস্থান, লাঘব হচ্ছে না তাদের আর্থিক দুরবস্থা। বলার অপেক্ষা রাখে না, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে দারিদ্র্য হারে শীর্ষে রয়েছে বৃহত্তর দিনাজপুর ও বৃহত্তর রংপুর নিয়ে গঠিত রংপুর বিভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬ অনুযায়ী সেখানে দারিদ্র্যের হার ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১০ সালের হায়েসেও সেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল সবচেয়ে বেশি (৪২ দশমিক ৩ শতাংশ)।

দারিদ্র্র্যের হারে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে পাঁচটিই রংপুর বিভাগে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রাম অবস্থিত রংপুর বিভাগেই। সেখানে দারিদ্র্যের হার ৭০ শতাংশের উপরে, যা সরকার স্বীকৃত দারিদ্র্য হারের (২৪.৩ শতাংশ) প্রায় তিনগুণ। হায়েস ২০১৬ অনুযায়ী দারিদ্র্যের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ। সেখানে দারিদ্র্যের হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২৮ দশমিক ৯ এবং ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্য হার নিয়ে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ। ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্য হার নিয়ে বরিশাল বিভাগ রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে।

আশ্বিন-কার্তিক মাসে উত্তরাঞ্চলে কৃষি শ্রমিকদের তেমন একটা কাজ থাকে না। বিশেষ করে এ অঞ্চলে বহুল প্রচলিত মরা কার্তিকে বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় তারা পরিবারের সদস্যদের কোনো রকমে জীবনধারণের জন্য বড় কৃষকদের কাছে অন্য সময়ের তুলনায় অর্ধেক দামে আগাম শ্রম বিক্রি করে দেন। আমন ধান কাটার মৌসুমে অগ্রিম শ্রম বিক্রির কাজ করে দেন।

সুতরাং চরম দারিদ্র্য তাদের নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে এ বছর করোনা মহামারীর কারণে তারা দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে কাজ করতে যেতে পারছেন না। তাদের দরকার নগদ অর্থের। ক্রয়ক্ষমতার অভাবে তারা বাজার থেকে সংগ্রহ করতে পারছেন না প্রয়োজনীয় খাবার। তারা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

উত্তরাঞ্চলের বন্যার্তদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব। মিডিয়ার খবর অনুযায়ী এসব রোগের সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব ঘটেছে দেশের দরিদ্রতম জেলা কুড়িগ্রামে। সুচিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দুর্বল হয়ে পড়বে, যা কর্মক্ষম শ্রমশক্তির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৫-২০) স্বীকার করা হয়েছে যে, দীর্ঘ সময় নিয়ে দেশে আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে। আঞ্চলিক বৈষম্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে উত্তরাঞ্চল। দেশের আটটি বিভাগের দারিদ্র্যের হারের তালিকায় উত্তরাঞ্চলের দুটি বিভাগ রংপুর ও রাজশাহীর যথাক্রমে প্রথম ও তৃতীয় স্থান দখল এর জ্বলন্ত প্রমাণ। বৈষম্যে ভোগা পশ্চাৎপদ অঞ্চলের সমস্যাগুলোর সমাধানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেশকিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ক. পশ্চাৎপদ অঞ্চল তহবিল গঠন, খ. অবকাঠামো ব্যবধান হ্রাস, গ. পশ্চাৎপদ জেলাগুলোতে ম্যানুফ্যাকচারিং সুবিধাবলি বৃদ্ধি, ঘ. কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং ঙ. আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি।

এসব কৌশল বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা নেই। এসব কৌশল বাস্তবায়িত হলে পশ্চাৎপদ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে গতি আসবে। এতে এ অঞ্চলের মানুষ বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেঙে না পড়ে তা মোকাবেলার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাবে। তবে এ মুহূর্তে সরকারের উচিত হবে এ বছরের শেষ বন্যায় (সম্ভবত) ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চলের মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]